কর্মতাপস আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় আদতে এক প্রফুল্ল স্মৃতি ।

*কর্মতাপস আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় আদতে এক প্রফুল্ল স্মৃতি*

                        
*প্রসূন কাঞ্জিলাল ।*


১৮৮৮ সাল।  জাহাজটা এসে কলকাতা বন্দরে থামতেই  নেমেছিলেন এক যুবক যিনি  ছ’বছর ‘এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়ে’ অধ্যয়ন করে সেখানকার ‘ডি.এস.সি.’ উপাধি লাভ করেছিলেন, আর সেখানে তাঁর প্রবন্ধ সর্বোৎকৃষ্ট বিবেচিত হওয়ার জন্য পঞ্চাশ পাউন্ডের একটা পুরস্কারও পেয়েছিলেন। সেই পুরস্কারের টাকাটা পুরোই লেগে গিয়েছিল জাহাজ ভাড়া ও প্রভৃতি খরচায়। তাই কলকাতায় পৌঁছেছিলেন একেবারে কপর্দকহীন অবস্থায়। জাহাজের কোষাধ্যক্ষের কাছে নিজের জিনিষপত্র জমা রেখে  ধার করে নিয়েছিলেন আটটি টাকা৷ যুবকের  পরণে ছিল সাহেবী পোষাক, কিন্তু  সেই পোষাকে আত্মীয়স্বজনের কাছে যেতে তাঁর দ্বিধাবোধ হচ্ছিল।  তাই জাহাজ থেকে নেমেই  ছুটে গিয়েছিলেন   বন্ধু  ‘জগদীশচন্দ্র বসু’ র বাড়িতে। তাঁর কাছ থেকে ধুতি, পাঞ্জাবি প'রে  তারপরে গিয়েছিলেন নিজের বাড়িতে। যুবকের নাম আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়। তখনকার দিনে বিলেতে পরীক্ষায় যাঁরা কৃতিত্ব দেখাতেন, তাঁরা সেখান থেকেই একটা চাকরির যোগাড় করে দেশে ফিরতেন। কিন্তু প্রফুল্লচন্দ্র সে রকম কিছু করে আসেন নি। তাই তাঁকে গোটা একটা বছর নিজের দেশে বেকার থাকার পরে  পেয়েছিলেন প্রেসিডেন্সি কলেজে সরকারী অধ্যাপকের পদ। সেটাও আবার ‘আই. ই. এস.’ তো নয়ই, ‘বি.ই.এস’-ও নয়; শ্রেণীর বাইরে আড়াই শো’ টাকা বেতনের এক পদ। এরপরে তাঁর হাতে ‘Mercurous nitrite’ আবিষ্কৃত হয়েছিল, তিনি হিন্দু রসায়নবিদ্যার ইতিহাস লেখার মালমশলা সংগৃহীত করছিলেন, সঙ্গে সঙ্গে তাঁর চেষ্টা চলছিল কি করে বক্তৃতার দ্বারা, বিভিন্ন পরীক্ষার মধ্য দিয়ে বিজ্ঞানকে ছাত্রদের কাছে মনোজ্ঞ করে তোলা যায়। প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের  সফলকাম হতে বিলম্ব হয়নি;  কলেজের ঠিক  পাশের ঘরেই ছিলেন তাঁর জুটি পদার্থবিদ্যার অধ্যাপক জগদীশচন্দ্র বসু। সেই সময় অন্য কলেজের ছাত্রেরা দলে দলে এসে তাঁদের বক্তৃতা শুনে যেতেন। সে সময় প্রেসিডেন্সী কলেজ বললেই বোঝাত ‘জে.সি.বোস-পি.সি রায়’। তৎকালীন সময়ের স্মৃতিচারণ করে ১৯৬১ সালে একটি প্রবন্ধে ‘চারুচন্দ্র ভট্টাচার্য’ মহাশয়  লিখেছিলেন, ‘‘কলকাতায় 5th Class থেকে পড়ছি। এই দুই মহাজ্ঞানীর নাম চারদিকে, কিন্তু কি দুদৈব! এফ-এ পাস করলুম, আজও এঁদের দর্শন লাভের সুযোগ ঘটল না। ১৯০১ সালের জুলাই মাসের প্রথম দিক। আজ থেকে ঠিক ষাট বছর আগের এক দিন। আর কে ঠেকায়, আজ তো প্রফুল্লচন্দ্রকে দেখব, খুব কাছ থেকেই দেখব, সপ্তাহে তিন-চার দিন করে দেখব। তিনি যে আমাদের ক্লাস নেবেন! প্রেসিডেন্সি কলেজে তৃতীয় বার্ষিক শ্রেণীতে ভর্তি হয়েছি। ১১টা থেকে ১২টা অবধি একটা ক্লাস ছিল। ঘন্টা বাজল, আমরা বারাণ্ডা দিয়ে ছুটতে থাকলুম, কে সামনে গিয়ে বসতে পারে। সব গিয়ে হাজির হলুম। দ্বিতীয় ঘন্টা পড়ল, দরজা খুলে বেয়ারা ঢুকল, হাতে  রেজিষ্টারি। টেবিলের উপর সেটা  রেখে পাশে গিয়ে সে দাঁড়াল। উদ্‌গ্রীব হয়ে ওই দরজার দিকে সকলে তাকিয়ে আছি, স্মিতমুখে প্রবেশ করলেন অধ্যাপক মশাই। বিলেত ফেরৎ, অথচ টাই বাঁধা নেই, গলাবন্ধ একটা কোট পরা, কোটটা সুতির, সাদা-কালো চৌখুপিওয়ালা ছিটের। রেজিষ্টারি খুলে নাম ডাকলেন, ছাত্রদের একটু-আধটু পরিচয় নিতে থাকলেন। কিন্তু সে কথা থাক। যেটা বিশেষভাৰে চোখে পড়ল সেটা হলো এই - তাঁর গায়ে যে রকমের কোট অবিকল সেই রকমের কোট ওই বেয়ারার গায়ে । বিকালে প্র্যাকটিক্যাল ক্লাসে কথাটা পাড়লুম গুপীবাবুর কাছে। ‘স্যার, এটা কি রকম হলো, অধ্যাপকের গায়ে যে রকমের কোট ওই বেয়ারার গায়ে অবিকল সেই রকমের কোট!’ হাসতে হাসতে গুপিবাবু বললেন, ‘হ্যাঁ, হে, একটা থান কিনে চারটা কোট করিয়েছিলেন, দুটো বেয়ারাকে দিয়েছেন, দুটো নিজে পরেন।’ একটা কথা চলতি আছে, একজন লোকের চেহারা দেখে, তাঁর বেশভূষা দেখে, ভিতরের মানুষকে চেনা যায় না। কিন্তু এই তো প্রথম দিনেই চেনা গেল আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়কে। এর বহু বছর পরে এক দিনের এক ঘটনা - জ্যৈষ্ঠ মাস, ভীষণ গরম, সকাল থেকে গুমোট করে রয়েছে। বেলা ৮টা সাড়ে ৮টা হবে।  আমার এক ছাত্র,সতীশ মিত্র  এসে বলল পি.সি.রায়কে আমি কাছ থেকে দেখিনি, আমাকে নিয়ে চলুন তাঁর কাছে, আলাপ করিয়ে দিন। আচার্যদেব এখন থাকেন বিজ্ঞান কলেজের দোতলায় দক্ষিণ দিকের এক ঘরে। ঘর খোলা থাকে, অবারিত দ্বার, যাঁর যখন ইচ্ছে যাচ্ছে। আমরা ঘরে ঢুকলুম, দেখলুম তিনি শুয়ে শুয়ে পড়ছেন সেক্সপীয়র। বললেন, ‘বোস, শোন এই জায়গাটা’ - বলে কিছুটা পড়ে গেলেন। তারপর, ‘কি মনে করে, বল।’ আমি বললুম – ‘এই ছেলেটি স্যার রমেশচন্দ্র মিত্রের পৌত্র, - আমাদের কলেজ থেকে বি.এস.সি পাশ করেছে।’ অনেকক্ষণ ধরে নানা কথাবার্তা হবার পর যখন বাইরে বারাণ্ডায় বেরিয়ে এলুম তখন  সতীশ আমাকে বলল - ‘দেখলুম ওঁর ঘরে পাখা নেই, আমি আজ দুপুরে একখানা পাখা ও একজন মিস্ত্রী  সঙ্গে করে এসে ওঁর ঘরে পাখা টাঙিয়ে দিয়ে যাব।’ আমি বললুম, – ‘দাঁড়াও, ওঁকে একবার জিজ্ঞেস করে আসি।’ ‘এ আর - কি জিজ্ঞেস করবেন!’ ‘না, হে, না, জিজ্ঞেস করা ভালো!’ দু’জনে আবার ফিরে গেলুম তাঁর ঘরে। সতীশের প্রস্তাবের কথাটা তাঁকে জানালুম। দমাস্ করে একটা কিল পড়ল আমার পিঠে। দরজার দিকে আঙুল দেখিয়ে বললেন - ‘এটা কোন্ দিক?’ ‘কেন, স্যার, দক্ষিণ দিক।’ ‘তবে!’ আমি চুপ করে রইলুম। এই ‘তবে’ কথাটার মানে ঠিক বুঝতে পারছিলুম না।  ‘দরজা খুলে রাখলে প্রচুর হাওয়া আসে, পাখার কোন দরকার হয় না।’কথা গুলো  বলে তিনি আবার নিজের স্থানে ফিরে গেলেন। আমরা হতবাক্। ঘরের দক্ষিণ দিকে একটা দরজার থাকলে সে ঘরে পাখার দরকার হয় না, সেটা বুঝতে একটু দেরি হচ্ছিল। চুপচাপ যে যাঁর বাড়ির দিকে রওনা হলুম। একদিন দুপুর বেলা আচার্যদেবের কাছে গেলুম। সেদিন ছিল রবিবার, সুতরাং পরীক্ষাগারে থাকতেন না, তাঁর ঘরেই তাঁকে পেলুম। কাজ সেরে চলে আসছি। ওই ঘরের মধ্যেই ছোট একটু ঘেরা জায়গায় কুকারে তার রান্না চড়েছিল। সামনে বেয়ারা ছিল, তাঁকে জিজ্ঞেস করলুম – ‘আজ কি রান্না হচ্ছে?’ বললো - ‘ভাত, মুশুরির ডাল, আলুসিদ্ধ।’ আমাদের কথাবার্তা বোধ হয় আচার্যদেবের কানে পৌঁছেছিল। তিনি এগিয়ে এসে বললেন - ‘মাখন দিয়ে আলুসিদ্ধ খেয়েছ? চমৎকার! একেবারে অমৃত! আমি মাঝে মাঝে খাই।’ বলে ফিরে গেলেন। ‘মাঝে মাঝে খাই।’ রোজ খাবার পয়সা কোথায়! সাতশ টাকা মাসে মাইনে, তার সবই তো প্রায় যায় ছাত্রদের দিতে। বেঙ্গল কেমিক্যালের ডিরেক্টর হিসেবে যা পান তাও তো সেখানকার কর্মীদের ক্লাবে দিয়ে আসেন, তাঁরা আমোদ-আহ্লাদ করবে। আর বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পরীক্ষক হিসেবে যা আসে সেটাও  যায় অন্য এক প্রতিষ্ঠানে। বাড়তি টাকা আর কটা!’’ এই কারণেই তাঁর যখন সত্তর বছর বয়স পূর্ণ হয়েছিল তখন কারাবন্দী গান্ধীজি জেল থেকেই ‘চারুচন্দ্র ভট্টাচার্য’কে একটা চিঠিতে লিখেছিলেন - ‘‘It took my breath away when I heard that out of his princely salary he kept only a few rupees for himself and the rest he devoted to public uses and particularly for helping poor students.’’ একজন উচ্চ প্রতিষ্ঠিত গবেষক, বৈজ্ঞানিক, শিক্ষক, লেখক ও একটা আস্ত প্রতিষ্ঠানের ডিরেক্টর হয়ে এই ধরণের জীবন যাপন করা এখন কি কেউ কল্পনা করতে পারেন? এতো পুরোপুরি এক সাধকের জীবন! সম্ভবতঃ তাই নিজের জীবনের একেবারে শেষের দিকে পৌঁছে ‘চারুচন্দ্র ভট্টাচার্য’ লিখেছিলেন, ‘‘পারের দিকে এক পা এগিয়ে দিয়েছি। দ্বিতীয় পদক্ষেপের আর বিলম্ব নেই। সেখানে পৌঁছলে সেখানকার অধিকর্তা যখন জিজ্ঞেস করবেন - পৃথিবীতে পাঠালুম, কি দেখে এলে? পৃথিবীর খুব বেশি কিছু দেখি নি, তবে দেখেছি - উত্তরে বলব - একটি ধানের শিষের উপরে একটি শিশির বিন্দু। আর মানুষ দেখেছি খুব বেশি নয়। তাঁদের মধ্যে একজন হলেন - প্রফুল্লচন্দ্র রায়।’’ প্রফুল্লচন্দ্রের একটি প্রধান বিশেষত্ব ছিল ছাত্রদের কৃতিত্বে তিনি যে রকম আনন্দ ও গৌরব অনুভব করতেন নিজের কৃতকার্যতাতেও বোধ হয় সেটা করতেন না। এতেই বোঝা যায় ছাত্রদের প্রতি তাঁর স্নেহ কতটা আন্তরিক ছিল এবং গবেষণার কাজের প্রতি তাঁর কত প্রগাঢ় অনুরাগ ছিল। কাজকে বড় করে তিনি নিজেকে সব সময় আড়ালে রাখতেন। যদিও তিনি জীবনব্যাপী রসায়ন শাস্ত্রের সেবা করে গিয়েছিলেন এবং সেটাই ছিল তাঁর অতিপ্রিয় শাস্ত্র তবু অন্যান্য বিষয়ে বিশেষতঃ সাহিত্য, ইতিহাস, রাজনীতি ও অর্থনীতি তাঁর অবসরের সঙ্গী ছিল। তাঁর পুস্তকাগার দেখলেই বোঝা যেত যে তাঁর অনুসন্ধিৎসা কত সৰ্ব্বতোমুখী ছিল। তবে নিজেকে কেবল গবেষণাগারে আবদ্ধ রাখেননি দেশের সকল অবস্থার সঙ্গেই তাঁর গভীর সংযোগ ছিল। এখন কেউ বই বিশেষ মনোযোগ দিয়ে পড়তে চান না। কোন মতে পড়ে, পরীক্ষায় ভালো নম্বর নিয়ে পাশ করে যাওয়াই সকলের লক্ষ্য থাকে। এই বিষয়ে তাঁরও আক্ষেপ ছিল। তাই তিনি বলেছিলেন, ‘‘আমরা যে বিদেশী ডিগ্রীর জন্য ব্যস্ত হই, সেটাও আমাদের দাস মনোভাবের ফল। আসল জিনিস হচ্ছে জ্ঞান-স্পৃহা। পড়াশুনা করতে চাইলে আমাদের যে সব লাইব্রেরী আছে তাতেও যথেষ্ট বই পাওয়া যায়। কলিকাতার Imperial Library ও University Library থেকে আমি বছরে অন্ততঃ এক হাজার বই নিয়ে পড়ি। পড়ি, নোট করি - যেন রাত পোহালে আমার এম.এ.এগ্‌জামিন। দেশে যে সব লাইব্রেরী আছে তারও সদ্ব্যবহার দেশের লোক করে না। সারবান বই খুব কম লোকেই পড়ে।’’
এবারে চলে যাওয়া যাক ইংরাজী ১৯১৯ সালে। কলকাতা মহানগরীর বুকে আপার সার্কুলার রোডের উপরে ছিল এক বিশাল অট্টালিকা। সেটার ছোট্ট একটা কামরায় বাস করতেন শীর্ণকায় এক বৃদ্ধ। তাঁর মাথার চুলগুলো ছিল ছোট ছোট করে ছাঁটা। তাঁর মুখমণ্ডল ছিল কাঁচা পাকা দাড়ি গোঁফে ভর্তি। যেমন সাধাসিধে ছিল তাঁর বেশভূষা, তেমনি ছিল তাঁর চেহারা, আর ঠিক তেমনি ছিল তাঁর স্বভাব। বাহ্যিক আড়ম্বর বা জাঁকজমক তাঁর জীবনে কখনও স্থান পায়নি। তাঁর ঘরের আসবাবপত্র ছিল আরও সাধারণ। একখানা হোট চৌকি (দড়ির খাটিয়া) আর দুটো ছোট ছোট কাঠের আলমারি; তাও সেগুলো একেবারে আজে বাজে কেরোসিন কাঠের তৈরী ছিল। সেই বৃদ্ধের জীবন-ইতিহাসে বিশ্রাম ও বাবুগিরি বলে কোন কথা লেখা ছিল না। তবুও দিন-রাত চব্বিশ ঘন্টার মধ্যে যে পাঁচ কি ছয় ঘন্টা অবসর পেতেন সেটাও তিনি কাটাতেন সেই দড়ির খাটিয়ায়। কাঠের দুটো আলমারিতে থাকতো সারা সপ্তাহের খোরাক। চিঁড়ে, মুড়ি, গুড়, নারকেলের সন্দেশ অথবা ওরকম ধরণের ঘরে তৈরী একেবারে আটপৌরে কোন খাবার। সপ্তাহের শেষের দিকে, শনি-রবিবারের মধ্যে, ডাক বিভাগ ও লোক মারফত বর্মা থেকে শুরু করে পাঠান অঞ্চল, নানা জায়গা থেকে খাবার তাঁর কাছে এসে যেত। তাছাড়া অনেক সময় ভারতের বাইরে থেকেও তাঁর কাছে খাবার আসতো। যেই নানাপ্রকার খাবারে ভরে উঠতো তাঁর ছোট্ট কাঠের দুটো আলমারি অমনি বৃদ্ধের মনও ভরে উঠতো খুশীতে। তবে তাঁর সেই খুশি বেশিদিন থাকত না। কারণ, রবিবার হলেই তাঁর কাছে এসে উপস্থিত হতেন একজোড়া বিরাট গোঁফের অধিকারী - তাঁর গোঁফজোড়ার অনুপাতে দেহটাও ছিল তেমনি। তিনি শুধু জবরদস্ত গোঁফের মালিক ছিলেন না। যেমনি ছিল তাঁর গোঁফ জোড়া, তেমনি ছিল তাঁর দেহ, তেমনি ছিল তাঁর বিদ্যা আর ঠিক তেমনি ছিল তাঁর মনের বিরাটত্ব। তাছাড়া সবচেয়ে মজার জিনিস ছিল তাঁর খাবার বহর। দু’তিন ঘন্টার মধ্যে তিনি একাই সাবাড় করে দিতে পারতেন পুরো দুটো আলমারির চিঁড়ে, গুড়, মুড়ি, সন্দেশ। সেই বিশাল বপু ও গোঁফের মালিককে সারা ভারত চিনত ‘বাংলার বাঘ’ নামে। তবে তাঁর আসল নাম ছিল ‘স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়’। বৃদ্ধের ঘরের পাশে ছিল আরও দুটি স্বল্প পরিসর কামরা। সেখানে থাকতেন কয়েকটি ছাত্র। তাঁরা দরিদ্র ছিলেন এবং ঐ বৃদ্ধের সরাসরি তত্ত্বাবধানে থেকে তাঁরই কাছে লেখাপড়া শিখতেন। বৃদ্ধের কাছে লক্ষ্মী-সরস্বতী দু’জনেই বাঁধা পড়েছিলেন। অবশ্য একথা বললে একটুকুও বাড়িয়ে বলা হবে না যে, বৃদ্ধের আজীবন সাধনা ছিল এক হাতে লক্ষ্মী আর অন্য হাতে সরস্বতী বিলিয়ে যাওয়া - যে যত পারো কুড়িয়ে নাও। একদিন একটা বড় মজার ব্যাপার ঘটেছিল বৃদ্ধের পাশের কামরায়। ছাত্ররা কলেজ থেকে ফিরে এসে যে যাঁর জামাকাপড় ছাড়তে ব্যস্ত  হঠাৎ  ঘরের মধ্যে কোন মানুষের একটা গোঁ গোঁ শব্দে সবাই চমকে উঠেছিলেন। ব্যাপার কি? মনে হচ্ছে কে যেন একটা বিপদে পড়ে বেশ কষ্ট পাচ্ছে। হয়তো কিছুতেই বিপদ মুক্ত হতে পারছে না। তাই এই কাতরানি! সবাই উদগ্রীব হয়ে তাকিয়ে দেখেছিলেন তাঁদেরই একজনের গায়ের জামা কেন জানি আর খুলতে চাইছে না! সেই দৃশ্য দেখে বাকী ছাত্ররা বেশ কৌতুক অনুভব করেছিলেন। তাঁরা বিনাপয়সায় ঘরে বসে বহুদিন বাদে অমন সুন্দর সার্কাস দেখছিলেন! সেই ছাত্রের দুঃখে সমবেদনা জানানো তো দূরের কথা, বাকিরা আনন্দে হেসেই কুটিপাটি হচ্ছিলেন। এমনি সময় কী ব্যাপার দেখতে, বিপদ থেকে সেই ছাত্রকে উদ্ধার করতে এগিয়ে এসেছিলেন বৃদ্ধ। ছাত্রটির অবস্থা দেখেই বৃদ্ধ বুঝতে পেরেছিলেন যে, ব্যাপারটা অত্যন্ত ঘোরালো! এখন কি উপায়ে সেই ছাত্রের গায়ের জামা খোলা যাবে? যে দর্জি জামা তৈরী করেছিলেন তিনি কি বোকা ছিলেন! তিনি জামার সামনের দিকে কয়েকটি বোতাম লাগিয়ে দিয়েছিলেন। যতবার জামা খোলো আর পরো ততবার বোতাম খোলো আর লাগাও। এত কি সব কাজের কথা মনে রাখা সম্ভব। আর সময়ই বা কোথায় অত। তাও আবার ওই কাঁচা বয়সে! বয়স বাড়লে হয়ত সেই ছাত্রটি চিন্তা করতে পারত ওসব কথা। আসলে কোন চিন্তায় মগ্ন থাকা অবস্থায় সেই ছাত্রটি জামা খুলতে গিয়েছিলেন। বোতামের কথা তাঁর মাথাতেই ছিল না। ফলে যা হওয়ার সেটাই হয়েছিল। শেষে সেই বৃদ্ধ ছাত্রটির শার্টের সামনের দিকের বোতাম কয়টি খুলে দিয়ে তাঁর পিঠ চাপড়ে সহাস্যে বলেছিলেন, ‘‘আস্ত একটি দার্শনিক নিয়ে মুস্কিলে পড়েছি।’’ সেই শীর্ণকায় বৃদ্ধ ছিলেন বিজ্ঞানাচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়। সেই ‘দার্শনিক’ ছাত্রটি ছিলেন মানিকগঞ্জের অধিবাসী, ঢাকার জুবিলী স্কুলের ছাত্র বিজ্ঞানবিদ ‘ডক্টর মেঘনাদ সাহা’। সেখানে উপস্থিত বাকী ছাত্ররা ছিলেন - ‘ডক্টর জ্ঞান ঘোষ’, ‘ডক্টর জ্ঞান মুখার্জী’, ‘শ্রীচারু মুখার্জী’ ও ‘শ্রীরাসবিহারী দাস’। ভারতের বিজ্ঞানক্ষেত্রে তাঁদের অবদানের কথা সর্বজনবিদিত। ‘মহম্মদ শহীদুল্লাহ’ তাঁর এক স্মৃতিচারণে প্রফুল্ল চন্দ্র রায় কে প্রথমবার দেখার অভিজ্ঞতা জানিয়ে লিখেছিলেন, ‘‘ছেলেবেলায় লোকমুখে শুনেছিলাম ‘লক্ষ মুদ্রা মূল্যে ডাঃ পি.সি রায়ের মাথা বিক্রী হয়ে গেছে।’ এই ছোট্ট গ্রাম্য কথাটির তাৎপর্য ঠিক তখন বুঝতে পারিনি। সেবার বৈশাখে যখন শুনতে পেলাম প্রতি বছরের ন্যায় এবারও ডাঃ রায় কিছুদিনের অবকাশ যাপনের উদ্দেশ্যে স্বগ্রামে আসছেন, তখন আগে থেকেই তৈরী হতে শুরু করলাম তাঁকে দেখবার জন্য৷ বিশেষভাবে, তাঁর মাথা দেখতে হবে। কি ধরণের তৈরী, না জানি কতবড় সে মাথা, যা’ দু’দশ টাকা নয় একেবারে লক্ষ টাকায় বিক্ৰী হ’ল! ডাঃ রায়ের চেহারা-ছবি, আচার-ব্যবহার, চাল-চলন, পোষাক-পরিচ্ছদ সম্বন্ধে পূর্বাহ্নে একটা কল্পনা করে রেখেছিলাম। যদি আমার সে কল্পনা শেষ পর্যন্ত একবিন্দুও সত্য হয়নি। তাই, প্রথমে বিশ্বাস করতে পারি নাই নিজের চোখ নিজের কানকে। কল্পনার আংশিক সত্য হওয়া ত’ দূরের কথা - একেবারে বিপরীত। ভেবেছিলাম হয়ত দেখতে পাব হ্যাট, কোট, প্যান্ট পরা এক সাহেব। তার পরিবর্তে দেখতে পেলাম এক অতি শীর্ণ, দীর্ঘকায়, শান্ত-শিষ্ট প্রশান্ত বৃদ্ধকে। মুখময় কাঁচা-পাকা দাড়ি-গোঁফে ভর্তি, গায়ে খদ্দরের ফতুয়া, পরণে মোটা সূতার একখানা ধুতী, তাও হাঁটু ঢেকেছে মাত্র। পায়ে তালতলার চটি। চেহারা থেকে শুরু করে অশন-বসন, আহার-বিহার, চাল-চলন, কথা-বার্তা কিছুতেই তাঁর সাহেবিয়ানার বা বাবুগিরির চিহ্ন নাই। খটখট করে দৃঢ় পদক্ষেপে এগিয়ে চলেছেন বৃদ্ধ তাঁরই প্রিয় শিষ্য তৎকালীন কপিলমুনি উচ্চ ইংরাজী বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শ্রীযুক্ত রাসবিহারী দাস মহাশয়ের কাঁধে ভর দিয়ে। বিদ্যা, বুদ্ধি, সামর্থ্যে যাঁর দেহের প্রতি অণু-পরমাণু উজ্জ্বল, তাঁর আবার কিসের প্রয়োজন বাহ্যিক অলঙ্কারের?’’ আসলে প্রফুল্লচন্দ্রের কাছে জাতি, ধর্ম, ইতর, ভদ্র, দেশ কাল বা পাত্রের মধ্যে কোন পার্থক্য ছিল না। দরিদ্রের জন্য তাঁর লক্ষ্মী-ভাণ্ডারের দ্বার সব সময়ে উন্মুক্ত ছিল।

