অক্ষয় ঐতিহ্য --- জন্ম দ্বিশতবর্ষে মনীষী শ্রী অক্ষয়কুমার দত্ত । (১৮২০ -১৮৮৬)

অক্ষয় ঐতিহ্য --- জন্ম দ্বিশতবর্ষে মনীষী শ্রী অক্ষয়কুমার দত্ত । (১৮২০  -১৮৮৬)

প্রসূন কাঞ্জিলাল।


বিগত বছর ১৫ জুলাই,  শ্রী অক্ষয়কুমার দত্তের জন্মের দ্বিশতবার্ষিকী ছিল। নামটা কি অপরিচিত মনে হচ্ছে ? অন্য একটি পরিচয় দিলে অবশ্য চিনতে অসুবিধা হবে না। তিনি ‘ছন্দের জাদুকর’ সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের পিতামহ। স্কুলের বিভিন্ন শ্রেণির পাঠ্যপুস্তকে দীর্ঘদিন থেকে সত্যেন্দ্রনাথের  কবিতা অন্তর্ভুক্ত হয়ে আসছে বলে সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত আজ পিতামহের চেয়েও হয়তো বেশি পরিচিত হতে পারেন, কিন্তু বাংলা ভাষা নির্মাণে ও বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান শিক্ষা প্রবর্তনে অক্ষয়কুমার দত্তের যে অবদান, তার গুরুত্ব অপরিসীম। তাঁর কীর্তির অলক্ষ্য প্রভাব আমাদের ওপর এখনো তাই বহমান।

বিদ্যাসাগর সম্পর্কে বলতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন ‘তাঁহার প্রধান কীর্তি বঙ্গভাষা’। কথাটি অক্ষয়কুমার দত্ত সম্পর্কেও সমানভাবে সত্য। তিনি বিদ্যসাগরের পরম বন্ধুও ছিলেন। তাঁরা দুজনই যুগপৎভাবে বাংলা ভাষা গদ্যের মজবুত ও আধুনিক ভিত্তি নির্মাণ করে গেছেন। সেই ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে বাংলা ভাষা বিকশিত হয়েছে। তিনি বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানচর্চার পথিকৃৎ, একজন উৎকৃষ্ট চিন্তাবিদ এবং প্রথম বাঙালি সমাজবিজ্ঞানী।

বর্ধমান জেলায় (নবদ্বীপের কাছে) চুপী গ্রামে ১৮২০ সালের ১৫ জুলাই জন্মেছিলনে অক্ষয়। তাঁর পিতা কলকাতায় পুলিশে চাকরি করতেন। গ্রামের স্কুলে কিছুদিন পড়ার পর অক্ষয় কলকাতার "ওরিয়েন্টাল সেমিনারি"তে পড়তে আসেন। কয়েক বছর পড়াশোনা করার পর পিতার মৃত্যু হলে তাঁকে লেখাপড়া ছেড়ে দিতে হয়। তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা এত দূর পর্যন্তই। কিন্তু অদম্য ছিল তাঁর জ্ঞানস্পৃহা। তাই বাড়িতেই নিজ উদ্যোগে পড়াশোনা চালিয়ে যান। স্কুলের ইংরেজ শিক্ষক বহুভাষাবিদ পণ্ডিত জেফ্রয়ের পৃষ্ঠপোষকতা পেয়েছিলেন তিনি। তাঁর কাছে গ্রিক, লাটিন, জার্মান, ফরাসি ও হিব্রু ভাষা ছাড়াও শেখেন পদার্থবিদ্যা, ভূগোল, জ্যামিতি, বীজগণিত, ত্রিকোণমিতি, সাধারণ বিজ্ঞান, মনস্তত্ত্ব প্রভৃতি। আর আমিরউদ্দীন মুন্সির কাছে শেখেন ফারসি ও আরবি ভাষা। পরবর্তীকালে ‘তত্ত্ববোধিনী’ পত্রিকার সম্পাদক থাকার সময় কিছুদিন তিনি কলকাতা মেডিকেল কলেজে গিয়ে অতিরিক্ত ছাত্র হিসেবে উদ্ভিদবিদ্যা, প্রাণিবিদ্যা, রসায়নশাস্ত্র ও প্রকৃতিবিজ্ঞান পড়েছিলেন।

ব্রাহ্মধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘তত্ত্ববোধিনী সভা’ গঠন করলে তিনি তার সভ্য হন এবং মাসিক আট টাকা বেতনে ব্রাহ্মদের প্রতিষ্ঠিত তত্ত্ববোধিনী পাঠশালার ভূগোল ও পদার্থবিদ্যার শিক্ষক নিযুক্ত হন। এই বিদ্যালয়ে বাংলা ভাষায় পাঠদানের সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু বাংলায় এসব বিষয়ে পাঠ্যপুস্তক না থাকায় তিনি ১৮৪১ সালে ‘ভূগোল’ নামে একটি গ্রন্থ রচনা করেন। তখন তাঁর বয়স মাত্র ২১ বছর। তখনো বিদ্যাসাগরের কোনো বই কিন্তু প্রকাশিত হয়নি। এই গ্রন্থটি অক্ষয় দত্তের প্রথম গদ্যগ্রন্থ হলেও তাঁর ভাষা পূর্ববর্তী বাংলা গদ্যের তুলনায় অনেক প্রাঞ্জল ও সরল। এই গ্রন্থে তিনিই প্রথম বাংলা ভাষায় যতি চিহ্ন ব্যবহার করেন। এই রইল সেই ভাষার নমুনা:-----

"যে বিদ্যা দ্বারা পৃথিবীর আকার পরিমাপ এবং তাহার উপরিভাগস্থ স্থান সমূহ সমুদয় জ্ঞাত হওয়া যায় তাহার নাম ভূগোল বিদ্যা।
‘ভূ' শব্দের অর্থ পৃথিবী এবং 'গোল' শব্দের অর্থ গোলাকার, অতএব গোলাকার পৃথিবী বিষয়ক বিদ্যাকে ভূগোল কহা যায়। পৃথিবীর আকৃতি প্রায় গোল যেমন কমলালেবু গোলাকার। অথচ তাহার বোঁটার নিকট কিঞ্চিৎ নিম্ন, সেইরূপ পৃথিবীও গোল কিন্তু উত্তর দক্ষিণে কিঞ্চিৎ চাপা।"

রবীন্দ্রনাথ বিদ্যাসাগর সম্পর্কে বলেছিলেন যে তিনিই বাংলা ভাষাকে ‘সর্বপ্রকার ব্যবহারযোগ্য’ করে তুলেছিলেন এবং ‘গ্রাম্য পাণ্ডিত্য ও গ্রাম্য বর্বরতা’—এই দুইয়ের হাত থেকে বাঁচিয়েছিলেন। ‘ভূগোল’–এর ভাষা দেখে মনে হয় রবীন্দ্রনাথ তাঁর জন্মের বিশ বছর আগে প্রকাশিত ও পরবর্তীকালে দুর্লভ এই গ্রন্থটি হয়তো বা তখনো দেখেননি।

অক্ষয়কুমার দত্ত ‘বিদ্যাদর্শন’ নামক একটি মাসিক পত্রিকা বের করেছিলেন কিছুদিন। তবে দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রতিষ্ঠিত ‘তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা'র সম্পাদক হিসেবেই তিনি বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেন। যদিও পত্রিকার মূল উদ্দেশ্য ছিল ব্রাহ্মধর্ম প্রচার, কিন্তু অক্ষয় দত্ত ও তাঁর বন্ধু বিদ্যাসাগরের কারণে এটি সে সময়ে সাহিত্য, বিজ্ঞান, দর্শন, ইতিহাস ও সমাজ সংস্কার বিষয়ে একটি অগ্রণী পত্রিকায় পরিণত হয়। 

বিদ্যাসাগরের বিধবাবিবাহ প্রচলনের উদ্দেশ্যে লিখিত বিভিন্ন প্রবন্ধ এই পত্রিকায় ছাপা হয় এবং অক্ষয় দত্ত তার সমর্থনে সম্পাদকীয় লেখেন। বিধবাবিবাহকে তিনি কতটুকু সমর্থন করতেন, পৌত্র সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের লেখা তাঁর সংক্ষিপ্ত জীবনীতে বর্ণিত একটি ঘটনা থেকে তার প্রমাণ পাওয়া যায়। একবার অক্ষয় দত্তের এক কর্মচারী কয়েক হাজার টাকা নিয়ে পালিয়ে যান। তাঁকে চিঠি লিখে জেল-পুলিশের ভয় দেখালে তিনি জবাবে তাঁকে জানান, ‘আপনি আমাকে বলেছিলেন আমি বিধবাবিবাহ করলে আমাকে পুরস্কার দেবেন। আমি বিধবাবিবাহ করেছি।’ অক্ষয়কুমার খোঁজ নিয়ে জানলেন, সত্যিই তিনি একজন বিধবাকেই বিয়ে করেছেন। তিনি সেই কর্মচারীকে চিঠি লিখলেন, ‘তোমার সকল অপরাধ ক্ষমা করলাম’।’

‘ভূগোল’ প্রকাশের পনেরো বছর পর প্রকাশিত তাঁর ‘পদার্থবিদ্যা’ বাংলা ভাষায় লেখা প্রথম পূর্ণাঙ্গ বিজ্ঞানের বই। এ ছাড়া বিজ্ঞানের ও সাধারণ জ্ঞানের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে লেখা ‘চারুপাঠ’ (প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় খণ্ড) পাঠ্যপুস্তক হিসেবে প্রচুর জনপ্রিয় হয়েছিল। এসব গ্রন্থে প্রথম ব্যবহৃত শব্দগুলি হল —মাধ্যাকর্ষণ, আহ্নিক গতি, বিষুবরেখা, অক্ষাংশ, দ্রাঘিমা, চুম্বক, বিকিরণ, তড়িৎ, সুমেরু, কুমেরু, স্থিতিস্থাপকতা, আপেক্ষিক গতি, ভারকেন্দ্র, দূরবীক্ষণ, অণুবীক্ষণ — ইত্যাদি অসংখ্য পরিভাষা আজ বাংলা ভাষার অঙ্গীভূত হয়েছে এবং আমরা প্রতিনিয়ত তা ব্যবহারও করছি।

অক্ষয় দত্তের একটি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ হলো ‘ভারতবর্ষীয় উপাসক  সম্প্রদায়’। তাঁর বইগুলো কোনো না কোনো ইংরেজি গ্রন্থ অবলম্বনে রচিত হলেও এই গ্রন্থে ভারতের উপাসক সম্প্রদায় সম্পর্কে তাঁর নিজের অনুসন্ধানলব্ধ তথ্য ও পর্যবেক্ষণ রয়েছে। বিখ্যাত জার্মান ভারতবিদ ম্যাক্সমুলার এ বইটি পড়েই অক্ষয় দত্তকে প্রশস্তিমূলক চিঠি লিখেছিলেন।

অক্ষয়কুমার তেইশ বছর বয়সে ব্রাহ্মধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু স্বাধীন চিন্তা ও নিবিড় বিজ্ঞানচর্চার কারণে এবং হয়তো বিদ্যাসাগরের সাহচর্যে এই সমাজবিজ্ঞানী সব ধরনের ভাববাদিতা ও সংস্কার থেকে মুক্ত হয়েছিলেন। যাত্রার ‘শুভ-অশুভ’ ক্ষণ বলে কিছু যে নেই তা প্রমাণ করার জন্য শাস্ত্রে ‘অশুভ’ এমন দিনক্ষণ দেখে তিনি ভ্রমণে বেরোতেন। বিদ্যাসাগর বেদান্ত-সাংখ্য দর্শনের মতো হিন্দুধর্মীয় দর্শনকে ভ্রান্ত বলেছিলেন। তেমনি অক্ষয় দত্তও হিন্দু ও ব্রাহ্মদের নিকট ঐশ্বরিক গ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত বেদকে মানুষের রচনা এবং সে কারণে অভ্রান্ত নয় বলে ঘোষণা করেন। তবে অক্ষয়কুমার দত্ত তাঁর ঈশ্বরবিষয়ক একটি সমীকরণের জন্য বিশেষভাবে পরিচিত । ধর্ম–সম্পর্কিত এই দৃষ্টিভঙ্গির জন্য ব্রাহ্মসমাজের পত্রিকা ‘তত্ত্ববোধিনী’তে কাজ করা অক্ষয় দত্তের জন্য অসুবিধাজনক হয়ে ওঠে। বিদ্যাসাগর শিক্ষক প্রশিক্ষণের জন্য তাঁর প্রতিষ্ঠিত ‘নরমাল স্কুল’এর প্রধান শিক্ষক করে নিয়ে আসেন বন্ধু অক্ষয়কে। তবে শারীরিক অসুস্থতার জন্য দীর্ঘদিন তিনি এ দায়িত্ব পালন করতে পারেননি।

নারী শিক্ষার পক্ষে একজন নিবেদিতপ্রাণ ব্যক্তি ছিলেন অক্ষয় দত্ত। বিদ্যাসাগর শাস্ত্র না মানলেও যেভাবে শাস্ত্র থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে প্রমাণ করেন যে বিধবাবিবাহ শাস্ত্রসম্মত, তেমনি শাস্ত্র না-মানা অক্ষয়ও নারী শিক্ষার সমর্থনে হিন্দু শাস্ত্র থেকে উদাহরণ দিয়ে সেগুলোকে নারী শিক্ষার সমর্থক বলে ব্যাখ্যা করেতেন।
বাংলা ভাষার প্রসারে তিনি যে গুরুত্ব দিতেন, তা অতুলনীয়। আমাদের ভাষা আন্দোলনের শতবর্ষ আগে তিনি অফিস–আদালত ও উচ্চশিক্ষাসহ সব স্তরে বাংলা ভাষা প্রচলনের কথা বলেছিলেন। প্রখ্যাত শিক্ষাব্রতী ডেভিড হেয়ারের মৃত্যুর পর তিনিই প্রথা ভেঙে প্রথম বাংলায় বক্তৃতা দিয়ে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন।

অক্ষয় দত্তের শিক্ষাচিন্তার আধুনিকতা এবং আজকের প্রাসঙ্গিকতা দেখে স্তম্ভিত হতে হয়। এখন আমরা আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে মুখস্থনির্ভরতা থেকে মুক্ত করা নিয়ে চিন্তিত। অথচ প্রায় দেড়শ বছর আগে অক্ষয় দত্ত কী বলেছিলেন শুনুন— " কালেজ ও স্কুলে যেরূপ শিক্ষাপ্রণালী ব্যবহৃত হইতেছে তাহা কেবল স্মরণশক্তি উন্নতিসাধনপক্ষে বিশেষ অনুকূল, বুদ্ধিবৃত্তির পরিচালনা ও উন্নতিসাধনের পক্ষে তত অনূকূল নহে। শুনিতে পাওয়া যায় যে, প্রধান প্রধান কালেজের অধ্যাপকেরা ছাত্রদিগকে কোনো প্রশ্ন করেন না। কেবল গ্রন্থের ব্যখ্যা করিয়া যান, ছাত্রেরা কেবল নোট লয়। ইহাতে বুদ্ধিবৃত্তির কীরূপ পরিচালনা হইতে পারে, পাঠকবর্গ তাহা সহজে বুঝিতে পারেন।"

অক্ষয় দত্ত আর বিদ্যাসাগর জন্মেছিলেন একই বছর, আজ থেকে দুইশ বছর আগে, ১৮২০ সালে। তাদের এই কীর্তিময় বন্ধুত্ব তাদের সমসাময়িক দুজন যুগপ্রবর্তক জার্মান দার্শনিকদ্বয়ের বন্ধুত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। এঁদের একজন তাঁদেরই সমান বয়সী, তাঁর নাম ফ্রেডারিক এঙ্গেলস, এবং অন্যজন দুই বছরের বড়, নাম কার্ল মার্ক্স।

প্রকৃতপক্ষে অক্ষয়কুমার দত্তই ছিলেন বাংলায় বিজ্ঞান সংস্কৃতি গড়ে তোলার মূল কান্ডারি। ১৮৪০ সালের জানুয়ারি মাসে, তত্ত্ববোধিনী সভার সহকারী সম্পাদক রূপে নির্বাচিত অক্ষয়কুমার, উক্ত বছরেই কলকাতায় প্রতিষ্ঠিত তত্ত্ববোধিনী পাঠশালার শিক্ষক রূপে নিযুক্ত হন। এখানেই তিনি ভূগোল ও পদার্থবিদ্যা পড়ানোর সময়ে বাংলা ভাষায় ‘ভূগোল’ ও ‘পদার্থবিদ্যা’ নামে দু’টি পাঠ্যপুস্তক লিখে ফেলেন। ‘পদার্থবিদ্যা’ (১৮৫৭) ছিল তাঁর লেখা বিশুদ্ধ বিজ্ঞানের (Pure Science) প্রথম বাংলা বই। বাংলায় বিজ্ঞানের পরিভাষা গঠনেও তাঁর অবদান চিরস্মরণীয়। আবার, ১৮৪২ সালের জুন মাসে প্রসন্নকুমার ঘোষের সহায়তায় অক্ষয়কুমার ‘বিদ্যাদর্শন’ নামে যে মাসিক পত্রিকা প্রকাশ শুরু করেন, তার মুখ্য উদ্দেশ্যই ছিল বাঙালি মননকে বিজ্ঞানচেতনায় সমৃদ্ধ করা। পাশ্চাত্য বেকনীয় দর্শনের গুণগ্রাহী অক্ষয়কুমার দত্ত মাতৃভাষায় শিক্ষাদানের বিষয়ে সর্বাধিক গুরুত্ব আরোপ করেছিলেন এবং সেই উদ্দেশ্য পূরণে তিনি নিজেই এগিয়ে এসেছিলেন। 

১৮৪৮ সালের জানুয়ারি মাস থেকে ‘তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা’-য় ব্রিটিশ phrenologist (করোটি পরীক্ষা দ্বারা কোনও ব্যক্তির চরিত্র ও বিবিধ গুণাবলি নির্ণয় করতে পারেন যাঁরা) জর্জ কুম্ব (George Combe)-এর "The Constitution of Man Considered in Relation of External Object" পুস্তকের ভাবধারায় ভারতীয় প্রেক্ষিতে তাঁর লেখা " বাহ্যবস্তুর সহিত মানব প্রকৃতির সম্বন্ধ বিচার " প্রকাশিত হতে থাকে। পরে এটাই দু’খণ্ডের বই হয়ে প্রকাশিত হয়। 

আর তিন খণ্ডে তাঁর লেখা ‘চারুপাঠ’ ছিল তৎকালীন সময়ের এক জনপ্রিয় পাঠ্যপুস্তক। সহজ, সরল ভাষায় ছোট ছোট প্রবন্ধের মধ্য দিয়ে বিজ্ঞান বিষয়ের নানা প্রবন্ধের মাধ্যমে এই বইয়ের মধ্য দিয়ে তিনি বিজ্ঞানকে বাঙালি সংস্কৃতির সঙ্গে অনেকটা সম্পৃক্ত করে তুলতে সক্ষম হয়েছিলেন।

নিজের উপার্জনের প্রায় সব টাকাই তিনি বাংলায় বিজ্ঞান-সমৃদ্ধ সমাজ গড়ে তোলার কাজে নিঃস্বার্থে দান করেছিলেন। মৌলিক বিজ্ঞান গবেষণার কেন্দ্র রূপে তাঁর অকৃত্রিম দানেই গড়ে উঠেছিল আজকের ‘ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য কালটিভেশন অব সায়েন্স’।

আজকের ভারতকে যখন কুসংস্কার আর অন্ধত্বের এক কঠিন বেড়াজালে আবদ্ধ করে ফেলার বন্দোবস্ত বা ষড়যন্ত্র চলছে, তখন এই বাঙালি মনীষীর জন্মের দ্বিশতবর্ষের মুহূর্তে দাঁড়িয়ে বাঙালির বিজ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রে তাঁর অনন্যসাধারণ মৌলিক অবদানকে আজকের বাঙালি সমাজের সামনে তুলে ধরাই আমাদের একান্ত কর্তব্য। 

১৮১৭ সালে হিন্দু কলেজ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে বাংলা সাহিত্যে বিজ্ঞানের লেখালিখি শুরু হয়েছে। তখন মূলতঃ ইংরেজ লেখকেরাই বাংলায় লেখালিখি করতেন।১৮১৭ থেকে ২০২০ পর্যন্ত বিজ্ঞান সাহিত্যের বয়সকে মোটামুটি তিনটি ভাগে ভাগ করা যায়।------

১। ইউরোপীয় লেখকদের আমল (হিন্দু কলেজের প্রতিষ্ঠাতা থেকে শ্রী অক্ষয়কুমার দত্তের পূর্ব পর্যন্ত)।

২। শ্রী অক্ষয়কুমার দত্ত থেকে শ্রী রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী।

৩।শ্রী রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী থেকে শ্রী জগদানন্দ রায়। 

আমাদের এও মনে রাখতে হবে, অক্ষয়কুমার দত্তের হাত ধরেই বাংলায় বিজ্ঞান সাহিত্য সাবালকত্ব লাভ করে। বিজ্ঞান, গণিত ও ভূগোলের অসংখ্য পারিভাষিক শব্দও তৈরি করেছিলেন অক্ষয়কুমার। অণুবীক্ষণ, চুম্বক, জ্যোতির্বিদ্যা, দাহ্য পদার্থ, জড়, তড়িৎ, পরিমিতি, ধ্রুবতারা, অঙ্গার, বাষ্প, বজ্র, জোয়ার, রামধনু, সৌরজগৎ, মাধ্যাকর্ষণ, গ্রহণ, সুমেরু, কুমেরু, মানমন্দির, জ্বালামুখী, আগ্নেয়গিরি ইত্যাদি তাঁরই তৈরি করা বাংলা শব্দ। 

1855 সালের 17 জুলাই বিদ্যাসাগরের তত্ত্বাবধানে সংস্কৃত কলেজে একটি নর্মাল স্কুল খোলা হল। উদ্দেশ্য - বিভিন্ন জেলায় যে সমস্ত আদর্শ স্কুল স্হাপন করেছেন বিদ্যাসাগর সেই সমস্ত স্কুলের জন্য আদর্শ ও উপযুক্ত শিক্ষক তৈরি করা। নর্মাল স্কুলটি দুটি ভাগে বিভক্ত। উচ্চ শ্রেণির ভার নিলেন প্রধানশিক্ষক শ্রী অক্ষয়কুমার দত্ত। অক্ষয়কুমার দত্তকে শ্রদ্ধা করতেন বিদ্যাসাগর। দুজনেই সমবয়সী। কয়েক মাসের বড় অক্ষয় দত্ত। স্কুল প্রতিষ্ঠার আগে শিক্ষা বিভাগের অধ্যক্ষকে তাই বিদ্যাসাগর চিঠিতে লিখলেন - " For the post of Head Master of the Normal classes, I would recommend Babu Akshay Kumar Dutt, the well known editor of the 'Tatwabodhini Patrika'. He is one of the very few of the best Bengali writers of the time. His knowledge of the English language is very respectable and he is well informed in the elements of general knowledge, and well acquainted with the art of teaching." 