হরিশ্চন্দ্র রায়। ভদ্রলোকের জমিদারি তখন পড়তির দিকে। বাড়িতে পাওনাদারদের নিয়মিত কড়া নাড়া। স্ত্রী ভুবনমোহিনীদেবী অঝোরে কাঁদতে কাঁদতে নিজের গয়নার টাকায় কেনা জমিদারির তালুক বিক্রির কাগজে সই করছেন। তাঁদের কলকাতার বাসা উঠিয়ে দিয়ে  ফিরলেন খুলনার গাঁয়ে। ছেলেরা উঠলেন হস্টেলে।

সেজো ছেলের (জন্ম, ২ অগস্ট, ১৮৬১) জীবনে এই দৃশ্যটি মনে থেকে গেল। কিছু দিন পরে সেই ছেলেই উচ্চশিক্ষার জন্য বিলেতের পথে রওনা দিতে উদ্যোগী হলেন। যাওয়ার আগে মা’কে বললেন, ‘জীবনে সাফল্য লাভ করলে, প্রথমেই সম্পত্তি পুনরুদ্ধার ও বাড়ির সংস্কার করব।’

সে কাজ বেশ কিছুটা করেওছিলেন। কিন্তু বাড়ির তুলনায় বাইরের জগৎ তাঁকে যে বেশি টানে। সেই টান আর দেশের কাজের জন্যই তিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায় ‘আচার্য’। তিনিই প্রফুল্লচন্দ্র রায়।

তাঁর বৈজ্ঞানিক কাজকর্ম বিশ্লেষণের ধৃষ্টতা এই নিবন্ধের উদ্দেশ্য নয়। শুধু একটি বিষয়ই বলা যেতে পারে, তা হল— মারকিউরাস নাইট্রাইটের আবিষ্কারকে প্রফুল্লচন্দ্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৃতিত্ব হিসেবে ধরা হলেও যৌগটির ‘অস্তিত্ব’ এখনও অধরা, দাবি বিজ্ঞানীদের একাংশের। বরং তাঁর বৈজ্ঞানিক কৃতিত্ব, ‘জৈব নাইট্রাইট, গন্ধকযুক্ত বিবিধ জৈব যৌগ এবং ধাতব লবণের সঙ্গে তাদের বিক্রিয়া, জৈব হ্যালোজেন যৌগ বিশেষত ফ্লোরিনযুক্ত এবং পারদের ধাতু যুক্ত জৈব যৌগ— এ সবের প্রস্তুতি ও পরীক্ষণের সূচনা’ করা। কিন্তু এ বিষয়গুলি বহুল চর্চিত। তাই জীবনভর নানা কাজ, জেদের মধ্য দিয়ে কী ভাবে প্রফুল্ল-চরিত্র তৈরি হয়েছিল, তা সন্ধানেরই চেষ্টা করব আমরা।

জন্মস্থান রাড়ুলি গ্রামেই স্কুলছাত্র তখন প্রফুল্লচন্দ্র। ইতিহাস, ভূগোলের নানা বইয়ে মুখ গুঁজে থাকেন। একদিন মনে হল, বাবার ভূগোলের জ্ঞান পরীক্ষা করলে কেমন হয়! শিশু প্রফুল্লচন্দ্রের প্রশ্ন, ‘আচ্ছা, সিবাস্টোপল কোথায়?’ মুহূর্তে বাবা হরিশ্চন্দ্রের উত্তর, ‘কী সিবাস্টোপলের কথা বলছ? ইংরেজরা ওই শহর কী ভাবে অবরোধ করল, তা যেন চোখে ভাসে!’ (‘সিজ় অব সিবাস্টোপল’, ১৮৫৪-৫৫) — প্রফুল্লচন্দ্রের মানসিক গঠনের প্রস্তুতি-পর্বে তাঁর বাবার ভূমিকা বিশেষ ভাবে স্মরণীয়। তিনি পাশ্চাত্য শিক্ষার গুরুত্ব উপলব্ধি করেছিলেন। বাড়িতে ডিএল রিচার্ডসনের ‘সিলেকশনস ফ্রম দ্য ব্রিটিশ পোয়েটস’-সহ দেশ-বিদেশের নানা বই, ‘তত্ত্ববোধিনী’, ‘অমৃতবাজার’, ‘সোমপ্রকাশ’, ‘হিন্দু পেট্রিয়ট’-সহ নানা পত্রিকার বিপুল সম্ভার তাঁর। গ্রামে একটি ইংরেজি-বাংলা স্কুলও প্রতিষ্ঠা করেন তিনি।

এমনকি, তাঁরই উদ্যোগে এক বার গ্রামের স্কুলের পণ্ডিত পৈতেত্যাগী মোহনলাল বিদ্যাবাগীশ বিধবা বিবাহেও সম্মত হলেন। লোকজনের বাধায় তা সম্পন্ন হল না। এমন প্রগতিবাদী হরিশ্চন্দ্র ও টাকীর কালীনাথ মুন্সিকে নিয়ে ছড়া কাটল গোঁড়ার দল: ‘‘হা কৃষ্ণ, হা হরি, এ কি ঘটাইল,/ রাড়ুলি টাকীর ন্যায় দেশ মজাইল।’’

বাবার পরিকল্পনাতেই কলকাতায় পড়তে আসা, ওঠা ১৩২ নম্বর আমহার্স্ট স্ট্রিটের বাসা, চাঁপাতলায়। হেয়ার স্কুলে ভর্তি হলেন। ১৮৭০-এর কলকাতায় তখন কলে জল সরবরাহ শুরু হয়েছে। বিজ্ঞান-মনের অধিকারী বালক প্রফুল্লচন্দ্র বিষয়টি অবাক বিস্ময়ে দেখতে থাকলেন। বারবার ছুটে যেতেন ময়দানে, অ্যালবার্ট হলে কেশবচন্দ্র সেনের ওজস্বী বক্তৃতা শুনতে। ব্রাহ্ম ধর্মের প্রতি অনুরাগ এই সময় থেকেই তৈরি হল। পাশাপাশি, ভোর তিনটে-চারটে থেকে উঠে পাঠ্যক্রমের বাইরের বই পড়াও চলতে থাকল নিয়মিত।

এর ফল হল মারাত্মক, কৈশোরে কঠিন রোগে পড়লেন প্রফুল্লচন্দ্র। স্কুলের পাঠে প্রায় দু’বছরের জন্য ইতি। ওই পর্বে ল্যাটিন ‘সামান্য কিছু’ শিখে ফেললেন। মোটামুটি সুস্থ হওয়ার পরে ভর্তি হলেন মূলত ব্রাহ্মদের দ্বারা পরিচালিত অ্যালবার্ট স্কুলে। এখানে যেন প্রাণ ভরে নিঃশ্বাস নিলেন প্রফুল্লচন্দ্র। ‘রেক্টর’ কেশবচন্দ্রের ভাই কৃষ্ণবিহারী সেনের ইং‌রেজি সাহিত্য পড়ানোর প্রতি তৈরি হল বিশেষ মুগ্ধতা।

প্রবেশিকা পরীক্ষায় শিক্ষকদের ‘আশানুরূপ’ ফল কিন্তু তাঁর হল না। এর পরে, বিদ্যাসাগরের কলেজ মেট্রোপলিটন ইনস্টিটিউশনে ভর্তি হওয়া। সেখানে ইংরেজি সাহিত্য পাঠ শুরু সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ও প্রসন্নকুমার লাহিড়ীর কাছে। চলল কালিদাসের কাব্য-পাঠও। কিন্তু এই পর্বেই প্রেসিডেন্সি কলেজের ‘বাহিরের ছাত্র হিসেবে’ স্যর আলেকজ়ান্ডার পেডলারের প্রেরণায় রসায়নের প্রতি বিশেষ টান শুরু।

জীবনের মোড় ঘোরাও তখনই। পরিবারের আর্থিক অবস্থা পড়তির দিকে। বাবার ইচ্ছে ছিল, ছেলেরা বিলেত যাক। সে জন্য এবং পরিবারের আর্থিক অবস্থার কথা ভেবে গোপনে ‘গিলক্রাইস্ট’ বৃত্তির জন্য প্রস্তুত হতে শুরু করলেন প্রফুল্লচন্দ্র। কিন্তু তা জানতে পেরে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ‘কৃতী’ ছাত্রের বিদ্রুপ, ‘ওর (প্রফুল্লচন্দ্রের) নাম লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যালেন্ডারের বিশেষ সংস্করণে বার হবে।’ প্রফুল্লচন্দ্রও আশা ছাড়লেন। কিন্তু একদিন কলেজে ইংরেজি দৈনিক ‘দ্য স্টেটসম্যান’-এর একটি সংবাদে দৃষ্টি পড়ল। গোটা দেশ থেকে সে বছর বৃত্তি পেয়েছেন বোম্বাইয়ের বাহাদুরজি আর বাংলার প্রফুল্লচন্দ্র!

বৃত্তি নিয়ে ক্যালিফোর্নিয়া জাহাজে চড়ে লন্ডন গেলেন প্রফুল্লচন্দ্র। কিছু দিন থাকার পরে গেলেন এডিনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে। কিন্তু গোল বাধল পোশাক নিয়ে। বিলিতি ওভারকোট, ‘টেইল-কোট’ তাঁর অপছন্দ। পছন্দ ছিল রাজা রামমোহন রায়ের চোগাচাপকান। তা-ই বানানো হল। কিন্তু দর্জির ভাষায় ‘সরু ও পাতলা’ হওয়ায় এ জিনিসও খুব একটা গায়ে আঁটল না।

এই পর্বে প্রফুল্লচন্দ্র তাঁর যৌবনে নারীর ভূমিকা নিয়ে একটি ছোট্ট অনুচ্ছেদ লিখেছেন ‘আত্মচরিত’-এ। নারীর মাধুর্য ও সৌন্দর্যকে অনুভব করার ক্ষমতা থাকলেও কোনও তরুণীর সঙ্গে পরিচয় ঘটলেই তিনি যেন গুটিয়ে যান। আবহাওয়া, জলবায়ু ইত্যাদি কয়েকটি কথা ছাড়া আর যেন রা সরে না তাঁর! বয়স্ক পুরুষদের সঙ্গে নানা বিষয়ে আলোচনাতেই তাঁর তৃপ্তি!

আর তৃপ্তি রসায়ন গবেষণায়। কিন্তু এর মধ্যেই একটা ঘটনা ঘটল। আচমকা, বিশ্ববিদ্যালয়ের লর্ড রেক্টর স্ট্যাফোর্ড হেনরি নর্থকোট ঘোষণা করলেন, ‘সিপাহী বিদ্রোহের আগে ও পরে ভারতের অবস্থা’ শীর্ষক বিষয়ে প্রবন্ধ প্রতিযোগিতা হবে। রসায়নের পাঠ কিছু দিনের জন্য তুলে রেখে ইংরেজি ও ফরাসিতে লেখা বিভিন্ন বইপত্র, অর্থনৈতিক ইতিহাস প্রভৃতি পাঠ শুরু করলেন। ফলস্বরূপ, মোট সাতটি অধ্যায়ে ভাগ করা প্রবন্ধ জমা দিলেন প্রফুল্লচন্দ্র। পুরস্কার না মিললেও এর মূল্যায়নে উইলিয়ম মুয়র ও অধ্যাপক ম্যাসন লিখলেন, ‘আর একটি উল্লেখযোগ্য প্রবন্ধ, যেটিতে মোটো আছে।...ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে এটি শ্লেষপূর্ণ আক্রমণে পূর্ণ।’ কিন্তু এই প্রবন্ধের জন্য প্রফুল্লচন্দ্র রাতারাতি বিখ্যাত হয়ে গেলেন। তবে ইতিহাসের পাঠ আপাতত মুলতুবি রেখে ১৮৮৭-তে রসায়নে মৌলিক গবেষণার জন্য ডিএসসি উপাধি পান তিনি।

তবে তার পরেও কিছু দিন বৃত্তির টাকায় বিলেতে থাকলেন বিজ্ঞানী। উদ্দেশ্য, ‘হাইল্যান্ড’ ভ্রমণ। লক ক্যাটরিনে সাঁতার কাটেন, রাত্রিবাস করেন লক লোমন্ডের তীরের হোটেলে। আর মনে মনে হয়তো আওড়ান ছেলেবেলায় পড়া উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থের ‘টু এ হাইল্যান্ড গার্ল’।

কিন্তু এ বার দেশে ফেরার পালা। দেশে ফিরে ভারতীয় শিক্ষা বিভাগে যোগ দেবেন, ইচ্ছে তেমনই। আলেকজ়ান্ডার ক্রাম ব্রাউন, উইলিয়ম মুয়রের সুপারিশ, চার্লস বার্নার্ডের চেষ্টা সত্ত্বেও তা সম্ভব হল না। শেষমেশ সেই সময়ে বিলেতে থাকা প্রেসিডেন্সি কলেজের অধ্যক্ষ চার্লস হেনরি টনি বাংলা শিক্ষা বিভাগে প্রফুল্লচন্দ্রকে নিয়োগের একটি সুপারিশপত্র পাঠালেন ডিরেক্টর আলফ্রেড ক্রফটের কাছে।

সেই চিঠির ভরসায়, কার্যত কপর্দকশূন্য অবস্থায় দেশে ফিরলেন প্রফুল্লচন্দ্র। প্রথম কাজই হল, বিলিতি পোশাক ছেড়ে বন্ধুর কাছে ধুতি আর চাদর ধার নেওয়া!

দেশে ফিরে কার্যত ১১ মাস কর্মহীন ছিলেন প্রফুল্লচন্দ্র! এই পর্বে বিশেষ ভাবে তাঁর পাশে দাঁড়ালেন জগদীশচন্দ্র বসু ও বন্ধুরা। শেষমেশ ১৮৮৯-র মাঝামাঝি প্রেসিডেন্সি কলেজে আড়াইশো টাকা বেতনের ‘সহকারী অধ্যাপক’-এর কাজ জুটল প্রফুল্লচন্দ্রের। তত দিনে তাঁর যোগ্যতার প্রতি সরকার অবিচার করেছে, ক্রফট সাহেবের কাছে সে কথা বলতে অপমানও হজম করতে হল তাঁকে। ক্রফট উদ্ধত ভাবে তাঁকে বললেন, ‘আপনার জন্য জীবনে অনেক পথ খোলা আছে। কেউ আপনাকে এই পদ গ্রহণ করতে বাধ্য করছে না!’ পাশাপাশি, বাংলার শাসনকর্তা চার্লস ইলিয়ট ‘ইম্পিরিয়াল সার্ভিসে’ ভারতীয়দের নিয়োগের পথ রুদ্ধ করে দিলেন।

তবে প্রেসিডেন্সির গবেষণাগারটি হয়ে উঠল প্রফুল্লচন্দ্রের আত্মার সঙ্গী। ভারতীয় নানা খাদ্যদ্রব্য ও তার ভেজাল নিয়ে এই পর্বেই গুরুত্বপূর্ণ বিশ্লেষণটি করলেন তিনি।

পাশাপাশি, তাঁর অধ্যাপক-সত্তাও ক্রমে বিকশিত হতে শুরু করল। ১৯০৯ সাল ভারতের রসায়ন তথা বৈজ্ঞানিক গবেষণার ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বছর। জ্ঞানেন্দ্রচন্দ্র ঘোষ, জ্ঞানেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়, মানিকলাল দে, সত্যেন্দ্রনাথ বসু, পুলিনবিহারী সরকার, নীলরতন ধর, মেঘনাদ সাহা, রসিকলাল দত্ত-সহ একঝাঁক কৃতী ছাত্র পেল প্রেসিডেন্সি। ছাত্রেরা পেলেন প্রফুল্লচন্দ্রকে। এঁদের অনেককে নিয়েই প্রফুল্লচন্দ্রের প্রত্যক্ষ নেতৃত্বে পরবর্তী সময়ে তৈরি হবে ‘ইন্ডিয়ান স্কুল অব কেমিস্ট্রি’।

এই ছাত্রদের দিকে তাকিয়েই প্রেসিডেন্সি থেকে অবসর গ্রহণের সময়ে প্রফুল্লচন্দ্র তাঁর বক্তব্যে কর্নেলিয়ার গল্প শোনালেন। গল্পটা এমন— এক ধনী গৃহিণী নিজের নানা দামি অলঙ্কার দেখিয়ে কর্নেলিয়ার কাছে তাঁর রত্ন-অলঙ্কার দেখানোর অনুরোধ করলেন। কর্নেলিয়া বললেন, ‘একটু অপেক্ষা করুন’। কিছুক্ষণ পরে তাঁর দুই সন্তান স্কুল থেকে ফিরলে, তাদের উদ্দেশ্য করে কর্নেলিয়া বললেন, ‘এরাই আমার অলঙ্কার।’ প্রফুল্লচন্দ্রও তাঁর ওই কৃতী ছাত্রদের কথা বলে বিদায়-ভাষণে বললেন, ‘এরাই আমার রত্ন’। এই রত্নদের টানেই হয়তো জানালেন তাঁর শেষ ইচ্ছের কথাও। ‘আমার বড় সাধ, মৃত্যুর পরে আমার এক মুঠো চিতাভস্ম যেন এই কলেজের পবিত্রভূমির কোথাও রক্ষিত থাকে।’

আসলে ছাত্র-রত্নদের চিনতে পারাটাই মাস্টারমশাইয়ের আসল কৃতিত্ব। এ প্রসঙ্গে জিতেন্দ্রনাথ রক্ষিতের কথা বলতে হয়। তিনি সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ থেকে বিএসসি পরীক্ষা দিয়েও পাশ করতে পারেননি। কিন্তু ‘ব্যবহারিক রসায়ন’-এ তাঁর অসাধারণ দক্ষতা। জাতীয় শিক্ষা পরিষদের পরীক্ষাগারে কিছু দিন কাজ করেই তিনি কৃতিত্বের পরিচয় দিলেন। প্রফুল্লচন্দ্র তাঁকে নিজের গবেষণা কাজে সহায়তার জন্যও ডেকে নিলেন। কালক্রমে, জিতেন্দ্রনাথ সরকারি আফিম বিভাগে বিশ্লেষকের চাকরি পান।

প্রেসিডেন্সির পরে  স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের অনুরোধে ১৯১৬-এ সায়েন্স কলেজে যোগ দিলেন প্রফুল্লচন্দ্র। আইনজীবী তারকনাথ পালিত ও রাসবিহারী ঘোষের দানে তৈরি এই কলেজ। কিন্তু সরকার এই কলেজ থেকে মুখ ফিরিয়ে থাকল। দ্বিধাহীন ভাবে বিলেতের মাটিতে দাঁড়িয়েই প্রফুল্লচন্দ্র বললেন, তাঁরা কলেজের জন্য অনুদান চাইলেই সরকার বলে ‘অর্থাভাব’। উল্টো দিকে, দেশের ধনী ব্যক্তিদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি সম্পর্কে মুখ ফিরিয়ে থাকারও সমালোচনা করলেন।

অথচ নিজে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়কে দশ হাজার টাকা দান, মাদ্রাজ, নাগপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে বক্তৃতা দিতে গিয়ে প্রাপ্য অর্থ সেখানেই দিয়ে আসা, কলকাতার সিটি কলেজ, এমনকি গ্রামে তাঁর বাবার প্রতিষ্ঠিত স্কুলটির পাশে দাঁড়ানো— এমন নানা কাজ আজীবন করেছেন প্রফুল্লচন্দ্র।

আসলে শিক্ষার জগতে প্রফুল্লচন্দ্র একটি ‘লেগাসি’। বিষয়টি তাঁর ছাত্র নয়, বরং তাঁর ‘ছাত্রের ছাত্র’র মুখে শোনা যাক। এই ছাত্রটি বলছেন, ‘আমি একটা গুরুতর অপরাধ করেছি যে, স্যর পিসি রায়ের ছাত্র হতে পারিনি। সে জন্য হয়তো তিনি আমাকে ক্ষমা করেননি।...আমি তাঁর রাসায়নিক ‘প্রশিষ্য’ হয়েছি। পিসি রায়ের ছাত্র অতুলচন্দ্র ঘোষের কাছে আমি রসায়ন শিখেছি।’ বক্তব্যটি, ভারতের সর্বোচ্চ বিজ্ঞান পুরস্কার যাঁর নামে, সেই শান্তিস্বরূপ ভাটনগরের!