দীর্ঘদিন অক্ষয়কুমার দত্ত তত্ত্ববোধিনী পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। শারীরিক কারণে যখন পত্রিকার কাজ থেকে বিরতি চাইছিলেন তখনি বিদ্যাসাগর তাঁকে নর্মাল স্কুলে প্রধান শিক্ষকের পদটি দান করেন। শুধুই কি শারীরিক কারণ? সে সময় দেবেন্দ্রনাথের সঙ্গে তাঁর মতানৈক্যও সর্বজনবিদিত। কারণ।দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর এক চিঠিতে লিখছেন--

" কতকগুলান নাস্তিক গ্রন্থাধ্যক্ষ হইয়াছে। ইহাদিগকে এই পদ হইতে বহিষ্কৃত না করিয়া দিলে ব্রাহ্মধর্ম প্রচারের সুবিধা নাই।" এর পর পরই অক্ষয়কুমার তত্ত্ববোধিনী ছেড়ে দেন। কেউ বলে তাঁকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। অক্ষয়কুমার দত্তর অন্যতম জীবনীকার, নকুড়চন্দ্র বিশ্বাস তাঁর "অক্ষয় চরিত" (1887) বইতে লিখেছেন নর্মাল  স্কুলের কাজ পেয়ে অক্ষয়কুমার বিদ্যাসাগরকে বলেছিলেন "তাহলে বাঁচি।" কিন্তু শ্রদ্ধেয় শ্রী আশীষ লাহিড়ী মহাশয় তাঁর "আঁধার রাতে একলা পথিক" বইতে অক্ষয়কুমারের এই মতামতকে খণ্ডন করে অক্ষয়কুমারের আরেক জীবনীকার মহেন্দ্র রায়ের বিবরণকে স্বীকৃতি দিয়েছেন। অক্ষয়কুমার জীবিত থাকা কালেই প্রকাশিত হয় মহেন্দ্র রায়ের "বাবু অক্ষয়কুমার দত্তের জীবনবৃত্তান্ত"(1887)। সেখানে মহেন্দ্র রায় লিখেছেন তাঁর পড়াশুনার ব্যাঘাত হবে বলে মাসিক তিনশ টাকা মাইনের এই পদ নিতে অস্বীকার করেছিলেন অক্ষয়কুমার। কিন্তু বিদ্যাসাগর যেহেতু আগেই চিঠি লিখে শিক্ষাধ্যক্ষের অনুমতি আদায় করেছিলেন, বিদ্যাসাগরের মর্যাদার কথা ভেবে কিছুটা নিমরাজি হয়েই অক্ষয়কুমার এই পদে যোগদান করেন। তবে বেশিদিন এই কাজে তিনি নিজেকে নিয়োজিত করতে পারেননি তাঁর শিরঃপীড়ার জন্য। বারবার অজ্ঞান হয়ে যেতেন। 1858 সালে তাই ছেড়েও দেন শিক্ষক-শিক্ষণ স্কুলের অধ্যক্ষের পদ। নিজের পড়াশোনা, লেখালিখির প্রতি মনোযোগী হন তিনি। 1870 এ প্রকাশিত হয় তুলনামূলক ভাষাতত্ত্ব, ধর্ম দর্শন ইত্যাদি বিষয়ের ওপর অন্যতম মৌলিক গবেষণা গ্রন্হ  "ভারতবর্ষীয় উপাসক সম্প্রদায়" - প্রথম খণ্ড।  এবং 1883 তে দ্বিতীয় খণ্ড।

          আগে কিন্তু কবিতাও লিখতেন অক্ষয়কুমার। সম্ভবত 1834 সালে প্রকাশিত হয়েছিল তাঁর একমাত্র কবিতার বই "অনঙ্গমোহন"। ভারতচন্দ্রের বিদ্যাসুন্দর কাব্যের আদর্শে রচিত সে বই অনেকটা বটতলার বই এর গোত্রে পর্যবসিত হয়েছিল। তাঁকে ঐ বই 'অনঙ্গমোহন' কবি হিসেবে অন্তত কোন স্বীকৃতি যে দিতে পারেনি এ এক আশ্চর্যের কথা। অক্ষয়কুমার দত্ত প্রথম কবি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলেও বাংলা সাহিত্য তাঁকে মনে রেখেছে গদ্যকার হিসেবে। বাংলা ভাষার বিবর্তনে এক বড় ভূমিকা ছিল তত্ত্ববোধিনী পত্রিকার। সে পত্রিকা অক্ষয়কুমার প্রচণ্ড দক্ষতার সঙ্গে সম্পাদনা করেছেন প্রায় বারো বছর,1843 থেকে 1855 পর্যন্ত। দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং অক্ষয়কুমার দত্ত ছিলেন প্রায় দুই মেরুর লোক। দুজনের মধ্যে প্রচুর মতপার্থক্য থাকলেও শুধুমাত্র অক্ষয়কুমারের গদ্য লেখার হাতটির জন্য তাঁকে সম্পাদকের পদে অধিষ্ঠিত করেছিলেন।

       অক্ষয়কুমারের গদ্য লেখার সূত্রপাত নিয়ে এক কাহিনী আছে। অক্ষয়কুমারের মেজ জ্যেঠুর ছেলে হরমোহন দত্ত তখনকার ' সুপ্রীমকোর্টের মাস্টার আপিসের বড়বাবু ছিলেন।' হরমোহনের কাছে থেকেই শিক্ষালাভ করতেন অক্ষয়কুমার। তখনকার আমলে বিখ্যাত পত্রিকা ' সংবাদ- প্রভাকর' এর সম্পাদক ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত সুপ্রিম কোর্টের বিজ্ঞাপন আদায়ের জন্য হরমোহনের কাছে যেতেন। সেখান থেকেই অক্ষয়কুমারের সঙ্গে গুপ্তকবির আলাপ। এছাড়া যে রামধন বসুর বাড়িতে থেকে অক্ষয়কুমার ওরিয়েন্টাল সেমিনারিতে পড়তেন সেই রামধন বসুর বাড়ির পাশে নরনারায়ণ দত্তের বাড়িতে ' বাঙ্গালা ভাষানুশীলনী' সভা হত। সেখানেও ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত এবং অক্ষয়কুমার যেতেন। ক্রমে ঘনিষ্ঠতা বাড়ে। এছাড়াও বরাহনগরে ' নীতিতরঙ্গিনী' নামে এক সভাতেও দুজনের গতায়াত ছিল। একদিন অক্ষয়কুমার প্রভাকরের অফিসে গেছেন। সেদিন ঈশ্বরচন্দ্রের সহকারী অনুপস্থিত। গুপ্ত কবি অক্ষয়কুমারকে 'ইংলিশম্যান' পত্রিকা থেকে কিছুটা অংশ অনুবাদ করে দিতে বলেন। অক্ষয়কুমার এমন প্রস্তাবে বিস্মিত হয়ে ঈশ্বরচন্দ্রকে বলেন- "আমি তো কোনদিন গদ্য লিখিনি"। ঈশ্বরচন্দ্রের পীড়াপীড়িতে শেষ অবধি কাজটি করেন তিনি। বাংলা সাহিত্যে আবির্ভূত হলেন গদ্যকার অক্ষয়কুমার দত্ত। তিনি ক্রমে 'সংবাদ প্রভাকর' এর লেখক হয়ে ওঠেন।

        অক্ষয়কুমার দত্তর জন্ম 1820 খ্রিষ্টাব্দের 15জুলাই বর্ধমান জেলার চুপীর গ্রামে। পিতা পীতাম্বর দত্ত। মা দয়াময়ী দেবী। পীতাম্বর আদি গঙ্গার ধারে কুঁদঘাটে ক্যাশিয়ার আর দারোগা ছিলেন। পীতাম্বর তাঁর মেজদার ছেলে হরমোহনের পড়াশোনার দায়িত্ব নিয়েছিলেন। তাই পরবর্তীকালে হরমোহনও অক্ষয়কুমারের পড়াশোনার দায়িত্ব নেন। ছোটবেলায় গ্রামের বাড়িতে সংস্কৃত, পার্সি ইত্যাদি পড়ার পর নয় বছর বয়সে হরমোহনের সঙ্গে খিদিরপুর চলে আসেন এবং দুজন শিক্ষকের কাছে ইংরেজি পড়তে শুরু করেন। এরপর পড়াশুনার প্রতি অক্ষয়কুমারের আগ্রহ দেখে তাঁকে 'ওরিয়েন্টাল সেমিনারি' স্কুলে ভর্তি করে দেন। যাতায়াতের সুবিধার জন্য অক্ষয়কুমার দর্জিপাড়ায় তাঁর পিসতুতো দাদা রামধন বসুর বাড়িতে থাকতেন। ওরিয়েন্টাল সেমিনারিতে হার্ডম্যান জেফ্রয় নামে এক ইংরেজের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হন অক্ষয়কুমার। স্কুলেই থাকতেন ঐ সাহেব। প্রত্যেকদিন সকাল সন্ধে অক্ষয়কুমার তাঁর কাছে গ্রীক, ল্যাটিন, হিব্রু, জার্মান, ইলিয়ড, ভার্জিল, পদার্থবিদ্যা, ভূগোল, জ্যামিতি, ত্রিকোণমিতি, অঙ্ক, বিজ্ঞান, শাস্ত্র ইত্যাদি পড়তেন। এভাবেই বিজ্ঞানের প্রতি তাঁর অনুরাগ বাড়ে। 1822 সালে কেম্ব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট পাস কোর্সের যে নতুন পাঠক্রম চালু করেছিলেন অনেকটা সেগুলোই জেফ্রয় পড়াতেন অক্ষয়কুমারকে।অক্ষয়কুমারের এক নোটবুক থেকে জানা যায় প্রথম জীবনে অক্ষয়কুমার কী কী বই পড়তেন।  সে তালিকায় যেমন ছিল গণিত, প্রাকৃতিক বিজ্ঞান তেমনি ছিল দর্শন, স্মৃতি, তন্ত্র, কাব্যনাটক ও অলঙ্কারের বই। অক্ষয়কুমার সম্ভবত সবচেয়ে বেশী প্রভাবিত হয়েছিলেন কুম্ব এর 'Constitution of Man in Relation to External Objects' পড়ে। তাঁর ' বাহ্যবস্তুর সহিত মানবপ্রকৃতির সম্বন্ধবিচার'( 1851)বইটি আদতে কুম্বের বইটির ভাবানুবাদ। তবে ওরিয়েন্টাল সেমিনারিতে বেশীদিন পড়া সম্ভব হয়নি তাঁর। 1839 এ পীতাম্বর দত্ত মারা গেলে তাঁর মা তাঁকে পড়াশুনা ছেড়ে সংসারের হাল ধরতে বলেন।তবে তিনি নিজে নিজে পড়াশোনাটা চালিয়ে যান।

ইতিমধ্যে 1835 এ অক্ষয়কুমার পনের বছর বয়সে বিয়ে করেন আগরপাড়ার রামমোহন ঘোষির মেয়ে নিমাইমণি কে। সে বিয়েও সুখের ছিল না। তাঁর তিনপুত্রের মধ্যে প্রথম দুজন  চন্দ্রকুমার এবং হেমচন্দ্র অকালে মারা যান। কনিষ্ঠপুত্র রজনীনাথ দত্ত ছিলেন হোমিওপ্যাথি ডাক্তার, তাঁরই সুযোগ্য পুত্র হলেন ছন্দের জাদুকর সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত। অবশ্য সত্যেন্দ্রনাথের যখন মাত্র চার বছর বয়স তখন প্রয়াত হন অক্ষয়কুমার। তখন সেটা 1886 সাল।

           ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তর সঙ্গে যোগাযোগের সুফল পেয়েছিলেন অক্ষয়কুমার। তাঁর হাত ধরেই 1839 এ তত্ত্ববোধিনীসভায় প্রবেশ করেন তিনি। ঐ বছরের পঁচিশে ডিসেম্বর তত্ত্ববোধিনী সভার সভ্য হন অক্ষয়কুমার। 1840 সালের 13 জুন তত্ত্ববোধিনী সভার উদ্যোগে তত্ত্ববোধিনী পাঠশালা প্রতিষ্ঠা হলে সে পাঠশালার বর্ণমালা, ভূগোল ও পদার্থবিদ্যার শিক্ষক হিসাবে নিযুক্ত হন অক্ষয়কুমার। শিবনাথ শাস্ত্রী History of the Brahmo Samaj' বইতে লিখেছেন -- "A Theological College, called Tattwabodhini Pathshala was started to train up a number of young men in the princile of new faith. A youthful and enthusiastic scholar and writer, named Akshay Kumar Dutta, was appointed a teacher of this institution. He took an important part in moulding the theology of the Samaj."  এই স্কুল স্হাপনের পেছনে অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল মিশনারি বিদ্যালয়গুলোর বাড়বাড়ন্ত বন্ধ করা। কিশোর ছাত্রদের মনে খ্রিষ্টধর্মর বীজ বপন হচ্ছিল। প্রসঙ্গত অক্ষয়কুমারের খগোল যন্ত্রপ্রীতি বা দূরবীক্ষণ যন্ত্রর প্রতি ভালোবাসা ছিল সর্বজনবিদিত। অন্ধকার রাতে বাড়ির ছাতে তিনি তাঁর প্রিয় খগোল যন্ত্রটি নিয়ে মহাকাশ নিরীক্ষণ করতেন। এর পরের বছর তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা প্রকাশিত হলে পত্রিকা সম্পাদনার ভার মহর্ষি তুলে দেন অক্ষয়কুমারের হাতে। মহর্ষি রীতিমতো পরীক্ষা করে তাঁকে বেছে নিয়েছিলেন। দেবেন্দ্রনাথ তাঁর আত্মজীবনীতে লিখছেন - "পত্রিকার একজন সম্পাদক নিয়োগ আবশ্যক। সভ্যদিগের মধ্যে অনেকেরই রচনা পরীক্ষা করিলাম। কিন্তু অক্ষয়কুমার দত্তের রচনা দেখিয়া তাঁকে মনোনীত করিলাম। তাঁহার এই রচনাতে গুণ ও দোষ দুইই প্রত্যক্ষ করিয়াছিলাম। গুণের কথা এই যে তাঁহার রচনা অতিশয় হৃদয়গ্রাহী ও মধুর। আর দোষ এই যে, ইহাতে তিনি জটা-জূট-মণ্ডিত ভস্মাচ্ছাদিত-দেহ তরুতলবাসী সন্ন্যাসীর প্রশংসা করিয়াছিলেন। এই চিহ্নধারী বহিঃপ্রকাশ আমার মতবিরুদ্ধ। আমি মনে করিলাম, যদি মতামতের জন্য নিজে সতর্ক থাকি, তাহা হইলে ইঁহার দ্বারা অবশ্যই পত্রিকা সম্পাদন করিতে পারিব। ফলতঃ তাহাই হইল। আমি অধিক বেতন দিয়া ঐ কার্য্যে অক্ষয়বাবুকে নিযুক্ত করিলাম।" 

মুক্তচিন্তাধারার অধিকারী অক্ষয়কুমারকে নিয়ে চলতে মহর্ষির একটু অসুবিধাই হচ্ছিল। তাই মহর্ষি লিখেছেন-- "আমি কোথায় আর তিনি কোথায়! আমি খুঁজিতেছি, ঈশ্বরের সহিত আমার কি সম্বন্ধ, আর তিনি খুঁজিতেছেন, বাহ্য বস্তুর সঙ্গে মানবপ্রকৃতির কী সম্বন্ধ। আকাশ পাতাল প্রভেদ।" অক্ষয়কুমার দত্তের চেষ্টায় এই পত্রিকায় ধর্ম ছাড়াও সাহিত্য, বিজ্ঞান, পুরাতত্ত্ব ইত্যাদি নিয়ে লেখা প্রকাশিত হত। এশিয়াটিক সোসাইটিরত মহর্ষি এক পেপার কমিটি করে দিয়েছিলেন যার কাজ ছিল লেখাপত্র মনোনীত করা। পাঁচ জন সভ্য ছিলেন এই কমিটিতে। তাঁদের অন্যতম ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, রাজেন্দ্রলাল মিত্র, মহর্ষি স্বয়ং, প্রসন্নকুমার সর্ব্বাধিকারী, আনন্দচন্দ্র বেদান্তবাগীশ প্রমুখ। পরে অক্ষয়কুমার এই কমিটির অন্তর্ভুক্ত হন। প্রায় বারো বছর এই পত্রিকার সম্পাদনা করে তত্ত্ববোধিনীকে বাংলা সাহিত্যে একটা বিশিষ্ট স্হান করে দেন। প্রায় সাতশ জন গ্রাহক ছিল সে সময়।

 রাজনারায়ণ বসু লিখেছেন-- "অনেকে অবগত নহেন যে দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ও বিদ্যাসাগর মহাশয়ের নিকট অক্ষয়কুমার দত্ত কত উপকৃত আছেন।তাঁহারা তাঁহার লেখা প্রথম প্রথম বিস্তর সংশোধন করিয়া দিতেন।" তবে যদি খুব কাছ থেকে নিরীক্ষণ করা যায় তবে দেখা যায় অক্ষয় দত্তর গদ্যর সঙ্গে মহর্ষির গদ্যর অনেক মিল। আবার দেবেন্দ্রনাথের বেদান্তের ঈশ্বরপ্রত্যাদিষ্ট ব্যাখ্যা বর্জনের পিছনে অক্ষয়কুমারের ভূমিকা অনস্বীকার্য। অক্ষয়কুমারের ভাবনাচিন্তায় বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি ছিল। আর মহর্ষির ভাবনায় বিজ্ঞানের স্হান ছিল গৌণ। একবার হিন্দু হোস্টেলের একদল ছাত্র অক্ষয়কুমারকে প্রার্থনার উপযোগিতা নিয়ে প্রশ্ন করেন। অক্ষয়কুমার তাঁদের প্রশ্ন করেন --' কৃষক পরিশ্রম করে কী পায়?' তারা বলে-'শস্য'। এরপর তিনি বলেন--' পরিশ্রমের সঙ্গে তারা যদি প্রার্থনাও করে তবে কী পাবে?' উত্তর আসে --' শস্য'। তখন অক্ষয়কুমার বলেন ' তাহলে প্রার্থনার মূল্য শূন্য।' বীজগণিতের প্রণালী দিয়ে দেখালেন--

        পরিশ্রম = শস্য
   পরিশ্রম+ প্রার্থনা = শস্য
  সুতরাং, প্রার্থনা = 0 (শূন্য) 

তিনি বলতেন বিজ্ঞানই প্রকৃত জ্ঞানের আধার। তত্ত্ববোধিনীর সম্পাদক থাকাকালীন তিনি নিয়মিত মেডিক্যাল কলেজে বহিরাগত ছাত্র হিসেবে বিজ্ঞানের ক্লাস করতেন।

অক্ষয়কুমার প্রথমজীবনে ব্রাহ্ম হলেও পরবর্তী কালে তাঁর ধর্মমত পরিবর্তিত হয়। তিনি ভারতবর্ষে বেকনের আদর্শ প্রথম প্রচার করেন। তাঁর ব্রহ্মের থেকে ব্রহ্মান্ড সম্পর্কে কৌতূহল বেশি। সাংখ্য বেদান্ত কেন মিথ্যে, কেন প্রাচীন ভারতীয় দর্শন নিয়ে আমাদের ধ্যানধারণাগুলি ত্রুটিপূর্ণ এসবের ওপর তিনি টীকা লেখেন। বিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয়ের ওপর তিনি প্রবন্ধ ছাপতেন তত্ত্ববোধিনী পত্রিকায়। 1842 সালে টাকীর প্রসন্নকুমার ঘোষের সহযোগিতায় অক্ষয়কুমার 'বিদ্যাদর্শন' নামে একটি পত্রিকা প্রকাশ করেন। ছমাস চলেছিল পত্রিকাটি। প্রথম বিজ্ঞানভিত্তিক প্রবন্ধ প্রথম 'বিদ্যাদর্শন' এ প্রকাশিত হয়।