কলেজকে ক্লাসের চৌহদ্দির মধ্যে আটকে রাখতে চান না প্রফুল্লচন্দ্র। ১৯২১-এ খুলনায় ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা গেল। কিন্তু সরকার তা মানতে নারাজ। এমনকি, সরকারি প্রতিনিধি রূপে বর্ধমানের মহারাজা খুলনা পরিদর্শন করে এসে বললেন, ‘দুর্ভিক্ষের চিহ্ন নেই।’ স্থির থাকলেন না প্রফুল্লচন্দ্র। দ্বারে-দ্বারে ভিক্ষার ঝুলি নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন। সংগ্রহ করলেন কয়েক লক্ষ টাকা। ১৯২১-এর খুলনা জেলার সাতক্ষীরা মহকুমায় ভয়ংকর দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়, সংবাদ পেয়েই আচার্য প্রণবানন্দজি মহারাজ তাঁর অনুগত ছাত্র ও তরুণদের নিয়ে সেই অঞ্চলে ছুটে গিয়ে সেবাকার্য আরম্ভ করেন। কিন্তু এই বিরাট সেবাকার্যে বহুলোক ও বহু অর্থের প্রয়োজন। খুলনা জেলার অন্যতম সুসন্তান ভারত বিখ্যাত বিজ্ঞানী আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় মহাশয় ভারতের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অর্থ সংগ্রহ করে আচার্য দেবের পাশে দাঁড়ালেন। শ্রী প্রণবানন্দ গুরুমহারাজও বিভিন্ন স্কুলে-কলেজে ঘুরে ঘুরে প্রায় ৫০০ জন তরুণ কর্মী সংগ্রহ করলেন। তাদেরকে দিয়ে অক্লান্ত পরিশ্রম করে প্রায় আটমাস যাবৎ অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে সেবাকার্য পরিচালনা করলেন। এই ঘটনার পর প্রণবানন্দজির সুখ্যাতি আরো ছড়িয়ে পড়ে।

১৯২২-এ বগুড়া, রাজশাহী, পাবনা-সহ বিস্তীর্ণ এলাকায় বিপুল বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হল জনজীবন। সরকারি হিসেবেই প্রায় ১,৮০০ বর্গ মাইল এলাকা প্লাবিত। ১২ হাজার গবাদি পশু নিখোঁজ। শস্য নষ্ট, প্রায় ৫০ জনের প্রাণহানি হয়েছে। ২১ নভেম্বর, ১৯২২-এর আনন্দবাজার পত্রিকা থেকে জানা যায়, আমনদিঘি, নসরতপুরের গ্রামবাসী রেললাইনের কালভার্টের পরিবর্তে সেতুর দাবি জানিয়েছিলেন। তা মঞ্জুর করেনি রেলওয়ে। ঘটনাচক্রে, প্রফুল্লচন্দ্রও বন্যার জন্য এটিকেই কারণ বললেন।

শুধু কারণ চিহ্নিত করা নয়, ‘বেঙ্গল রিলিফ কমিটি’র ছাতার তলায় শুরু করলেন কাজ। সায়েন্স কলেজই হল তাঁর হেড কোয়ার্টার। কমিটির আর একজন সেনানি সুভাষচন্দ্র বসু। প্রফুল্লচন্দ্রের আহ্বানে অন্তত ৭০ জন স্বেচ্ছাসেবক প্রাথমিক কাজ শুরু করলেন। তাঁর আহ্বানে বোম্বাই, মাদ্রাজ-সহ দেশের নানা প্রান্ত, এমনকি জাপান থেকেও সাহায্য এল। সঙ্গে-সঙ্গে দেশবাসী ত্রাণের জন্য সায়েন্স কলেজে পাঠাতে থাকলেন রাশি-রাশি জামাকাপড়।১৯২১ সালে দক্ষিণ খুলনার দুর্ভিক্ষ ও ১৯২২ সালে মধ্য ও উত্তরবঙ্গের বন্যায় তাঁর সাহায্য বা দানের ফিরিস্তি দেওয়া এখানে সম্ভব নয়। বাঙালি জাতির কিসে উন্নতি হবে, কেমন করে তাঁরা স্বাধীন হবে, শিক্ষিত হবে এই ছিল তাঁর আজীবন সাধনা। প্রতি বছর বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাসাধিককাল অবকাশ যাপনের উদ্দেশ্যে তিনি নিজের গ্রাম ‘রাড়ুলী’তে যেতেন। সেখানে তাঁর সখের মধ্যে ছিল - প্রতিদিন বৈকালে নৌকা ভ্রমণে যাওয়া। তবে জনসাধারণ ও তাঁর নৌকা ভ্রমণের মধ্যে একটু পার্থক্য ছিল। নৌকায় চড়ে তিনি নিজেই সেটার দাঁড় টানতেন৷ তখনও জরাজীর্ণ সেই বৃদ্ধের দেহে ছিল বল; তবে দেহের বল অপেক্ষা মনের বলই ছিল তাঁর বেশী। আর সেই মনের বলের জোরেই তিনি যে কোন ধরণের কঠিন কাজ সমাধা করতে পারতেন। প্রতিদিন অমন করে মাইকেল মধুসূদন দত্তের ‘কপোতাক্ষ’ নদীতে নিজে দাঁড় টেনে তিনি নৌকাবিহারে বের হতেন৷ তবে সেটা করতে গিয়ে একদিন তিনি বিপদেও পড়েছিলেন। একদিন হঠাৎ কালবৈশাখীর ঝড় উঠেছিল সালকিয়ার কাছে। ঝড়ের বেগ সামলাতে না পেরে নৌকা ডুবেছিল। নৌকার সঙ্গে প্রফুল্লচন্দ্রও জলে পড়েছিলেন। শেষে, সেই যাত্রায় ‘অনাথনাথ রায়’ নামে একটি যুবক আচার্য রায়ের একখানা পা ধরে তাড়াতাড়ি তাঁকে ডাঙায় তুলে তাঁর প্রাণ রক্ষা করেছিলেন। ১৯২১ সালের দক্ষিণ খুলনার দুর্ভিক্ষের কথা ইতিহাসে সর্বজনবিদিত। দেশময় হাহাকার পড়ে গিয়েছিল। লোকের পেটে ভাত ছিল না, পরণে কাপড় ছিল না, দুর্ভিক্ষ পীড়িতদের দেহ হয়ে উঠেছিল কঙ্কালসার। অনাহারে অর্ধাহারে মানুষ তিলে তিলে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছিল। গাছে ফল ছিল না, এমনকি অনেক গাছের পাতাও ছিল না। খাল-বিল হয়ে গিয়েছিল শুষ্ক। মাছ সিদ্ধ করে যে খাবে লোকে, সেটারও উপায় ছিল না। এমন দিনে জনসাধারণ তৎকালীন সরকারের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করাতে, ব্রিটিশ সরকার অত্যন্ত দয়াপরবশ হয়ে ‘খুলনার কালেক্টর’ ‘ফকাস’ (L. R. Faucas) নামের একজন ইংরেজ আই.সি.এস.কে তদন্তের রিপোর্ট কি হবে সেটা আগেই শিখিয়ে পড়িয়ে তদন্ত করতে পাঠিয়েছিল। তিনি নদীপথে যেতে যেতে ‘কেওড়া’ নামক একপ্রকার জংলী ফলভর্তি গাছ দেখে পূর্ব চুক্তি অনুযায়ী তদন্তের ফলাফলে সরকারকে জানিয়েছিলেন, ‘‘গাছে ফল, ফুল ও পাতা ভর্তি, অতএব দুর্ভিক্ষের প্রশ্ন ওঠে না।’’ এর ফলে বৃদ্ধ বয়সে প্রফুল্লচন্দ্রকে ভিক্ষার ঝুলি কাঁধে নিয়ে বের হতে হয়েছিল। যখন তিনি ‘আশাশুনি’ নামক জায়গায় দুঃস্থ মানুষদের চাল, ডাল, কাপড় বিতরণ করছিলেন সেই সময় তাঁর সঙ্গে দেখা হয়েছিল ফকাসের। সেখানে সবার সামনে তীব্রকণ্ঠে তিনি রিপোর্টের বিরোধিতা করাতে ফকাস তাঁকে বলেছিলেন, ‘‘What can I do sir, if it is the policy of the Govt.’’ ব্রিটিশ সরকার কিভাবে ভারতবাসীদের হত্যা করত - এই ঘটনা তার জ্বলন্ত উদাহরণ।
আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় রাজনীতিক ছিলেন না। কিন্তু দেশ যখনই কোনও সঙ্কটের সম্মুখীন হয়েছিল, তখনই তিনি জনস্বার্থ রক্ষাকল্পে নির্ভীকচিত্তে দাঁড়িয়েছিলেন এবং পরিস্থিতির সমাধানে এগিয়ে এসেছিলেন। যখন ইংলণ্ডের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ‘রেমজে’ ‘ম্যাকডোনাল্ড সাম্প্রদায়িক বাঁটোয়ারা’র সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছিলেন, তখন ‘ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস’ সেটা না গ্রহণ না বর্জন নীতি গ্রহণ করায় আচার্য রায় মুক্তকণ্ঠে সেই নীতিকে ভ্রান্ত বলে প্রকাশ করেছিলেন। এমনকি রাজনীতির লোক না হয়েও সেই উপলক্ষে আচার্য রায় দেশের বিভিন্ন জায়গার নেতৃস্থানীয় প্রতিনিধিগণের এক সম্মেলন আহ্বান করেছিলেন। ১৯৩৪ সালের ১৮ই ও ১৯শে আগষ্ট কলকাতার ‘রামমোহন লাইব্রেরী’তে সেই সম্মেলনের অধিবেশন হয়েছিল। তাতে ‘অর্গানাইজিং কমিটি’র সভাপতিরূপে আচার্য রায় তাঁর অভিভাষণে মন্তব্য করেছিলেন যে – ‘‘হোয়াইট পেপার বর্ণিত প্রতিক্রিয়াপন্থী শাসনতন্ত্রের বিরুদ্ধে কংগ্রেসের ওয়ার্কিং কমিটি সংগ্রাম-ধ্বনি তুলিয়া থাকেন; কিন্তু সাম্প্রদায়িক বাঁটোয়ারার ন্যায় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তাঁহারা নিরপেক্ষ নীতি অবলম্বন করিতেছেন। এই সাম্প্রদায়িক সিদ্ধান্ত চিরদিনের জন্য ভারতবাসীকে বিরামহীন সংগ্রামরত দুইটি দলে বিভক্ত করিবে।’’ সেই সম্মেলনের ফলে কংগ্রেস ভেঙে ‘কংগ্রেস জাতীয় দল’ গঠিত হয়েছিল; সেই দল সাফল্যের সঙ্গে কেন্দ্রীয় পরিষদের নির্বাচনে প্রতিযোগিতা করেছিল এবং বাংলার সমস্ত আসন দখল করতে সমর্থ হয়েছিল। রাজনীতির লোক না হয়েও প্রফুল্লচন্দ্র কিন্তু বাংলার মানুষের মন বুঝতে কোন ভুল করেননি। বাংলার জনসাধারণ যে তথাকথিত সাম্প্রদায়িক বাঁটোয়ারা গ্রহণ করতে রাজি ছিল না, ‘কংগ্রেস জাতীয় দলের’ বিপুল সাফল্য সেই কথাই প্রমান করে। নিজের মৃত্যু পর্যন্ত আচার্য রায় কংগ্রেস জাতীর দলের বন্ধু ও পরিচালক পদে প্রতিষ্ঠিত ছিলেন। ১৯৩৯ সালের ২৭শে আগষ্ট আর একটা ‘নিখিল ভারত বাঁটোয়ারা বিরোধী সম্মেলনের’ অধিবেশন হয়েছিল। আচার্য রায় সেই অধিবেশনের উদ্বোধন করেছিলেন। সেই উপলক্ষে তিনি যে বক্তৃতা করেছিলেন সেটা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বক্তৃতা প্রসঙ্গে আচার্য রায় বলেছিলেন, ‘‘দুঃখ ও বিরক্তির মিশ্র মনোভাব লইয়া আজ আমি এই সম্মেলনে বক্তৃতা করিতেছি। আমার দুঃখের বিষয় এই যে, ভারতের রাজনৈতিক জীবনের এক দিকে সাম্প্রদায়িক কোলাহল ও অত্যধিক স্বার্থপূর্ণ মনোভাব প্রকট হইতেছে; আমার বিরক্তির কারণ এই যে, আমাদের রাজনৈতিক জীবনের ঘৃণিত সাম্প্রদায়িক বাঁটোয়ারা ব্যাধি সম্পর্কে ভারতের প্রতি কর্তব্য পালন সম্বন্ধে দিল্লীর ও হোয়াইট হলের কর্তৃপক্ষের মতিগতি আছে বলিয়া মনে হইতেছে না। আমি বিশেষ করিয়া আমার সেই সকল স্বদেশবাসীর জন্য দুঃখিত যাঁহারা স্বাধীনতা সংগ্রামের জন্য সম্মিলিত ফ্রন্ট গঠনের আপাত মনোহর যুক্তি প্রদর্শন করিয়া ঐ সকল বিরোধী নীতির সহিত আপোষ রফা করিতে অগ্রসর হন। কারণ ভারতের শাসনতান্ত্রিক ব্যবস্থার মধ্যে সাম্প্রদায়িক নীতি প্রবিষ্ট হওয়ায় মীমাংসার যাবতীয় সম্ভাবনা ক্রমশঃ লোপ পাইতেছে। তাঁহাদের ‘না-গ্রহণ না-বর্জন’ নীতি নিঃসংশয়ে বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদের কূটনীতির সহিত সহযোগিতা করিয়া বিভেদ, মনোমালিন্য এবং বিদ্বেষের বিভীষণ দৃশ্য প্রকট করিতেছে। জগতের চক্ষে ভারতের মর্যাদাহানির জন্যই সুকৌশলে উহা উদ্ভাবিত হইয়াছে।’’ সেই অভিভাষণের উপসংহারে আচার্য রায় বলেছিলেন, ‘‘গত আড়াই বৎসর সাম্প্রদায়িক সিদ্ধান্ত কার্যকরী হইয়াছে। উহা যে যথার্থই অনৈক্যের বীজ তাহা প্রমাণিত হইয়াছে। ইহার ফলে আইন সভায় বিভিন্ন প্রকারের আইন এবং এই প্রদেশের স্বার্থহানিকর ও বিপদজনক মৌলিক শাসনতান্ত্রিক পরিবর্তন সাধিত হইতেছে। কিন্তু তথাপি আমি হতাশ হই নাই। কারণ, আমি বিশ্বাস করি, পরিশেষে ন্যায়েরই জয় হইবে।’’ আচার্য প্রফুল্লচন্দ্রের জনসেবায় যোগদানের এটাই একমাত্র দৃষ্টান্ত নয়। ১৯৩৬ সালে প্রাথমিক শিক্ষা পদ্ধতি পুনর্গঠনের উদ্দেশ্যে বাংলা সরকার যখন একটি প্রস্তাব উত্থাপিত করেছিল, তখন সেই শিক্ষা পদ্ধতির জন্য বঙ্গপ্রদেশে শিক্ষা বিস্তারের পক্ষে সমূহ অসুবিধা সৃষ্টির আশঙ্কা করে আচার্য রায় সেটার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন এবং সেই প্রস্তাবের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাবার জন্য ‘এলবার্ট হলে’ যে জনসভায় আয়োজন হয়েছিল তাতে তিনি সভাপতিত্ব করেছিলেন। তারপরে উক্ত প্রস্তাবের বিরুদ্ধে যে আন্দোলন শুরু হয়েছিল, তিনি সেটারও নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। তাতে আকাঙ্খিত ফল হয়েছিল ও সেই প্রস্তাব আর বেশীদূর এগোতে পারেনি। ১৯৪০ সালে বঙ্গীয় ব্যবস্থা পরিষদে উত্থাপিত কুখ্যাত মাধ্যমিক শিক্ষা বিলের প্রতিবাদেও তিনি এগিয়ে এসেছিলেন এবং ১৯৪০ সালের ২১শে ও ২২শে ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত বঙ্গীর মাধ্যমিক শিক্ষা বিলের প্রতিবাদ সম্মেলনে সভাপতির অভিভাষণে তিনি সেই বিলের সমস্ত প্রতিক্রিয়াশীল বিষয়সমূহের স্বরূপ উদ্ঘাটন করেছিলেন। তাঁর বক্তৃতার উপসংহারে তিনি বলেছিলেন - ‘‘এই বিল রচনায় বাঙ্গলার শিক্ষা সম্পর্কে প্রয়োজনীয় বিষয় সমূহের প্রতি আদৌ দৃষ্টিপাত করা হয় নাই: বস্তুতঃ এই বিলটি রাজনৈতিক ও সাম্প্রদায়িক উদ্দেশ্য লইয়া রচিত হইয়াছে। ইহার সহিত শিক্ষার কোন সম্পর্ক নাই। এই বিলের ব্যবস্থাসমূহও অত্যন্ত প্রতিক্রিয়াশীল। বঙ্গীয় ব্যবস্থা পরিষদ বিলটিকে সিলেক্ট কমিটির নিকট প্রেরণ করিয়াছেন। কিন্তু এই সিলেক্ট কমিটির পক্ষে ঐ সকল প্রতিক্রিয়াশীল ব্যবস্থার বিশেষ কোন উন্নতি সাধন সম্ভব নহে। সুতরাং ঐ বিলটি প্রত্যাহার করাই উচিত, অন্যথা এই প্রদেশে অভ্রান্ত বিক্ষোভের সৃষ্টি হইবে। শিক্ষাক্ষেত্রে কর্মী হিসাবে আমার যে অভিজ্ঞতা যাছে তাহা হইতে আমি বলিতে পারি এই বিলটি দুরভিসন্ধিমূলক ও অনিষ্টকর। এই বিলটির দ্বারা কাহারও কোন উপকার হইবে না, এমন কি ইহা সাম্প্রদায়িকতাবাদীদেরও কোন কাজে আসিবে না। স্পর্শকাতর চারাগাছের ন্যায় মৈত্রীর মুক্ত আবহাওয়াতেই শিক্ষার বিস্তার হইয়া থাকে এবং জাতীয় ঐক্যই শিক্ষার মূল।’’ ১৯৪১ সালের এপ্রিল মাসে সিলেক্ট কমিটি কর্তৃর্ক মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পর্কে রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছিল। আচার্য রায় সংবাদপত্রে প্রদত্ত বিবৃতিতে সেই রিপোর্টের তীক্ষ্ম সমালোচনা করেছিলেন ও সেটার প্রতিক্রিয়াশীল বিষয়সমূহের প্রতি জনসাধারণের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেছিলেন - ‘‘বঙ্গীয় শিক্ষা পরিষদের সুনির্দিষ্ট অভিমত সিলেক্ট কমিটির রিপোর্টের দ্বারা মাধ্যমিক শিক্ষা বিলের আদৌ উন্নতি হয় নাই। এবং বহু বিষয়ে উক্ত বিল পর্বের চেয়ে ক্ষতিকারক হইয়াছে। আপাতদৃষ্টিতে কমিটি কর্তৃক উক্ত বিলের সামান্য উন্নতি হইলেও পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পরীক্ষা করিলে দেখা যাইবে যে, ইহাতে কোন সারবত্তা নাই। সুতরাং পরিষদ পুর্নবার উক্ত বিলটি প্রত্যাহারের জন্য আবেদন করিতেছে ইহা প্রত্যাহৃত না হইলে এই প্রদেশের জনবিক্ষোভ বৃদ্ধি পাইবে এবং দেশের অবস্থা সঙ্কটজনক হইয় পড়িবে।’’ তৎকালীন সরকারের বিভিন্ন ভ্রান্ত নীতির বিরোধিতা করতে প্রফুল্লচন্দ্র কখনও পিছপা হননি, যেমন একবার সরকারের পক্ষ থেকে ছাত্রদের প্রদেয় বৃত্তির সমালোচনা করে লিখেছিলেন, ‘‘স্যার অ্যাসলি ইডেন যখন বাংলার ছোটলাট ছিলেন, তখন তিনি বৎসরে ৫০০ পাউণ্ড খরচ করিয়া দুইটি কৃষিবৃত্তির প্রবর্তন করেন। এই বৃত্তিদ্বারা প্রতি বৎসর বিশ্ববিদ্যালয়ের দুইজন সর্ব্বোচ্চ উপাধিপ্রাপ্ত ছাত্রকে বৈজ্ঞানিক কৃষিবিদ্যা শিক্ষার জন্য বিলাতে পাঠান হইত। এক একজন ছাত্রের পিছনে ২৫০ পাউণ্ড খরচ হইত। তখনকার দিনে একশত পাউণ্ডের মূল্য এখনকার তিনশত পাউণ্ডের সমান। প্রথম বারে যান একজন মুসলমান ও একজন হিন্দু। মুসলমান ভদ্রলোকটি বিহারের সৈয়দ সহকৎ হোসেন। হিন্দু ভদ্রলোকটির নাম অম্বিকাচরণ সেন। তাঁহারা শিক্ষালাড করিয়া যখন দেশে ফিরিয়া আসিলেন, তখন তাঁহাদের অর্জ্জিত কৃষিবিদ্যা কোন কাজে লাগাইবার সুযোগ হইল না। তাঁহারা হইলেন ষ্ট্যাটুটারি সিভিলিয়ান - জেলার ম্যাজিষ্টেট্ বা জর্জ। তারপর ক্রমে ক্রমে গেলেন অধ্যক্ষ গিরীশচন্দ্র বসু, ব্যোমকেশ চক্রবর্ত্তী, কবি দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, অতুল রায়, নৃত্যগোপাল মুখার্জি ও ভূপালচন্দ্র বসু প্রভৃতি। ইঁহারা আমার সমসাময়িক। ফিরিয়া আসিয়া ইঁহাদের অধিকাংশেরই করিতে হইল ডেপুটিগিরি। ব্যোমকেশ বাবু হইলেন ব্যারিষ্টার। আর গিরীশবাবু স্কুলমাষ্টারির দ্বারা জীবিকা অর্জন করিতে লাগিলেন। ইঁহাদের কৃষিশিক্ষা দেশের কোন কাজেই লাগিল না। এই প্রকারে দেশের কয়েক লক্ষ টাকা অকারণ অপচয় হল।’’ ভারতের কল্যাণ ও উন্নতি জন্য আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় যে ধরণের তাগিদ অনুভব করেছিলেন, স্বল্পসংখ্যক ব্যক্তিই সেই ধরনের অনুভব করিতে পেরেছিলেন এবং নিজের অনুভূতিকে তিনি যেমন সাহসের সঙ্গে প্রকাশ করেছিলেন, সেই সময় সেই ধরনের সাহসী ব্যক্তির সংখ্যা ছিল আরও স্বল্প। রাজনীতির ক্ষেত্রে ‘রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর’ ও প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের মধ্যে মতভেদ ছিল গভীর। প্রফুল্লচন্দ্র রায় বলতেন - ‘‘Researches can wait, industries can wait, but Swaraj cannot wait.’’ আর ‘রবীন্দ্রনাথের’ কথা ছিল, ‘‘The complete man must not be sacrificed to the patriotic man, or even to the merely moral man.’’ কোন কথাটা ঠিক, সেটা অভিজ্ঞরা বলতে পারবেন। কিন্তু এই দুই মহাজ্ঞানীর মধ্যে একটা বিষয়ে মিল ছিল, সেটা হলো গঠন কর্ম। তাই একজন গড়েছিলেন ‘বেঙ্গল কেমিক্যাল’, অপরজন প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন ‘শান্তিনিকেতন-শ্রীনিকেতন’। ১৯১৬ সালে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে অবসর গ্রহণ করে যখন তিনি বিজ্ঞান কলেজে পালিত অধ্যাপকের পদ গ্রহণ করেছিলেন তখন প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে তাঁকে যে বিদায়-সম্বর্ধনা জানানো হয়েছিল, তাতে বলা হয়েছিল - ‘‘বিজ্ঞান কলেজ এবং রাসায়নিক গবেষণা যেন দীর্ঘকাল ধরিয়া আপনার অক্লান্ত সেবায় ও উৎসাহে শক্তি লাভ করে।’’ উত্তরে আচার্যদেব বলেছিলেন, ‘‘যদি কেহ আমাকে জিজ্ঞাসা করেন যে প্রেসিডেন্সি কলেজে আমার কার্যকাল শেষ হইবার সময় আমি কি মূল্যবান সম্পত্তি সঞ্চয় করিয়াছি, তাহা হইলে প্রাচীনকালের কর্নেলিয়ার কথায় আমার ছাত্রদিগকে দেখাইয়া আমি উত্তর দিব - এঁরাই আমার রত্ন।’’ তাইতো তাঁর সত্তর বছর বয়সের জয়ন্তী উপলক্ষ্যে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ‘‘উপনিষদে কথিত আছে, যিনি এক তিনি বললেন, আমি বহু হব। সৃষ্টির মূলে এই আত্মবিসর্জনের ইচ্ছা। আচার্য প্রফুল্লচন্দ্রের সৃষ্টিও সেই ইচ্ছার নিয়মে। তাঁর ছাত্রদের মধ্যে তিনি বহু হয়েছেন, নিজের চিত্তকে সঞ্জীবিত করেছেন বহু চিত্তের মধ্যে। নিজেকে অকৃপণভাবে সম্পূর্ণ দান না করলে এ কখনো সম্ভপর হোত না। এই যে আৱদানমূলক সৃষ্টিশক্তি এ দৈবশক্তি। আচার্যের এই শক্তির মহিমা জরাগ্রস্ত হবে না। তরুণের হৃদয়ে হৃদয়ে নবনবোন্বেষশালিনী বুদ্ধির মধ্য দিয়ে তা দূরকালে প্রসারিত হবে।

এই সময়পর্বেই মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীর ‘চরকা-মন্ত্র’র প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করলেন আচার্য। প্রথম দিকে, বিষয়টি নিয়ে খুব একটা ইতিবাচক ধারণা ছিল না তাঁর। কিন্তু পরে নিজেই হিসেব করে দেখলেন, বাংলাদেশের সাড়ে চার কোটি লোকের দেড় কোটি মানুষও যদি চরকা কাটেন, তবে মাসে এঁদের সামগ্রিক আয় হবে দেড় কোটি টাকা!

গান্ধীর সঙ্গে সখ্যতা আসলে বেশ কিছু দিন আগেই তৈরি হয়েছিল প্রফুল্লচন্দ্রের। তাঁরই উদ্যোগে অ্যালবার্ট হলে গাঁধীর জন্য এক সভা আয়োজিত হয়। সভার উদ্দেশ্য, দক্ষিণ আফ্রিকা ফেরত গাঁধীর কাছ থেকে ব্রিটিশ উপনিবেশে ভারতীয়দের অবস্থা কলকাতাবাসীর কাছে তুলে ধরা। কিন্তু রাজনৈতিক দর্শনে আচার্যকে পুরোপুরি গাঁধীবাদী বলা যায় কি না, তা নিয়ে তর্ক হতে পারে। তাঁকে হিন্দু মহাসভায় বক্তব্য রাখতে দেখা যায়। আবার আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ে বক্তব্য রাখতে গিয়ে ভারত-সভ্যতায় ইসলামের অবদানও তুলে ধরেন তিনি। আসলে গাঁধী-দর্শনের সারল্যের প্রতি একটা আকর্ষণ অনুভব করেন প্রফুল্লচন্দ্র। সে অনুভব তাঁর স্বদেশচিন্তার ফসল। এই একই কারণে তাঁর সঙ্গে সখ্য গোপালকৃষ্ণ গোখলেরও।

এই স্বদেশ-ভাবনা থেকেই প্রফুল্লচন্দ্রের বিখ্যাত বই ‘এ হিস্ট্রি অব হিন্দু কেমিস্ট্রি’ ও ৮০০ টাকা পুঁজি নিয়ে তৈরি শিল্প প্রতিষ্ঠান ‘বেঙ্গল কেমিক্যাল অ্যান্ড ফার্মাসিউটিক্যাল ওয়ার্কস’। ৯১ নম্বর আপার সার্কুলার রোডে আচার্যের ভাড়াবাড়িটিই এই শিল্প প্রতিষ্ঠানটির আঁতুড়ঘর। এর নেপথ্যে ছিল বিদেশ থেকে নানা দ্রব্যের আমদানিতে লাগাম পরানো এবং বাঙালি তথা ভারতীয়কে কেরানি থেকে নিজের পায়ে দাঁড় করানোর ইচ্ছে।

তবে এর জন্য সবার আগে দরকার বিজ্ঞান-মানসটি তৈরি করা। প্রেসিডেন্সির রসায়নের ক্লাসে ছাত্রদের সামনে বার্নারে পোড়ানো হাড়ের গুঁড়ো রাখলেন প্রফুল্লচন্দ্র। তা মুখেও দিয়ে বোঝালেন, এই হাড়ভস্ম যে প্রাণীরই হোক, এটি একজন রসায়নবিদের কাছে ‘বিশুদ্ধ মিশ্রপদার্থ’, ক্যালসিয়াম ফসফেট।

এ ভাবে এক দিকে, বিজ্ঞান চেতনা তৈরি, অন্য দিকে কসাই মহল্লায় গিয়ে হাড় সংগ্রহের মতো নানা কাজ করতে করতেই শিল্প প্রতিষ্ঠানটি শুরু করে দিলেন প্রফুল্লচন্দ্র। ওষুধ ও রাসায়নিক দ্রব্য প্রস্তুতের পাশাপাশি, প্রফুল্লচন্দ্র বিশেষ জোর দিলেন বিপণনেও। কালক্রমে নানা বাধাবিঘ্ন পেরিয়ে প্রতিষ্ঠানটি ডালপালা ছড়িয়ে দেশের বাজারে সমাদৃত তো হলই, সঙ্গে বিশ্বযুদ্ধের সময়ে ইংরেজ সরকারকেও সহযোগিতা করল। এর কৃতজ্ঞতায় ইংরেজ সরকার তাঁকে ‘নাইট’ উপাধি দেয়। যদিও, এ নিয়ে তাঁর বিন্দুমাত্র আগ্রহ দেখা যায়নি। কারণ, পরক্ষণেই দেখা গিয়েছে তিনি রাওলাট আইনের বিরোধিতায় সরব।

পাশাপাশি, রসায়ন-শাস্ত্রের ইতিহাস অধ্যয়ন করতে করতেই এক দিন হাতে এল ফরাসি রসায়নবিদ মার্সিলিন বের্তেলোর একটি বই। তাঁর সঙ্গে পত্রালাপও শুরু হল। কালক্রমে, বের্তেলো তাঁর লেখা সিরিয়া, আরব প্রভৃতি দেশের রসায়ন সম্পর্কিত তিন খণ্ডের বইটিও পাঠালেন। এটি পড়েই প্রফুল্লচন্দ্রের পরিকল্পনা হিন্দু রসায়নের ইতিহাস লেখার। ভারতবর্ষের নানা গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থাগার, লন্ডনের ইন্ডিয়া অফিস, বারাণসী-সহ নানা প্রান্ত থেকে সংস্কৃত পুঁথি সংগ্রহ ও পাঠ করলেন প্রফুল্লচন্দ্র। সাহায্য করলেন পণ্ডিত নবকান্ত কবিভূষণ। এরই ফল, দু’খণ্ডে ‘হিন্দু রসায়নের ইতিহাস’।

প্রফুল্লচন্দ্রের বিজ্ঞান ভাবনা যা-ই হোক না কেন, তাঁর সব কিছু জুড়ে ছিল দেশ আর দেশের প্রকৃতি। তাই ১৮৯০-এ তৈরি করেন ‘নেচার ক্লাব’। নীলরতন সরকার, প্রাণকৃষ্ণ আচার্য, রামব্রহ্ম সান্যাল, হেরম্বচন্দ্র মৈত্র, বিপিনবিহারী সরকার ছিলেন এর সদস্য। পাশাপাশি, ‘কলকাতার ফুসফুস’ ময়দানে ঘুরতে যাওয়া, তা-ও করেছেন সমান ভাবে।

পরিবেশের সূত্রেই প্রাণী ও উদ্ভিদ-বিজ্ঞানেও প্রফুল্লচন্দ্রের বিশেষ আকর্ষণ। সেই আকর্ষণেই কখনও দেওঘরে গিয়ে ‘অনিষ্টকর’ ভেলার ফল খেয়ে বিপত্তিও বাধান। আবার কখনও গ্রীষ্মে গ্রাম রাড়ুলিতে গিয়ে গোখরো সাপ ধরিয়ে তার বিষদাঁতের পরীক্ষা করেন! কখনও বা শহর কলকাতায় প্রাতঃভ্রমণে বেরিয়ে রাস্তায় পড়ে থাকা ভামের দেহ এনে তার ব্যবচ্ছেদের ব্যবস্থা করেন।

আসলে প্রকৃতির উপরে মানুষের কেরদানিটা সহ্য হয়নি প্রফুল্লচন্দ্রের। তাই রবীন্দ্র সরোবরে ছট করতে চাওয়া, জলাভূমি বুজিয়ে ইমারত তৈরি করার বর্তমান দেশে প্রফুল্লচন্দ্রের একটা কথা বিশেষ ভাবে মনে করা যায়— ‘‘পশ্চিমবঙ্গে পুকুর বাঁধ প্রভৃতি জলসেচ প্রণালীর ধ্বংসের সহিত তাহার পল্লীধ্বংসের কাহিনী ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত।’’ এই জন-বিজ্ঞানকে বোঝাতে বাংলা ভাষায় সাধারণের উপযোগী বইও লিখেছেন প্রফুল্লচন্দ্র। আদতে তিনি চেয়েছিলেন স্থিতিশীল উন্নয়ন।

১৯৪৪, ১৬ জুন। প্রয়াত হন অকৃতদার এই মনীষী। কিন্তু তাঁর প্রয়াণের পরে, এমনকি তাঁর জীবিত অবস্থাতেও বাঙালি, ভারতীয়রা কতটা রক্ষা করতে পেরেছে প্রফুল্ল-ঐতিহ্য? জীবিত অবস্থায় তাঁর শেষ জন্মদিন পালিত হয় মেঘনাদ সাহার উদ্যোগে। কিন্তু এ জন্য অর্থ সংগ্রহ করতে গিয়ে তিনি সমস্যায় পড়েছিলেন। আর প্রফুল্লচন্দ্রের মৃত্যুর পরে সমসময়ে তাঁর সাধের শিল্প প্রতিষ্ঠানটি নিয়েও নানা প্রশ্ন সামনে আসে! দুঃসাধ্য অধ্যবসায়ে জয় করবে নব নব জ্ঞানের সম্পদ। আচার্য নিজের জয়কীর্তি নিজে স্থাপন করেছেন উদ্যমশীল জীবনের ক্ষেত্রে, পাথর দিয়ে নয়, প্রেম দিয়ে। আমরাও তার জয়ধ্বনি করি।’’ সেদিন প্রফুল্লচন্দ্রকে পাশে বসিয়ে ‘রবীন্দ্রনাথ’ কথাগুলি বলেছিলেন। আজ তাঁদের কেউই নেই। রয়ে গেছে তাঁদের স্মৃতিগুলো।
                           
তথ্যসূত্র ও গ্রন্থঋণ :---- 

১- অধ্যায়ন ও সাধনা, প্রফুল্ল চন্দ্র রায়, সুত্রধর (২০১০)।
২- দেশপ্রেমী বিজ্ঞানী আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়, অচিন্ত্যকুমার মুখোপাধ্যায়, টিচার্স বুক এজেন্সী (২০১১)।
৩- আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের পল্লি মঙ্গল, ড. তপন বাগচী, কলি প্রকাশনী (২০১১)।
৪- আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়: জীবন, কর্ম, রচনাসংগ্রহ; ড. সন্তোষকুমার ঘোড়ই, পারুল প্রকাশনী (২০১০)।
৫- আত্মচরিত (প্রথম ও দ্বিতীয় খন্ড), আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়।
৬- স্মৃতিসত্তায় আচার্য  প্রফুল্লচন্দ্র, বিশ্বনাথ মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত।
৭.‘আত্মচরিত’ (দে’জ): প্রফুল্লচন্দ্র রায়, 
৮.‘আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র' (চর্চাপদ) : রবীন মজুমদার,
৯.‘অন্বেষা’ (প্রফুল্লচন্দ্র রায় বিশেষ সংখ্যা), 
১০.‘প্রফুল্লচন্দ্র রে’ (এনবিটি): জে সেনগুপ্ত, 
১১.‘জার্নাল অব দি ইন্ডিয়ান কেমিক্যাল সোসাইটি’ 
১২. ইন্টারনেট প্রভৃতি।