           ব্যক্তিগত জীবনে সুখী ছিলেন না অক্ষয়কুমার। বিয়েতে সুখ পাননি তিনি। 'বাহ্যবস্তুর সহিত মানবপ্রকৃতির সম্বন্ধবিচার' বইতে তিনি লিখেছিলেন-----

1. বিবাহের আগে স্বামী -স্ত্রী পরস্পরের সঙ্গে আলাপ করে নেবে।

2. সাবালক না হলে বিয়ে করা যাবে না।

3. স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বয়সের ফারাক যেন না থাকে।

4. নিকট আত্মীয়দের মধ্যে বিয়ে ঠিক না।

5. বহুবিবাহ পাপ। বিধবাবিবাহ নীতিসঙ্গত।

6. বিবাহবিচ্ছেদকে সমাজে স্বীকৃতি দেওয়া উচিত।

..........ইত্যাদি.......ইত্যাদি।

অক্ষয়কুমার লেখেন ----
"পরস্পর বিরুদ্ধ-স্বভাব, অসম-বুদ্ধি ও বিপরীত-মতাবলম্বী স্ত্রী-পুরুষের পাণিগ্রহন হইলে, উভয়কেই যাবজ্জীবন বিষম যন্ত্রণা ভোগ করতে হয়।"

প্রগতিশীল মহলে আলোড়ন পড়েছিল তখন। 1854 সালের 15 ডিসেম্বর কাশীপুরে 'সমাজোন্নতিবিধায়িনী সুহৃদসমিতি'র সূচনা হয়। অক্ষয়কুমার দত্তর পৃষ্ঠপোষকতায় এই সভায় স্ত্রীশিক্ষার প্রবর্তন, বিধবাবিবাহ, বহুবিবাহ রদ, বাল্যবিবাহ বর্জনের প্রস্তাব দেওয়া হয়।

       দুরারোগ্য শিরঃপীড়ায় জীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে তাঁর। বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে ঘুরে, চিকিৎসা করেও কিছু লাভ হয়নি। জীবনের শেষ দশ বছর বালিতে (হাওড়া জেলা) দেওয়ানগাজী অঞ্চলে 'শোভনোদ্যান ' নামক নিজের বাড়িতে কালযাপন করেন। এক বিঘা জমির ওপর এক সুন্দর বাগান ছিল বাড়িতে। মাথা ব্যথা অসহ্য হলে তিনি বাগানে বেড়াতেন। অনেক দুর্লভ গাছ ছিল বাগানে। বাড়িতে একটা ভূতাত্ত্বিক সংগ্রহশালা করতে চেয়েছিলেন। তিনি যেখানে বসতেন তার চারিদিকে বিভিন্ন শামুক, জীবকঙ্কাল, বিরল সামুদ্রিক প্রাণীর খোলস সাজানো থাকত।  তাঁর পড়ার ঘরে পাঁচটি ছবি ছিল --- রামমোহন রায়, আইজ্যাক নিউটন, চার্লস ডারউইন, টি এইচ হাক্সলি ও জন স্টুয়ার্ট মিলের। খুব কষ্ট পেয়েছেন শেষ জীবনে। তাঁর অসুখকে হিন্দু পেট্রিয়ট 'জাতীয় বিপর্যয়' হিসেবে ঘোষণা করেছিল। 1886 সালের 28 মে তিনি পরলোকগমন করেন। তখন 'সোমপ্রকাশ' পত্রিকা লেখেন --"বঙ্গবাসী মাত্রই তাঁহার শোকে ম্রিয়মান।"

ইংরেজ দার্শনিক ফ্রান্সিস বেকনের (১৫৬১-১৬২৬) চিন্তাধারা আধুনিক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির জন্ম দিয়েছিল। তাঁকে দর্শনে এম্পিরিসিজম বা অভিজ্ঞতাবাদের জনক বলা হয়। অভিজ্ঞতাবাদ অনুযায়ী বিশ্বব্রহ্মাণ্ড সম্পর্কে জ্ঞানলাভ সম্ভব, এবং জ্ঞানের একমাত্র বা প্রাথমিক উৎস হল অভিজ্ঞতা। বেকন মনে করতেন যে প্রকৃতিকে পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যবেক্ষণ ও আরোহী যুক্তির প্রয়োগই হল বিজ্ঞানের নিয়ম সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার একমাত্র পথ। এর সঙ্গে তিনি জোর দিয়েছিলেন পরীক্ষা করে সেই সিদ্ধান্তের সত্যতা যাচাইয়ের উপর। বিজ্ঞানীকে সবসময়েই নিজের সিদ্ধান্ত সম্পর্কেও সন্দিহান থাকতে হবে। অভিজ্ঞতাবাদ ও আরোহী যুক্তির সম্মিলনই ইউরোপে মধ্যযুগীয় খ্রিস্টান ধ্যানধারণার বিপরীতে দাঁড়িয়ে বিজ্ঞানের নবজন্ম ঘটিয়েছিল। বেকনের মতে বিজ্ঞানের লক্ষ্য হল মানুষের জীবনযাত্রার উন্নতি। আমাদের দেশে বেকনের প্রথম অনুসারী রামমোহন রায়, পাশ্চাত্য শিক্ষার সমর্থনে ১৮২৩ সালে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীকে লেখা রামমোহনের সেই বিখ্যাত চিঠিতে তিনি বারবার বেকনের মতকেই নিজের সমর্থনে ব্যবহার করেছেন। কিন্তু তিনি বেকনের পাশাপাশি বেদান্তের চর্চাও চেয়েছিলেন, স্পষ্টতই তা স্ববিরোধী। বেদান্তের ‘ব্রহ্ম সত্য জগৎ মিথ্যা’, এই উক্তির সঙ্গে অভিজ্ঞতাবাদকে মেলানো সম্ভব নয়। আধুনিক বিজ্ঞানের ভগীরথ বেকনের আমাদের দেশে প্রথম সার্থক শিষ্য তাহলে কে?

এই বছর আমরা ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের জন্মের দ্বিশতবর্ষ পালন করেছি। সমাজ সংস্কার, নারী শিক্ষার প্রসার, আধুনিক শিক্ষাচিন্তা – নানা দিক দিয়ে বাংলা তথা ভারতের ইতিহাসে তাঁর অবদান অবিস্মরণীয়। তাঁর সমবয়সী ও ঘনিষ্ঠ একজনের কথা আমরা প্রায় ভুলে গিয়েছিলাম। এ বছর তাঁরও জন্মের দ্বিশতবর্ষ পূর্ণ হয়েছে, তিনি অক্ষয়কুমার দত্ত। বাংলা ভাষাতে বিজ্ঞান রচনাতে তিনি পথিকৃৎ, সেই কথা যদিও বা মনে রেখে থাকি, আমরা ভুলতে বসেছি তাঁর বিজ্ঞানমনস্কতা ও দর্শনচিন্তার কথা। এই দুই ক্ষেত্রে অক্ষয়কুমারের দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে দিয়েছিল বেকনের দর্শন। বিদ্যাসাগর ও অক্ষয়কুমার দু’জনেই বেকনের অভিজ্ঞতাবাদের অনুসারী ছিলেন। বিদ্যাসাগরের ক্ষেত্রে তা জানতে পারি বারাণসীর সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষ ব্যালান্টাইনের নির্ধারিত সংস্কৃত কলেজের পাঠক্রম বিষয়ে তাঁর চিঠি ও রিপোর্টে, কিন্তু সেই সময় তা প্রকাশ্যে আসেনি।  বিদ্যাসাগর এ বিষয়ে তাঁর মত আলোচনাতে উৎসাহী ছিলেন না, তাঁর সেই সময়ও ছিল না। যিনি প্রথম আমাদের দেশে অভিজ্ঞতাবাদকে আত্মস্থ করে তার ধ্বজা প্রকাশ্যে তুলে ধরেছিলেন তিনি অক্ষয়কুমার দত্ত।

বাংলা ভাষার বিজ্ঞান সাহিত্যের সূচনা করেছিলেন অক্ষয়কুমার। তাঁর উল্লেখযোগ্য বইয়ের মধ্যে আছে ‘ভূগোল’ (প্রকাশকাল ১৮৪১), ‘বাহ্যবস্তুর সহিত মানবপ্রকৃতির সম্বন্ধবিচার’ (প্রথম ভাগ, ১৮৫১; দ্বিতীয় ভাগ ১৮৫৩) ‘চারুপাঠ’ (প্রথম ভাগ ১৮৫৩; দ্বিতীয় ভাগ ১৮৫৪; তৃতীয় ভাগ ১৮৫৯), ‘পদার্থবিদ্যা’ (১৮৫৬), ধর্মনীতি (১৮৫৬), ‘ভারতবর্ষীয় উপাসক সম্প্রদায়’ (প্রথম ভাগ ১৮৭০; দ্বিতীয় ভাগ ১৮৮৩) প্রভৃতি। প্রথম দিকের বইগুলি মূলত অনুবাদ ও সংকলন। অনুবাদ বলে তাদের তুচ্ছ করার কোনো কারণ নেই, বিজ্ঞানের সিঁড়িতে পা রাখার ক্ষেত্রে অনুবাদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মধ্য যুগে আরব সভ্যতাতে বিজ্ঞানের চোখ-ধাঁধানো বিকাশের সূচনা হয়েছিল গ্রিক ও সংস্কৃত থেকে বিজ্ঞান বিষয়ক লেখা অনুবাদের মাধ্যমে।

 পরবর্তীকালে আবার আরবি থেকে লাতিন ভাষায় অনুবাদ ইউরোপের বিজ্ঞানে জোয়ার আনে।  অক্ষয়কুমারের অনুবাদ কিন্তু শুধুমাত্র ভাষান্তর নয়, তাতে যথেষ্ট মৌলিক চিন্তাভাবনার ছাপ আছে। বাংলাতে বিজ্ঞান রচনার জন্য একই সঙ্গে তাঁকে সৃষ্টি করতে হয়েছিল পরিভাষার। এক কথায় বলতে গেলে বাংলাতে বিজ্ঞান লেখার গদ্যরীতিই তাঁকে গড়ে নিতে হয়েছিল।

একটি প্রবন্ধে অক্ষয়কুমারের কর্মজীবনের সমস্ত দিকের প্রতি সুবিচার করা অসম্ভব। আগেই বলেছি, বাংলা ভাষাতে বিজ্ঞান চর্চার ইতিহাসে অক্ষয়কুমারের নাম চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। যখন ভারতীয়রা বিদেশী শাসনের গুণগানে ব্যস্ত সেই সময় তিনি সরাসরি বিদেশী শাসনকে দেশবাসীর দুরবস্থার কারণ হিসাবে চিহ্নিত করেছিলেন। নীলকরদের অত্যাচার ও চিরস্থায়ী ব্যবস্থাতে সৃষ্ট জমিদারদের প্রজাশোষণ সম্পর্কে সমালোচনা করতে তিনি পরাঙ্মুখ ছিলেন না। শেষ বিষয়টি আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ কারণ জমিদার দেবেন্দ্রনাথের সঙ্গে অক্ষয়কুমারের বিবাদে সরাসরি না এলেও নিশ্চয় তার ছায়া পড়েছিল। ‘ভারতবর্ষীয় উপাসক সম্প্রদায়’ রচনা করতে গিয়ে তিনি তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে জাতিপ্রথা মানেন নি। পঞ্জিকাতে যে সময়কে অশুভ বলা হত, কুসংস্কার বিরোধী অক্ষয়কুমার সেই সময়কেই যাত্রা শুরুর জন্য বেছে নিতেন। কোনো পুজোর দিনে অন্যরা যখন স্নানের উদ্দেশ্যে গঙ্গার দিকে চলেছে, তখন গঙ্গানদীর পাশে বাড়ি থাকা সত্ত্বেও অক্ষয়কুমার সবাইকে দেখিয়ে পুকুরে চান করতেন। অক্ষয়কুমারের বহুবিবাহ ও বাল্যবিবাহের বিরোধিতা, বিধবা বিবাহের প্রতি সমর্থন তাঁকে সেই যুগে সংস্কার আন্দোলনের সামনের সারিতে স্থান করে দেয়। বিবাহিত জীবনে স্বামী ও স্ত্রীর সমানাধিকারের প্রতি তাঁর সমর্থন এক স্কুলের ছাত্রদের মধ্যে এমনই সমর্থন পেয়েছিল যে অভিভাবকরা স্কুলটাই পুড়িয়ে দিতে চেয়েছিলেন। এই ক্ষুদ্র লেখাতে আমরা শুধু অক্ষয়কুমারের বেকন অনুরাগের প্রতিই দৃষ্টি রাখব।

অক্ষয়কুমারকে আকর্ষণ করেছিল বিজ্ঞান, তা পড়তে গিয়ে তাঁর পরিচয় হয় বেকনের অভিজ্ঞতাবাদের সঙ্গে। অভিজ্ঞতাবাদই সেই যুগে সবচেয়ে আধুনিক ও সার্থক বিজ্ঞানদর্শন। প্রথম জীবনে স্কটল্যান্ডের চিন্তাবিদ জর্জ কুম্বের মতের দ্বারা অক্ষয়কুমার প্রথম দিকে বিশেষ প্রভাবিত ছিলেন, তাঁর ‘বাহ্যবস্তুর সহিত মানবপ্রকৃতির সম্বন্ধবিচার’ হল কুম্বের ‘Constitution of Man in Relation to External Objects’ বইটির ভাবানুবাদ। ১৮৫৯ সালে চার্লস ডারউইনের ‘অরিজিন অফ স্পিসিস’ প্রকাশের পরে পরেই তিনি তা পড়েছিলেন। হয়তো অক্ষয়কুমারই আমাদের দেশে প্রথম ডারউইনের প্রাকৃতিক নির্বাচন তত্ত্বের বৈপ্লবিক তাৎপর্য বুঝতে পেরেছিলেন। ডারউইন ছিলেন স্বঘোষিত ভাবেই বেকনের অনুগামী। প্রকৃতি পর্যবেক্ষণ ও তার থেকে সুদূরপ্রসারী সিদ্ধান্ত নেয়ার বিষয়ে ‘অরিজিন অফ স্পিসিস’ আধুনিক পাঠককেও চমকে দেয়।  ডারউইনের মত প্রচারে জীববিদ টমাস হাক্সলির অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছিলেন। অর্থনীতিবিদ জন স্টুয়ার্ট মিল বেকনের আরোহী যুক্তিবাদকে আরও শাণিত করেছিলেন। আইজ্যাক নিউটনের চিন্তাধারার উপর বেকনের প্রভাব স্পষ্ট। নিউটনের একটি বিখ্যাত উক্তি, “Hypothesis non fingo”, আমি কোনো রকম পূর্বানুমান করি না। আগে থেকে কোনো ধারণা না করে পরীক্ষার মাধ্যমে যা পাওয়া যায়, তাই মেনে নেওয়ার এই চিন্তা বেকন দর্শনেরই অনুরূপ। রামমোহন যে বিখ্যাত চিঠিতে সুস্পষ্টভাবে বেকনের দর্শনকেই ব্রিটেন তথা ইউরোপের উন্নতির কারণ হিসাবে বর্ণনা করেছেন, তা অক্ষয়কুমার তাঁর বইতে উদ্ধৃত করেছিলেন। নিজের বাড়িতে রামমোহন, নিউটন, ডারউইন, টমাস হাক্সলি  ও জন স্টুয়ার্ট মিলের ছবি টানিয়ে অক্ষয়কুমার তাকে দেবালয় আখ্যা দিয়েছিলেন। লক্ষণীয় যে এই পাঁচজনই বেকনের দর্শনের অনুসারী। বেকনই হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন তাঁর আরাধ্য। অনেকের মতে জীবনের শেষ প্রান্তে তিনি হয়ে পড়েছিলেন অজ্ঞেয়বাদী, তিনি মনে করতেন ঈশ্বর থাকা বা না থাকার কোনো প্রমাণ নেই, যুক্তি দিয়ে ঈশ্বরের অস্তিত্ব প্রমাণ করা যাবে না।

অক্ষয়কুমারের পূর্বোক্ত প্রার্থনা-ইকুয়েশন একসময় কলকাতায় ঝড় তুলেছিল।বেকনীয় অভিজ্ঞতাবাদের ছাপ এখানেও স্পষ্ট। আধুনিক যুগের দৃষ্টিতে এই যুক্তির মধ্যে যে ফাঁকি ধরা পড়বে তাতে সন্দেহ নেই, কিন্তু উনিশ শতকের মধ্যখানে দাঁড়িয়ে এই যুক্তিবিন্যাস কলকাতার শিক্ষিত মহলে আলোড়ন তুলেছিল। অক্ষয়কুমার কিন্তু তাতে খুশি হননি, বলেছিলেন, “বিশুদ্ধবুদ্ধি বিজ্ঞানবিৎ লোকের পক্ষে যাহা অতি বোধ-সুলভ, তাহা এদেশীয় লোকদের নূতন বোধ হইল এটি বড় দুঃখের বিষয়।” অর্থাৎ বিজ্ঞান দর্শনের প্রাথমিক পাঠই ভারতবর্ষে প্রসারিত হয়নি।

দেবেন্দ্রনাথের স্থাপিত তত্ত্ববোধিনী সভার সঙ্গে অব্রাহ্মরাও যুক্ত হয়েছিলেন, বিদ্যাসাগরের নাম তাঁদের মধ্যে স্মরণীয়। অক্ষয়কুমার কিন্তু ব্রাহ্মধর্ম গ্রহণ করেছিলেন, দেবেন্দ্রনাথ সহ প্রথম একুশ জন ব্রাহ্মের মধ্যে তিনিও একজন। সাধারণে চলিত হিন্দুধর্মের পৌত্তলিকতাতে তিনি আগেই বিশ্বাস হারিয়েছিলেন, কারণ বিশ্বইতিহাস পাঠ তাঁকে দেখিয়েছিল যে গ্রিক বা রোমান সভ্যতার যুগে ইউরোপের প্রচলিত ধর্মের দেবদেবীদের স্থান রয়েছে শুধু বইয়ের পাতায়। ব্রাহ্মধর্মের একেশ্বরবাদ তাঁকে আকৃষ্ট করেছিল।
      
ব্রাহ্মধর্মের দর্শন নির্ধারণে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। হিন্দুধর্মের বিশ্বাস বেদ অপৌরুষেয় অর্থাৎ মানুষের সৃষ্টি নয়, ঈশ্বরপ্রণীত; তাই তা অভ্রান্ত। প্রথম প্রথম দেবেন্দ্রনাথ ও অন্যান্য  ব্রাহ্মরাও তাই বিশ্বাস করতেন। অক্ষয়কুমার বেদ ও বেদান্তের অভ্রান্ততা সম্পর্কে প্রশ্ন তোলেন। ধর্মগ্রন্থ যে যুক্তিনিরপেক্ষ বিশ্বাসের কথা বলে, তাঁর বেকনীয় দর্শনের সঙ্গে তা একেবারেই মেলে না। তাঁর যুক্তির যথার্থতা মেনে দেবেন্দ্রনাথ বেদবেদান্তের অভ্রান্ততার ধারণা পরিত্যাগ করেন। ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত সাধে কি আর তাঁর সম্পর্কে লিখেছিলেন, ‘বেকন পড়িয়া করে বেদের সিদ্ধান্ত’? অনেক পরে ‘ভারতবর্ষীয় উপাসক সম্প্রদায়’ বইতে অক্ষয়কুমার লিখেছেন, ‘বেদের যে অংশ যে ব্যক্তির কৃত স্পষ্টই লিখিত আছে, এবং তন্মধ্যে নানা স্থানে ও নানা কালে বিদ্যমান লোকসমূহের ভক্তি শ্রদ্ধা, রাগ দ্বেষ, কাম ক্রোধ, বিপদ আপদ, যুদ্ধ বিবাদ, ব্যসন বাণিজ্য ইত্যাদি অশেষ প্রকার ব্যাপারের বিবিধ বৃত্তান্ত বিনিবেশিত রহিয়াছে, তথাপি জৈমিনি মহাশয়ের মত-প্রভাবে তাহা অপৌরুষেয়, ... এইরূপ অঙ্গীকার করিতে হইবে।’
       
অক্ষয়কুমার কালক্রমে বুঝেছিলেন যে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে ধর্মের সত্যাসত্য নির্ণয় বাঙালি ভদ্রলোকের কাছে খুব গ্রহণযোগ্য হবে না। নানা ঘটনার মধ্যে দিয়ে তা আরও পরিষ্কার হয়। ভবানীপুর  ব্রাহ্মসমাজের এক বক্তৃতায় তিনি বলেছিলেন, ‘ভাস্কর ও আর্য্যভট্ট এবং নিউটন্‌ ও লাপ্লাস্‌ যে কিছু যথার্থ বিষয় উদ্‌ভাবন করিয়াছেন, তাহাও আমাদের শাস্ত্র। গৌতম ও কণাদ এবং বেকন ও কোন্ত্‌ যে-কোন প্রকৃত তত্ত্ব প্রচার করিয়াছেন, তাহাও আমাদের শাস্ত্র।‘ লাপ্লাস ও কোঁত ঈশ্বরের অস্তিত্বে বিশ্বাস করতেন না, খোদ সম্পাদকের বক্তৃতাটি তত্ত্ববোধিনী পত্রিকাতে ছাপার সময় সেই দুটি নাম তাঁর অজ্ঞাতসারেই বাদ দিয়ে দেওয়া হয়।এই রকম নানান প্রভেদের জন্য অক্ষয়কুমারকে শেষ পর্যন্ত পদত্যাগ করতে হয়েছিল।