Popular posts from this blog

*সংক্ষিপ্ত কালী সংহিতা**.........প্রসূন কাঞ্জিলাল।* সনাতন ধর্মমতে কালী বা কালিকা হচ্ছেন শক্তির দেবী। কাল শব্দটির অর্থ সময় হতে পারে, আবার এটা রঙও বুঝাতে পারে। কাল তথা কৃষ্ণবর্ণ, এর অর্থ হতে পারে মৃত্যুবোধক। যেমন আমরা বলি- ‘কাল’এসে গেছে, মৃত্যুর সময় সমাসন্ন, মহাকাল এসে গেছে। দেবীর নাম মহাকালীও বটে। কালীর নাম কাল না হয়ে কালী হলো এ কারণে যে শিবের অপর নাম কাল, যা অনন্ত সময়কাল বোধক। কালী হচ্ছে কাল-এর স্ত্রীলিঙ্গ বোধক। মা কালী মা দুর্গা বা পার্বতী’র সংহারী রূপ। ঊনবিংশ শতাব্দীর সংস্কৃত ভাষার বিখ্যাত অভিধান শব্দকল্পদ্রুম এ বলা হচ্ছে ‘কাল শিবহ্। তস্য পত্নতি কালী।’ অর্থাৎ শিবই কাল বা কালবোধক। তাঁর পত্নী কালী। কালী হচ্ছেন মা দুর্গার বা পার্বতীর অপর ভয়াল রূপ। তিনি সময়ের, পরিবর্তনের, শক্তির, সংহারের দেবী। তিনি কৃষ্ণবর্ণা বা মেঘবর্ণা এবং ভয়ংকরী। সনাতন ধর্মাবলম্বীরা ভয়ংকরেরও পূজা করেন। তিনি অশুভ শক্তির বিনাশ করেন। তাঁর এই শক্তির পূজা সনাতন সমাজকে প্রভাবিত করেছে, বিশুদ্ধ শক্তি সঞ্চারিত করেছে, অন্তর শুদ্ধি দিয়েছে, দুর্দিনের দুর্বলতায় সাহস দিয়েছে। শাক্ত সৃষ্টিতত্ত্ব মতে এবং শাক্ত-তান্ত্রিক বিশ্বাস মতে তিনিই পরম ব্রহ্ম। কালীকে এই সংহারী রূপের পরেও আমরা মাতা সম্বোধন করি। তিনি সন্তানের কল্যাণ চান, তিনি মঙ্গলময়ী, তিনি কল্যাণী--- এটাই তাঁর প্রতি সনাতন ধর্মীয় বিশ্বাসের মূল আস্থা ও নির্যাস। একটা ধারণা আমাদের মধ্যে বর্তমান আছে যে, শিব পার্বতীর স্বামী এবং মা কালীর ভাসুর। কথাটি আদৌ সত্য নয়। অসুররক্ত স্নাত কোপান্বিতা এই দেবীর সংহারী মূর্তিতে কিছুটা নিবৃত্ত ও প্রশমিত করতে শিব তাঁর চলার পথে শুয়ে থাকলেন। দেবী পথ চলতে গিয়ে তাঁর স্বামী শিবকে পায়ে মাড়ালেন। এই পাদস্পৃষ্ঠতার লজ্জায় ও তার অনুশোচনায় মায়ের জিহ্বায় কামড় পড়লো। তাঁর কোপভাব স্থিমিত হলো, ছেদ পড়লো।কালীকে যদি বলি কল্পনা, তবে সেই কল্পনাও ধর্মে বর্ণিত হয়েছে বর্তমান বিজ্ঞানের ধারণার হাজার হাজার বছর আগে। এ কথা বিজ্ঞান প্রথমতঃ স্বীকার করে যে, সৃষ্টির আদি যুগে অনন্ত ব্রহ্মা- ছিল নিকষ কালো অন্ধকারে নিমজ্জিত, নিশ্ছিদ্র তমসায় আবৃত, অনন্ত সৃষ্টিতে তখনো আলোর সৃষ্টি হয়নি। রবি শশী তারা বা কোন আলোকবর্তিকা তখনো ছিলনা। বিজ্ঞান মতে আলোর সৃষ্টির আগে অন্ধকার ছিল। এ বর্ণনায় কান পেতে শুনলে আমরা দেখি কৃষ্ণবর্ণা মা কালী সেই যুগের প্রতিনিধিত্ব করছেন। ধর্ম ও বিজ্ঞানের এখানে অপূর্ব সমন্বয় ঘটেছে। দ্বিতীয়তঃ বিজ্ঞানের ‘বিগ্ ব্যাংগ্ তত্ত্ব’ মতে কাল বা সময় তখন সবে মাত্র সৃষ্টি হয়েছে, কাল্ বা সময় যখন সৃষ্টি হলো তথা যে দিন ভূমিষ্ঠ হলো, সেদিন নির্ধারিত হলো সেই কালেরও শেষ আছে, সংহার আছে। বিশ্ব ব্রহ্মা- সৃষ্টি যখন হয়েছে সময় এলে তা ধ্বংসও হবে। তার লয়ও অবশ্যম্ভাবী। কালী এই সংহারের প্রতিভূ, তিনি কাল এর জীবন্তকালের সীমারেখার নির্ধারণকৃত। তৃতীয়তঃ বিজ্ঞানীরা সৃষ্টির প্রথম যুগের মহাবিশ্বের যে বর্ণনা দেন তা ভয়াল ভীষণ, তার মধ্যে সৃষ্টির চাইতে ধ্বংসই বেশী। প্রবল সংহারের মধ্যে দিয়ে অনন্ত ব্রহ্মার সৃষ্টি। মা কালী সেই সংহারের প্রতিভূ তিনি ভয়াল দর্শনা সংহারের দেবী। সৃষ্টির সেই ক্রমবিকাশের যুগেই মা কালী মা জগজ্জননী প্রবল সংহারের মধ্যে দিয়েই তাঁর সৃষ্টি ও তাঁর কল্যাণময় রূপকে আমাদের কাছে তুলে ধরেছেন। মা কালী যুগপৎ কাল, কৃষ্ণবর্ণ এবং সংহারের দেবী। কিছুই ছিল না, তখন দেবী ছিলেন। এই মাতৃপূজা তথা মাতৃমূর্তি হিন্দুধর্মের আদিকথা।অথর্ব বেদ-এ কালীর উল্লেখ থাকলেও বিশেষ হিসেবে কথক গ্রাহ্য সূত্রে (১৯.৭) প্রথমবার কালীর উল্লেখ ঘটে। কালী অগ্নিদেবের সাতটি জিহ্বার একটি নাম, অগ্নিদেব হচ্ছেন আগুনের ঋগ্বেদীয় দেবতা যার উপস্থিতি মুণ্ডুক উপনিষদে বর্তমান; তবে এখানে কালী বলতে দেবী কালীকেই উল্লেখ করা হয়েছে এটা নির্ণীত করা কঠিন। কালী’র বর্তমান রূপের উপস্থিতি আমরা পাই মহাভারতের সুপ্তিকা পার্বণে, যেখানে তিনি কালরাত্রি হিসেবে অভিহিতা, যিনি পাণ্ডব সৈন্যদের স্বপ্নে দৃশ্যমান এবং পরে দ্রোণাচার্য পুত্র অশ্বত্থামা যখন তাদের আক্রমণ করলেন তখন তিনি প্রকৃত স্বরূপে আবির্ভূতা। মহাদেবী’র একটি শক্তি হিসেবে তিনি ষষ্ঠ শতাব্দীর ‘দেবী মাহাত্ম্যম’এ প্রসিদ্ধ, এবং ‘রক্তবীজ’ নামক অসুরকে পরাভূতকারী দেবী হিসেবে গুরুত্ব সহকারে উল্লেখিত। রক্তবীজকে নিশ্চিহ্ন করতে দেবী নরসিংহী, বৈষ্ণবী, কুমারী, মহেশ্বরী, ব্রাহ্মী, বরাহী, ঐন্দ্রী, চামু- বা কালী এই অষ্ট-মাতৃকা রূপে সংস্থিতা। দশম শতাব্দীর ‘কালিকা পুরাণে’ পরম সত্য হিসেবে কালীকে স্তুতি করা হয়। তবে ভিন্ন ও স্বতন্ত্র এক দেবী হিসেবে ষষ্ঠ শতাব্দীতে কালী প্রথম উল্লেখিতা। এবং এ সকল তন্ত্রে গ্রন্থে তিনি বহির্বৃত্তে বা প্রান্তিক সীমায় বা যুদ্ধ ক্ষেত্রে স্থিতা বা দণ্ডায়মানা দেবী। অধিকাংশ ক্ষেত্রে তিনি শিবের শক্তিরূপে চিহ্নিতা, এবং বিবিধ পুরাণে শিবের উপস্থিতির সঙ্গে তিনি ওতপ্রোতভাবে সম্পৃক্তা। কালিকা পুরাণে তাঁকে বলা হচ্ছে ‘আদি শক্তি’, তিনি প্রকৃতির সীমার বাইরেও অধিষ্ঠাত্রী ‘পরা প্রকৃতি’।১৬৯৯ শকাব্দে (১৭৭৭ খ্রীষ্টাব্দে) কাশীনাথ বিরচিত ‘শ্যামাসপর্যায়বিধি-তে এ পূজার সর্বপ্রথম উল্লেখ লক্ষণীয়। পূজার প্রমাণস্বরূপ এ গ্রন্থে পুরাণ ও তন্ত্রের বচন উল্লেখিত। সপ্তদশ শতাব্দীতে বলরাম বিরচিত কালিকা মঙ্গলকাব্যে একটি বাৎসরিক ধর্মীয় অনুষ্ঠান কালীকে নিবেদিত এই মর্মে উল্লেখিত। অষ্টাদশ শতাব্দীতে নবদ্বীপের রাজা কৃষ্ণচন্দ্র বাংলায় প্রথম কালীপূজার প্রবর্তন করেন। ঊনবিংশ শতাব্দীতে কালীপূজা বাংলায় বিশেষ প্রাধান্য লাভ করে। রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের পৌত্র ঈশানচন্দ্র এবং কলকাতার সমাজের বিত্তবান ও উচ্চশ্রেণীর লোকজনের মধ্যে এ পূজার প্রচলন বৃদ্ধি পায়। ক্রমে দুর্গা পূজার সাথে সাথে কালী পূজাও বিশেষত বাংলায় একটি প্রধান হিন্দু ধর্মীয় উৎসবে পরিণত হয়। পরে এবিষয়ে বিস্তারিত আলোচনায় আসা যাবে।শিবের উপর দণ্ডায়মানা কেন, তার তিনটি ব্যাখ্যা বর্তমান এর একটি প্রচলিত কাহিনী, একটি পৌরাণিক, অন্যটি তান্ত্রিক ব্যাখ্যা। এটা বলা হয়ে থাকে যে শক্তি ছাড়া শিব হচ্ছে শব। শিবের উপর দন্ডায়মানা কালী এটাই বুঝায় যে শক্তি বাদ দিলে বস্তু মৃতমাত্র। পৌরাণিক ব্যাখ্যা মতে, পার্বতী একদিন স্বামীকে প্রশ্ন করলেন তার দশটি রূপের মধ্যে কোনটি শিবের পছন্দ ? বিস্মিত পার্বতী শুনলেন, কালীর ভয়াল মূর্ত্তিতেই শিবের সাচ্ছন্দ্য। এই ধারণাটি দেবী ভাগবত পুরাণে ব্যাখ্যা করা আছে। দ্বাদশ থেকে পঞ্চদশ শতাব্দীর ভক্তিমূলক শ্যামাসঙ্গীতেও মায়ের বর্তমান রূপের এই ধারণাটি গুরুত্ব পেয়েছে। তান্ত্রিক পদ্ধতিতে তাঁর ভয়াল রূপ সত্ত্বেও রাত দুপুরে শ্মশানে তাঁর মুখোমুখি হওয়ার সাহস অর্জন এবং অন্যদিকে তাঁর প্রতি বাঙালিদের শিশুর মতো শর্তহীন ভালবাসা উভয় ক্ষেত্রে মৃত্যুর সঙ্গে পরিচিত হওয়া ও তাকে মেনে নেওয়াই মুখ্য কাজ।দুর্গার মতো কালীও সাধারণ সর্বজনীন হিসেবে বিবেচিত। সবচেয়ে সরাসরি বহুল ভাবে তিনি পূজিতা হন মহাকালী বা ভদ্রকালী রূপে। আদি পরাপ্রকৃতি (দেবী দুর্গা) অথবা ভাগ্যবতীর দশমহাবিদ্যা রূপের একটি রূপে কালী পূজিতা হন। দেবী বন্দনার এই স্তোত্রকে বলা হয় দেবী অর্গলা স্তোত্রম্ যা নিম্নরূপঃ'‘ওঁ জয় ত্বং দেবী চামুণ্ডে জয় ভূত অপহারিণি।জয় সর্বগতে দেবী কালরাত্রি নমোহস্তুতে।। ১জয়ন্তী মঙ্গলা কালী ভদ্রকালী কপালিনী।দুর্গা শিবা ক্ষমা ধাত্রী স্বাহা স্বধা নমোহস্তুতে।। ২’'আবার 'শ্রী শ্রী চন্ডী'-র একাদশ অধ্যায় তথা উত্তর-চরিত্র, 'নারায়ণীস্তুতি'-র দশম শ্লোক অনুযায়ী,"সর্বমঙ্গলা মঙ্গল্যে শিবে সর্বার্থসাধিকে। শরণ্যে ত্র্যম্বকে গৌরী নারায়নী নমহোস্তুতে।।১০"যা উপরে বর্ণিত একই ব্যঞ্জনার দ্যোতক।মধ্যযুগের শেষের দিকে বাঙালীর ভক্তিমূলক সাহিত্যে কালী ব্যাপক স্থান নিয়ে বিরাজমান। সাধক রামপ্রসাদ সেন(১৭১৮-১৭৭৫) এর মতো কালীভক্ত উপাসকরা কালীকে নিয়ে রচনা করেছেন অসংখ্য ভক্তিমূলক গান। অথচ শিবপত্নী হিসেবে পার্বতীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হয়ে নানা কাহিনীতে উচ্চারিত হওয়া ছাড়া কালীকে অষ্টাদশ শতাব্দীর আগে বাঙালীর ঘরে ঘরে আবাহনী গেয়ে পূজিত হতে কদাচিৎ দেখা গেছে। আর বাঙালির ঘরে তাঁর ভয়াল রূপের বর্ণনা, বৈশিষ্ট, অভ্যাসসমূহ উল্লেখযোগ্য কোন রূপান্তর ঘটেনি। বাংলাদেশে অনেক কালী মন্দির আছে। এর অনেকগুলোই সুপ্রাচীন। অধুনা লুপ্ত ঢাকার রমনা কালী মন্দির তেমনি একটি পুরাতন কালী মন্দির। ব্রহ্মযামলে উল্লেখ আছে ‘কালিকা বঙ্গদেশে চ’, অর্থাৎ, ‘বঙ্গদেশে দেবী কালিকা বা কালী নামে পূজিতা হন।’ নানা রূপে নানা স্থানে কালী পূজিতা হন, যেমন দক্ষিণাকালী, শ্মশানকালী, ভদ্রকালী, রক্ষাকালী গুহ্যকালী, মহাকালী, চামুণ্ডা ইত্যাদি নামে মাহাত্ম্যে এ কালীর মধ্যে কিছু কিছু ভিন্নতা বর্তমান। অন্যদিকে বিভিন্ন মন্দিরে দশমহাবিদ্যা ব্রহ্মময়ী, ভবতারিণী, আনন্দময়ী, করুণাময়ী ইত্যাদি নামে কালী’র পূজা হয়। চট্টগ্রাম শহরের চট্টেশ্বরী শ্রী কালীবাড়ী, গোলপাহাড় শ্মশান কালীবাড়ী, দেওয়ানহাটের দেওয়ানেশ্বরী কালীবাড়ী,সদরঘাট কালীবাড়ী, পটিয়া পিঙ্গলা কালীবাড়ী, ধলঘাট বুড়াকালীবাড়ী সহ চট্টগ্রামে অনেক প্রসিদ্ধ কালী মন্দির বর্তমান। এছাড়াও আসামের কামরূপ কামাখ্যা দেবীর পূজাও বিশেষ প্রসিদ্ধ। এর প্রায় প্রত্যেকটিতে প্রত্যেক শনি ও মঙ্গলবার এবং অমাবস্যায় কালীপূজা হয়। কার্ত্তিক মাসের অমাবস্যা তিথিতে দীপান্বিতার দিন কালীপূজা বিশেষভাবে পালিত হয়।সর্বজনীন মণ্ডপে যেখানে দুর্গাপূজা হয় সেখানে অধিকাংশ মণ্ডপে কালীপূজাও হয়ে থাকে। অনেক কালীসাধক বিখ্যাত এবং শ্রদ্ধার্হ। শ্রীরামকৃষ্ণ কালীর উপাসক ছিলেন। স্বামী বিবেকানন্দও কালীর ভক্ত ছিলেন। কালী প্রশস্তিমূলক গান তথা শ্যামাসঙ্গীত বাংলা গানের একটি ভিন্ন ধারা। কালীসাধক রাম প্রসাদ সেন, কমলাকান্ত ভট্টাচার্য এ ধারায় অন্যতম অবদান রাখেন। দ্বিজেন্দ্রলাল রায় এবং কাজী নজরুল ইসলামও এ ধারার উৎকৃষ্ট মানের গান রেখে গেছেন। নিরক্ষর শ্রীরামকৃষ্ণ দেবী কালী সচেতনতায় সিক্ত হয়ে অনবদ্য বাণী উচ্চারণ করতেন যা শ্রী'ম রচিত অমর গ্রন্থ ‘রামকৃষ্ণ কথামৃত’তে স্থান পেয়েছে। ‘মৃত্যুরূপা কালী’, দেবী কালীকে নিয়ে আছে স্বামী বিবেকানন্দ রচিত একটি বিখ্যাত সুদীর্ঘ কবিতা। ভগিনী নিবেদিতা মাতৃরূপা কালী নামক একটি কালী বিষয়ক গ্রন্থ রচনা করেছিলেন।দীপাবলী বা দীপান্বিতা বা কার্ত্তিকী অমাবস্যায় অনুষ্ঠিত কালীপূজা উপলক্ষে দেবী মূর্তির দক্ষিণা কালীর অবয়বে তৈরী হয়, এক্ষেত্রে দেবী বৈশিষ্ট হচ্ছে দেবী করালবদনা, কৃষ্ণবর্ণা, নীলবর্ণা বা মহামেঘবর্ণা। দেবী আলুলায়িত কেশা। রামপ্রসাদী গানে ভক্তিভরে মাকে বলা হচ্ছে,‘…এলোকেশী সর্বনাশী..’,মা এলোকেশী, রক্তচক্ষু, লোল জিহ্বা, চতুর্ভূজা, নৃমুণ্ড-মালিনী,, নরহস্তের কোমরবন্ধ, বাম ঊর্ধ্ব করে উন্মুক্ত খড়্গ এবং অধো হস্তে নরমুণ্ড, দক্ষিণ করদ্বয়ে বর ও অভয়মুদ্রা। দক্ষিণা কালীর দক্ষিণ পা শিববক্ষে স্পর্শমান, বাম পা খানিকটা দূরত্বে। স্বামীর গায়ে পা পড়ায় অসুর-রক্ত পানে সিক্ত জিহ্বায় কামড়। ত্রিনয়নী মা অসুর হত্যার মহাঘোরে হাস্যরতা ও ভয়াল দর্শনা। মায়ের গলায় নৃমুণ্ড মালায় সাধারণত ১০৮টি অথবা ৫১ টি নরমুণ্ড বর্তমান। ১০৮ হিন্দুদের জন্য একটি পবিত্র সংখ্যা, দেবনাগরী বর্ণমালায় সর্বসমেত ৫১টি বর্ণ আছে। হিন্দুদের বিশ্বাস সংস্কৃত একটি চলমান জীবন্ত ভাষা এবং এর ৫১ টি বর্ণমালায় অপার শক্তি নিহিত আছে।মায়ের কোন চিরস্থায়ী গুণ বা প্রকৃতি নেই, যার মানে দাঁড়ায় বিশ্ব-প্রকৃতি ধ্বংসের পরেও তিনি বর্তমান থাকবেন। হিন্দু শাস্ত্রে পূজিতা দেবীদের মধ্যে কালীর রূপ ও চরিত্র সর্বাধিক রোমাঞ্চকর ও বিস্ময় উদ্রেককারী। ঘোর অমাবস্যার গভীর রাতে তাঁর পূজা সম্পন্ন হয়। কালী ভীষণ দর্শনা, ক্রোধান্বিতা, লজ্জাহীনা। কালী ভয়ঙ্কর যোদ্ধা, রক্তপিয়াসী। কালী চির ব্যতিক্রমী। ঐশী সংযোগ সত্ত্বেও এক দীর্ঘকালীন উপেক্ষার আখ্যান। তবে দুর্বল, দ্বিধান্বিত মন যখনই শক্তি প্রার্থনা করেছে, বল ভিক্ষা করেছে, ওই করাল বদনা মহাতেজার শরনাপন্ন হয়েছে। ঘোর আমানিশায় জনমানবহীন মধ্যরাতের নিভৃত পূজাতেই ছিল তাঁর অধিকার। কোনো ক্ষেত্রে সূর্যের আলো স্পর্শ ও ছিল নিষিদ্ধ। হাজার বছরের বিমুখতা অতিক্রম করে আজকের দীপাবলী উৎসবে যথেষ্ট ধূমধাম সহযোগে তাঁর উপাসনা হয়ে থাকে। তবে বাঙালীর উৎসবমুখীতাই যে এই পূজার জনপ্রিয়তার অংশত কারণ তাতে সন্দেহের অবকাশ নেই। কারণ বহু ধুমধাম সহযোগে সম্বৎসরের এই মাতৃ আরাধনা তথা শক্তি পূজা আমাদের সমাজে নারীর অবস্থান ও গ্রহণযোগ্যতাকে বিন্দু মাত্র প্রভাবিত করে না। বর্তমান সময়ের দীপান্বিতা উৎসব যদি মোহনা হয়, তবে এই তরঙ্গিনীর উৎস সম্পর্কে আগ্রহ স্বাভাবিক। এই অনুসন্ধান সহজ নয়। কালের প্রবাহে উপনদীর মতো অসংখ্য উপগাথা এসে মিশে গেছে মূল তথ্যে - আজ তাদের পৃথক করা বেশ কঠিন কাজ। অনেক সময়ই অসম্ভব। তবে প্রতিটি অংশই অতীব চিত্তাকর্ষক তাতে সন্দেহ নেই। পুরান তথা বিভিন্ন সাহিত্য থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী কালীর বর্তমান রূপ পরিগ্রহে সময় লেগেছে অন্তত দুই হাজার বছর। কালীর বৈদিক পরিচয় অথর্ব বেদের সুত্রে। এই বেদে প্রথম কালীর স্বরূপ প্রকাশিত হয়। তবে মার্কণ্ডেয় পুরাণ, কালিকা পুরাণ ইত্যাদিতেও কালীর উল্ল্যেখ পাওয়া যায়। মহাভারতের সৌপ্তিক পর্বে কালরাত্রি নাম্নী এক দেবীর বর্ণনা পাই। এই দেবী কালিকারই অন্য রূপ বলে উল্লিখিত হয়ে থাকে। উৎস খুঁজতে গিয়ে দেবী কালীর প্রথম পর্যায়ের সাথে অনার্য সম্বন্ধের সম্ভাবনা জোরালো ভাবে উঠে আসে। হরপ্পা - মহেঞ্জদরো সভ্যতায় মাতৃ পূজা প্রচলিত ছিল বলে জানা যায়। এই সভ্যতা ছিল মাতৃতান্ত্রিক। পূজিতা এই দেবীর সাথে দেবী কালিকার প্রভূত সাদৃশ্য পাওয়া যায়। আবার কেউ কেউ কালীকে আদিবাসি সম্প্রদায়ের দেবী রূপেও বর্ণনা করে থাকেন। সপ্তম - অষ্টম দশকের কিছু লেখায় এর উল্ল্যেখ আছে তবে ঈষৎ ভিন্ন ভাবে। যেমন বান ভট্টের নাটক কাদম্বরীতে দেবী চণ্ডীর উপাখ্যান পাওয়া যায়। ইনি শবর জাতির দ্বারা পূজিতা হতেন। সমকালীন কবি বাকপতি বিরচিত " গৌড় বহও " নামক প্রাকৃত ভাষায় রচিত কাব্য গ্রন্থে বিন্ধ্যবাসিনি নামে এক দেবীর কথা আছে যিনি ছিলেন শবরদের আরাধ্যা। তাঁর সাথে ও কালীর বিশেষ মিল পাওয়া যায়। মূল বর্ণনা অনুযায়ী এই দেবী ভীষণ দর্শনা, মুণ্ডমালিনী, প্রায় নগ্ন এক মূর্তি। খ্রিস্ট পূর্ব ৩০০ থেকে প্রায় ৬০০ খ্রিস্টাব্দ অবধি কালী মূলত যুদ্ধের দেবী রূপে পূজিতা হতেন। বৈদিক দেবী হলেও তৎকালীন সময়ে সনাতন হিন্দু ধর্মের মূল স্রোতে তিনি কিছুটা ব্রাত্যই ছিলেন। কালীর আরাধনা বিশেষত নিম্ন বর্ণ বা অবৈদিক সমাজেই বিশেষ জনপ্রিয় ছিল। নগরের বাইরে শ্মশানের কাছাকাছি অঞ্চলেই কালী মন্দিরের অবস্থান বেশি পরিলক্ষিত হয়। তবে ষষ্ঠ শতকের 'দেবী মাহাত্মম' রচনায় মহাকালী রূপে কালীর রূপ ও মাহাত্ম্যের বিস্তৃত বর্ণনা পাই। অশুভ বিনাশ করে ইনি শুভ শক্তির প্রতিষ্ঠা করেন। দেবী দুর্গার ললাট উৎপন্না মহা শক্তিশালিনী দেবী রূপে তিনি স্বীকৃতি পান। আবার স্বামী অভেদানন্দের মতে বৈদিক দেবী 'রাত্রি' পরবর্তীতে দেবি কালিকা হয়ে ওঠেন। তবে তন্ত্র সাধনার সাথে সুনিবিড় যোগাযোগ এক সুদীর্ঘ সময় কালীকে সাধারন মানুষের থেকে দূরে সরিয়ে রাখে। এক ভয় মিশ্রিত শ্রদ্ধা এর কারণ হয়তো। তবে পরবর্তীতে এই সম্পর্ক ধীরে ধীরে সহজ হয়। সতেরোশ খ্রিস্টাব্দ-উত্তর সময়ে কালী সাধনা এক অন্য রূপ পায়। ভয়াল ভয়ঙ্কর রক্ত পিপাসু দেবী, স্নেহময়ী মা হয়ে ওঠেন। সাধক রাম প্রসাদ, সাধক বামাখ্যাপা তথা শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংস দেবের ন্যায় কালী উপাসকেরা দেবী কালিকার ভবতারিণী মাতৃ রূপ পূজা প্রচার করেন। ক্রমশ এই রূপ সাধারন বাঙালী মনের কাছাকাছি আসে । বাঙালী হৃদয় আসনে তখন থেকেই তাঁর করুনাঘন অবস্থান।ব্রিটিশ শাসিত বাংলা তথা ভারতে কালী উপাসনা বিশেষ তাৎপর্য পূর্ণ হয়ে উঠেছিল। পরাধীন জাতির অন্তরের ক্ষোভ আর প্রতিবাদের উচ্চারণ কালীর দৃপ্ত ব্যক্তিত্বকে অনুসরন করতে চাইত। সশস্ত্র স্বাধীনতা সংগ্রামের অংশ হিসেবে শক্তি আরাধনা তথা কালী উপাসনার প্রচলনের বহু প্রমান পাওয়া যায়। কালীর তেজোময়ী, লড়াকু ভাবময়তা তৎকালীন বিপ্লবীদের মধ্যে যথেষ্ট জনপ্রিয়তা অর্জন করে। প্রখর নারী সত্ত্বা, যা ছিল উপেক্ষিত, বিপর্যয়ের ক্ষণে তা দৈবী স্বরূপে স্বীকৃত হয়। অপর কারণটি ছিল কালী সম্পর্কে শাসক জাতির অবহেলা মিশ্রিত আতঙ্ক ও ভয়। এই উগ্র ভয়াল প্রায় নগ্ন রূপ ব্রিটিশ মানসিকতাকে সজোরে আঘাত করে। রক্তপিপাসু এবং যৌনতার প্রতীক রূপেই কালীর পরিচয় হয়। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, শ্রীমৎ দক্ষিণাকালিকার ধ্যান মণ্ত্রে সর্বশেষ পঙ্ক্তির আগের পঙ্ক্তির অংশ বিশেষ ---".... মহাকালেন চ সমং বিপরীতরতাতুরাম ।।"অর্থাৎ, দেবী বিপরীত-রতাতুরা -- দেবীর ভৈরব মহাকাল। মহাকালের সাথে দেবী বিপরীত রতিতে সঙ্গতা হয়ে রয়েছেন। ( রতিকালে শায়িত পুরুষোপরি নারী আরোহণ করে ক্রীয়া নিষ্পন্ন করলে তাকে বিপরীত রতি বলে )। এক্ষেত্রে, ব্রক্ষ্মচৈতণ্যকে অধিষ্ঠান করে মায়াশক্তিরূপিণী কালী জগত সৃষ্টি করে চলেছেন। আর এখানেই প্রচ্ছন্ন ভাবে লুকিয়ে আছে যৌনতা ও সৃষ্টির পারস্পরিক মেলবন্ধন।কালীকে নিয়ে অবজ্ঞা ভাব তখনকার বহু বিদেশী বিদ্বদজনের মধ্যেও দেখা যায়। এমনকি পণ্ডিত ম্যাক্সমুলার ও কালীকে নিয়ে বিশেষ আগ্রহ দেখান নি। তবে পরবর্তীতে বিশেষত উনিশশো ষাট ও সত্তরের দশকে কালীর এই ব্যতিক্রমী স্ত্রী সত্ত্বা বহু গবেষণার মূল বিষয় হয়ে ওঠে। কালী শব্দের ব্যুৎপত্তি ও অর্থ সম্পর্কিত প্রচলিত ধারনা সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত উল্ল্যেখ ব্যতিরেকে এই আলোচনা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। কু ধাতুর উত্তরে অল্ + কর্তৃবাচ্যে অন্ যুক্ত হয়ে কাল পদটি হয়। এর অর্থ হলো মৃত্যু বা মহাকাল অর্থাৎ মহাদেব। এই কাল শব্দের উত্তরে স্ত্রীলিঙ্গে ঈপ্ প্রত্যয় যুক্ত হয় কালী শব্দটির সৃষ্টি হয়েছে। অর্থ হলো মহাকালের বিশেষ শক্তি কালী। দশমহাবিদ্যার ইনিই প্রথম মহাবিদ্যা। অনন্তকালের সৃষ্টিরুপিণী পরমা প্রকৃতির রূপ এই মহাশক্তি কালী। শ্রী শ্রী চণ্ডী মতে কালী তিনি, যিনি 'কাল' নিয়ন্ত্রন করেন। 'কাল' অর্থে সময়। বেদ তত্ত্ব অনুসারে তিনি আদি শক্তি - মহাকাল শিবের অর্ধাঙ্গিনী! শক্তি উপাসনা এ ক্ষেত্রে অনেকাংশেই পুরুষ তথা শিব নির্ভর। তবে তন্ত্র মতে কালীর দৈবী সত্ত্বা বহুলাংশে স্বাধীন ও একক। এই মতবাদ অনুযায়ী কালী শব্দের মধ্যে 'কল' ধাতু আছে। কল্ ধাতুর ভাবগত অর্থ হলো গণনা, গতি, আশ্রয়, শব্দ, সংখ্যা ! তাই কালী শব্দের তাৎপর্য হলো সংখ্যায়নী গতি সম্পন্না যিনি। শিবের বুকের উপর দণ্ডায়মান কালী - এটা সৃষ্টি তত্ত্বের প্রথমিক পর্যায়ের ইঙ্গিতবাহী। সাংখ্য দর্শন বলে পুরুষ অক্রিয় , প্রকৃতির সংস্পর্শে তিনি সক্রিয় হয়ে ওঠেন। তাই পুরুষ শিব এখানে শব রূপে শায়িত। বস্তুবাদী এই দর্শন অনুসারে পুরুষ স্থানু বা স্থির ধর্মী , প্রকান্তরে তীব্র ধনাত্মক শক্তি। আর নারী চরিষ্ণু বা ঋণাত্মক। এই দুই বিপরীতধর্মী শক্তির পারস্পরিক মিলনে সৃষ্টির সূচনা। আর তারই প্রতীক নিস্ক্রিয় শিবের বুকে চঞ্চলা কালীর পদ চারণা! মধ্যযুগীয় তন্ত্র মতোবাদের প্রসারে এই সাংখ্য দর্শনের যথেষ্ট প্রভাব দেখা যায়।কালী নারী সত্ত্বার এমন এক রূপ যা স্বয়ংসম্পূর্ণ, প্রচলিত স্ত্রী ভাবনার পরিপন্থী, অনন্য। তাঁর দৈবী ভাবমূর্তি বিতর্কিত ও বটে। কারণ কালী পৃথক - লোল জিহ্বা, উন্মুক্ত স্তন, নগ্ন জঙ্ঘা অথচ অনায়াস সাবলীল ভঙ্গিমায় এক ব্যতিক্রমী চরিত্র। আবহমান কাল ধরেই ভক্তি মার্গে তাঁর আসনে উপেক্ষার ছায়া। তাঁর রণরঙ্গিণী রক্ত লোলুপ নির্লজ্জ রূপে তথা কথিত সভ্য মন সদা বিব্রত - সে একাল হোক বা সেকাল। বেদ ও পুরানের অকুণ্ঠ সমর্থন সত্ত্বেও তাঁর ঐশী অস্তিত্বের সামগ্রিক গ্রহনীয়তা দীর্ঘসময় ধরে ছিল অবহেলিত। এখানে এও এক লড়াইয়ের কাহিনি--- আপস না করার লড়াই। অতি প্রাচীনকাল থেকেই কালী আধুনিক। তাঁর বলিষ্ঠ ব্যক্তিত্বকে কখনই আরোপিত মনে হয় না। যুদ্ধ ক্ষেত্রে প্রবল পরাক্রমে অসুর নিধন তাকে কখনই অসহজ করে তোলে না। এই স্বাচ্ছন্দ্যই হয়তো নারী ক্ষমতায়নের প্রথম সোপান।শ্রীশ্রী মা কালীর নাম উৎপত্তি ও রূপভেদ:--- ব্রহ্মযামল নামক তন্ত্রগ্রন্থের মতে, কালী বঙ্গদেশের অধিষ্ঠাত্রী দেবী। ‘কালী’ শব্দটি ‘কাল’ শব্দের স্ত্রীলিঙ্গ। এই শব্দের অর্থ ‘কৃষ্ণ’ (কালো) বা ‘ঘোর বর্ণ’। মহাকাব্য মহাভারত-এ যে ভদ্রকালীর উল্লেখ আছে, তা দেবী দুর্গারই একটি রূপ। মহাভারত-এ ‘কালরাত্রি’ বা ‘কালী’ নামে আরও এক দেবীর উল্লেখ পাওয়া যায়। ইনি যুদ্ধে নিহত যোদ্ধৃবর্গ ও পশুদের আত্মা বহন করেন। আবার হরিবংশ গ্রন্থে কালী নামে এক দানবীর উল্লেখ পাওয়া যায়। ‘কাল’ শব্দের দুটি অর্থ রয়েছে: ‘নির্ধারিত সময়’ ও ‘মৃত্যু’। কিন্তু দেবী প্রসঙ্গে এই শব্দের মানে "সময়ের থেকে উচ্চতর"। সমোচ্চারিত শব্দ ‘কালো’র সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক না থাকলেও, সংস্কৃত সাহিত্যের বিশিষ্ট গবেষক টমাস কবার্নের মতে, ‘কালী’ শব্দটি ‘কৃষ্ণবর্ণ’ বোঝানোর জন্যও ব্যবহৃত হতে পারে।★ রূপভেদ- তন্ত্র পুরাণে দেবী কালীর একাধিক রূপভেদের উল্লেখ পাওয়া যায়। তোড়লতন্ত্র অনুসারে, কালী আট প্রকার। যথা: দক্ষিণকালিকা, সিদ্ধকালিকা, গুহ্যকালিকা, শ্রীকালিকা, ভদ্রকালী, চামুণ্ডাকালিকা, শ্মশানকালিকা ও মহাকালী। মহাকাল সংহিতার অনুস্মৃতিপ্রকরণে নয় প্রকার কালীর উল্লেখ পাওয়া যায়। যথা: দক্ষিণাকালী, ভদ্রকালী, শ্মশানকালী, কালকালী, গুহ্যকালী, কামকলাকালী, ধণকালিকা, সিদ্ধিকালী, চণ্ডিকালিকা। শ্রী অভিনব গুপ্তের তন্ত্রালোক ও তন্ত্রসার গ্রন্থদ্বয়ে কালীর ১৩টি রূপের উল্লেখ আছে। যথা: সৃষ্টিকালী, স্থিতিকালী, সংহারকালী, রক্তকালী, যমকালী, মৃত্যুকালী, রুদ্রকালী, পরমার্ককালী, মার্তণ্ডকালী, কালাগ্নিরুদ্রকালী, মহাকালী, মহাভৈরবঘোর ও চণ্ডকালী। জয়দ্রথ যামল গ্রন্থে কালীর যে রূপগুলির নাম পাওয়া যায়, সেগুলি হল: ডম্বরকালী, রক্ষাকালী, ইন্দীবরকালিকা, ধনদকালিকা, রমণীকালিকা, ঈশানকালিকা, জীবকালী, বীর্যকালী, প্রজ্ঞাকালী ও সপ্তার্নকালী। নিম্নে মা কালীর মূল রূপগুলির (অষ্টধা কালী) ব্যাখ্যা দেবার চেষ্টা করলাম।● দক্ষিণাকালী- দক্ষিণাকালী হলো কালীর সর্বাপেক্ষা প্রসিদ্ধ মূর্তি। ইনি প্রচলিত ভাষায় শ্যামাকালী নামেও আখ্যাতা। দক্ষিণাকালী করালবদনা, ঘোরা, মুক্তকেশী, চতুর্ভূজা এবং মুণ্ডমালাবিভূষিতা। তাঁর বামকরযুগলে সদ্যছিন্ন নরমুণ্ড ও খড়্গ; দক্ষিণকরযুলে বর ও অভয় মুদ্রা। তাঁর গাত্রবর্ণ মহামেঘের ন্যায়; তিনি দিগম্বরী। তাঁর গলায় মুণ্ডমালার হার; কর্ণে দুই ভয়ানক শবরূপী কর্ণাবতংস; কটিদেশে নরহস্তের কটিবাস। তাঁর দন্ত ভয়ানক; তাঁর স্তনযুগল উন্নত; তিনি ত্রিনয়নী এবং মহাদেব শিবের বুকে দণ্ডায়মান। তাঁর দক্ষিণপদ শিবের বক্ষে স্থাপিত। তিনি মহাভীমা, হাস্যযুক্তা ও মুহুর্মুহু রক্তপানকারিনী। তাত্ত্বিকের তাঁর নামের যে ব্যাখ্যা দেন তা নিম্নরূপ: দক্ষিণদিকের অধিপতি যম যে কালীর ভয়ে পলায়ন করেন, তাঁর নাম দক্ষিণাকালী। তাঁর পূজা করলে ত্রিবর্ণা তো বটেই সর্বোপরি সর্বশ্রেষ্ঠ ফলও দক্ষিণাস্বরূপ পাওয়া যায়।● সিদ্ধকালী- সিদ্ধকালী কালীর একটি অখ্যাত রূপ। গৃহস্থের বাড়িতে সিদ্ধকালীর পূজা হয় না; তিনি মূলত সিদ্ধ সাধকদের ধ্যান আরাধ্যা। কালীতন্ত্র-এ তাঁকে দ্বিভূজা রূপে কল্পনা করা হয়েছে। অন্যত্র তিনি ব্রহ্মরূপা ভুবনেশ্বরী। তাঁর মূর্তিটি নিম্নরূপ: দক্ষিণহস্তে ধৃত খড়্গের আঘাতে চন্দ্রমণ্ডল থেকে নিঃসৃত অমৃত রসে প্লাবিত হয়ে বামহস্তে ধৃত একটি কপালপাত্রে সেই অমৃত ধারণ করে পরমানন্দে পানরতা। তিনি সালংকারা। তাঁর বাম পদ শিবের বুকে ও দক্ষিণ পদ শিবের উরুদ্বয়ের মধ্যস্থলে সংস্থাপিত।● গুহ্যকালী- গুহ্যকালী বা আকালীর রূপ গৃহস্থের নিকট অপ্রকাশ্য। তিনি সাধকদের আরাধ্য। তাঁর রূপকল্প ভয়ংকর: গুহ্যকালীর গাত্রবর্ণ গাঢ় মেঘের ন্যায়; তিনি লোলজিহ্বা ও দ্বিভূজা; গলায় পঞ্চাশটি নরমুণ্ডের মালা; কটিতে ক্ষুদ্র কৃষ্ণবস্ত্র; স্কন্ধে নাগযজ্ঞোপবীত; মস্তকে জটা ও অর্ধচন্দ্র; কর্ণে শবদেহরূপী অলংকার; হাস্যযুক্তা, চতুর্দিকে নাগফণা দ্বারা বেষ্টিতা ও নাগাসনে উপবিষ্টা; বামকঙ্কণে তক্ষক সর্পরাজ ও দক্ষিণকঙ্কণে অনন্ত নাগরাজ; বামে বৎসরূপী শিব; তিনি নবরত্নভূষিতা; নারদাদিঋষিগণ শিবমোহিনী গুহ্যকালীর সেবা করেন; তিনি অট্টহাস্যকারিণী, মহাভীমা ও সাধকের অভিষ্ট ফলপ্রদায়িনী। গুহ্যকালী নিয়মিত শবমাংস ভক্ষণে অভ্যস্তা। মুর্শিদাবাদ-বীরভূম সীমান্তবর্তী আকালীপুর গ্রামে মহারাজা নন্দকুমার প্রতিষ্ঠিত গুহ্যকালীর মন্দিরের কথা জানা যায়। মহাকাল সংহিতা মতে, নববিধা কালীর মধ্যে গুহ্যকালীই সর্বপ্রধানা। তাঁর মন্ত্র বহু – প্রায় আঠারো প্রকারের।● মহাকালী- তন্ত্রসার গ্রন্থমতে, মহাকালী পঞ্চবক্ত্রা ও পঞ্চদশনয়না। তবে শ্রীশ্রীচণ্ডী-তে তাঁকে আদ্যাশক্তি, দশবক্ত্রা, দশভূজা, দশপদী ও ত্রিংশলোচনা রূপে কল্পনা করা হয়েছে। তাঁর দশ হাতে রয়েছে যথাক্রমে খড়্গ, চক্র, গদা, ধনুক, বাণ, পরিঘ, শূল, ভূসুণ্ডি, নরমুণ্ড ও শঙ্খ। ইনিও ভৈরবী; তবে গুহ্যকালীর সঙ্গে এঁর পার্থক্য রয়েছে। ইনি সাধনপর্বে ভক্তকে উৎকট ভীতি প্রদর্শন করলেও অন্তে তাঁকে রূপ, সৌভাগ্য, কান্তি ও শ্রী প্রদান করেন।● ভদ্রকালী- ভদ্রকালী নামের ভদ্র শব্দের অর্থ কল্যাণ এবং কাল শব্দের অর্থ শেষ সময়। যিনি মরণকালে জীবের মঙ্গলবিধান করেন, তিনিই ভদ্রকালী। ভদ্রকালী নামটি অবশ্য শাস্ত্রে দুর্গা ও সরস্বতী দেবীর অপর নাম রূপেও ব্যবহৃত হয়েছে। কালিকাপুরাণ মতে, ভদ্রকালীর গাত্রবর্ণ অতসীপুষ্পের ন্যায়, মাথায় জটাজুট, ললাটে অর্ধচন্দ্র ও গলদেশে কণ্ঠহার। তন্ত্রমতে অবশ্য তিনি মসীর ন্যায় কৃষ্ণবর্ণা, কোটরাক্ষী, সর্বদা ক্ষুধিতা, মুক্তকেশী; তিনি জগৎকে গ্রাস করছেন; তাঁর হাতে জ্বলন্ত অগ্নিশিখা ও পাশযুগ্ম। গ্রামবাংলায় অনেক স্থলে ভদ্রকালীর বিগ্রহ নিষ্ঠাসহকারে পূজিত হয়। এই দেবীরও একাধিক মন্ত্র রয়েছে। তবে প্রসিদ্ধ চতুর্দশাক্ষর মন্ত্রটি হল – ‘হৌঁ কালি মহাকালী কিলি কিলি ফট স্বাহা’।● চামুণ্ডাকালী- চামুণ্ডাকালী বা চামুণ্ডা ভক্ত ও সাধকদের কাছে কালীর একটি প্রসিদ্ধ রূপ। দেবীভাগবত পুরাণ ও মার্কণ্ডেয় পুরাণ-এর বর্ণনা অনুযায়ী, চামুণ্ডা চণ্ড ও মুণ্ড নামক দুই অসুর বধের নিমিত্ত দেবী দুর্গার ভ্রুকুটিকুটিল ললাট থেকে উৎপন্ন হন। তাঁর গাত্রবর্ণ নীল পদ্মের ন্যায়, হস্তে অস্ত্র, দণ্ড ও চন্দ্রহাস; পরিধানে ব্যাঘ্রচর্ম; অস্তিচর্মসার শরীর ও বিকট দাঁত। দুর্গাপূজায় মহাষ্টমী ও মহানবমীর সন্ধিক্ষণে আয়োজিত সন্ধিপূজার সময় দেবী চামুণ্ডার পূজা হয়। পূজক অশুভ শত্রুবিনাশের জন্য শক্তি প্রার্থনা করে তাঁর পূজা করেন। অগ্নিপুরাণ-এ আট প্রকার চামুণ্ডার কথা বলা হয়েছে। তাঁর মন্ত্রও অনেক। বৃহন্নন্দীকেশ্বর পুরাণে বর্ণিত চামুণ্ডা দেবীর ধ্যানমন্ত্রটি এইরূপ - নীলোৎপলদলশ্যামা চতুর্বাহুসমন্বিতা । খট্বাঙ্গ চন্দ্রহাসঞ্চ বিভ্রতী দক্ষিণে করে ।। বামে চর্ম্ম চ পাশঞ্চ ঊর্দ্ধাধোভাগতঃ পুনঃ । দধতী মুণ্ডমালাঞ্চ ব্যাঘ্রচর্মধরাম্বরা ।। কৃশোদরী দীর্ঘদংষ্ট্রা অতিদীর্ঘাতিভীষণা । লোলজিহ্বা নিমগ্নারক্তনয়নারাবভীষণা ।। কবন্ধবাহনাসীনা বিস্তারা শ্রবণাননা । এষা কালী সমাখ্যাতা চামুণ্ডা ইতি কথ্যতে ।।● শ্মশানকালী- কালীর "শ্মশানকালী" রূপটির পূজা সাধারণত শ্মশানঘাটে হয়ে থাকে। এই দেবীকে শ্মশানের অধিষ্ঠাত্রী দেবী মনে করা হয়। তন্ত্রসাধক কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ রচিত বৃহৎ তন্ত্রসার অনুসারে এই দেবীর ধ্যানসম্মত মূর্তিটি নিম্নরূপ:----"শ্মশানকালী দেবীর গায়ের রং কাজলের মতো কালো। তিনি সর্বদা বাস করেন। তাঁর চোখদুটি রক্তপিঙ্গল বর্ণের। চুলগুলি আলুলায়িত, দেহটি শুকনো ও ভয়ংকর, বাঁ-হাতে মদ ও মাংসে ভরা পানপাত্র, ডান হাতে সদ্য কাটা মানুষের মাথা। দেবী হাস্যমুখে আমমাংস খাচ্ছেন। তাঁর গায়ে নানারকম অলংকার থাকলেও, তিনি উলঙ্গ এবং মদ্যপান করে উন্মত্ত হয়ে উঠেছেন।"শ্মশানকালীর আরেকটি রূপে তাঁর বাঁ-পাটি শিবের বুকে স্থাপিত এবং ডান হাতে ধরা খড়্গ। এই রূপটিও ভয়ংকর রূপ। তন্ত্রসাধকেরা মনে করেন, শ্মশানে শ্মশানকালীর পূজা করলে শীঘ্র সিদ্ধ হওয়া যায়। রামকৃষ্ণ পরমহংসের স্ত্রী সারদা দেবী দক্ষিণেশ্বরে শ্মশানকালীর পূজা করেছিলেন। কাপালিকরা শবসাধনার সময় কালীর শ্মশানকালী রূপটির ধ্যান করতেন। সেকালের ডাকাতেরা ডাকাতি করতে যাবার আগে শ্মশানঘাটে নরবলি দিয়ে শ্মশানকালীর পূজা করতেন। পশ্চিমবঙ্গের অনেক প্রাচীন শ্মশানঘাটে এখনও শ্মশানকালীর পূজা হয়। তবে গৃহস্থবাড়িতে বা পাড়ায় সর্বজনীনভাবে শ্মশানকালীর পূজা হয় না। রামকৃষ্ণ পরমহংস বলেছিলেন, শ্মশানকালীর ছবিও গৃহস্থের বাড়িতে রাখা উচিত নয়।● শ্রীকালী- গুণ ও কর্ম অনুসারে শ্রীকালী কালীর আরেক রূপ। অনেকের মতে এই রূপে তিনি দারুক নামক অসুর নাশ করেন। ইনি মহাদেবের শরীরে প্রবেশ করে তাঁর কণ্ঠের বিষে কৃষ্ণবর্ণা হয়েছেন। শিবের ন্যায় ইনিও ত্রিশূলধারিনী ও সর্পযুক্তা।সেকালের কালী পূজা:----আজ আমরা যে কালীমূর্তির আরাধনা সর্বত্র দেখতে পাই, তার রূপটি (দক্ষিণাকালী) সর্বপ্রথম বিখ্যাত তন্ত্রসাধক কৃষ্ণানন্দ আগমবাগিশ (১৬ শতক) কল্পনা করেছিলেন বলে কথিত আছে। শোনা যায়, তিনি অমাবস্যার রাতে স্বহস্তে কালীমূর্তি তৈরি করে সে-রাতেই নিজে পূজা সম্পন্ন করে প্রতিমা বিসর্জন দিতেন। অবশ্য অনেকে মনে করেন যে, তাঁর আগেও বাঙলায় কালী আরাধনা প্রচলিত ছিল। এ-ভাবেই বাঙলার কালী আরাধনার সঙ্গে যুক্ত হয়ে গেছে কৃষ্ণনগরের মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্রের নাম। জনশ্রুতি এই যে, এই কালীভক্ত রাজা আদেশ দিয়েছিলেন যে, তাঁর রাজ্যে প্রতি গৃহস্থকে কার্তিকী অমাবস্যায় তার বাড়িতে কালীপূজা করতে হবে, অন্যথায় শাস্তি পেতে হবে। তাঁর পরবর্তী দুই পুরুষও এই আদেশ বহাল রাখেন। এর ফলে শুধু কৃষ্ণনগর জেলাতেই নাকি দশ সহস্রাধিক বাড়িতে কালীপূজা অনুষ্ঠিত হতো, যার পরিণতিতে ঐ অঞ্চলে শ্যামাপূজার রাত্রিতে পূজারী ব্রাহ্মণের অভাব দেখা দেয়। কালীপূজায় ঐ জেলায় পশুবলিও নাকি হতো প্রায় দশ হাজারের মতো। চিন্তাহরণ চক্রবর্তী রচিত ‘বাঙলার পূজাপার্বন’ বইটিতে এই তথ্য পাওয়া যায়। এই লেখকের মতে আঠারো শতকের শেষের দিকেও কালীপূজা বাংলাদেশে ততটা জনপ্রিয় হয়নি। ‘তন্ত্রসার’-এর মতো প্রাচীন কোনো গ্রন্থে কালীপূজার উল্লেখ নেই। যে ‘শ্যামাসপর্যা’ গ্রন্থে এই পূজার উল্লেখ পাওয়া যায়, তা অপেক্ষাকৃত আধুনিক।রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের পৌত্র ঈশানচন্দ্রের কালী আরাধনা নিয়েও অনেক কাহিনী শোনা যায়। কালীপূজায় তাঁর এক হাজার মণ মিষ্টান্ন ও সেই ওজনের চিনি, চাল-কলা ইত্যাদি সহ এক হাজারটি শাড়ি ও মেয়েদের এক হাজার রেশমি পোশাক ইত্যাদির হাজার রকমের ভোগ নিবেদনের কাহিনী পাওয়া যায়। ঐ কাহিনী অনুসারে এই কালীপূজায় মহিষ, পাঁঠা ও ভেড়া (প্রতিটি এক হাজার করে) বলি দেবার খরচ পড়েছিল প্রায় দশ হাজার টাকা আর পূজার অন্যান্য খরচ ধরলে আরও প্রায় কুড়ি হাজার টাকা! এই বেহিসেবী ব্যয় মেটাতে গিয়ে ঈশানচন্দ্রকে নাকি সর্বস্বান্ত হতে হয়েছিল।কালীপূজার আড়ম্বরে এমনই নিঃস্ব হয়ে যাওয়া আর এক রাজার গল্প পাওয়া যায় শ্রীরামপুরের মিশনারি উইলিয়াম ওয়ার্ডের লেখায় (১৮১৫)। এই রাজা রামকৃষ্ণ বরানগরে কালীর এক মর্মরমূর্তি প্রতিষ্ঠার উৎসবে নাকি তখনকার দিনে এক লক্ষ টাকা ব্যয় করেছিলেন। ওয়ার্ড লিখেছেন, কালীর নামে রাজা বিপুল সম্পত্তি দান করেছিলেন, সেই সম্পত্তির আয় থেকে দৈনিক পাঁচশ’ লোক খাওয়ানো হয়।... কালীপূজার খরচের ফলে এখন তিনি প্রায় সর্বস্ব হারিয়েছেন।