আধুনিক মনে প্রশ্ন জাগে, ধর্মের সত্যতা বিচারে বৈজ্ঞানিক যুক্তির প্রয়োগ কি সম্ভব? অক্ষয়কুমারের অবস্থান সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তিত হয়েছে। বেদবেদান্তের অভ্রান্ততা বিষয়ে তাঁর মত আগেই আলোচনা করেছি। এও দেখেছি যে প্রার্থনার সাহায্যে কোনো বাস্তব ফল পাওয়া যায় বলে তিনি বিশ্বাস করতেন না। তত্ত্ববোধিনী পত্রিকার পাতাতে তিনি যে বিজ্ঞানের প্রবন্ধ লিখতে শুরু করেছিলেন, তার মূল লক্ষ্য ছিল প্রকৃতির নিয়ম জানা। প্রকৃতি নিয়ম মেনে চলে, এবং সেই নিয়ম একজন নিয়মস্রষ্টা ঈশ্বরের অস্তিত্বের প্রমাণ, অক্ষয়কুমারের এই অবস্থানকে বলা যায় ডীইস্‌ম। জর্জ কুম্বও ছিলেন ডীইস্ট।  ডীইস্টরা ধর্মগ্রন্থের আপ্তবাক্যে বিশ্বাস করেন না, তাঁরা যুক্তি ও পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে জগৎস্রষ্টা ঈশ্বরের অস্তিত্ব প্রমাণ করতে চান। তাই অক্ষয়কুমারের শাস্ত্রকারদের মধ্যে আর্যভট্ট, নিউটন, লাপ্লাসদের স্থান পাওয়া মোটেই আকস্মিক নয়। যুক্তি ও পর্যবেক্ষণ – বেকনীয়  দর্শনের এই দুই মূল স্তম্ভের সঙ্গে ডীইস্‌মের উপর উপর মিল খুঁজে পেয়েছিলেন অক্ষয়কুমার। কিন্তু সম্ভবত তা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি।

এই প্রসঙ্গে স্মরণ করতে হয় একটি বিখ্যাত উক্তি, ‘ডীইস্ট হল সেই যে নাস্তিক হয়ে ওঠার আগেই মারা গেছে।’ অক্ষয়কুমার নাস্তিক না হলেও সম্ভবত অজ্ঞেয়বাদী হওয়া পর্যন্ত বেঁচেছিলেন। ডারউইনের আগে বিশ্বাসীরা ঈশ্বরের সমর্থনে যে যুক্তি দেখাতেন, তাকে বলা যায় Intelligent design-এর যুক্তি। সেই অনুসারে প্রতিটি জীব তার পরিবেশের সঙ্গে এমন ভাবে খাপ খেয়ে যায় যে কোনো বুদ্ধিমান স্রষ্টা ছাড়া তা সম্ভব নয়। এর সঙ্গে ডীইস্‌মের মিল খুব স্পষ্ট। অক্ষয়কুমারও লিখেছেন, ‘জীবের শরীর অতি আশ্চর্য্য শিল্প-কার্য্য। তাহার প্রত্যেক অঙ্গ পরাৎপর পরম শিল্পকরের নিরুপম নৈপুণ্য-পক্ষে নিরন্তর সাক্ষ্যদান করিতেছে।’  ডারউইনের বিবর্তনতত্ত্ব সেই যুক্তিকে নস্যাৎ করে দেয়। বিবর্তনতত্ত্বের পাঠ অক্ষয়কুমারকেও নিঃসন্দেহে প্রভাবিত করেছিল। অক্ষয়কুমার আগে লিখেছিলেন, ‘যে পক্ষী যেরূপ দ্রব্য আহার করে জগদীশ্বর তাহার চঞ্চু তদুপযোগী করিয়া দিয়াছেন।‘ ফিঞ্চ পাখির ঠোঁট সম্পর্কে ডারউইনের বিখ্যাত আলোচনা পড়ে অক্ষয়কুমার নিশ্চয় বুঝেছিলেন যে তাঁর যুক্তি ঘোড়ার আগে গাড়িকে জুড়ছে, প্রকৃতপক্ষে পাখির খাদ্যাভ্যাসই তার চঞ্চুর গঠন নির্ধারণ করেছে। সুগভীর ঈশ্বরবিশ্বাসী ডারউইন তাঁর নিজের তত্ত্বের যুক্তি মেনে অজ্ঞেয়বাদের পথ ধরেছিলেন। অক্ষয়কুমার শেষ জীবনে নিজেকে আস্তিক বেকনের সঙ্গে সঙ্গে নাস্তিক অগুস্ত কোঁতেরও অনুগামী বলে ঘোষণা করেছিলেন। তবে এই প্রসঙ্গে বলে রাখা ভালো যে শেষ বয়সে অক্ষয়কুমারর অজ্ঞেয়বাদী হয়ে গিয়েছিলেন, সেই সিদ্ধান্তের সঙ্গে সবাই একমত নন। অক্ষয়কুমার নিজে সে বিষয়ে তাঁর জীবনীকার মহেন্দ্রনাথ রায়ের প্রশ্নের সরাসরি কোনো উত্তর দেননি।  

অক্ষয়কুমারের অক্ষয় কীর্তি ‘ভারতবর্ষীয় উপাসক সম্প্রদায়’। এই বইয়ের সংক্ষিপ্ত পরিচয় দেওয়াও সীমিত পরিসরের মধ্যে সম্ভব নয়। এটি তাঁর পুরোপুরি মৌলিক রচনা। ভারতের দুই খণ্ডে বিভক্ত বইয়ের দুটি দীর্ঘ উপক্রমণিকা আছে, যেখানে তিনি বেকনের পদ্ধতির প্রয়োগ করে দেখিয়েছেন যে ভারতীয় ষড়দর্শনের অনেকাংশই নিরীশ্বরবাদী। কেন আধুনিক বিজ্ঞানের জন্ম ভারতে হল না তিনি আলোচনা করেছেন। দীর্ঘ আলোচনা না করে বেকনের নামোল্লেখ আছে এমন কয়েকটি অংশ উদ্ধৃত করি।

সাংখ্য দর্শন আলোচনা প্রসঙ্গে তিনি লিখেছেন, ‘সাঙ্খ্য-শাস্ত্রের কোন কোন অংশে সমধিক বুদ্ধির প্রাখর্য্য প্রদর্শিত হইয়াছে তাহার সন্দেহ নাই। কিন্তু এ অংশটি নিতান্ত মনঃকম্পিত এখন একথা বলা বাহুল্য। যে সময়ে, ভূমণ্ডলে বিজ্ঞান-রাজ্যের পথ-প্রদর্শক বেকন্‌ ও কোন্তের জন্ম হয় নাই, সে সময়ে আর অধিক প্রত্যাশা করাই বা কেন?’ অর্থাৎ তিনি পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষা ছাড়া শুধুমাত্র চিন্তার মাধ্যমে সত্যে পৌঁছানোর সম্ভাবনাকে অস্বীকার করছেন।

       কণাদ প্রবর্তিত বৈশেষিক দর্শনে পরমাণুর কথা আছে। সে সম্পর্কে সমধিক শ্রদ্ধা সত্ত্বেও তাঁর আক্ষেপ, ‘... সূত্রপাতেই অবশেষ হইল। অঙ্কুর রোপিত হইল, কিন্তু বর্ধিত, পুষ্পিত ও ফলিত হইল না। উহা সংস্কৃত, পরিবর্দ্ধিত ও বহুলীকৃত করিয়া ফল-পুষ্প-শোভায় সুশোভিত করা ভারতভূমির ভাগ্যে ঘটিল না। কালক্রমে সে সৌভাগ্য বেকন্‌, কোন্ত্‌ ও হম্বোল্‌টের জন্মভূমিতে গিয়া প্রকাশিত ও প্রাদুর্ভূত হইয়া উঠিল। তথাপি আমাদের সুশ্রুত, চরক, আর্য্যভট্টাদির পদ-কমলে বার বার নমস্কার!’

       পরে তিনি লিখেছেন, "... দার্শনিক গ্রন্থকারের অনেকেই সতেজ বুদ্ধির সুপুষ্ট বীজ লইয়া জন্ম গ্রহণ করিয়াছিলেন। যদি তত্ত্বানুসন্ধানের প্রকৃত পথাবলম্বন পূর্ব্বক বিশুদ্ধ বিজ্ঞান-মার্গে বিচরণ করিতে পারিতেন, তবে বহুকাল পূর্বে ভারত-ভূমিও ইয়ুরোপ-ভূমির ন্যায় এ অংশে ভূ-স্বর্গ-পদে অধিরূঢ় হইতেন তাহার সন্দেহ নাই। তাঁহারা বিশ্বের যথার্থ প্রকৃতি ও সেই প্রকৃতি-সিদ্ধ নিয়মাবলী নির্দ্ধারণ পূর্ব্বক কর্ত্তব্যাকর্ত্তব্য-নিরূপণের নিশ্চিত উপায় চেষ্টা না করিয়া কেবল আপনাদের  অনুধ্যান-বলে দুই একটি প্রকৃত মতের সহিত অনেকগুলি মনঃকল্পিত মত উদ্ভাবন করিয়া গিয়াছেন। তাঁহাদের একটি পথ প্রদর্শকের অভাব ছিল। একটি বেকন্‌ – একটি বেকন্‌ – একটি বেকন্‌ তাঁহাদের আবশ্যক হইয়াছিল।"  স্পষ্টতই অক্ষয়কুমার অভিমত প্রকাশ করছেন যে প্রকৃত বিজ্ঞান দর্শনের অভাবেই ভারতে বিজ্ঞানের বিকাশ হতে পারেনি।

অপ্রাসঙ্গিক হলেও অক্ষয়কুমারের একটি উদ্ধৃতি তুলে দেওয়ার লোভ সামলাতে পারছি না। বেকনের প্রয়োজনের কথা বলে তিনি লিখছেন যে সুসজ্জিত সৈন্যদলও দক্ষ সেনাপতির অভাবে ব্যর্থ হয়। ‘একটি রণজিৎ - একটি বোনাপার্ত্‌ – একটি ওয়াশিংটন্‌ আবশ্যক।’ যে তিনজন সেনাপতির নাম করেছেন, একজনও ইংরেজ ছিলেন না; নেপোলিয়ন ও ওয়াশিংটন তো ব্রিটেনের বিরুদ্ধেই লড়াই করেছেন। 

প্রাচীন ভারতীয় দর্শনের মধ্যে নিরীশ্বরবাদের প্রভাবের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন অক্ষয় কুমার। তিনি কৌতুকের সঙ্গে লক্ষ্য করেছেন যে ঈশ্বরকে অস্বীকার করলেও বেদের অভ্রান্ততাকে বিষয়ে অধিকাংশ দর্শন একমত। বেদের অভ্রান্ততা বিষয়ে তাঁর মত আমরা আগে দেখেছি। নিরীশ্বরবাদী সাংখ্য দর্শনের প্রবর্তক কপিল সম্পর্কে তিনি লিখেছেন, ‘চিরকাল হিন্দু-সমাজে বেদের কি অতুল প্রভাব ও দুর্জ্জয় পরাক্রমই চলিয়া আসিয়াছে। কপিল ঈশ্বরের  অস্তিত্ব অক্লেশে অস্বীকার করিলেন, কিন্তু বেদের মহিমা অগ্রাহ্য করিতে পারিলেন না। তিনিও বেদার্থ প্রামাণিক বলিয়া অঙ্গীকার করিয়াছেন।’ পরবর্তীকালে টীকাকাররা বৈশেষিক দর্শনে ঈশ্বরের অস্তিত্বের সাক্ষ্য খোঁজার চেষ্টা করেছেন, সে বিষয়ে তাঁর বক্তব্য, ‘কণাদ ঋষির সেইরূপ বিশ্বাস থাকিলে, সূত্রের মধ্যে ঈশ্বর-প্রসঙ্গ সুস্পষ্ট না লিখিয়া তাহার অন্তর্গত শব্দ-বিশেষের অভ্যন্তর-গুহায় তাহা প্রচ্ছন্ন রাখা কি কোনরূপে সম্ভব হয়?’ সবশেষে তাঁর সিদ্ধান্ত, "প্রথমে কিছু ছিল না, কেবল একমাত্র অদ্বিতীয় পরমেশ্বরই বিদ্যমান ছিলেন, তিনিই পশ্চাৎ সমুদয় জগৎ সৃজন করেন, যাঁহারা কেবল ইহাকেই আস্তিকতাবাদ বলিয়া স্বীকার করিয়াছেন, তাঁহাদের মতে প্রায় সমুদয় ষড়্‌দর্শনকে নাস্তিকতা প্রতিপাদক বলিয়া উল্লেখ করিতে হয়। "

বেকনের দর্শন বিষয়ে পরবর্তীকালে নানা সমালোচনা হয়েছে, তার অধিকাংশই অবশ্য অক্ষয়কুমারের অনেক পরে। সেই সমালোচনা ঠিক না ভুল তা নিয়েও বিতর্ক আছে। এই লেখাতে তার মধ্যে যাওয়ার অবকাশ নেই। বিদ্যাসাগর জেনারেল কমিটি অফ পাবলিক ইন্সট্রাকশনের কাছে চিঠিতে লিখেছিলেন, ‘সাংখ্য ও বেদান্ত যে ভ্রান্তদর্শন, সে সম্বন্ধে এখন আর বিশেষ মতভেদ নেই। তবে ভ্রান্ত হলেও এই দুই দর্শনের প্রতি হিন্দুদের গভীর শ্রদ্ধা আছে। সংস্কৃতে যখন এইগুলি পড়াতেই হবে তখন তার প্রতিষেধক হিসেবে ছাত্রদের ভাল ভাল ইংরেজি দর্শনশাস্ত্রের বই পড়ানো দরকার।’ (অনুবাদ সূত্র, বিনয় ঘোষ, বিদ্যাসাগর ও বাঙালী সমাজ) এর বেশি লেখার তিনি প্রয়োজন বোধ করেন নি। অক্ষয়কুমার কোথায় ভারতীয় দর্শন কানাগলিতে ঢুকে পড়েছে বা উদ্দেশ্যহীন তর্কে সময় নষ্ট করেছে তার বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। এবং এই কাজে তাঁর সহায় হয়েছেন বেকন।

আমাদের দেশে আধুনিক বিজ্ঞানদর্শনের প্রয়োজনীয়তা প্রথম উপলব্ধি করেছিলেন অক্ষয়কুমার, তাঁকেই আমরা ভুলতে বসেছিলাম। আশার কথা দ্বিশতবর্ষে অক্ষয়কুমারকে নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।  
তাঁকে বাঙালি খুব মনে রাখেনি। তাঁর মৃত্যু নিয়ে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও নিরুচ্চার থাকেন। অথচ  বলা হত --- "Akshaykumar is Indianising European Science." অক্ষয়কুমার দত্তর সুযোগ্য পৌত্র সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত 'হোমশিখা ' কাব্যগ্রন্থটি পিতামহকে উৎসর্গ করেন। তিনি এই বলে শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন--

" হে আদর্শ জ্ঞানযোগী ! 
হে জিজ্ঞাসু তব জিজ্ঞাসায় , 
উদ্বোধিত চিত্ত মোর ; 
গরুড় সে জ্ঞান পিপাসায় ।"


তথ্যঋণ : --------

1. অক্ষয়কুমার দত্ত : আঁধার রাতে একলা পথিক- আশীষ লাহিড়ী(2019), দ্বিতীয় সংস্করণ, দেজ পাবলিশিং

2. সেকালের কৃতী বাঙালি-- মন্মথনাথ ঘোষ(2020)

3. সাহিত্য সাধক চরিতমালা (প্রথম খণ্ড)- বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ(2016)

4. History of the Brahmo Samaj-- Shivnath Sastri(1993)

5. মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের আত্মজীবনী

6. বাংলা গদ্যের পদাঙ্ক-- সম্পাদনা: প্রমথনাথ বিশী ও বিজিতকুমার দত্ত(1426)

7. উনিশ শতকের বাংলা সংবাদ ও সাময়িকপত্র- স্বপন বসু(2018)

8. রামকৃষ্ণ ভট্টাচার্য, কামারের এক ঘা, দ্বিতীয় সংস্করণ, ইন্সটিটিউট

9. বিনয় ঘোষ, বিদ্যাসাগর ও বাঙালী সমাজ, ওরিয়েন্ট ব্ল্যাকসোয়ান.