সারা বাংলাদেশ জুড়ে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য ‎ঐতিহ্যমন্ডিত কালী-আরাধনার কেন্দ্র আর তাদের নিয়ে প্রচলিত নানা কাহিনীরও শেষ নেই! যেমন, মুর্শিদাবাদের ডাহাপাড়ার দেবী কীরিটেশ্বরী, জনশ্রুতি - বাংলার নবাব মীরজাফর অসুস্থ অবস্থায় এই দেবীর চরণামৃত পান করতেন। এ-রকম আরো কয়েকটি কালীমন্দিরের মধ্যে উল্লেখযোগ্য শান্তিপুরে শাক্ত কৃষ্ণানন্দ আগমবাগিশ আর বৈষ্ণব অদ্বৈত আচার্যের বংশধরদের প্রতিষ্ঠিত কালী, রামপ্রসাদের সাধনপীঠ কুমারহট্টের (হালিশহর) ও কমলাকান্তের কোটালহাটের কালী, ভদ্রপুরে মহারাজা নন্দকুমারের প্রতিষ্ঠিত দ্বিভুজা কালী, বিষ্ণুপুরের ময়নাপুরে প্রাচীন কালী, কালনা, সিঙ্গুর ও রাণাঘাটের সিদ্ধেশ্বরী, সিউড়ি ও নবদ্বীপের ভবতারিণী, চূঁচুড়ার দয়াময়ী, নলহাটির ললাটেশ্বরী, শেওড়াফুলির নিস্তারিনী, বাগনানের মহাকালী, বর্ধমানের কঙ্কালেশ্বরী ইত্যাদি ইত্যাদি। এছাড়া বীরভূমে বীরসিংহপুরের কালী, অম্বিকা-কালনার দারুময়ী অম্বিকা ও ২৪ পরগ্ণার ময়দার কালীও বিখ্যাত।পশ্চিমবঙ্গের বাইরেও বিশ্রুত কালীক্ষেত্রের সংখ্যা নেহাত কম নয়। ঝাড়খন্ডে ধানবাদের নিকটবর্তী কল্যাণেশ্বরী ও রাজরাপ্পার ছিন্নমস্তার মন্দির ভক্তদের কাছে সুপরিচিত। এ ছাড়া পূর্ববঙ্গে (বাংলাদেশ) বিক্রমপুরে সোনারঙের কালী, ঢাকার জয়দেবপুরে শ্মশানকালী, বগুড়ার কালঙ্কেশ্বরী (বা প্রেতাসনা কালী), ত্রিপুরার মেহারে মেহার-কালী ইত্যাদিও সুপরিচিত। তমলুকের দেবী বর্গভীমা এবং কাঁথির কপালকুণ্ডলার নামাঙ্কিত মন্দির বা বাঁশবেড়িয়ার হংসেশ্বরী মন্দিরে পূজিতা দেবীও আদতে কালীরই নানা রূপ। বীরভূমের তারাপীঠে পূজিতা দেবী কালীর নিকটতম রূপান্তর তারার মন্দিরের কথা ছেড়ে দিলেও সেখানে রয়েছে বোলপুরের কাছে কঙ্কালী, ভাঙ্গালি ও বর্ধমান সীমান্তে অট্টহাস ইত্যাদি কালী-উপাসনা স্থলগুলি, যার মধ্যে কয়েকটি শক্তিপীঠ হিসেবে পরিগণিত হয়ে থাকে। এছাড়াও রয়েছে নানা ডাকাতের নামের সঙ্গে জড়িত অগণিত কালীমন্দির।এ-রকমই একটি, সিঙ্গুরের ডাকাতকালীর মন্দির দেখতে যাবার এক বিবরণ মেলে যোগেন্দ্রনাথ গুপ্তের বিখ্যাত বই ‘বাংলার ডাকাত’-এ। শেওড়াফুলি যাবার পথের বর্ণনা দিয়ে তিনি লিখছেন, “শীর্ণ সংকীর্ণ সর্পিল পথ। চৈত্র মাস। শুষ্ক পথের পাশে স্থানে স্থানে জঙ্গলঘেরা ডোবা। অতিকষ্টে মন্দিরের কাছে আসিলাম। ডাকাত কালীর মন্দির ভগ্ন ও জীর্ণ। ইঁট খসিয়া পড়িতেছে। এদিক ওদিক সাপ ছোটাছুটি করিতেছে। দিনের বেলায়ও অন্ধকার। মন্দিরে ভীষণাকৃতি কালীমূর্তি। ভিতরে আবর্জনা পূর্ণ।......একপাশে একটি বড় হাড়িকাঠভূমিতে পড়িয়া আছে।......আমি ডাকাতে কালীকে দেখিতে আসিয়া ভয়ে বিস্ময়ে শিহরিয়া উঠিলাম...। নানা আগাছায় পূর্ণ ভয়াল স্থান। দিনের বেলায়ও ভয় করে।...” সিঙ্গুরের এই ডাকাতে কালীর মন্দির কিন্তু আজও আছে, যদিও প্রাচীন জরাজীর্ণ মন্দিরের সংস্কার হয়েছে। এই কালীর নাম সিদ্ধেশ্বরী। গগন সর্দার, সনাতন বাগদি, রঘু ডাকাত ইত্যাদি নানা ডাকাতের নাম ও গল্প সিঙ্গুরের এই কালীর সঙ্গে জড়িত।এই সূত্রে কালীপূজোয় আরও দুটি বিদেশী-লিখিত নরবলির বিবরণের উল্লেখ এখানে করা যায়। একটি পর্তুগীজ জার্নালে ক্যাপটেন নরোনহা নামে এক ধর্মভীরু পর্তুগীজের বিবরণ পাওয়া যায়। মেদিনীপুরের কাছাকাছি কোনো স্থানে ডাকাতদের সঙ্গে গিয়ে তিনি এক বটগাছের নীচে তিনি তাদের আরাধ্যা কালীমূর্তি দেখতে পান। বলি হিসেবে সেখানে দু’টি অর্ধমূর্ছিত বালক ও অদুরে সিঁদুর মাখানো খড়গ দেখে তিনি ভয়ে সেখান থেকে পালিয়ে যান। আর একটি বিবরণ যার লেখা, তিনি ধর্মে ক্যাথলিক হলেও পেশায় ছিলেন ডাকাত। এক স্থানীয় জমিদারের পৃষ্ঠপোষকতায় তিনি খুলনা ও নোয়াখালি অঞ্চলে ডাকাতি করতেন, পরে পালিয়ে যান সুন্দরবনের গভীরে। সেখানে তিনি ‘ভবানীপূজা’র আয়োজন করেন বলে জানিয়েছেন, যাতে নরবলির জন্য মানুষ কেনাবেচার কথা পাওয়া যাচ্ছে ও বলির যোগ্য মানুষের লক্ষণ মিলিয়ে সওদা করছেন স্ব্য়ং পুরোহিত!ওয়ার্ডের বিবরণে এরকম আরো কালীভক্তদের বিবরণ মেলে, যারা কালীপূজো উপলক্ষে বিপুল ব্যয় করতেন, যেমন ধরা যাক, খিদিরপুরের ন্যায়নারায়ণ ঘোষাল বা গোপীমোহন নামে কলকাতার এক বৈষ্ণব ব্রাহ্মণ। প্রথমজন নাকি ১৭৯৫ সাল নাগাদ কালীপূজায় পঁচিশ হাজার টাকা ব্যয় করে ২৫টি মহিষ, ১০৮টি পাঁঠা ও ৫টি ভেড়া বলি দিয়েছিলেন। অপর ব্যক্তি ১৮১১ সালে কালীপূজায় দশ হাজার টাকা ব্যয় করেছিলেন।কলকাতার আরেক বাবু শোভাবাজারের কালীশঙ্কর ঘোষের বাড়ির কালীপূজার আড়ম্বরের বিবরণ পাওয়া যায় হরিহর শেঠের লেখায়ঃ- “কালীশঙ্কর ঘোষের বাটীতে তান্ত্রিকমতে অতি ভয়ানক ভাবে কালীপূজা হইত। শ্যামাপূজার রাত্রে মদ্যপান অব্যাহতভাবে চলিত এবং বলির রক্তে প্রাঙ্গণ ভরিয়া যাইত, নর্দমা দিয়া রক্তস্রোত বহিয়া যাইত।” এই বাড়ির পূজোতেই পশুবলির বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছেন পূর্বে উল্লিখিত পাদ্‌রি ওয়ার্ড তাঁর বইয়ে। বাড়ির মাঝখানে খোলা আঙিনায় রয়েছে বলির পশুগুলি, পাশেই স্ব্য়ং কালীশংকর। তাঁর কয়েকজন সঙ্গী ও বলির কাজে সহায়তার জন্য জনা বিশেক লোক। আঙ্গিনার চারদিক ঘিরে দালান, তার একটি ঘরে উত্তরমুখী করে প্রতিমা বসানো, অপর কয়েকটি ঘর দর্শকে ঠাসা। এর পর এই পাদরি জানিয়েছেন যে, প্রথমে বলি পড়ে পাঁঠা, তারপর মহিষ ও সবশেষে দু’ তিনটি ভেড়া। ওয়ার্ডের বর্ণনা কিছুটা শোনা যাকঃ- “একজন পূজারী বলি দেওয়া পাঁঠার মুন্ডুটি ধরে নাচতে নাচতে মূর্তির সামনে নিয়ে গেল। সদ্য কাটা মুন্ড থেকে তাজা রক্ত তার সর্বাঙ্গে গড়িয়ে পড়তে থাকে। বলিদান শেষ হলে কালীশঙ্কর, যে লোকটি বলি দিল, তাকে গাঢ় আলিঙ্গনে আবদ্ধ করলেন। তাকে বস্ত্র ইত্যাদি প্রভূত জিনিষপত্র দান করা হলো। পশুর মুন্ড, রক্ত, দেহের বিভিন্ন অংশের মাংস পূজারী দেবীকে নিবেদন করলেন। তারপর বালির ওপর আগুন জ্বেলে ঘৃত সহযোগে হোম শুরু হলো। তখন সারা আঙিনা রক্তে ভাসছে।” এ-ছাড়াও কালীপূজার বিষয়ে ওয়ার্ড যে-সব তথ্য জানিয়েছেন, তার মধ্যে আছে, দেবীকে যে মদ্য নিবেদন করা হয়, তা কর্তা ও তাঁর ঘনিষ্ঠ মহলের লোকেরা একান্তে পান করে। আর প্রতিমার সম্মুখে নৃত্যগীতের মধ্য দিয়ে উৎসবের সমাপ্তি ঘটে।পশুবলি অবশ্য গৃহস্থ বাড়ির কালীপূজোয় ছিল বহুল প্রচলিত প্রথা। কাঁসারিপাড়ার মল্লিকবাড়িতে আর সিমলার হোগলকুঁড়িয়ায় গুহবাড়িতে কালীপূজোয় মহিষ বলির প্রথা ছিল বলে জানা যায়। পাঁঠা বলি তো ছিল সাধারণ ব্যাপার! আবার বিখ্যাত ধনী আশুতোষ দেবের (ছাতুবাবু) বাড়ির কালীপূজায় কোনো বলিই হতো না। ১৭৫৭ সালে সুতানুটি অঞ্চলে রাজা মাণিক বন্দ্যোপাধ্যায় প্রতিষ্ঠিত পুঁটে-কালীর মন্দিরে বৈশিষ্ট্যই ছিল অসংখ্য বলিদান। পলাশির যুদ্ধের সমকালে যখন কলকাতার অধিকাংশ জায়গা ছিল জঙ্গলাকীর্ণ, তখন ডাকাতি করতে যাবার আগে কালীমূর্তির সামনে এমন কি, নরবলি দেবার গল্পও শোনা যায়। চিতু ডাকাতের প্রতিষ্ঠিত চিত্তেশ্বরী কালী মন্দিরে ১৭৭৮ সালের গ্রীষ্মের এক অমাবস্যায় এমনই নরবলি হয়েছিল বলে জানা যায়। কালীঘাটেও কোম্পানির আমলে নাকি একবার নরবলির জন্য একজনের ফাঁসি হয়েছিল বলে ডঃ ডাফের বিবরণে উল্লিখিত আছে। কলকাতার সবচেয়ে বিখ্যাত কালীক্ষেত্র কালীঘাটের মন্দিরে কার্তিকী অমাবস্যায় কালী আরাধনার আড়ম্বরের উল্লেখ করে মিশনারি ওয়ার্ড জানিয়েছেন যে, এই পূজায় প্রায় হাজার চারেক লোকের সমাগম হতো। অনেকেই পূজা উপলক্ষে প্রচুর খরচ করত। ১৭৬৫ সালে রাজা নবকৃষ্ণ নাকি এই কালীমন্দিরের পূজোয় লাখ খানেক টাকা ব্যয় করেন ও মূর্তির জন্য দান করেন সোনার মুন্ডমালা। পাদরি ওয়ার্ডের বিবরণ অনুযায়ী এই রাজা কালীমূর্তির জন্য দান করেন হাজার টাকা মূল্যের সোনার হার সহ অন্যান্য অলঙ্কার ও রুপোর বাসনপত্র। তিনি দু’ হাজার আতুরকে অর্থদান করেন ও যে-পরিমাণ ভোজ্যবস্তু ও মিষ্টি দান করেন, তা দিয়ে খাওয়ানো হয়েছিল এক হাজার মানুষকে। এই বিশ্রুত কালীমন্দিরে কালীর নিত্যপূজাও হতো এবং সে সূত্রে এর সঙ্গে নানা ধনাঢ্য মানুষের নাম শোনা যায় নানাজনের লেখা বিবরণে ও সমকালের সংবাদপত্রের পাতায়। শোভাবাজারের রাজা গোপীমোহন দেব ১৮২২ সালে একবার কাড়ানাকাড়া বাজিয়ে ধূমধাম সহকারে কালীঘাটে পূজো দিয়েছিলেন ও এই পূজো দেখতে এত ভীড় হয় যে শান্তিরক্ষায় পুলিশের প্রয়োজন হয়েছিল। রাজা বাহাদুর কালীমূর্তির হাতের রুপোর খড়্গ আর সোনার নরমুন্ড গড়িয়ে দেওয়া ছাড়াও নানা রকমের অলঙ্কার পট্টবস্ত্র আর শাল-দোশালায় মূর্তিকে মন্ডিত করেন।অতীত বাঙলার, এমন কি, ভারত ও নেপালের নানা ধনী ভক্তজন নানা সময়ে কালীঘাটের কালীমূর্তির জন্য বিভিন্ন আভরণ দান করেন বলে শোনা যায়। দেবীর চারটি রুপোর হাত দিয়েছিলেন খিদিরপুরের গোকুলচন্দ্র ঘোষাল। পরে চারটি সোনার হাত দেন কলকাতার কালীচরণ মল্লিক। বেলেঘাটার রামনারায়ণ সরকার দিয়েছিলেন সোনার একটি মুকুট আর পাইকপাড়ার রাজা ইন্দ্রচন্দ্র সিংহ দেবীর সোনার জিভটি গড়িয়ে দেন। পাতিয়ালার মহারাজা দিয়েছিলেন দেবীমূর্তির গলার একশো আটটি নরমুন্ডের মালা, মূর্তির মাথার ওপরের রুপোর ছাতাটি নাকি দেন নেপালের প্রধান সেনাপতি জঙবাহাদুর।মূর্তির পরেই কালীঘাটের মন্দিরের ও মন্দির পরিসরের নানা অংশের নির্মাণেও রয়েছে নানা বিচিত্র মানুষের যোগদান। ১৭৭০-৭১ সাল নাগাদ মন্দিরের সামনের গঙ্গার ঘাটটি এক বিশ্বস্ত পাঞ্জাবি সৈনিক হুজুরিমল্লের শেষ ইচ্ছানুযায়ী বাঁধিয়ে দেয় ইংরেজ সরকার। কালীর বর্তমান মন্দিরটির নির্মাণ হয়েছিল বরিশার জমিদার সন্তোষ রায়চৌধুরী ও তাঁর উত্তরাধিকারীদের সৌজন্যে। এছাড়াও শ্যামরায়ের মন্দির, তোরণদ্বার, বিভিন্ন ভোগঘর, নহবতখানা ইত্যাদির নির্মাণের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাওয়ালির বৈষ্ণব জমিদার উদয়নারায়ণ মণ্ডল, গোরখপুরের টীকা রায়, শ্রীপুরের জমিদার তারকচন্দ্র চৌধুরী, তেলেনিপাড়ার জমিদার কাশীনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখের নাম। ১৮৩৫ সালে নাটমন্দিরটি তৈরি করান আন্দুলের জমিদার রাজা কাশীনাথ রায়। এখানে উল্লেখ করা যায় যে, এই নাটমন্দিরেই ১৮৯৯ সালে কালী সম্পর্কে তাঁর বিখ্যাত বক্তৃতা দিয়েছিলেন স্বামী বিবেকানন্দের বিদেশিনী শিষ্যা ভগিনী নিবেদিতা। সে এক অন্য কাহিনী!অ্যালবার্ট হলে [অর্থাৎ এখনকার কফি হাউস] কালী বিষয়ে তাঁর প্রথম বক্তৃতাটি দিয়েছিলেন আইরিশ দুহিতা নিবেদিতা। শ্রোতাদের মধ্যে ছিলেন কলকাতার শিক্ষিত সমুদায় ও ব্রাহ্মসমাজের নানা বিশিষ্ট ব্যক্তি, যেমন সত্যেন্দ্রমোহন ঠাকুর, ব্রজেন্দ্রনাথ গুপ্ত, ডাঃ নিশিকান্ত চ্যাটার্জি ও ড: মহেন্দ্রলাল সরকার প্রমুখ। সাধারণ শ্রোতারা নিবেদিতার ভাষণে সন্তুষ্ট হলেও কিছু তথাকথিত প্রগতিশীল ব্যক্তি তাঁর বক্তব্যের প্রতিবাদ করেন। নিবেদিতা এই বক্তৃতায় কুসংস্কারকে প্রশ্রয় দিচ্ছেন বলে সবচেয়ে তীব্র ভাষায় আক্রমণ করেন মহেন্দ্রলাল। কলকাতার কালীবিরোধীদের বক্তব্যের জবাব দেবার সুযোগ আসে যখন কালীঘাট মন্দিরের সেবায়েত হালদারেরা নিবেদিতাকে মন্দির প্রাঙ্গনে বক্তৃতা দিতে আমন্ত্রণ জানান। এই কালীঘাটেই নাটমন্দিরের চত্বরে নিবেদিতা ২৮শে মে শ্রোতায় ঠাসা এক সভায় কালী আরাধনার বলিপ্রথা, মূর্তিপূজা ও মূর্তির তথাকথিত কুৎসিত রূপ ইত্যাদি অভিযোগের জবাব দিয়েছিলেন। পরে তাঁর এই বক্তৃতা পুস্তিকাকারে প্রকাশ করেন মন্দির কর্তৃপক্ষ। উল্লেখযোগ্য যে, ‘কালী দি মাদার’ নামে নিবেদিতার একটি বইও আছে।কালীঘাটের কালীর প্রতি শুধু যে বাঙালি বা হিন্দুরাই ভক্তি বা বিশ্বাস পোষণ করতেন, এমন কিন্তু নয়। শোনা যায়, পাঞ্জাব আর বার্মা দখল করবার পর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির তরফে কালীঘাটে ষোড়শোপচারে পূজো পাঠানো হয়েছিল। মার্শম্যানের বিবরণেও এর সমর্থন মেলে। কালীপূজোয় কোম্পানির এই এলাহি খরচের পেছনে অবশ্য ভক্তির চেয়ে দেশী সেপাইদের সন্তুষ্ট করার বাসনাই সম্ভবত কাজ করেছিল। কিন্তু পাদরি ওয়ার্ড কালীঘাট সহ বিভিন্ন কালীমন্দিরে অহিন্দু ভক্তদের আনাগোনার কথা লিখেছেন। তিনি জানাচ্ছেন, “শুধু হিন্দুরাই যে এই কালো পাথরের দেবীমুর্তির পূজা করে, এমন কিন্তু নয়। আমি জানতে পেরেছি, অনেক ইয়োরোপীয় বা তাদের এ-দেশীয় স্ত্রীরা কালী মন্দিরে যায় ও দেবীর আরাধনায় হাজার হাজার টাকা ব্যয় করে। আমি যে-ব্রাহ্মণের সাহায্য নিয়ে এই বিবরণ প্রস্তুত করেছি, তিনি বলেছেন, তিনি...... বহুবার সাহেব-মেমদের কালী মন্দিরে পূজো দিতে পালকি করে আসতে দেখেছেন।...... তাঁকে মন্দিরের কর্তৃপক্ষ সুনিশ্চিত ভাবে জানিয়েছেন, কোনো প্রার্থনা নিয়ে কালীর কাছে দিতে ইয়োরোপীয়রা প্রায়ই এসে থাকে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির এক বিশিষ্ট কর্মচারী সম্প্রতি মামলা জিতে কালীদেবীকে দু’ তিন হাজার টাকা মূল্যের নানা সামগ্রী দান করেছেন।”কালীঘাটের মন্দির সম্পর্কে পাদ্রি ওয়ার্ড লিখেছেন, “কলকাতার কাছে কালীর এক বিখ্যাত মন্দির রয়েছে। সমগ্র এশিয়া, এমন কি, সমগ্র বিশ্বের হিন্দু এই দেবীর পূজা করে।” ওয়ার্ডের বিবরণে এই অতিরিক্ত সংবাদও পাওয়া যায় যে, প্রায় পাঁচশো মুসলমান নাকি প্রতি মাসে কালীকে পূজো দিয়ে যেতেন। এর পরে তাঁর অধিকন্তু মন্তব্যঃ- “কি আশ্চর্য ভাবেই না এই দেবীমূর্তি সাধারণ লোকের মনে প্রভাব বিস্তার করেছে! ......বাংলার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সমসংখ্যক গণিকারা এসেও মন্দিরে পূজো দিয়ে যায়। তাদের কারো প্রার্থনা উপপতির রোগমুক্তি, কেউ বা চায় তার ঘরে আরও বেশি লোকের আগমন!” পবিত্রকুমার ঘোষ জানিয়েছেন, একসময় অবিভক্ত বাংলার, পরে পূর্ব পাকিস্তানের জননেতা শহিদ সুরাওয়ার্দি নাকি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হবার বাসনায় কালীঘাটে মানত করেছিলেন ও কলকাতায় দু’জন লোক পাঠিয়ে তাঁর হিন্দু বন্ধুদের মারফৎ ‘বিরাট ডালা সাজিয়ে’ কালীঘাটে পূজো দেবার ব্যবস্থা করেছিলেন। আর একজন বিখ্যাত বাঙালি শিল্পপতি স্যার বীরেন মুখার্জিও নাকি প্রতি সপ্তাহে কালীঘাটের মন্দিরে পূজো দিতেন।কালীঘাট ব্যতিরেকে কলকাতার অন্যান্য প্রাচীন কালী মন্দিরগুলি নিয়েও আড়ম্বর-বৈচিত্র্যের কাহিনী কম নেই। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রতিপত্তিশালী দেওয়ান গোবিন্দরাম মিত্রের প্রতিষ্ঠিত সিদ্ধেশ্বরী কালীর মন্দির ছিল কলকাতার মনুমেন্টের থেকেও উঁচু, আর তা খ্যাত ছিল ‘ব্ল্যাক প্যাগোডা’ নামে। এই মন্দির বেশ কয়েকবার ঝড়ে আর ভূমিকম্পে ভেঙে পড়ে ও তা পুনরায় তৈরি করা হয়। তাঁর কালীপূজোর ঘটাও নাকি ছিল খুব বিখ্যাত।কলকাতার কালীমন্দিরগুলোর মধ্যে সম্ভবত প্রাচীনতা আর খ্যাতির বিচারে কালীঘাটের পরেই চিত্তেশ্বরী মন্দিরের নাম উল্লেখ্য। অতীতের সেই যুগে গঙ্গার তীর ধরে তীর্থযাত্রীরা চিৎপুরে দেবী চিত্তেশ্বরী বা চিত্রেশ্বরী কালীমন্দিরে পূজো দেবার পর মশাল জ্বালিয়ে দল বেঁধে যেত কালীঘাটে। জনশ্রুতি আছে, এই পথের ধারেই তীর্থযাত্রীদের ওপর লুঠপাট চালাতো চিতে ডাকাত, এমন কি, এইসব অসহায় যাত্রীকে ধরে নাকি বলিও দিত কালীর সামনে। এই চিতু ডাকাতের নাম থকেই দেবী চিত্তেশ্বরী বা চিৎপুর নামের জন্ম হয়েছে (বা এর উল্টোটাও হতে পারে), এমন লোকশ্রুতিও আছে (কলকাতা কলেক্টরেটের ১৭৬১ সালের এক পাট্টায়ও এ কথার উল্লেখ আছে)। জঙ্গলাকীর্ণ এই পায়ে চলা রাস্তাটি ইংরেজদের নথিতে পরিচিত ছিল পিলগ্রিমস রোড নামে। বর্তমানে এই চিত্তেশ্বরী মন্দিরে (কাশীপুরে) প্রতিষ্ঠিত বিগ্রহটি দুর্গা বা চন্ডীর হলেও কলকাতার আদিযুগে এটি যে কালীমন্দির হিসেবেই পরিচিত ছিল, তার বহু প্রমাণ আছে। ‘ক্যালকাটা রিভিয়ু’ পত্রিকায় ১৮৪৫ সালে লেখা হয়েছিল, “Chitrapur was noted for the temple of ChitreswariDeby or the goddess of Chitru, known among Europeans as the temple of Kali at Chitpore”। এখানে আরও লেখা হয়েছিল, “This was the spot where the largest number of human sacrifices was offered to the goddess in Bengal before the establishment of the British Government.” একই ধরনের কথা পাওয়া যায় কটন সাহেবের ‘ক্যালকাটাওল্ড অ্যান্ড নিউ’ গ্রন্থেও। এই বইটির মতে এই স্থানটি ছিল “noted for the temple of Chitru or Kalee, renowned for the number of human sacrifices formerly offered at her shrine.”কলকাতা বা তার উপকন্ঠের আর একটি প্রসিদ্ধ কালীক্ষেত্র দক্ষিণেশ্বর, যা রানি রাসমণি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ১৮৫৫ সালের ৩১শে মে এই মন্দিরে ভবতারিণী কালীর মূর্তি প্রতিষ্ঠার দিনের কাহিনী পাওয়া যায় ‘সমাচার দর্পণে’। সেদিন নাকি “কলিকাতার বাজার দূরে থাকুক্‌, পাণিহাটি, বৈদ্যবাটি, ত্রিবেণী ইত্যাদি স্থানের বাজারেও সন্দেশাদি মিষ্টান্নের বাজার আগুন হইয়া উঠে। এইমত জনরব যে পাঁচশত মণ সন্দেশ লাগে।” এই দক্ষিণেশ্বরের ভবতারিণীর পূজারী হিসেবে নিযুক্ত রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের দৌলতে এই মন্দির পরবর্তী কালে বিশ্বখ্যাত হয়ে ওঠে। অথচ একথা আজ হয়তো অনেকেই জানেন না, শ্রীরামকৃষ্ণের প্রধান শিষ্য বিবেকানন্দের এই মন্দিরে প্রবেশ নিষিদ্ধ হয়েছিল সমুদ্র অতিক্রম করে ম্লেচ্ছদেশে যাবার কারণে! এই মন্দিরের কালীকে নিয়ে ইংরেজিতে চমৎকার একটি কবিতা লিখেছিলেন হরীন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়।কলকাতার প্রাচীন ও প্রথম বারোয়ারি (সম্ভবত বাংলার প্রথম বারোয়ারি কালীপূজা), মধ্য কলকাতার "আদি বারোয়ারি কালী পূজা" নামে উদযাপিত হয়ে থাকে। ১৮৫৮ সালে, জনৈক শ্রী বিহারী লাল বসুর হাতে এই পূজাটি শুরু হয়। ১৯২৪-২৬ সালের মধ্যে পূজাটি বারোয়ারি কালী পূজায় পরিণত হয়। উল্লেখ্য যে সেই সময় বাংলায় কালী পূজার প্রচলন (সর্বজনীন ভাবে) সেই রকম ভাবে ছিল না।কলিকাতা কালিকাক্ষেত্রের গল্প-ইতিহাস “এই কলিকাতা কালিকাক্ষেত্র, কাহিনী ইহার সবার শ্রুত” সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের কবিতার এই কথাগুলো কিন্তু ফেলনা নয়। কলকাতার সঙ্গে কালীর সম্পর্ক এমনকি দুর্গাঠাকুরের চেয়েও বেশি পুরোনো। কলকাতা শহর গড়ে ওঠার আগেই দূর-দূরান্ত থেকে মানুষরা এসে ভিড় করে পুজো দিতেন কালীঘাটের মন্দিরে। কেউ কেউ তো ‘কলিকাতা’ নামের পিছনেও ‘কালী’ শব্দটির খোঁজ পেয়েছেন। সে হয়তো কষ্ট-কল্পনা, কিন্তু তা বলে কালীপুজোর সঙ্গে এই শহরের সম্পর্ক খুঁজতে কল্পনাবিলাসী হওয়ার প্রয়োজন নেই। এমনিতেই শহরজোড়া একাধিক বিখ্যাত কালীমন্দির। কালীঘাটের মন্দির ছাড়াও চিৎপুরের ডাকাতে কালী, ঠনঠনিয়ার সিদ্ধেশ্বরী কালী, ফিরিঙ্গি কালী বা দক্ষিণেশ্বরের ভবতারিণী। এইসব বিখ্যাত কালীমন্দিরের সঙ্গে জড়িয়ে কত রোমাঞ্চকর ইতিহাস। নেহাত ভক্তিরসের সামগ্রী নয় সেইসব গল্প। আর, কলকাতার কালীপুজো বলতে এই বিখ্যাত মন্দিরের বাইরেও হাজারো ইতিহাস। রাজ-রাজরা, ডাকাত, জমিদার, লালমুখো সাহেব, বড়োলোক সবাই সমাপতিত সেখানে। কলকাতার সবচাইতে বিখ্যাত কালীমন্দির কালীঘাটের পুজো নিয়েই গল্পের শেষ নেই। অনেকের মতে, এই কালীই কলকাতার অধিষ্ঠাত্রী দেবী। আর, এই মন্দিরে রাজাদের দানধ্যান-ব্যয়ের কথা বললে তো শেষই হবে নাকি। রাজা নবকৃষ্ণ, শোভাবাজারের রাজা গোপীমোহন দেব, খিদিরপুরের গোকুলচন্দ্র ঘোষাল, কালীচরণ মল্লিক, ইন্দ্রচন্দ্র সিংহ, পাতিয়ালার মহারাজ, নেপালের প্রধান সেনাপতি জঙ বাহাদুর প্রভৃতি ব্যক্তির দানের কথা আগেই বলা হয়েছে।দেবীর অঙ্গসজ্জার পাশাপাশি এই মন্দিরের গড়ে ওঠার, সেজে ওঠারও বিচিত্র ইতিহাস যা ইতিপূর্বেই সংক্ষেপে বর্ণিত হয়েছে, যার তথ্য গুনে শেষ করা যাবে না। শুধু কালীঘাট নয়, কলকাতার অন্যান্য সাবেক কালীমন্দিরগুলোর ইতিহাসও কম রঙিন নয়। ‘ব্ল্যাক প্যাগোডা’নামে প্রচলিত কোম্পানীর দেওয়ান গোবিন্দরাম মিত্র প্রতিষ্ঠিত সিদ্ধেশ্বরী কালীমন্দির, , দক্ষিণেশ্বরের ভবতারিণী মন্দির, অথবা কলকাতায় নানা বড়োলোক-অভিজাত মানুষদের বাড়ির কালীপুজোয় জাঁক-জমকের অন্ত ছিল না। পাশাপাশি, বড়লোকের বাড়ির কালীপূজায় অবধারিত ছিল পশুবলি। খিদিরপুরের ন্যায়নারায়ণ ঘোষালের পুজোয় বা শোভাবাজারের কালীশঙ্কর ঘোষের বাড়ির কালীপূজার টাকার পাশাপাশি মদ্য ও রক্তেরও বন্যা বইত। শুধু পশুবলিই নয়, নরবলির ঘটনাও শোনা যেত তখন কলকাতায়। অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে কলকাতা তখন জঙ্গলাকীর্ণ এক শহর। এখানে-সেখানে ডাকাতদের ডেরা। চিতু ডাকাত-প্রতিষ্ঠিত চিত্তেশ্বরী কালী মন্দিরে ১৭৭৮ সালের এক অমাবস্যায় নাকি নরবলি হয়েছিল। কালীঘাটেও নাকি নরবলি দেওয়া হয়েছিল একবার। ডঃ ডাফ লিখেছেন, এই নরবলির ঘটনায় কোম্পানির শাসকরা ফাঁসিতেও ঝুলিয়েছিলেন কয়েকজনকে। সেদিনের কলকাতা শহর আজকের তিলোত্তমা মহানগরী নয়। তার কালীপুজোর ধরণেও তাই ভক্তিরসের সঙ্গে অনায়াসে মিশে যায় বীভৎসতারস। পশুবলিকে ঘিরে রাজা-বাবুদের উদ্দামতার বিবরণ শুনে গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে। এবং, এরই পাশাপাশি মিশে থাকে বাবু-জমিদারদের আড়ম্বরের কথাও। কালীপুজোর রাতে কারণবারি তো ‘প্রসাদ’। তার নেশা সাত্ত্বিক নেশা। সেই ‘কারণবারি’ হোক না বিলিতি। ক্ষতি কী? মহেন্দ্রনাথ দত্ত লিখেছেন, শিমলার বসুবাড়ির বিখ্যাত কালীপুজোয় ততোধিক বিখ্যাত মদ্যপানের কথা। গৃহস্থ-ভক্ত সবাই মিলে মাটির গামলায় কারণবারি নিয়ে গোল হয়ে ঘিরে বসতেন। তারপর স্ট্র থুড়ি নল দিয়ে টানতেন সুরা। আবার শোভাবাজারের কালীশঙ্কর ঘোষের বাড়িতে তো ভৃত্য-গৃহিণী কেউই সুরারসে বঞ্চিত হতেন না। একবার নাকি নেশার ঘোরে পুরুতকেই বলি দেবার উপক্রম হয়েছিল। এই নিয়ে প্রাণকৃষ্ণের মজার গল্প আছে একখানা। কারণবারি প্রসাদে চুর এক ভৃত্য পদসেবা করতে গিয়ে কিছুতেই আর বাবুর পা খুঁজে পাচ্ছে না। গোটা বাড়ি জুড়ে পায়ের খোঁজে হইহই পড়ে গেল। বাবুর পা কোথায় গেল? পুজোমণ্ডপেও পা নেই। এদিকে পায়ের অভাবে বাবু নামতে-হাঁটতে পারছেন না। শেষে গিন্নিমা আদেশ দিলেন পুরুতমশাইয়ের বাড়িতে গিয়ে খোঁজ করার। নৈবেদ্যর সঙ্গে পা-টাও ভুলক্রমে চলে গেছে হয়তো। পুরুতমশাই সব শুনে খুবই বিনয়ের সঙ্গে বললেন, এত নৈবেদ্যর মধ্যে বাবুর পা খুঁজতে রাত কাবার হয়ে যাবে। খুঁজে পেলে কাল সকালে তিনি স্বয়ং বাবুকে পা ফিরিয়ে দিয়ে আসবেন।শুধু মদ্যপানে কি আর জমে পুজো? তাই, পুজোর পরে পার্টি হত। সেই পার্টিতে সাহেব-মেমরা আসতেন। বাইজি নাচ, কবিগান, পাঁচালি, তরজা, আখড়াই-হাফ আখড়াইতে মেতে থাকত আসর। পরে যুক্ত হল যাত্রাগান আর জেলেপাড়ার সঙ। তাছাড়া ছিল আতসবাজির পসরা। কালীপ্রতিমা নিয়ে বাজনা-আলো সহকারে শোভাযাত্রাতেও বেরোতেন বাবুরা। সেই শোভাযাত্রার জাঁক নিয়ে পরস্পরের মধ্যে রেষারিষিও ছিল তীব্র। সব মিলিয়ে কালীপুজো ব্যাপারটা মোটে সাধারণ এক উৎসব ছিল না কলকাতাবাসীর কাছে।সময় গড়িয়ে গেল ঢের। গঙ্গার মূল স্রোত সরে এসে আদিগঙ্গাও শুকিয়ে পরিণত হল খালে। সেইসব বাবুয়ানি-রাজ-রাজরাদের কালও শেষ হল। মহানগরীর সেইসব কালীপুজোও মুখ লুকোল ইতিহাসে। বিখ্যাত কালীমন্দিরগুলোর পুজোর কথা অবশ্য আলাদা। প্রথা মেনে তারা আজও বহমান। কিছু সাবেক পুজোও বেঁচে-বর্তে আছে কোথাও কোথাও। কিন্তু, ফাঁকা জমি-জঙ্গলাকীর্ণ আধো আলো-আধো অন্ধকারের সেই গা ছমছমে কলকাতার গায়ে কাঁটা দেওয়া কালীপুজোরা আর নেই। ডাকাতরা নেই, বলির বীভৎসতাও নেই। কিন্তু, ইতিহাসের গপ্পেরা এত সহজে মরে না। আতসবাজির মতো আকাশজুড়ে তাদের ছড়িয়ে পড়তে দেখাও কম লোভনীয় নয়।কত যে কালী কলকাতায়। এমনটা কোনও শহরে নেই। শাক্তধর্মের এমন জনপ্রিয়তা বঙ্গদেশ ছাড়া কোথাও মিলবে না। বিশ্বসৃষ্টির আদিকরণ তিনি। আবার অন্যমতে, ইনিই আদ্যাশক্তি মহাময়ী। তন্ত্র ও পুরাণে কালিকার নানা রূপভেদ যা পূর্বেই আলোচিত হয়েছে। বাংলা জুড়ে অবশ্য তার নানা নাম। কলকাতার উত্তরে দক্ষিণেশ্বরে তিনি মা ভবতারিণী আবার দক্ষিণের কালীঘাটে দেবী কালিকা। আদ্যাপীঠে আদ্যাকালী, কাশীপুরে চিত্তেশ্বরী, ঠনঠনিয়ায় সিদ্ধেশ্বরী, বউবাজারে ফিরিঙ্গি, কেওড়াতলায় শ্মশানকালী, টালিগঞ্জে করুণাময়ী, নিমতলায় আনন্দময়ী। কালীময় কলকাতার কথা কয়েক আঁচড়ে আঁকার চেষ্টা রইল এখানে। অবশ্যই সবার কথা বলা গেল না।ক্ষেত্রবিশেষে কিছু কিছু পুনঃকথন হলেও কলকাতার কিছু কালী মন্দির বিশেষ উল্লেখের দাবী রাখে।কালীঘাটের দেবীকালিকা: কালীঘাটের মন্দিরের গুরুত্ব বেড়েছে প্রকৃতপক্ষে সপ্তদশ শতাব্দীর শেষ দিকে। কালীঘাটে দেবীর চারটি আঙুল পড়েছিল। দেবী কালিকার ভৈরব নকুলেশ্বর। কিংবদন্তী কাশীর মতো পুণ্যক্ষেত্র কালীঘাটে কীটপতঙ্গ মরলেও সঙ্গে সঙ্গে তারা মুক্তি পেয়ে যায়। এই কালীপীঠ গড়ে ওঠার পিছনে নানা কাহিনির জাল বিস্তৃত। এমন একটা কাহিনি হল:যশোরের রাজা প্রতাপাদিত্যের খুল্লতাত শ্রীবসন্ত রায় একটি ছোট মন্দির নির্মাণ করেছিলেন। সেই সময় দেবীর সেবায়েত ছিলেন ভুবনেশ্বর ব্রহ্মচারী। তিনি ছিলেন অপুত্রক। তাঁর দৌহিত্র হালদাররাই বর্তমানে কালীঘাটের বিখ্যাত বংশ। মন্দিরের পূজা এখনও করে চলেছেন তাঁরা। বর্তমান মন্দির নির্মাণ হয় উনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে। শোনা যায় সাবর্ণ চৌধুরীর পরিবারের সন্তোষ রায় পঁচিশ হাজার টাকা ব্যয়ে বাংলার নিজস্ব ঘরানার চার চালা এবং তার উপর আর একটি ছোট চারচালার শিখর সমেত মন্দিরটি নির্মাণ শুরু করেছিলেন। তাঁর পুত্র রামনাথ রায় ও ভ্রাতষ্পুত্র রাজীবলোচন রায় ১৮০৯ সালে মন্দির নির্মাণ সম্পূর্ণ করেন। পরবর্তী কালে আন্দুলের জমিদার কাশীনাথ রায় নাটমন্দির গড়ে দেন। নহবত্‌খানা ও দুটি ভোগের ঘর তৈরি করে দিয়েছিলেন গোরক্ষপুরের টিকা রায়। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিও মন্দিরের জন্য দুশো বিঘা জমি দান করেছিলেন। কালীঘাটের দেবীকালিকার রূপ মাহাত্ম্যের কথা তো আগেই বলা হয়েছে।কালীঘাটের মূল পূজা মূলত আটটি। রক্ষাকালী পুজো, স্নানযাত্রা, জন্মাষ্টমী, মনসাপুজো, চড়ক, গাজন ও রামনবমী। কালীপুজোর রাতে দেবীকে পুজো করা হয় লক্ষ্মীরূপে। কালী-শ্যামা নন দীপাবলিতে আরাধিত হন লক্ষ্মী।দক্ষিণেশ্বরের মা ভবতারিণী: কথিত রয়েছে এক বার কাশীযাত্রার আগের দিন ভোর রাতে জানবাজারের রানি মা রানি রাসমণির স্বপ্নে দেখা দিলেন মা জগদম্বা। রানিকে বললেন গঙ্গার পূর্ববর্তী তীরে মন্দির স্থাপনা করতে। কাশী যাওয়ার দরকার নেই। সেই স্বপ্নাদেশ শিরোধার্য করে ১৮৪৭ খ্রিস্টাব্দে ৬ সেপ্টেম্বর কলকাতা থেকে ছ’কিলোমিটার দূরে ভাগীরথীর তীরে সুপ্রিম কোর্টের অ্যাটর্নি জেমস হেস্টির কাছ থেকে ৬০ বিঘা জমি ৬০ হাজার টাকায় কিনলেন। ১৮৫৫ খ্রিস্টাব্দের ৩১ মে স্নানযাত্রার দিন গড়ে তুললেন সাদা রঙের নবরত্ন মন্দির। কাজটা সহজ ছিল না। কৈর্বত্য হরেকৃষ্ণ দাসের মেয়ে মন্দির গড়বে। এ ‘আস্পর্দা’ সে দিন মেনে নিতে পারেননি কুমারহট্ট হালিশহরের ব্রাহ্মণ ও উচ্চবর্ণের সমাজপতিরা। শেষপর্যন্ত সব বাধা দূর করে প্রতিষ্ঠিত হল কষ্ঠিপাথরের দেবীমূর্তি। সাধ করে রাসমণি তার নাম রাখলেন ভবতারিণী। মন্দিরের মেঝে শ্বেত ও কৃষ্ণ প্রস্তরাবৃত। সোপানযুক্ত উঁচুবেদী। বেদীর উপর সহস্র দল রৌপ্যপদ্ম। তার উপর দক্ষিণে মাথা ও উত্তরে শয়ান শ্বেতপাথরের শিবমূর্তি। মহাদেবের বুকের উপর ত্রিনয়নী ভবতারিণী রঙিন বেনারসি ও মহামূল্যবান রত্নঅলঙ্কারে ভূষিতা। ১৮৫৭-৫৮ খ্রিস্টাব্দে দাদা রামকুমার চট্টোপাধ্যায়ের কাছ থেকে পুজোর দায়িত্ব পান শ্রীরামকৃষ্ণ। এই মন্দিরই এই যুগাবতারের সাধনপীঠ।ঠনঠনিয়ার সিদ্ধেশ্বরী কালী: বর্তমান মন্দিরটি তৈরির অনেক আগেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল সিদ্ধেশ্বরী কালী এমন একটা মত প্রচলিত রয়েছে। জনশ্রুতি, উদয়নারায়ণ-ব্রহ্মচারী নামে এক তান্ত্রিক আনুমানিক ১৭০৩ খ্রিস্টাব্দে মাটি দিয়ে সিদ্ধেশ্বরী রূপের কালীর্মূতি গড়েন। তখন স্থানটি ছিল জঙ্গলাকীর্ণ। ১৮০৬ খ্রিস্টাব্দে শঙ্কর ঘোষ নামে এক ধনী ব্যক্তি কালীমন্দির ও পুষ্পেশ্বর শিবের আটচালা মন্দির নির্মাণ করেন। পুজোর ভারও নেন তিনি। কার্তিক অমাবস্যায় আদিকালীর পুজো ছাড়াও জৈষ্ঠ্যমাসে ফলহারিণী এবং মাঘ মাসে রটন্তী কালীর পুজো হয়।কাশীপুরের চিত্তেশ্বরী সর্বমঙ্গলা: গভীর জঙ্গল ঘেরা এক স্থান। ভাগীরথীর তীরে। সে জঙ্গলে বাস দুর্ষর্ধ ডাকাত দলের। সেই ডাকাত দলের পাণ্ডা রঘু ডাকাত। এই ডাকাত সর্দারের হাতেই প্রতিষ্ঠা পায় চিত্তেশ্বরী। নিয়মিত নরবলি হত এখানে। সর্দারের মৃত্যুর পর দায়িত্ব নেন রামশরণ সিমলাই নামে এক ব্রাহ্মণ। তিনি স্বপ্নাবিষ্ট হয়ে কাশীপুর গান অ্যান্ড শেল ফ্যাক্টারি রোড বা বর্তমানে খগেন চ্যাটার্জি রোডে নতুন বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করেন। রামশরণ প্রতিষ্ঠিত বিগ্রহটি নিমকাঠের রক্তবর্ণা ত্রিনয়নীদেবী চতুর্ভুজা ও সিংহবাহিনী। দেবীর হাত বর, অভয় মুদ্রা, খড়্গ ও কমণ্ডুলে বিভূষিতা। কথিত, রামপ্রসাদ কলকাতা থেকে হালিশহর নৌকাযোগে যেতে যেতে দেবীকে গান শুনিয়েছিলেন, ‘মা তারিণী শঙ্কর বৈরাগী তোর নাং...।’ মূল মন্দিরটি ১৬১০ খ্রিস্টাব্দে নির্মাণ করেছিলেন হুগলি জেলার মনোহর ঘোষ ওরফে মহাদেব ঘোষ।কাশীপুর আদি চিত্তেশ্বরী দুর্গা: এই দেবীর কাহিনিও প্রায় এক। তবে এখানে ডাকাতের নাম চিতু বা চিত্তেশ্বর রায়। ডাকাতি করতে যাওয়ার আগে চিতু ষোড়শপচারে দেবীর পুজো করত। আদি চিত্তেশ্বরী বলার কারণ কথিত প্রায় পাঁচশো বছর আগে এই দেবীর প্রতিষ্ঠা হয়েছিল। দেবীর নামেই জায়গাটির নাম চিত্‌পুর হয়ে ওঠে। এই দেবীও নিমকাঠ দিয়ে তৈরি। দেবীর বিগ্রহের সঙ্গে রয়েছে একটি বাঘের মূর্তি। জমিদার গোবিন্দরাম মিত্র মন্দিরটি পুনঃনির্মাণ করেছিলেন।বউবাজারের ফিরিঙ্গি কালী: ১৪৩৭ খ্রিস্টাব্দে তখন কোথায় কলকাতা কোথায় চিত্তরঞ্জন অ্যাভিনিউ। গভীর জঙ্গল, শ্মশান, অদূরে ভাগীরথী। সেই শ্মশানে ছোট একটি চালা ঘরে প্রতিষ্ঠিত ছিল শিবলিঙ্গ ও দেবীকালিকায় বিগ্রহ। শ্মশানে প্রতিষ্ঠিত হলেও দেবী ছিলেন সিদ্ধেশ্বরী। কালের বিবর্তনে শহর গড়ে উঠল। জনপদ সৃষ্টি হল। আনাগোনা শুরু হল পতুর্গিজ ও ইংরেজদের। তাদের মধ্যে ছিলেন পতুর্গিজ খ্রিস্টান অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি। এই ফিরিঙ্গি কালীভক্তের দৌলতে সিদ্ধেশ্বরী কালী লোকমুখে হয়ে উঠলেন ফিরিঙ্গি কালী। ১৮২০-১৮৮০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত এই মন্দিরের পূজারী ছিলেন শ্রীমন্ত পণ্ডিত। সাড়ে পাঁচ ফুট উচ্চতার বিগ্রহ ত্রিনয়নী। এই মন্দিরে শিব ও সিদ্ধেশ্বরী কালী ছাড়াও দুর্গা, শীতলা, মনসা ও নারায়ণের মূর্তি প্রতিষ্ঠিত রয়েছে। প্রতি পূর্ণিমায় সত্যনারায়ণ ও অমাবস্যায় বিশেষ কালীপুজো হয়ে থাকে।কলকাতার কালী মাহাত্ম্যের এ এক সামান্য অংশ। কলকাতার উত্তর থেকে দক্ষিণ ঐতিহ্যপূর্ণ কালী-মন্দিরের সংখ্যা অন্তত তিন ডজন। রাজ্যে সাধনপীঠ ও সতীপীঠ যোগ করলে সে সংখ্যাটি কমপক্ষে ২২২। এই সংখ্যাটি পরিণত ও জনপ্রিয় কালীমন্দির বা পীঠের। এ ছাড়াও এই শহর ও রাজ্যের নানা প্রান্তে জমিদার ও বনেদিবাড়িগুলিতে রয়েছে বহু কালীমন্দির। কলকাতায় এমনই বিখ্যাত ছয় বনেদিবাড়ি হল, হাটখোলার রামচন্দ্র দত্ত। হাটখোলারই জগত্‌রাম দত্ত। দর্জিপাড়ার নীলমণি মিত্র স্ট্রিটের মিত্রবাড়ি। সিমলার রামদুলাল সরকার ও সিমলারই তারক প্রামাণিকের বাড়ি।কালীর এই ভয়াবহ নগ্নিকা মূর্তি-ভাবনার পিছনে আদিম কোনও ধর্মধারা বা ‘কাল্ট’ এর প্রভাব রয়েছে বলে অনুমান করেন সমাজবিদেরা। তাঁদের অনেকেরই মতে কালী আদতে কোনও বৈদিক দেবী নয়। এ দেশের লোকায়ত মাটি থেকেই তার উদ্ভব। কোনও এক নগ্নিকা খড়্গ-মুণ্ডমালা শোভিতা যখন দেবী হিসাবে পূজিত হচ্ছেন তখন তা আদিম অরণ্যচারী মানুষের সংস্কৃতির কোনও ঐতিহ্যকে বহন করছে বলে মনে করা হয়। পরবর্তী কালে আর্য ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতির দেবীভাবনার সঙ্গে যুক্ত হয়ে কালী হিন্দু-ব্রাহ্মণ্যতন্ত্রের দেবীতে রূপান্তরিত হয়েছেন।"ওঁ ক্রীং কালিকায়ৈ নমঃ"তথ্যসূত্র:---১- Tantric visions of the divine feminine: th e ten mahavidyas By David R. Kinsley.২- Mother of my heart, daughter of my dreams By Rachel Fell McDermott.৩- Encountering Kali: in the margins, at the center, in the West By Rachel Fell McDermott, Jeffrey John Kripal.৪- The camphor flame: popular Hinduism and society in India By Christopher John Fuller..৫. বঙ্গদর্শন ও আনন্দবাজার পত্রিকা। ৬. পণ্ডিত শ্যামাচরণ কবিরত্ন বিরচিত শ্রী শ্রী কালীপূজা পদ্ধতি।৭. শ্রী শ্রী চণ্ডী // নীলিমা সান্যাল।৮. ইন্টারনেট // গুগল সার্চ।৯. বিশেষ কৃতজ্ঞতা স্বীকারঃ শুভজিৎ মুখার্জী।

একটি নারীই সবচেয়ে শক্তিশালী ও কার্যকর নেতৃত্ব দিতে পারেন ।।