10. ইন্টারনেট ও অন্যান্য। 

                  ------------------------------

Popular posts from this blog

*সংক্ষিপ্ত কালী সংহিতা**.........প্রসূন কাঞ্জিলাল।* সনাতন ধর্মমতে কালী বা কালিকা হচ্ছেন শক্তির দেবী। কাল শব্দটির অর্থ সময় হতে পারে, আবার এটা রঙও বুঝাতে পারে। কাল তথা কৃষ্ণবর্ণ, এর অর্থ হতে পারে মৃত্যুবোধক। যেমন আমরা বলি- ‘কাল’এসে গেছে, মৃত্যুর সময় সমাসন্ন, মহাকাল এসে গেছে। দেবীর নাম মহাকালীও বটে। কালীর নাম কাল না হয়ে কালী হলো এ কারণে যে শিবের অপর নাম কাল, যা অনন্ত সময়কাল বোধক। কালী হচ্ছে কাল-এর স্ত্রীলিঙ্গ বোধক। মা কালী মা দুর্গা বা পার্বতী’র সংহারী রূপ। ঊনবিংশ শতাব্দীর সংস্কৃত ভাষার বিখ্যাত অভিধান শব্দকল্পদ্রুম এ বলা হচ্ছে ‘কাল শিবহ্। তস্য পত্নতি কালী।’ অর্থাৎ শিবই কাল বা কালবোধক। তাঁর পত্নী কালী। কালী হচ্ছেন মা দুর্গার বা পার্বতীর অপর ভয়াল রূপ। তিনি সময়ের, পরিবর্তনের, শক্তির, সংহারের দেবী। তিনি কৃষ্ণবর্ণা বা মেঘবর্ণা এবং ভয়ংকরী। সনাতন ধর্মাবলম্বীরা ভয়ংকরেরও পূজা করেন। তিনি অশুভ শক্তির বিনাশ করেন। তাঁর এই শক্তির পূজা সনাতন সমাজকে প্রভাবিত করেছে, বিশুদ্ধ শক্তি সঞ্চারিত করেছে, অন্তর শুদ্ধি দিয়েছে, দুর্দিনের দুর্বলতায় সাহস দিয়েছে। শাক্ত সৃষ্টিতত্ত্ব মতে এবং শাক্ত-তান্ত্রিক বিশ্বাস মতে তিনিই পরম ব্রহ্ম। কালীকে এই সংহারী রূপের পরেও আমরা মাতা সম্বোধন করি। তিনি সন্তানের কল্যাণ চান, তিনি মঙ্গলময়ী, তিনি কল্যাণী--- এটাই তাঁর প্রতি সনাতন ধর্মীয় বিশ্বাসের মূল আস্থা ও নির্যাস। একটা ধারণা আমাদের মধ্যে বর্তমান আছে যে, শিব পার্বতীর স্বামী এবং মা কালীর ভাসুর। কথাটি আদৌ সত্য নয়। অসুররক্ত স্নাত কোপান্বিতা এই দেবীর সংহারী মূর্তিতে কিছুটা নিবৃত্ত ও প্রশমিত করতে শিব তাঁর চলার পথে শুয়ে থাকলেন। দেবী পথ চলতে গিয়ে তাঁর স্বামী শিবকে পায়ে মাড়ালেন। এই পাদস্পৃষ্ঠতার লজ্জায় ও তার অনুশোচনায় মায়ের জিহ্বায় কামড় পড়লো। তাঁর কোপভাব স্থিমিত হলো, ছেদ পড়লো।কালীকে যদি বলি কল্পনা, তবে সেই কল্পনাও ধর্মে বর্ণিত হয়েছে বর্তমান বিজ্ঞানের ধারণার হাজার হাজার বছর আগে। এ কথা বিজ্ঞান প্রথমতঃ স্বীকার করে যে, সৃষ্টির আদি যুগে অনন্ত ব্রহ্মা- ছিল নিকষ কালো অন্ধকারে নিমজ্জিত, নিশ্ছিদ্র তমসায় আবৃত, অনন্ত সৃষ্টিতে তখনো আলোর সৃষ্টি হয়নি। রবি শশী তারা বা কোন আলোকবর্তিকা তখনো ছিলনা। বিজ্ঞান মতে আলোর সৃষ্টির আগে অন্ধকার ছিল। এ বর্ণনায় কান পেতে শুনলে আমরা দেখি কৃষ্ণবর্ণা মা কালী সেই যুগের প্রতিনিধিত্ব করছেন। ধর্ম ও বিজ্ঞানের এখানে অপূর্ব সমন্বয় ঘটেছে। দ্বিতীয়তঃ বিজ্ঞানের ‘বিগ্ ব্যাংগ্ তত্ত্ব’ মতে কাল বা সময় তখন সবে মাত্র সৃষ্টি হয়েছে, কাল্ বা সময় যখন সৃষ্টি হলো তথা যে দিন ভূমিষ্ঠ হলো, সেদিন নির্ধারিত হলো সেই কালেরও শেষ আছে, সংহার আছে। বিশ্ব ব্রহ্মা- সৃষ্টি যখন হয়েছে সময় এলে তা ধ্বংসও হবে। তার লয়ও অবশ্যম্ভাবী। কালী এই সংহারের প্রতিভূ, তিনি কাল এর জীবন্তকালের সীমারেখার নির্ধারণকৃত। তৃতীয়তঃ বিজ্ঞানীরা সৃষ্টির প্রথম যুগের মহাবিশ্বের যে বর্ণনা দেন তা ভয়াল ভীষণ, তার মধ্যে সৃষ্টির চাইতে ধ্বংসই বেশী। প্রবল সংহারের মধ্যে দিয়ে অনন্ত ব্রহ্মার সৃষ্টি। মা কালী সেই সংহারের প্রতিভূ তিনি ভয়াল দর্শনা সংহারের দেবী। সৃষ্টির সেই ক্রমবিকাশের যুগেই মা কালী মা জগজ্জননী প্রবল সংহারের মধ্যে দিয়েই তাঁর সৃষ্টি ও তাঁর কল্যাণময় রূপকে আমাদের কাছে তুলে ধরেছেন। মা কালী যুগপৎ কাল, কৃষ্ণবর্ণ এবং সংহারের দেবী। কিছুই ছিল না, তখন দেবী ছিলেন। এই মাতৃপূজা তথা মাতৃমূর্তি হিন্দুধর্মের আদিকথা।অথর্ব বেদ-এ কালীর উল্লেখ থাকলেও বিশেষ হিসেবে কথক গ্রাহ্য সূত্রে (১৯.৭) প্রথমবার কালীর উল্লেখ ঘটে। কালী অগ্নিদেবের সাতটি জিহ্বার একটি নাম, অগ্নিদেব হচ্ছেন আগুনের ঋগ্বেদীয় দেবতা যার উপস্থিতি মুণ্ডুক উপনিষদে বর্তমান; তবে এখানে কালী বলতে দেবী কালীকেই উল্লেখ করা হয়েছে এটা নির্ণীত করা কঠিন। কালী’র বর্তমান রূপের উপস্থিতি আমরা পাই মহাভারতের সুপ্তিকা পার্বণে, যেখানে তিনি কালরাত্রি হিসেবে অভিহিতা, যিনি পাণ্ডব সৈন্যদের স্বপ্নে দৃশ্যমান এবং পরে দ্রোণাচার্য পুত্র অশ্বত্থামা যখন তাদের আক্রমণ করলেন তখন তিনি প্রকৃত স্বরূপে আবির্ভূতা। মহাদেবী’র একটি শক্তি হিসেবে তিনি ষষ্ঠ শতাব্দীর ‘দেবী মাহাত্ম্যম’এ প্রসিদ্ধ, এবং ‘রক্তবীজ’ নামক অসুরকে পরাভূতকারী দেবী হিসেবে গুরুত্ব সহকারে উল্লেখিত। রক্তবীজকে নিশ্চিহ্ন করতে দেবী নরসিংহী, বৈষ্ণবী, কুমারী, মহেশ্বরী, ব্রাহ্মী, বরাহী, ঐন্দ্রী, চামু- বা কালী এই অষ্ট-মাতৃকা রূপে সংস্থিতা। দশম শতাব্দীর ‘কালিকা পুরাণে’ পরম সত্য হিসেবে কালীকে স্তুতি করা হয়। তবে ভিন্ন ও স্বতন্ত্র এক দেবী হিসেবে ষষ্ঠ শতাব্দীতে কালী প্রথম উল্লেখিতা। এবং এ সকল তন্ত্রে গ্রন্থে তিনি বহির্বৃত্তে বা প্রান্তিক সীমায় বা যুদ্ধ ক্ষেত্রে স্থিতা বা দণ্ডায়মানা দেবী। অধিকাংশ ক্ষেত্রে তিনি শিবের শক্তিরূপে চিহ্নিতা, এবং বিবিধ পুরাণে শিবের উপস্থিতির সঙ্গে তিনি ওতপ্রোতভাবে সম্পৃক্তা। কালিকা পুরাণে তাঁকে বলা হচ্ছে ‘আদি শক্তি’, তিনি প্রকৃতির সীমার বাইরেও অধিষ্ঠাত্রী ‘পরা প্রকৃতি’।১৬৯৯ শকাব্দে (১৭৭৭ খ্রীষ্টাব্দে) কাশীনাথ বিরচিত ‘শ্যামাসপর্যায়বিধি-তে এ পূজার সর্বপ্রথম উল্লেখ লক্ষণীয়। পূজার প্রমাণস্বরূপ এ গ্রন্থে পুরাণ ও তন্ত্রের বচন উল্লেখিত। সপ্তদশ শতাব্দীতে বলরাম বিরচিত কালিকা মঙ্গলকাব্যে একটি বাৎসরিক ধর্মীয় অনুষ্ঠান কালীকে নিবেদিত এই মর্মে উল্লেখিত। অষ্টাদশ শতাব্দীতে নবদ্বীপের রাজা কৃষ্ণচন্দ্র বাংলায় প্রথম কালীপূজার প্রবর্তন করেন। ঊনবিংশ শতাব্দীতে কালীপূজা বাংলায় বিশেষ প্রাধান্য লাভ করে। রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের পৌত্র ঈশানচন্দ্র এবং কলকাতার সমাজের বিত্তবান ও উচ্চশ্রেণীর লোকজনের মধ্যে এ পূজার প্রচলন বৃদ্ধি পায়। ক্রমে দুর্গা পূজার সাথে সাথে কালী পূজাও বিশেষত বাংলায় একটি প্রধান হিন্দু ধর্মীয় উৎসবে পরিণত হয়। পরে এবিষয়ে বিস্তারিত আলোচনায় আসা যাবে।শিবের উপর দণ্ডায়মানা কেন, তার তিনটি ব্যাখ্যা বর্তমান এর একটি প্রচলিত কাহিনী, একটি পৌরাণিক, অন্যটি তান্ত্রিক ব্যাখ্যা। এটা বলা হয়ে থাকে যে শক্তি ছাড়া শিব হচ্ছে শব। শিবের উপর দন্ডায়মানা কালী এটাই বুঝায় যে শক্তি বাদ দিলে বস্তু মৃতমাত্র। পৌরাণিক ব্যাখ্যা মতে, পার্বতী একদিন স্বামীকে প্রশ্ন করলেন তার দশটি রূপের মধ্যে কোনটি শিবের পছন্দ ? বিস্মিত পার্বতী শুনলেন, কালীর ভয়াল মূর্ত্তিতেই শিবের সাচ্ছন্দ্য। এই ধারণাটি দেবী ভাগবত পুরাণে ব্যাখ্যা করা আছে। দ্বাদশ থেকে পঞ্চদশ শতাব্দীর ভক্তিমূলক শ্যামাসঙ্গীতেও মায়ের বর্তমান রূপের এই ধারণাটি গুরুত্ব পেয়েছে। তান্ত্রিক পদ্ধতিতে তাঁর ভয়াল রূপ সত্ত্বেও রাত দুপুরে শ্মশানে তাঁর মুখোমুখি হওয়ার সাহস অর্জন এবং অন্যদিকে তাঁর প্রতি বাঙালিদের শিশুর মতো শর্তহীন ভালবাসা উভয় ক্ষেত্রে মৃত্যুর সঙ্গে পরিচিত হওয়া ও তাকে মেনে নেওয়াই মুখ্য কাজ।দুর্গার মতো কালীও সাধারণ সর্বজনীন হিসেবে বিবেচিত। সবচেয়ে সরাসরি বহুল ভাবে তিনি পূজিতা হন মহাকালী বা ভদ্রকালী রূপে। আদি পরাপ্রকৃতি (দেবী দুর্গা) অথবা ভাগ্যবতীর দশমহাবিদ্যা রূপের একটি রূপে কালী পূজিতা হন। দেবী বন্দনার এই স্তোত্রকে বলা হয় দেবী অর্গলা স্তোত্রম্ যা নিম্নরূপঃ'‘ওঁ জয় ত্বং দেবী চামুণ্ডে জয় ভূত অপহারিণি।জয় সর্বগতে দেবী কালরাত্রি নমোহস্তুতে।। ১জয়ন্তী মঙ্গলা কালী ভদ্রকালী কপালিনী।দুর্গা শিবা ক্ষমা ধাত্রী স্বাহা স্বধা নমোহস্তুতে।। ২’'আবার 'শ্রী শ্রী চন্ডী'-র একাদশ অধ্যায় তথা উত্তর-চরিত্র, 'নারায়ণীস্তুতি'-র দশম শ্লোক অনুযায়ী,"সর্বমঙ্গলা মঙ্গল্যে শিবে সর্বার্থসাধিকে। শরণ্যে ত্র্যম্বকে গৌরী নারায়নী নমহোস্তুতে।।১০"যা উপরে বর্ণিত একই ব্যঞ্জনার দ্যোতক।মধ্যযুগের শেষের দিকে বাঙালীর ভক্তিমূলক সাহিত্যে কালী ব্যাপক স্থান নিয়ে বিরাজমান। সাধক রামপ্রসাদ সেন(১৭১৮-১৭৭৫) এর মতো কালীভক্ত উপাসকরা কালীকে নিয়ে রচনা করেছেন অসংখ্য ভক্তিমূলক গান। অথচ শিবপত্নী হিসেবে পার্বতীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হয়ে নানা কাহিনীতে উচ্চারিত হওয়া ছাড়া কালীকে অষ্টাদশ শতাব্দীর আগে বাঙালীর ঘরে ঘরে আবাহনী গেয়ে পূজিত হতে কদাচিৎ দেখা গেছে। আর বাঙালির ঘরে তাঁর ভয়াল রূপের বর্ণনা, বৈশিষ্ট, অভ্যাসসমূহ উল্লেখযোগ্য কোন রূপান্তর ঘটেনি। বাংলাদেশে অনেক কালী মন্দির আছে। এর অনেকগুলোই সুপ্রাচীন। অধুনা লুপ্ত ঢাকার রমনা কালী মন্দির তেমনি একটি পুরাতন কালী মন্দির। ব্রহ্মযামলে উল্লেখ আছে ‘কালিকা বঙ্গদেশে চ’, অর্থাৎ, ‘বঙ্গদেশে দেবী কালিকা বা কালী নামে পূজিতা হন।’ নানা রূপে নানা স্থানে কালী পূজিতা হন, যেমন দক্ষিণাকালী, শ্মশানকালী, ভদ্রকালী, রক্ষাকালী গুহ্যকালী, মহাকালী, চামুণ্ডা ইত্যাদি নামে মাহাত্ম্যে এ কালীর মধ্যে কিছু কিছু ভিন্নতা বর্তমান। অন্যদিকে বিভিন্ন মন্দিরে দশমহাবিদ্যা ব্রহ্মময়ী, ভবতারিণী, আনন্দময়ী, করুণাময়ী ইত্যাদি নামে কালী’র পূজা হয়। চট্টগ্রাম শহরের চট্টেশ্বরী শ্রী কালীবাড়ী, গোলপাহাড় শ্মশান কালীবাড়ী, দেওয়ানহাটের দেওয়ানেশ্বরী কালীবাড়ী,সদরঘাট কালীবাড়ী, পটিয়া পিঙ্গলা কালীবাড়ী, ধলঘাট বুড়াকালীবাড়ী সহ চট্টগ্রামে অনেক প্রসিদ্ধ কালী মন্দির বর্তমান। এছাড়াও আসামের কামরূপ কামাখ্যা দেবীর পূজাও বিশেষ প্রসিদ্ধ। এর প্রায় প্রত্যেকটিতে প্রত্যেক শনি ও মঙ্গলবার এবং অমাবস্যায় কালীপূজা হয়। কার্ত্তিক মাসের অমাবস্যা তিথিতে দীপান্বিতার দিন কালীপূজা বিশেষভাবে পালিত হয়।সর্বজনীন মণ্ডপে যেখানে দুর্গাপূজা হয় সেখানে অধিকাংশ মণ্ডপে কালীপূজাও হয়ে থাকে। অনেক কালীসাধক বিখ্যাত এবং শ্রদ্ধার্হ। শ্রীরামকৃষ্ণ কালীর উপাসক ছিলেন। স্বামী বিবেকানন্দও কালীর ভক্ত ছিলেন। কালী প্রশস্তিমূলক গান তথা শ্যামাসঙ্গীত বাংলা গানের একটি ভিন্ন ধারা। কালীসাধক রাম প্রসাদ সেন, কমলাকান্ত ভট্টাচার্য এ ধারায় অন্যতম অবদান রাখেন। দ্বিজেন্দ্রলাল রায় এবং কাজী নজরুল ইসলামও এ ধারার উৎকৃষ্ট মানের গান রেখে গেছেন। নিরক্ষর শ্রীরামকৃষ্ণ দেবী কালী সচেতনতায় সিক্ত হয়ে অনবদ্য বাণী উচ্চারণ করতেন যা শ্রী'ম রচিত অমর গ্রন্থ ‘রামকৃষ্ণ কথামৃত’তে স্থান পেয়েছে। ‘মৃত্যুরূপা কালী’, দেবী কালীকে নিয়ে আছে স্বামী বিবেকানন্দ রচিত একটি বিখ্যাত সুদীর্ঘ কবিতা। ভগিনী নিবেদিতা মাতৃরূপা কালী নামক একটি কালী বিষয়ক গ্রন্থ রচনা করেছিলেন।দীপাবলী বা দীপান্বিতা বা কার্ত্তিকী অমাবস্যায় অনুষ্ঠিত কালীপূজা উপলক্ষে দেবী মূর্তির দক্ষিণা কালীর অবয়বে তৈরী হয়, এক্ষেত্রে দেবী বৈশিষ্ট হচ্ছে দেবী করালবদনা, কৃষ্ণবর্ণা, নীলবর্ণা বা মহামেঘবর্ণা। দেবী আলুলায়িত কেশা। রামপ্রসাদী গানে ভক্তিভরে মাকে বলা হচ্ছে,‘…এলোকেশী সর্বনাশী..’,মা এলোকেশী, রক্তচক্ষু, লোল জিহ্বা, চতুর্ভূজা, নৃমুণ্ড-মালিনী,, নরহস্তের কোমরবন্ধ, বাম ঊর্ধ্ব করে উন্মুক্ত খড়্গ এবং অধো হস্তে নরমুণ্ড, দক্ষিণ করদ্বয়ে বর ও অভয়মুদ্রা। দক্ষিণা কালীর দক্ষিণ পা শিববক্ষে স্পর্শমান, বাম পা খানিকটা দূরত্বে। স্বামীর গায়ে পা পড়ায় অসুর-রক্ত পানে সিক্ত জিহ্বায় কামড়। ত্রিনয়নী মা অসুর হত্যার মহাঘোরে হাস্যরতা ও ভয়াল দর্শনা। মায়ের গলায় নৃমুণ্ড মালায় সাধারণত ১০৮টি অথবা ৫১ টি নরমুণ্ড বর্তমান। ১০৮ হিন্দুদের জন্য একটি পবিত্র সংখ্যা, দেবনাগরী বর্ণমালায় সর্বসমেত ৫১টি বর্ণ আছে। হিন্দুদের বিশ্বাস সংস্কৃত একটি চলমান জীবন্ত ভাষা এবং এর ৫১ টি বর্ণমালায় অপার শক্তি নিহিত আছে।মায়ের কোন চিরস্থায়ী গুণ বা প্রকৃতি নেই, যার মানে দাঁড়ায় বিশ্ব-প্রকৃতি ধ্বংসের পরেও তিনি বর্তমান থাকবেন। হিন্দু শাস্ত্রে পূজিতা দেবীদের মধ্যে কালীর রূপ ও চরিত্র সর্বাধিক রোমাঞ্চকর ও বিস্ময় উদ্রেককারী। ঘোর অমাবস্যার গভীর রাতে তাঁর পূজা সম্পন্ন হয়। কালী ভীষণ দর্শনা, ক্রোধান্বিতা, লজ্জাহীনা। কালী ভয়ঙ্কর যোদ্ধা, রক্তপিয়াসী। কালী চির ব্যতিক্রমী। ঐশী সংযোগ সত্ত্বেও এক দীর্ঘকালীন উপেক্ষার আখ্যান। তবে দুর্বল, দ্বিধান্বিত মন যখনই শক্তি প্রার্থনা করেছে, বল ভিক্ষা করেছে, ওই করাল বদনা মহাতেজার শরনাপন্ন হয়েছে। ঘোর আমানিশায় জনমানবহীন মধ্যরাতের নিভৃত পূজাতেই ছিল তাঁর অধিকার। কোনো ক্ষেত্রে সূর্যের আলো স্পর্শ ও ছিল নিষিদ্ধ। হাজার বছরের বিমুখতা অতিক্রম করে আজকের দীপাবলী উৎসবে যথেষ্ট ধূমধাম সহযোগে তাঁর উপাসনা হয়ে থাকে। তবে বাঙালীর উৎসবমুখীতাই যে এই পূজার জনপ্রিয়তার অংশত কারণ তাতে সন্দেহের অবকাশ নেই। কারণ বহু ধুমধাম সহযোগে সম্বৎসরের এই মাতৃ আরাধনা তথা শক্তি পূজা আমাদের সমাজে নারীর অবস্থান ও গ্রহণযোগ্যতাকে বিন্দু মাত্র প্রভাবিত করে না। বর্তমান সময়ের দীপান্বিতা উৎসব যদি মোহনা হয়, তবে এই তরঙ্গিনীর উৎস সম্পর্কে আগ্রহ স্বাভাবিক। এই অনুসন্ধান সহজ নয়। কালের প্রবাহে উপনদীর মতো অসংখ্য উপগাথা এসে মিশে গেছে মূল তথ্যে - আজ তাদের পৃথক করা বেশ কঠিন কাজ। অনেক সময়ই অসম্ভব। তবে প্রতিটি অংশই অতীব চিত্তাকর্ষক তাতে সন্দেহ নেই। পুরান তথা বিভিন্ন সাহিত্য থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী কালীর বর্তমান রূপ পরিগ্রহে সময় লেগেছে অন্তত দুই হাজার বছর। কালীর বৈদিক পরিচয় অথর্ব বেদের সুত্রে। এই বেদে প্রথম কালীর স্বরূপ প্রকাশিত হয়। তবে মার্কণ্ডেয় পুরাণ, কালিকা পুরাণ ইত্যাদিতেও কালীর উল্ল্যেখ পাওয়া যায়। মহাভারতের সৌপ্তিক পর্বে কালরাত্রি নাম্নী এক দেবীর বর্ণনা পাই। এই দেবী কালিকারই অন্য রূপ বলে উল্লিখিত হয়ে থাকে। উৎস খুঁজতে গিয়ে দেবী কালীর প্রথম পর্যায়ের সাথে অনার্য সম্বন্ধের সম্ভাবনা জোরালো ভাবে উঠে আসে। হরপ্পা - মহেঞ্জদরো সভ্যতায় মাতৃ পূজা প্রচলিত ছিল বলে জানা যায়। এই সভ্যতা ছিল মাতৃতান্ত্রিক। পূজিতা এই দেবীর সাথে দেবী কালিকার প্রভূত সাদৃশ্য পাওয়া যায়। আবার কেউ কেউ কালীকে আদিবাসি সম্প্রদায়ের দেবী রূপেও বর্ণনা করে থাকেন। সপ্তম - অষ্টম দশকের কিছু লেখায় এর উল্ল্যেখ আছে তবে ঈষৎ ভিন্ন ভাবে। যেমন বান ভট্টের নাটক কাদম্বরীতে দেবী চণ্ডীর উপাখ্যান পাওয়া যায়। ইনি শবর জাতির দ্বারা পূজিতা হতেন। সমকালীন কবি বাকপতি বিরচিত " গৌড় বহও " নামক প্রাকৃত ভাষায় রচিত কাব্য গ্রন্থে বিন্ধ্যবাসিনি নামে এক দেবীর কথা আছে যিনি ছিলেন শবরদের আরাধ্যা। তাঁর সাথে ও কালীর বিশেষ মিল পাওয়া যায়। মূল বর্ণনা অনুযায়ী এই দেবী ভীষণ দর্শনা, মুণ্ডমালিনী, প্রায় নগ্ন এক মূর্তি। খ্রিস্ট পূর্ব ৩০০ থেকে প্রায় ৬০০ খ্রিস্টাব্দ অবধি কালী মূলত যুদ্ধের দেবী রূপে পূজিতা হতেন। বৈদিক দেবী হলেও তৎকালীন সময়ে সনাতন হিন্দু ধর্মের মূল স্রোতে তিনি কিছুটা ব্রাত্যই ছিলেন। কালীর আরাধনা বিশেষত নিম্ন বর্ণ বা অবৈদিক সমাজেই বিশেষ জনপ্রিয় ছিল। নগরের বাইরে শ্মশানের কাছাকাছি অঞ্চলেই কালী মন্দিরের অবস্থান বেশি পরিলক্ষিত হয়। তবে ষষ্ঠ শতকের 'দেবী মাহাত্মম' রচনায় মহাকালী রূপে কালীর রূপ ও মাহাত্ম্যের বিস্তৃত বর্ণনা পাই। অশুভ বিনাশ করে ইনি শুভ শক্তির প্রতিষ্ঠা করেন। দেবী দুর্গার ললাট উৎপন্না মহা শক্তিশালিনী দেবী রূপে তিনি স্বীকৃতি পান। আবার স্বামী অভেদানন্দের মতে বৈদিক দেবী 'রাত্রি' পরবর্তীতে দেবি কালিকা হয়ে ওঠেন। তবে তন্ত্র সাধনার সাথে সুনিবিড় যোগাযোগ এক সুদীর্ঘ সময় কালীকে সাধারন মানুষের থেকে দূরে সরিয়ে রাখে। এক ভয় মিশ্রিত শ্রদ্ধা এর কারণ হয়তো। তবে পরবর্তীতে এই সম্পর্ক ধীরে ধীরে সহজ হয়। সতেরোশ খ্রিস্টাব্দ-উত্তর সময়ে কালী সাধনা এক অন্য রূপ পায়। ভয়াল ভয়ঙ্কর রক্ত পিপাসু দেবী, স্নেহময়ী মা হয়ে ওঠেন। সাধক রাম প্রসাদ, সাধক বামাখ্যাপা তথা শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংস দেবের ন্যায় কালী উপাসকেরা দেবী কালিকার ভবতারিণী মাতৃ রূপ পূজা প্রচার করেন। ক্রমশ এই রূপ সাধারন বাঙালী মনের কাছাকাছি আসে । বাঙালী হৃদয় আসনে তখন থেকেই তাঁর করুনাঘন অবস্থান।ব্রিটিশ শাসিত বাংলা তথা ভারতে কালী উপাসনা বিশেষ তাৎপর্য পূর্ণ হয়ে উঠেছিল। পরাধীন জাতির অন্তরের ক্ষোভ আর প্রতিবাদের উচ্চারণ কালীর দৃপ্ত ব্যক্তিত্বকে অনুসরন করতে চাইত। সশস্ত্র স্বাধীনতা সংগ্রামের অংশ হিসেবে শক্তি আরাধনা তথা কালী উপাসনার প্রচলনের বহু প্রমান পাওয়া যায়। কালীর তেজোময়ী, লড়াকু ভাবময়তা তৎকালীন বিপ্লবীদের মধ্যে যথেষ্ট জনপ্রিয়তা অর্জন করে। প্রখর নারী সত্ত্বা, যা ছিল উপেক্ষিত, বিপর্যয়ের ক্ষণে তা দৈবী স্বরূপে স্বীকৃত হয়। অপর কারণটি ছিল কালী সম্পর্কে শাসক জাতির অবহেলা মিশ্রিত আতঙ্ক ও ভয়। এই উগ্র ভয়াল প্রায় নগ্ন রূপ ব্রিটিশ মানসিকতাকে সজোরে আঘাত করে। রক্তপিপাসু এবং যৌনতার প্রতীক রূপেই কালীর পরিচয় হয়। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, শ্রীমৎ দক্ষিণাকালিকার ধ্যান মণ্ত্রে সর্বশেষ পঙ্ক্তির আগের পঙ্ক্তির অংশ বিশেষ ---".... মহাকালেন চ সমং বিপরীতরতাতুরাম ।।"অর্থাৎ, দেবী বিপরীত-রতাতুরা -- দেবীর ভৈরব মহাকাল। মহাকালের সাথে দেবী বিপরীত রতিতে সঙ্গতা হয়ে রয়েছেন। ( রতিকালে শায়িত পুরুষোপরি নারী আরোহণ করে ক্রীয়া নিষ্পন্ন করলে তাকে বিপরীত রতি বলে )। এক্ষেত্রে, ব্রক্ষ্মচৈতণ্যকে অধিষ্ঠান করে মায়াশক্তিরূপিণী কালী জগত সৃষ্টি করে চলেছেন। আর এখানেই প্রচ্ছন্ন ভাবে লুকিয়ে আছে যৌনতা ও সৃষ্টির পারস্পরিক মেলবন্ধন।কালীকে নিয়ে অবজ্ঞা ভাব তখনকার বহু বিদেশী বিদ্বদজনের মধ্যেও দেখা যায়। এমনকি পণ্ডিত ম্যাক্সমুলার ও কালীকে নিয়ে বিশেষ আগ্রহ দেখান নি। তবে পরবর্তীতে বিশেষত উনিশশো ষাট ও সত্তরের দশকে কালীর এই ব্যতিক্রমী স্ত্রী সত্ত্বা বহু গবেষণার মূল বিষয় হয়ে ওঠে। কালী শব্দের ব্যুৎপত্তি ও অর্থ সম্পর্কিত প্রচলিত ধারনা সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত উল্ল্যেখ ব্যতিরেকে এই আলোচনা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। কু ধাতুর উত্তরে অল্ + কর্তৃবাচ্যে অন্ যুক্ত হয়ে কাল পদটি হয়। এর অর্থ হলো মৃত্যু বা মহাকাল অর্থাৎ মহাদেব। এই কাল শব্দের উত্তরে স্ত্রীলিঙ্গে ঈপ্ প্রত্যয় যুক্ত হয় কালী শব্দটির সৃষ্টি হয়েছে। অর্থ হলো মহাকালের বিশেষ শক্তি কালী। দশমহাবিদ্যার ইনিই প্রথম মহাবিদ্যা। অনন্তকালের সৃষ্টিরুপিণী পরমা প্রকৃতির রূপ এই মহাশক্তি কালী। শ্রী শ্রী চণ্ডী মতে কালী তিনি, যিনি 'কাল' নিয়ন্ত্রন করেন। 'কাল' অর্থে সময়। বেদ তত্ত্ব অনুসারে তিনি আদি শক্তি - মহাকাল শিবের অর্ধাঙ্গিনী! শক্তি উপাসনা এ ক্ষেত্রে অনেকাংশেই পুরুষ তথা শিব নির্ভর। তবে তন্ত্র মতে কালীর দৈবী সত্ত্বা বহুলাংশে স্বাধীন ও একক। এই মতবাদ অনুযায়ী কালী শব্দের মধ্যে 'কল' ধাতু আছে। কল্ ধাতুর ভাবগত অর্থ হলো গণনা, গতি, আশ্রয়, শব্দ, সংখ্যা ! তাই কালী শব্দের তাৎপর্য হলো সংখ্যায়নী গতি সম্পন্না যিনি। শিবের বুকের উপর দণ্ডায়মান কালী - এটা সৃষ্টি তত্ত্বের প্রথমিক পর্যায়ের ইঙ্গিতবাহী। সাংখ্য দর্শন বলে পুরুষ অক্রিয় , প্রকৃতির সংস্পর্শে তিনি সক্রিয় হয়ে ওঠেন। তাই পুরুষ শিব এখানে শব রূপে শায়িত। বস্তুবাদী এই দর্শন অনুসারে পুরুষ স্থানু বা স্থির ধর্মী , প্রকান্তরে তীব্র ধনাত্মক শক্তি। আর নারী চরিষ্ণু বা ঋণাত্মক। এই দুই বিপরীতধর্মী শক্তির পারস্পরিক মিলনে সৃষ্টির সূচনা। আর তারই প্রতীক নিস্ক্রিয় শিবের বুকে চঞ্চলা কালীর পদ চারণা! মধ্যযুগীয় তন্ত্র মতোবাদের প্রসারে এই সাংখ্য দর্শনের যথেষ্ট প্রভাব দেখা যায়।কালী নারী সত্ত্বার এমন এক রূপ যা স্বয়ংসম্পূর্ণ, প্রচলিত স্ত্রী ভাবনার পরিপন্থী, অনন্য। তাঁর দৈবী ভাবমূর্তি বিতর্কিত ও বটে। কারণ কালী পৃথক - লোল জিহ্বা, উন্মুক্ত স্তন, নগ্ন জঙ্ঘা অথচ অনায়াস সাবলীল ভঙ্গিমায় এক ব্যতিক্রমী চরিত্র। আবহমান কাল ধরেই ভক্তি মার্গে তাঁর আসনে উপেক্ষার ছায়া। তাঁর রণরঙ্গিণী রক্ত লোলুপ নির্লজ্জ রূপে তথা কথিত সভ্য মন সদা বিব্রত - সে একাল হোক বা সেকাল। বেদ ও পুরানের অকুণ্ঠ সমর্থন সত্ত্বেও তাঁর ঐশী অস্তিত্বের সামগ্রিক গ্রহনীয়তা দীর্ঘসময় ধরে ছিল অবহেলিত। এখানে এও এক লড়াইয়ের কাহিনি--- আপস না করার লড়াই। অতি প্রাচীনকাল থেকেই কালী আধুনিক। তাঁর বলিষ্ঠ ব্যক্তিত্বকে কখনই আরোপিত মনে হয় না। যুদ্ধ ক্ষেত্রে প্রবল পরাক্রমে অসুর নিধন তাকে কখনই অসহজ করে তোলে না। এই স্বাচ্ছন্দ্যই হয়তো নারী ক্ষমতায়নের প্রথম সোপান।শ্রীশ্রী মা কালীর নাম উৎপত্তি ও রূপভেদ:--- ব্রহ্মযামল নামক তন্ত্রগ্রন্থের মতে, কালী বঙ্গদেশের অধিষ্ঠাত্রী দেবী। ‘কালী’ শব্দটি ‘কাল’ শব্দের স্ত্রীলিঙ্গ। এই শব্দের অর্থ ‘কৃষ্ণ’ (কালো) বা ‘ঘোর বর্ণ’। মহাকাব্য মহাভারত-এ যে ভদ্রকালীর উল্লেখ আছে, তা দেবী দুর্গারই একটি রূপ। মহাভারত-এ ‘কালরাত্রি’ বা ‘কালী’ নামে আরও এক দেবীর উল্লেখ পাওয়া যায়। ইনি যুদ্ধে নিহত যোদ্ধৃবর্গ ও পশুদের আত্মা বহন করেন। আবার হরিবংশ গ্রন্থে কালী নামে এক দানবীর উল্লেখ পাওয়া যায়। ‘কাল’ শব্দের দুটি অর্থ রয়েছে: ‘নির্ধারিত সময়’ ও ‘মৃত্যু’। কিন্তু দেবী প্রসঙ্গে এই শব্দের মানে "সময়ের থেকে উচ্চতর"। সমোচ্চারিত শব্দ ‘কালো’র সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক না থাকলেও, সংস্কৃত সাহিত্যের বিশিষ্ট গবেষক টমাস কবার্নের মতে, ‘কালী’ শব্দটি ‘কৃষ্ণবর্ণ’ বোঝানোর জন্যও ব্যবহৃত হতে পারে।★ রূপভেদ- তন্ত্র পুরাণে দেবী কালীর একাধিক রূপভেদের উল্লেখ পাওয়া যায়। তোড়লতন্ত্র অনুসারে, কালী আট প্রকার। যথা: দক্ষিণকালিকা, সিদ্ধকালিকা, গুহ্যকালিকা, শ্রীকালিকা, ভদ্রকালী, চামুণ্ডাকালিকা, শ্মশানকালিকা ও মহাকালী। মহাকাল সংহিতার অনুস্মৃতিপ্রকরণে নয় প্রকার কালীর উল্লেখ পাওয়া যায়। যথা: দক্ষিণাকালী, ভদ্রকালী, শ্মশানকালী, কালকালী, গুহ্যকালী, কামকলাকালী, ধণকালিকা, সিদ্ধিকালী, চণ্ডিকালিকা। শ্রী অভিনব গুপ্তের তন্ত্রালোক ও তন্ত্রসার গ্রন্থদ্বয়ে কালীর ১৩টি রূপের উল্লেখ আছে। যথা: সৃষ্টিকালী, স্থিতিকালী, সংহারকালী, রক্তকালী, যমকালী, মৃত্যুকালী, রুদ্রকালী, পরমার্ককালী, মার্তণ্ডকালী, কালাগ্নিরুদ্রকালী, মহাকালী, মহাভৈরবঘোর ও চণ্ডকালী। জয়দ্রথ যামল গ্রন্থে কালীর যে রূপগুলির নাম পাওয়া যায়, সেগুলি হল: ডম্বরকালী, রক্ষাকালী, ইন্দীবরকালিকা, ধনদকালিকা, রমণীকালিকা, ঈশানকালিকা, জীবকালী, বীর্যকালী, প্রজ্ঞাকালী ও সপ্তার্নকালী। নিম্নে মা কালীর মূল রূপগুলির (অষ্টধা কালী) ব্যাখ্যা দেবার চেষ্টা করলাম।● দক্ষিণাকালী- দক্ষিণাকালী হলো কালীর সর্বাপেক্ষা প্রসিদ্ধ মূর্তি। ইনি প্রচলিত ভাষায় শ্যামাকালী নামেও আখ্যাতা। দক্ষিণাকালী করালবদনা, ঘোরা, মুক্তকেশী, চতুর্ভূজা এবং মুণ্ডমালাবিভূষিতা। তাঁর বামকরযুগলে সদ্যছিন্ন নরমুণ্ড ও খড়্গ; দক্ষিণকরযুলে বর ও অভয় মুদ্রা। তাঁর গাত্রবর্ণ মহামেঘের ন্যায়; তিনি দিগম্বরী। তাঁর গলায় মুণ্ডমালার হার; কর্ণে দুই ভয়ানক শবরূপী কর্ণাবতংস; কটিদেশে নরহস্তের কটিবাস। তাঁর দন্ত ভয়ানক; তাঁর স্তনযুগল উন্নত; তিনি ত্রিনয়নী এবং মহাদেব শিবের বুকে দণ্ডায়মান। তাঁর দক্ষিণপদ শিবের বক্ষে স্থাপিত। তিনি মহাভীমা, হাস্যযুক্তা ও মুহুর্মুহু রক্তপানকারিনী। তাত্ত্বিকের তাঁর নামের যে ব্যাখ্যা দেন তা নিম্নরূপ: দক্ষিণদিকের অধিপতি যম যে কালীর ভয়ে পলায়ন করেন, তাঁর নাম দক্ষিণাকালী। তাঁর পূজা করলে ত্রিবর্ণা তো বটেই সর্বোপরি সর্বশ্রেষ্ঠ ফলও দক্ষিণাস্বরূপ পাওয়া যায়।● সিদ্ধকালী- সিদ্ধকালী কালীর একটি অখ্যাত রূপ। গৃহস্থের বাড়িতে সিদ্ধকালীর পূজা হয় না; তিনি মূলত সিদ্ধ সাধকদের ধ্যান আরাধ্যা। কালীতন্ত্র-এ তাঁকে দ্বিভূজা রূপে কল্পনা করা হয়েছে। অন্যত্র তিনি ব্রহ্মরূপা ভুবনেশ্বরী। তাঁর মূর্তিটি নিম্নরূপ: দক্ষিণহস্তে ধৃত খড়্গের আঘাতে চন্দ্রমণ্ডল থেকে নিঃসৃত অমৃত রসে প্লাবিত হয়ে বামহস্তে ধৃত একটি কপালপাত্রে সেই অমৃত ধারণ করে পরমানন্দে পানরতা। তিনি সালংকারা। তাঁর বাম পদ শিবের বুকে ও দক্ষিণ পদ শিবের উরুদ্বয়ের মধ্যস্থলে সংস্থাপিত।● গুহ্যকালী- গুহ্যকালী বা আকালীর রূপ গৃহস্থের নিকট অপ্রকাশ্য। তিনি সাধকদের আরাধ্য। তাঁর রূপকল্প ভয়ংকর: গুহ্যকালীর গাত্রবর্ণ গাঢ় মেঘের ন্যায়; তিনি লোলজিহ্বা ও দ্বিভূজা; গলায় পঞ্চাশটি নরমুণ্ডের মালা; কটিতে ক্ষুদ্র কৃষ্ণবস্ত্র; স্কন্ধে নাগযজ্ঞোপবীত; মস্তকে জটা ও অর্ধচন্দ্র; কর্ণে শবদেহরূপী অলংকার; হাস্যযুক্তা, চতুর্দিকে নাগফণা দ্বারা বেষ্টিতা ও নাগাসনে উপবিষ্টা; বামকঙ্কণে তক্ষক সর্পরাজ ও দক্ষিণকঙ্কণে অনন্ত নাগরাজ; বামে বৎসরূপী শিব; তিনি নবরত্নভূষিতা; নারদাদিঋষিগণ শিবমোহিনী গুহ্যকালীর সেবা করেন; তিনি অট্টহাস্যকারিণী, মহাভীমা ও সাধকের অভিষ্ট ফলপ্রদায়িনী। গুহ্যকালী নিয়মিত শবমাংস ভক্ষণে অভ্যস্তা। মুর্শিদাবাদ-বীরভূম সীমান্তবর্তী আকালীপুর গ্রামে মহারাজা নন্দকুমার প্রতিষ্ঠিত গুহ্যকালীর মন্দিরের কথা জানা যায়। মহাকাল সংহিতা মতে, নববিধা কালীর মধ্যে গুহ্যকালীই সর্বপ্রধানা। তাঁর মন্ত্র বহু – প্রায় আঠারো প্রকারের।● মহাকালী- তন্ত্রসার গ্রন্থমতে, মহাকালী পঞ্চবক্ত্রা ও পঞ্চদশনয়না। তবে শ্রীশ্রীচণ্ডী-তে তাঁকে আদ্যাশক্তি, দশবক্ত্রা, দশভূজা, দশপদী ও ত্রিংশলোচনা রূপে কল্পনা করা হয়েছে। তাঁর দশ হাতে রয়েছে যথাক্রমে খড়্গ, চক্র, গদা, ধনুক, বাণ, পরিঘ, শূল, ভূসুণ্ডি, নরমুণ্ড ও শঙ্খ। ইনিও ভৈরবী; তবে গুহ্যকালীর সঙ্গে এঁর পার্থক্য রয়েছে। ইনি সাধনপর্বে ভক্তকে উৎকট ভীতি প্রদর্শন করলেও অন্তে তাঁকে রূপ, সৌভাগ্য, কান্তি ও শ্রী প্রদান করেন।● ভদ্রকালী- ভদ্রকালী নামের ভদ্র শব্দের অর্থ কল্যাণ এবং কাল শব্দের অর্থ শেষ সময়। যিনি মরণকালে জীবের মঙ্গলবিধান করেন, তিনিই ভদ্রকালী। ভদ্রকালী নামটি অবশ্য শাস্ত্রে দুর্গা ও সরস্বতী দেবীর অপর নাম রূপেও ব্যবহৃত হয়েছে। কালিকাপুরাণ মতে, ভদ্রকালীর গাত্রবর্ণ অতসীপুষ্পের ন্যায়, মাথায় জটাজুট, ললাটে অর্ধচন্দ্র ও গলদেশে কণ্ঠহার। তন্ত্রমতে অবশ্য তিনি মসীর ন্যায় কৃষ্ণবর্ণা, কোটরাক্ষী, সর্বদা ক্ষুধিতা, মুক্তকেশী; তিনি জগৎকে গ্রাস করছেন; তাঁর হাতে জ্বলন্ত অগ্নিশিখা ও পাশযুগ্ম। গ্রামবাংলায় অনেক স্থলে ভদ্রকালীর বিগ্রহ নিষ্ঠাসহকারে পূজিত হয়। এই দেবীরও একাধিক মন্ত্র রয়েছে। তবে প্রসিদ্ধ চতুর্দশাক্ষর মন্ত্রটি হল – ‘হৌঁ কালি মহাকালী কিলি কিলি ফট স্বাহা’।● চামুণ্ডাকালী- চামুণ্ডাকালী বা চামুণ্ডা ভক্ত ও সাধকদের কাছে কালীর একটি প্রসিদ্ধ রূপ। দেবীভাগবত পুরাণ ও মার্কণ্ডেয় পুরাণ-এর বর্ণনা অনুযায়ী, চামুণ্ডা চণ্ড ও মুণ্ড নামক দুই অসুর বধের নিমিত্ত দেবী দুর্গার ভ্রুকুটিকুটিল ললাট থেকে উৎপন্ন হন। তাঁর গাত্রবর্ণ নীল পদ্মের ন্যায়, হস্তে অস্ত্র, দণ্ড ও চন্দ্রহাস; পরিধানে ব্যাঘ্রচর্ম; অস্তিচর্মসার শরীর ও বিকট দাঁত। দুর্গাপূজায় মহাষ্টমী ও মহানবমীর সন্ধিক্ষণে আয়োজিত সন্ধিপূজার সময় দেবী চামুণ্ডার পূজা হয়। পূজক অশুভ শত্রুবিনাশের জন্য শক্তি প্রার্থনা করে তাঁর পূজা করেন। অগ্নিপুরাণ-এ আট প্রকার চামুণ্ডার কথা বলা হয়েছে। তাঁর মন্ত্রও অনেক। বৃহন্নন্দীকেশ্বর পুরাণে বর্ণিত চামুণ্ডা দেবীর ধ্যানমন্ত্রটি এইরূপ - নীলোৎপলদলশ্যামা চতুর্বাহুসমন্বিতা । খট্বাঙ্গ চন্দ্রহাসঞ্চ বিভ্রতী দক্ষিণে করে ।। বামে চর্ম্ম চ পাশঞ্চ ঊর্দ্ধাধোভাগতঃ পুনঃ । দধতী মুণ্ডমালাঞ্চ ব্যাঘ্রচর্মধরাম্বরা ।। কৃশোদরী দীর্ঘদংষ্ট্রা অতিদীর্ঘাতিভীষণা । লোলজিহ্বা নিমগ্নারক্তনয়নারাবভীষণা ।। কবন্ধবাহনাসীনা বিস্তারা শ্রবণাননা । এষা কালী সমাখ্যাতা চামুণ্ডা ইতি কথ্যতে ।।● শ্মশানকালী- কালীর "শ্মশানকালী" রূপটির পূজা সাধারণত শ্মশানঘাটে হয়ে থাকে। এই দেবীকে শ্মশানের অধিষ্ঠাত্রী দেবী মনে করা হয়। তন্ত্রসাধক কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ রচিত বৃহৎ তন্ত্রসার অনুসারে এই দেবীর ধ্যানসম্মত মূর্তিটি নিম্নরূপ:----"শ্মশানকালী দেবীর গায়ের রং কাজলের মতো কালো। তিনি সর্বদা বাস করেন। তাঁর চোখদুটি রক্তপিঙ্গল বর্ণের। চুলগুলি আলুলায়িত, দেহটি শুকনো ও ভয়ংকর, বাঁ-হাতে মদ ও মাংসে ভরা পানপাত্র, ডান হাতে সদ্য কাটা মানুষের মাথা। দেবী হাস্যমুখে আমমাংস খাচ্ছেন। তাঁর গায়ে নানারকম অলংকার থাকলেও, তিনি উলঙ্গ এবং মদ্যপান করে উন্মত্ত হয়ে উঠেছেন।"শ্মশানকালীর আরেকটি রূপে তাঁর বাঁ-পাটি শিবের বুকে স্থাপিত এবং ডান হাতে ধরা খড়্গ। এই রূপটিও ভয়ংকর রূপ। তন্ত্রসাধকেরা মনে করেন, শ্মশানে শ্মশানকালীর পূজা করলে শীঘ্র সিদ্ধ হওয়া যায়। রামকৃষ্ণ পরমহংসের স্ত্রী সারদা দেবী দক্ষিণেশ্বরে শ্মশানকালীর পূজা করেছিলেন। কাপালিকরা শবসাধনার সময় কালীর শ্মশানকালী রূপটির ধ্যান করতেন। সেকালের ডাকাতেরা ডাকাতি করতে যাবার আগে শ্মশানঘাটে নরবলি দিয়ে শ্মশানকালীর পূজা করতেন। পশ্চিমবঙ্গের অনেক প্রাচীন শ্মশানঘাটে এখনও শ্মশানকালীর পূজা হয়। তবে গৃহস্থবাড়িতে বা পাড়ায় সর্বজনীনভাবে শ্মশানকালীর পূজা হয় না। রামকৃষ্ণ পরমহংস বলেছিলেন, শ্মশানকালীর ছবিও গৃহস্থের বাড়িতে রাখা উচিত নয়।● শ্রীকালী- গুণ ও কর্ম অনুসারে শ্রীকালী কালীর আরেক রূপ। অনেকের মতে এই রূপে তিনি দারুক নামক অসুর নাশ করেন। ইনি মহাদেবের শরীরে প্রবেশ করে তাঁর কণ্ঠের বিষে কৃষ্ণবর্ণা হয়েছেন। শিবের ন্যায় ইনিও ত্রিশূলধারিনী ও সর্পযুক্তা।সেকালের কালী পূজা:----আজ আমরা যে কালীমূর্তির আরাধনা সর্বত্র দেখতে পাই, তার রূপটি (দক্ষিণাকালী) সর্বপ্রথম বিখ্যাত তন্ত্রসাধক কৃষ্ণানন্দ আগমবাগিশ (১৬ শতক) কল্পনা করেছিলেন বলে কথিত আছে। শোনা যায়, তিনি অমাবস্যার রাতে স্বহস্তে কালীমূর্তি তৈরি করে সে-রাতেই নিজে পূজা সম্পন্ন করে প্রতিমা বিসর্জন দিতেন। অবশ্য অনেকে মনে করেন যে, তাঁর আগেও বাঙলায় কালী আরাধনা প্রচলিত ছিল। এ-ভাবেই বাঙলার কালী আরাধনার সঙ্গে যুক্ত হয়ে গেছে কৃষ্ণনগরের মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্রের নাম। জনশ্রুতি এই যে, এই কালীভক্ত রাজা আদেশ দিয়েছিলেন যে, তাঁর রাজ্যে প্রতি গৃহস্থকে কার্তিকী অমাবস্যায় তার বাড়িতে কালীপূজা করতে হবে, অন্যথায় শাস্তি পেতে হবে। তাঁর পরবর্তী দুই পুরুষও এই আদেশ বহাল রাখেন। এর ফলে শুধু কৃষ্ণনগর জেলাতেই নাকি দশ সহস্রাধিক বাড়িতে কালীপূজা অনুষ্ঠিত হতো, যার পরিণতিতে ঐ অঞ্চলে শ্যামাপূজার রাত্রিতে পূজারী ব্রাহ্মণের অভাব দেখা দেয়। কালীপূজায় ঐ জেলায় পশুবলিও নাকি হতো প্রায় দশ হাজারের মতো। চিন্তাহরণ চক্রবর্তী রচিত ‘বাঙলার পূজাপার্বন’ বইটিতে এই তথ্য পাওয়া যায়। এই লেখকের মতে আঠারো শতকের শেষের দিকেও কালীপূজা বাংলাদেশে ততটা জনপ্রিয় হয়নি। ‘তন্ত্রসার’-এর মতো প্রাচীন কোনো গ্রন্থে কালীপূজার উল্লেখ নেই। যে ‘শ্যামাসপর্যা’ গ্রন্থে এই পূজার উল্লেখ পাওয়া যায়, তা অপেক্ষাকৃত আধুনিক।রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের পৌত্র ঈশানচন্দ্রের কালী আরাধনা নিয়েও অনেক কাহিনী শোনা যায়। কালীপূজায় তাঁর এক হাজার মণ মিষ্টান্ন ও সেই ওজনের চিনি, চাল-কলা ইত্যাদি সহ এক হাজারটি শাড়ি ও মেয়েদের এক হাজার রেশমি পোশাক ইত্যাদির হাজার রকমের ভোগ নিবেদনের কাহিনী পাওয়া যায়। ঐ কাহিনী অনুসারে এই কালীপূজায় মহিষ, পাঁঠা ও ভেড়া (প্রতিটি এক হাজার করে) বলি দেবার খরচ পড়েছিল প্রায় দশ হাজার টাকা আর পূজার অন্যান্য খরচ ধরলে আরও প্রায় কুড়ি হাজার টাকা! এই বেহিসেবী ব্যয় মেটাতে গিয়ে ঈশানচন্দ্রকে নাকি সর্বস্বান্ত হতে হয়েছিল।কালীপূজার আড়ম্বরে এমনই নিঃস্ব হয়ে যাওয়া আর এক রাজার গল্প পাওয়া যায় শ্রীরামপুরের মিশনারি উইলিয়াম ওয়ার্ডের লেখায় (১৮১৫)। এই রাজা রামকৃষ্ণ বরানগরে কালীর এক মর্মরমূর্তি প্রতিষ্ঠার উৎসবে নাকি তখনকার দিনে এক লক্ষ টাকা ব্যয় করেছিলেন। ওয়ার্ড লিখেছেন, কালীর নামে রাজা বিপুল সম্পত্তি দান করেছিলেন, সেই সম্পত্তির আয় থেকে দৈনিক পাঁচশ’ লোক খাওয়ানো হয়।... কালীপূজার খরচের ফলে এখন তিনি প্রায় সর্বস্ব হারিয়েছেন।সারা বাংলাদেশ জুড়ে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য ‎ঐতিহ্যমন্ডিত কালী-আরাধনার কেন্দ্র আর তাদের নিয়ে প্রচলিত নানা কাহিনীরও শেষ নেই! যেমন, মুর্শিদাবাদের ডাহাপাড়ার দেবী কীরিটেশ্বরী, জনশ্রুতি - বাংলার নবাব মীরজাফর অসুস্থ অবস্থায় এই দেবীর চরণামৃত পান করতেন। এ-রকম আরো কয়েকটি কালীমন্দিরের মধ্যে উল্লেখযোগ্য শান্তিপুরে শাক্ত কৃষ্ণানন্দ আগমবাগিশ আর বৈষ্ণব অদ্বৈত আচার্যের বংশধরদের প্রতিষ্ঠিত কালী, রামপ্রসাদের সাধনপীঠ কুমারহট্টের (হালিশহর) ও কমলাকান্তের কোটালহাটের কালী, ভদ্রপুরে মহারাজা নন্দকুমারের প্রতিষ্ঠিত দ্বিভুজা কালী, বিষ্ণুপুরের ময়নাপুরে প্রাচীন কালী, কালনা, সিঙ্গুর ও রাণাঘাটের সিদ্ধেশ্বরী, সিউড়ি ও নবদ্বীপের ভবতারিণী, চূঁচুড়ার দয়াময়ী, নলহাটির ললাটেশ্বরী, শেওড়াফুলির নিস্তারিনী, বাগনানের মহাকালী, বর্ধমানের কঙ্কালেশ্বরী ইত্যাদি ইত্যাদি। এছাড়া বীরভূমে বীরসিংহপুরের কালী, অম্বিকা-কালনার দারুময়ী অম্বিকা ও ২৪ পরগ্ণার ময়দার কালীও বিখ্যাত।পশ্চিমবঙ্গের বাইরেও বিশ্রুত কালীক্ষেত্রের সংখ্যা নেহাত কম নয়। ঝাড়খন্ডে ধানবাদের নিকটবর্তী কল্যাণেশ্বরী ও রাজরাপ্পার ছিন্নমস্তার মন্দির ভক্তদের কাছে সুপরিচিত। এ ছাড়া পূর্ববঙ্গে (বাংলাদেশ) বিক্রমপুরে সোনারঙের কালী, ঢাকার জয়দেবপুরে শ্মশানকালী, বগুড়ার কালঙ্কেশ্বরী (বা প্রেতাসনা কালী), ত্রিপুরার মেহারে মেহার-কালী ইত্যাদিও সুপরিচিত। তমলুকের দেবী বর্গভীমা এবং কাঁথির কপালকুণ্ডলার নামাঙ্কিত মন্দির বা বাঁশবেড়িয়ার হংসেশ্বরী মন্দিরে পূজিতা দেবীও আদতে কালীরই নানা রূপ। বীরভূমের তারাপীঠে পূজিতা দেবী কালীর নিকটতম রূপান্তর তারার মন্দিরের কথা ছেড়ে দিলেও সেখানে রয়েছে বোলপুরের কাছে কঙ্কালী, ভাঙ্গালি ও বর্ধমান সীমান্তে অট্টহাস ইত্যাদি কালী-উপাসনা স্থলগুলি, যার মধ্যে কয়েকটি শক্তিপীঠ হিসেবে পরিগণিত হয়ে থাকে। এছাড়াও রয়েছে নানা ডাকাতের নামের সঙ্গে জড়িত অগণিত কালীমন্দির।এ-রকমই একটি, সিঙ্গুরের ডাকাতকালীর মন্দির দেখতে যাবার এক বিবরণ মেলে যোগেন্দ্রনাথ গুপ্তের বিখ্যাত বই ‘বাংলার ডাকাত’-এ। শেওড়াফুলি যাবার পথের বর্ণনা দিয়ে তিনি লিখছেন, “শীর্ণ সংকীর্ণ সর্পিল পথ। চৈত্র মাস। শুষ্ক পথের পাশে স্থানে স্থানে জঙ্গলঘেরা ডোবা। অতিকষ্টে মন্দিরের কাছে আসিলাম। ডাকাত কালীর মন্দির ভগ্ন ও জীর্ণ। ইঁট খসিয়া পড়িতেছে। এদিক ওদিক সাপ ছোটাছুটি করিতেছে। দিনের বেলায়ও অন্ধকার। মন্দিরে ভীষণাকৃতি কালীমূর্তি। ভিতরে আবর্জনা পূর্ণ।......একপাশে একটি বড় হাড়িকাঠভূমিতে পড়িয়া আছে।......আমি ডাকাতে কালীকে দেখিতে আসিয়া ভয়ে বিস্ময়ে শিহরিয়া উঠিলাম...। নানা আগাছায় পূর্ণ ভয়াল স্থান। দিনের বেলায়ও ভয় করে।...” সিঙ্গুরের এই ডাকাতে কালীর মন্দির কিন্তু আজও আছে, যদিও প্রাচীন জরাজীর্ণ মন্দিরের সংস্কার হয়েছে। এই কালীর নাম সিদ্ধেশ্বরী। গগন সর্দার, সনাতন বাগদি, রঘু ডাকাত ইত্যাদি নানা ডাকাতের নাম ও গল্প সিঙ্গুরের এই কালীর সঙ্গে জড়িত।এই সূত্রে কালীপূজোয় আরও দুটি বিদেশী-লিখিত নরবলির বিবরণের উল্লেখ এখানে করা যায়। একটি পর্তুগীজ জার্নালে ক্যাপটেন নরোনহা নামে এক ধর্মভীরু পর্তুগীজের বিবরণ পাওয়া যায়। মেদিনীপুরের কাছাকাছি কোনো স্থানে ডাকাতদের সঙ্গে গিয়ে তিনি এক বটগাছের নীচে তিনি তাদের আরাধ্যা কালীমূর্তি দেখতে পান। বলি হিসেবে সেখানে দু’টি অর্ধমূর্ছিত বালক ও অদুরে সিঁদুর মাখানো খড়গ দেখে তিনি ভয়ে সেখান থেকে পালিয়ে যান। আর একটি বিবরণ যার লেখা, তিনি ধর্মে ক্যাথলিক হলেও পেশায় ছিলেন ডাকাত। এক স্থানীয় জমিদারের পৃষ্ঠপোষকতায় তিনি খুলনা ও নোয়াখালি অঞ্চলে ডাকাতি করতেন, পরে পালিয়ে যান সুন্দরবনের গভীরে। সেখানে তিনি ‘ভবানীপূজা’র আয়োজন করেন বলে জানিয়েছেন, যাতে নরবলির জন্য মানুষ কেনাবেচার কথা পাওয়া যাচ্ছে ও বলির যোগ্য মানুষের লক্ষণ মিলিয়ে সওদা করছেন স্ব্য়ং পুরোহিত!ওয়ার্ডের বিবরণে এরকম আরো কালীভক্তদের বিবরণ মেলে, যারা কালীপূজো উপলক্ষে বিপুল ব্যয় করতেন, যেমন ধরা যাক, খিদিরপুরের ন্যায়নারায়ণ ঘোষাল বা গোপীমোহন নামে কলকাতার এক বৈষ্ণব ব্রাহ্মণ। প্রথমজন নাকি ১৭৯৫ সাল নাগাদ কালীপূজায় পঁচিশ হাজার টাকা ব্যয় করে ২৫টি মহিষ, ১০৮টি পাঁঠা ও ৫টি ভেড়া বলি দিয়েছিলেন। অপর ব্যক্তি ১৮১১ সালে কালীপূজায় দশ হাজার টাকা ব্যয় করেছিলেন।কলকাতার আরেক বাবু শোভাবাজারের কালীশঙ্কর ঘোষের বাড়ির কালীপূজার আড়ম্বরের বিবরণ পাওয়া যায় হরিহর শেঠের লেখায়ঃ- “কালীশঙ্কর ঘোষের বাটীতে তান্ত্রিকমতে অতি ভয়ানক ভাবে কালীপূজা হইত। শ্যামাপূজার রাত্রে মদ্যপান অব্যাহতভাবে চলিত এবং বলির রক্তে প্রাঙ্গণ ভরিয়া যাইত, নর্দমা দিয়া রক্তস্রোত বহিয়া যাইত।” এই বাড়ির পূজোতেই পশুবলির বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছেন পূর্বে উল্লিখিত পাদ্‌রি ওয়ার্ড তাঁর বইয়ে। বাড়ির মাঝখানে খোলা আঙিনায় রয়েছে বলির পশুগুলি, পাশেই স্ব্য়ং কালীশংকর। তাঁর কয়েকজন সঙ্গী ও বলির কাজে সহায়তার জন্য জনা বিশেক লোক। আঙ্গিনার চারদিক ঘিরে দালান, তার একটি ঘরে উত্তরমুখী করে প্রতিমা বসানো, অপর কয়েকটি ঘর দর্শকে ঠাসা। এর পর এই পাদরি জানিয়েছেন যে, প্রথমে বলি পড়ে পাঁঠা, তারপর মহিষ ও সবশেষে দু’ তিনটি ভেড়া। ওয়ার্ডের বর্ণনা কিছুটা শোনা যাকঃ- “একজন পূজারী বলি দেওয়া পাঁঠার মুন্ডুটি ধরে নাচতে নাচতে মূর্তির সামনে নিয়ে গেল। সদ্য কাটা মুন্ড থেকে তাজা রক্ত তার সর্বাঙ্গে গড়িয়ে পড়তে থাকে। বলিদান শেষ হলে কালীশঙ্কর, যে লোকটি বলি দিল, তাকে গাঢ় আলিঙ্গনে আবদ্ধ করলেন। তাকে বস্ত্র ইত্যাদি প্রভূত জিনিষপত্র দান করা হলো। পশুর মুন্ড, রক্ত, দেহের বিভিন্ন অংশের মাংস পূজারী দেবীকে নিবেদন করলেন। তারপর বালির ওপর আগুন জ্বেলে ঘৃত সহযোগে হোম শুরু হলো। তখন সারা আঙিনা রক্তে ভাসছে।” এ-ছাড়াও কালীপূজার বিষয়ে ওয়ার্ড যে-সব তথ্য জানিয়েছেন, তার মধ্যে আছে, দেবীকে যে মদ্য নিবেদন করা হয়, তা কর্তা ও তাঁর ঘনিষ্ঠ মহলের লোকেরা একান্তে পান করে। আর প্রতিমার সম্মুখে নৃত্যগীতের মধ্য দিয়ে উৎসবের সমাপ্তি ঘটে।পশুবলি অবশ্য গৃহস্থ বাড়ির কালীপূজোয় ছিল বহুল প্রচলিত প্রথা। কাঁসারিপাড়ার মল্লিকবাড়িতে আর সিমলার হোগলকুঁড়িয়ায় গুহবাড়িতে কালীপূজোয় মহিষ বলির প্রথা ছিল বলে জানা যায়। পাঁঠা বলি তো ছিল সাধারণ ব্যাপার! আবার বিখ্যাত ধনী আশুতোষ দেবের (ছাতুবাবু) বাড়ির কালীপূজায় কোনো বলিই হতো না। ১৭৫৭ সালে সুতানুটি অঞ্চলে রাজা মাণিক বন্দ্যোপাধ্যায় প্রতিষ্ঠিত পুঁটে-কালীর মন্দিরে বৈশিষ্ট্যই ছিল অসংখ্য বলিদান। পলাশির যুদ্ধের সমকালে যখন কলকাতার অধিকাংশ জায়গা ছিল জঙ্গলাকীর্ণ, তখন ডাকাতি করতে যাবার আগে কালীমূর্তির সামনে এমন কি, নরবলি দেবার গল্পও শোনা যায়। চিতু ডাকাতের প্রতিষ্ঠিত চিত্তেশ্বরী কালী মন্দিরে ১৭৭৮ সালের গ্রীষ্মের এক অমাবস্যায় এমনই নরবলি হয়েছিল বলে জানা যায়। কালীঘাটেও কোম্পানির আমলে নাকি একবার নরবলির জন্য একজনের ফাঁসি হয়েছিল বলে ডঃ ডাফের বিবরণে উল্লিখিত আছে। কলকাতার সবচেয়ে বিখ্যাত কালীক্ষেত্র কালীঘাটের মন্দিরে কার্তিকী অমাবস্যায় কালী আরাধনার আড়ম্বরের উল্লেখ করে মিশনারি ওয়ার্ড জানিয়েছেন যে, এই পূজায় প্রায় হাজার চারেক লোকের সমাগম হতো। অনেকেই পূজা উপলক্ষে প্রচুর খরচ করত। ১৭৬৫ সালে রাজা নবকৃষ্ণ নাকি এই কালীমন্দিরের পূজোয় লাখ খানেক টাকা ব্যয় করেন ও মূর্তির জন্য দান করেন সোনার মুন্ডমালা। পাদরি ওয়ার্ডের বিবরণ অনুযায়ী এই রাজা কালীমূর্তির জন্য দান করেন হাজার টাকা মূল্যের সোনার হার সহ অন্যান্য অলঙ্কার ও রুপোর বাসনপত্র। তিনি দু’ হাজার আতুরকে অর্থদান করেন ও যে-পরিমাণ ভোজ্যবস্তু ও মিষ্টি দান করেন, তা দিয়ে খাওয়ানো হয়েছিল এক হাজার মানুষকে। এই বিশ্রুত কালীমন্দিরে কালীর নিত্যপূজাও হতো এবং সে সূত্রে এর সঙ্গে নানা ধনাঢ্য মানুষের নাম শোনা যায় নানাজনের লেখা বিবরণে ও সমকালের সংবাদপত্রের পাতায়। শোভাবাজারের রাজা গোপীমোহন দেব ১৮২২ সালে একবার কাড়ানাকাড়া বাজিয়ে ধূমধাম সহকারে কালীঘাটে পূজো দিয়েছিলেন ও এই পূজো দেখতে এত ভীড় হয় যে শান্তিরক্ষায় পুলিশের প্রয়োজন হয়েছিল। রাজা বাহাদুর কালীমূর্তির হাতের রুপোর খড়্গ আর সোনার নরমুন্ড গড়িয়ে দেওয়া ছাড়াও নানা রকমের অলঙ্কার পট্টবস্ত্র আর শাল-দোশালায় মূর্তিকে মন্ডিত করেন।অতীত বাঙলার, এমন কি, ভারত ও নেপালের নানা ধনী ভক্তজন নানা সময়ে কালীঘাটের কালীমূর্তির জন্য বিভিন্ন আভরণ দান করেন বলে শোনা যায়। দেবীর চারটি রুপোর হাত দিয়েছিলেন খিদিরপুরের গোকুলচন্দ্র ঘোষাল। পরে চারটি সোনার হাত দেন কলকাতার কালীচরণ মল্লিক। বেলেঘাটার রামনারায়ণ সরকার দিয়েছিলেন সোনার একটি মুকুট আর পাইকপাড়ার রাজা ইন্দ্রচন্দ্র সিংহ দেবীর সোনার জিভটি গড়িয়ে দেন। পাতিয়ালার মহারাজা দিয়েছিলেন দেবীমূর্তির গলার একশো আটটি নরমুন্ডের মালা, মূর্তির মাথার ওপরের রুপোর ছাতাটি নাকি দেন নেপালের প্রধান সেনাপতি জঙবাহাদুর।মূর্তির পরেই কালীঘাটের মন্দিরের ও মন্দির পরিসরের নানা অংশের নির্মাণেও রয়েছে নানা বিচিত্র মানুষের যোগদান। ১৭৭০-৭১ সাল নাগাদ মন্দিরের সামনের গঙ্গার ঘাটটি এক বিশ্বস্ত পাঞ্জাবি সৈনিক হুজুরিমল্লের শেষ ইচ্ছানুযায়ী বাঁধিয়ে দেয় ইংরেজ সরকার। কালীর বর্তমান মন্দিরটির নির্মাণ হয়েছিল বরিশার জমিদার সন্তোষ রায়চৌধুরী ও তাঁর উত্তরাধিকারীদের সৌজন্যে। এছাড়াও শ্যামরায়ের মন্দির, তোরণদ্বার, বিভিন্ন ভোগঘর, নহবতখানা ইত্যাদির নির্মাণের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাওয়ালির বৈষ্ণব জমিদার উদয়নারায়ণ মণ্ডল, গোরখপুরের টীকা রায়, শ্রীপুরের জমিদার তারকচন্দ্র চৌধুরী, তেলেনিপাড়ার জমিদার কাশীনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখের নাম। ১৮৩৫ সালে নাটমন্দিরটি তৈরি করান আন্দুলের জমিদার রাজা কাশীনাথ রায়। এখানে উল্লেখ করা যায় যে, এই নাটমন্দিরেই ১৮৯৯ সালে কালী সম্পর্কে তাঁর বিখ্যাত বক্তৃতা দিয়েছিলেন স্বামী বিবেকানন্দের বিদেশিনী শিষ্যা ভগিনী নিবেদিতা। সে এক অন্য কাহিনী!অ্যালবার্ট হলে [অর্থাৎ এখনকার কফি হাউস] কালী বিষয়ে তাঁর প্রথম বক্তৃতাটি দিয়েছিলেন আইরিশ দুহিতা নিবেদিতা। শ্রোতাদের মধ্যে ছিলেন কলকাতার শিক্ষিত সমুদায় ও ব্রাহ্মসমাজের নানা বিশিষ্ট ব্যক্তি, যেমন সত্যেন্দ্রমোহন ঠাকুর, ব্রজেন্দ্রনাথ গুপ্ত, ডাঃ নিশিকান্ত চ্যাটার্জি ও ড: মহেন্দ্রলাল সরকার প্রমুখ। সাধারণ শ্রোতারা নিবেদিতার ভাষণে সন্তুষ্ট হলেও কিছু তথাকথিত প্রগতিশীল ব্যক্তি তাঁর বক্তব্যের প্রতিবাদ করেন। নিবেদিতা এই বক্তৃতায় কুসংস্কারকে প্রশ্রয় দিচ্ছেন বলে সবচেয়ে তীব্র ভাষায় আক্রমণ করেন মহেন্দ্রলাল। কলকাতার কালীবিরোধীদের বক্তব্যের জবাব দেবার সুযোগ আসে যখন কালীঘাট মন্দিরের সেবায়েত হালদারেরা নিবেদিতাকে মন্দির প্রাঙ্গনে বক্তৃতা দিতে আমন্ত্রণ জানান। এই কালীঘাটেই নাটমন্দিরের চত্বরে নিবেদিতা ২৮শে মে শ্রোতায় ঠাসা এক সভায় কালী আরাধনার বলিপ্রথা, মূর্তিপূজা ও মূর্তির তথাকথিত কুৎসিত রূপ ইত্যাদি অভিযোগের জবাব দিয়েছিলেন। পরে তাঁর এই বক্তৃতা পুস্তিকাকারে প্রকাশ করেন মন্দির কর্তৃপক্ষ। উল্লেখযোগ্য যে, ‘কালী দি মাদার’ নামে নিবেদিতার একটি বইও আছে।কালীঘাটের কালীর প্রতি শুধু যে বাঙালি বা হিন্দুরাই ভক্তি বা বিশ্বাস পোষণ করতেন, এমন কিন্তু নয়। শোনা যায়, পাঞ্জাব আর বার্মা দখল করবার পর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির তরফে কালীঘাটে ষোড়শোপচারে পূজো পাঠানো হয়েছিল। মার্শম্যানের বিবরণেও এর সমর্থন মেলে। কালীপূজোয় কোম্পানির এই এলাহি খরচের পেছনে অবশ্য ভক্তির চেয়ে দেশী সেপাইদের সন্তুষ্ট করার বাসনাই সম্ভবত কাজ করেছিল। কিন্তু পাদরি ওয়ার্ড কালীঘাট সহ বিভিন্ন কালীমন্দিরে অহিন্দু ভক্তদের আনাগোনার কথা লিখেছেন। তিনি জানাচ্ছেন, “শুধু হিন্দুরাই যে এই কালো পাথরের দেবীমুর্তির পূজা করে, এমন কিন্তু নয়। আমি জানতে পেরেছি, অনেক ইয়োরোপীয় বা তাদের এ-দেশীয় স্ত্রীরা কালী মন্দিরে যায় ও দেবীর আরাধনায় হাজার হাজার টাকা ব্যয় করে। আমি যে-ব্রাহ্মণের সাহায্য নিয়ে এই বিবরণ প্রস্তুত করেছি, তিনি বলেছেন, তিনি...... বহুবার সাহেব-মেমদের কালী মন্দিরে পূজো দিতে পালকি করে আসতে দেখেছেন।...... তাঁকে মন্দিরের কর্তৃপক্ষ সুনিশ্চিত ভাবে জানিয়েছেন, কোনো প্রার্থনা নিয়ে কালীর কাছে দিতে ইয়োরোপীয়রা প্রায়ই এসে থাকে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির এক বিশিষ্ট কর্মচারী সম্প্রতি মামলা জিতে কালীদেবীকে দু’ তিন হাজার টাকা মূল্যের নানা সামগ্রী দান করেছেন।”কালীঘাটের মন্দির সম্পর্কে পাদ্রি ওয়ার্ড লিখেছেন, “কলকাতার কাছে কালীর এক বিখ্যাত মন্দির রয়েছে। সমগ্র এশিয়া, এমন কি, সমগ্র বিশ্বের হিন্দু এই দেবীর পূজা করে।” ওয়ার্ডের বিবরণে এই অতিরিক্ত সংবাদও পাওয়া যায় যে, প্রায় পাঁচশো মুসলমান নাকি প্রতি মাসে কালীকে পূজো দিয়ে যেতেন। এর পরে তাঁর অধিকন্তু মন্তব্যঃ- “কি আশ্চর্য ভাবেই না এই দেবীমূর্তি সাধারণ লোকের মনে প্রভাব বিস্তার করেছে! ......বাংলার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সমসংখ্যক গণিকারা এসেও মন্দিরে পূজো দিয়ে যায়। তাদের কারো প্রার্থনা উপপতির রোগমুক্তি, কেউ বা চায় তার ঘরে আরও বেশি লোকের আগমন!” পবিত্রকুমার ঘোষ জানিয়েছেন, একসময় অবিভক্ত বাংলার, পরে পূর্ব পাকিস্তানের জননেতা শহিদ সুরাওয়ার্দি নাকি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হবার বাসনায় কালীঘাটে মানত করেছিলেন ও কলকাতায় দু’জন লোক পাঠিয়ে তাঁর হিন্দু বন্ধুদের মারফৎ ‘বিরাট ডালা সাজিয়ে’ কালীঘাটে পূজো দেবার ব্যবস্থা করেছিলেন। আর একজন বিখ্যাত বাঙালি শিল্পপতি স্যার বীরেন মুখার্জিও নাকি প্রতি সপ্তাহে কালীঘাটের মন্দিরে পূজো দিতেন।কালীঘাট ব্যতিরেকে কলকাতার অন্যান্য প্রাচীন কালী মন্দিরগুলি নিয়েও আড়ম্বর-বৈচিত্র্যের কাহিনী কম নেই। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রতিপত্তিশালী দেওয়ান গোবিন্দরাম মিত্রের প্রতিষ্ঠিত সিদ্ধেশ্বরী কালীর মন্দির ছিল কলকাতার মনুমেন্টের থেকেও উঁচু, আর তা খ্যাত ছিল ‘ব্ল্যাক প্যাগোডা’ নামে। এই মন্দির বেশ কয়েকবার ঝড়ে আর ভূমিকম্পে ভেঙে পড়ে ও তা পুনরায় তৈরি করা হয়। তাঁর কালীপূজোর ঘটাও নাকি ছিল খুব বিখ্যাত।কলকাতার কালীমন্দিরগুলোর মধ্যে সম্ভবত প্রাচীনতা আর খ্যাতির বিচারে কালীঘাটের পরেই চিত্তেশ্বরী মন্দিরের নাম উল্লেখ্য। অতীতের সেই যুগে গঙ্গার তীর ধরে তীর্থযাত্রীরা চিৎপুরে দেবী চিত্তেশ্বরী বা চিত্রেশ্বরী কালীমন্দিরে পূজো দেবার পর মশাল জ্বালিয়ে দল বেঁধে যেত কালীঘাটে। জনশ্রুতি আছে, এই পথের ধারেই তীর্থযাত্রীদের ওপর লুঠপাট চালাতো চিতে ডাকাত, এমন কি, এইসব অসহায় যাত্রীকে ধরে নাকি বলিও দিত কালীর সামনে। এই চিতু ডাকাতের নাম থকেই দেবী চিত্তেশ্বরী বা চিৎপুর নামের জন্ম হয়েছে (বা এর উল্টোটাও হতে পারে), এমন লোকশ্রুতিও আছে (কলকাতা কলেক্টরেটের ১৭৬১ সালের এক পাট্টায়ও এ কথার উল্লেখ আছে)। জঙ্গলাকীর্ণ এই পায়ে চলা রাস্তাটি ইংরেজদের নথিতে পরিচিত ছিল পিলগ্রিমস রোড নামে। বর্তমানে এই চিত্তেশ্বরী মন্দিরে (কাশীপুরে) প্রতিষ্ঠিত বিগ্রহটি দুর্গা বা চন্ডীর হলেও কলকাতার আদিযুগে এটি যে কালীমন্দির হিসেবেই পরিচিত ছিল, তার বহু প্রমাণ আছে। ‘ক্যালকাটা রিভিয়ু’ পত্রিকায় ১৮৪৫ সালে লেখা হয়েছিল, “Chitrapur was noted for the temple of ChitreswariDeby or the goddess of Chitru, known among Europeans as the temple of Kali at Chitpore”। এখানে আরও লেখা হয়েছিল, “This was the spot where the largest number of human sacrifices was offered to the goddess in Bengal before the establishment of the British Government.” একই ধরনের কথা পাওয়া যায় কটন সাহেবের ‘ক্যালকাটাওল্ড অ্যান্ড নিউ’ গ্রন্থেও। এই বইটির মতে এই স্থানটি ছিল “noted for the temple of Chitru or Kalee, renowned for the number of human sacrifices formerly offered at her shrine.”কলকাতা বা তার উপকন্ঠের আর একটি প্রসিদ্ধ কালীক্ষেত্র দক্ষিণেশ্বর, যা রানি রাসমণি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ১৮৫৫ সালের ৩১শে মে এই মন্দিরে ভবতারিণী কালীর মূর্তি প্রতিষ্ঠার দিনের কাহিনী পাওয়া যায় ‘সমাচার দর্পণে’। সেদিন নাকি “কলিকাতার বাজার দূরে থাকুক্‌, পাণিহাটি, বৈদ্যবাটি, ত্রিবেণী ইত্যাদি স্থানের বাজারেও সন্দেশাদি মিষ্টান্নের বাজার আগুন হইয়া উঠে। এইমত জনরব যে পাঁচশত মণ সন্দেশ লাগে।” এই দক্ষিণেশ্বরের ভবতারিণীর পূজারী হিসেবে নিযুক্ত রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের দৌলতে এই মন্দির পরবর্তী কালে বিশ্বখ্যাত হয়ে ওঠে। অথচ একথা আজ হয়তো অনেকেই জানেন না, শ্রীরামকৃষ্ণের প্রধান শিষ্য বিবেকানন্দের এই মন্দিরে প্রবেশ নিষিদ্ধ হয়েছিল সমুদ্র অতিক্রম করে ম্লেচ্ছদেশে যাবার কারণে! এই মন্দিরের কালীকে নিয়ে ইংরেজিতে চমৎকার একটি কবিতা লিখেছিলেন হরীন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়।কলকাতার প্রাচীন ও প্রথম বারোয়ারি (সম্ভবত বাংলার প্রথম বারোয়ারি কালীপূজা), মধ্য কলকাতার "আদি বারোয়ারি কালী পূজা" নামে উদযাপিত হয়ে থাকে। ১৮৫৮ সালে, জনৈক শ্রী বিহারী লাল বসুর হাতে এই পূজাটি শুরু হয়। ১৯২৪-২৬ সালের মধ্যে পূজাটি বারোয়ারি কালী পূজায় পরিণত হয়। উল্লেখ্য যে সেই সময় বাংলায় কালী পূজার প্রচলন (সর্বজনীন ভাবে) সেই রকম ভাবে ছিল না।কলিকাতা কালিকাক্ষেত্রের গল্প-ইতিহাস “এই কলিকাতা কালিকাক্ষেত্র, কাহিনী ইহার সবার শ্রুত” সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের কবিতার এই কথাগুলো কিন্তু ফেলনা নয়। কলকাতার সঙ্গে কালীর সম্পর্ক এমনকি দুর্গাঠাকুরের চেয়েও বেশি পুরোনো। কলকাতা শহর গড়ে ওঠার আগেই দূর-দূরান্ত থেকে মানুষরা এসে ভিড় করে পুজো দিতেন কালীঘাটের মন্দিরে। কেউ কেউ তো ‘কলিকাতা’ নামের পিছনেও ‘কালী’ শব্দটির খোঁজ পেয়েছেন। সে হয়তো কষ্ট-কল্পনা, কিন্তু তা বলে কালীপুজোর সঙ্গে এই শহরের সম্পর্ক খুঁজতে কল্পনাবিলাসী হওয়ার প্রয়োজন নেই। এমনিতেই শহরজোড়া একাধিক বিখ্যাত কালীমন্দির। কালীঘাটের মন্দির ছাড়াও চিৎপুরের ডাকাতে কালী, ঠনঠনিয়ার সিদ্ধেশ্বরী কালী, ফিরিঙ্গি কালী বা দক্ষিণেশ্বরের ভবতারিণী। এইসব বিখ্যাত কালীমন্দিরের সঙ্গে জড়িয়ে কত রোমাঞ্চকর ইতিহাস। নেহাত ভক্তিরসের সামগ্রী নয় সেইসব গল্প। আর, কলকাতার কালীপুজো বলতে এই বিখ্যাত মন্দিরের বাইরেও হাজারো ইতিহাস। রাজ-রাজরা, ডাকাত, জমিদার, লালমুখো সাহেব, বড়োলোক সবাই সমাপতিত সেখানে। কলকাতার সবচাইতে বিখ্যাত কালীমন্দির কালীঘাটের পুজো নিয়েই গল্পের শেষ নেই। অনেকের মতে, এই কালীই কলকাতার অধিষ্ঠাত্রী দেবী। আর, এই মন্দিরে রাজাদের দানধ্যান-ব্যয়ের কথা বললে তো শেষই হবে নাকি। রাজা নবকৃষ্ণ, শোভাবাজারের রাজা গোপীমোহন দেব, খিদিরপুরের গোকুলচন্দ্র ঘোষাল, কালীচরণ মল্লিক, ইন্দ্রচন্দ্র সিংহ, পাতিয়ালার মহারাজ, নেপালের প্রধান সেনাপতি জঙ বাহাদুর প্রভৃতি ব্যক্তির দানের কথা আগেই বলা হয়েছে।দেবীর অঙ্গসজ্জার পাশাপাশি এই মন্দিরের গড়ে ওঠার, সেজে ওঠারও বিচিত্র ইতিহাস যা ইতিপূর্বেই সংক্ষেপে বর্ণিত হয়েছে, যার তথ্য গুনে শেষ করা যাবে না। শুধু কালীঘাট নয়, কলকাতার অন্যান্য সাবেক কালীমন্দিরগুলোর ইতিহাসও কম রঙিন নয়। ‘ব্ল্যাক প্যাগোডা’নামে প্রচলিত কোম্পানীর দেওয়ান গোবিন্দরাম মিত্র প্রতিষ্ঠিত সিদ্ধেশ্বরী কালীমন্দির, , দক্ষিণেশ্বরের ভবতারিণী মন্দির, অথবা কলকাতায় নানা বড়োলোক-অভিজাত মানুষদের বাড়ির কালীপুজোয় জাঁক-জমকের অন্ত ছিল না। পাশাপাশি, বড়লোকের বাড়ির কালীপূজায় অবধারিত ছিল পশুবলি। খিদিরপুরের ন্যায়নারায়ণ ঘোষালের পুজোয় বা শোভাবাজারের কালীশঙ্কর ঘোষের বাড়ির কালীপূজার টাকার পাশাপাশি মদ্য ও রক্তেরও বন্যা বইত। শুধু পশুবলিই নয়, নরবলির ঘটনাও শোনা যেত তখন কলকাতায়। অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে কলকাতা তখন জঙ্গলাকীর্ণ এক শহর। এখানে-সেখানে ডাকাতদের ডেরা। চিতু ডাকাত-প্রতিষ্ঠিত চিত্তেশ্বরী কালী মন্দিরে ১৭৭৮ সালের এক অমাবস্যায় নাকি নরবলি হয়েছিল। কালীঘাটেও নাকি নরবলি দেওয়া হয়েছিল একবার। ডঃ ডাফ লিখেছেন, এই নরবলির ঘটনায় কোম্পানির শাসকরা ফাঁসিতেও ঝুলিয়েছিলেন কয়েকজনকে। সেদিনের কলকাতা শহর আজকের তিলোত্তমা মহানগরী নয়। তার কালীপুজোর ধরণেও তাই ভক্তিরসের সঙ্গে অনায়াসে মিশে যায় বীভৎসতারস। পশুবলিকে ঘিরে রাজা-বাবুদের উদ্দামতার বিবরণ শুনে গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে। এবং, এরই পাশাপাশি মিশে থাকে বাবু-জমিদারদের আড়ম্বরের কথাও। কালীপুজোর রাতে কারণবারি তো ‘প্রসাদ’। তার নেশা সাত্ত্বিক নেশা। সেই ‘কারণবারি’ হোক না বিলিতি। ক্ষতি কী? মহেন্দ্রনাথ দত্ত লিখেছেন, শিমলার বসুবাড়ির বিখ্যাত কালীপুজোয় ততোধিক বিখ্যাত মদ্যপানের কথা। গৃহস্থ-ভক্ত সবাই মিলে মাটির গামলায় কারণবারি নিয়ে গোল হয়ে ঘিরে বসতেন। তারপর স্ট্র থুড়ি নল দিয়ে টানতেন সুরা। আবার শোভাবাজারের কালীশঙ্কর ঘোষের বাড়িতে তো ভৃত্য-গৃহিণী কেউই সুরারসে বঞ্চিত হতেন না। একবার নাকি নেশার ঘোরে পুরুতকেই বলি দেবার উপক্রম হয়েছিল। এই নিয়ে প্রাণকৃষ্ণের মজার গল্প আছে একখানা। কারণবারি প্রসাদে চুর এক ভৃত্য পদসেবা করতে গিয়ে কিছুতেই আর বাবুর পা খুঁজে পাচ্ছে না। গোটা বাড়ি জুড়ে পায়ের খোঁজে হইহই পড়ে গেল। বাবুর পা কোথায় গেল? পুজোমণ্ডপেও পা নেই। এদিকে পায়ের অভাবে বাবু নামতে-হাঁটতে পারছেন না। শেষে গিন্নিমা আদেশ দিলেন পুরুতমশাইয়ের বাড়িতে গিয়ে খোঁজ করার। নৈবেদ্যর সঙ্গে পা-টাও ভুলক্রমে চলে গেছে হয়তো। পুরুতমশাই সব শুনে খুবই বিনয়ের সঙ্গে বললেন, এত নৈবেদ্যর মধ্যে বাবুর পা খুঁজতে রাত কাবার হয়ে যাবে। খুঁজে পেলে কাল সকালে তিনি স্বয়ং বাবুকে পা ফিরিয়ে দিয়ে আসবেন।শুধু মদ্যপানে কি আর জমে পুজো? তাই, পুজোর পরে পার্টি হত। সেই পার্টিতে সাহেব-মেমরা আসতেন। বাইজি নাচ, কবিগান, পাঁচালি, তরজা, আখড়াই-হাফ আখড়াইতে মেতে থাকত আসর। পরে যুক্ত হল যাত্রাগান আর জেলেপাড়ার সঙ। তাছাড়া ছিল আতসবাজির পসরা। কালীপ্রতিমা নিয়ে বাজনা-আলো সহকারে শোভাযাত্রাতেও বেরোতেন বাবুরা। সেই শোভাযাত্রার জাঁক নিয়ে পরস্পরের মধ্যে রেষারিষিও ছিল তীব্র। সব মিলিয়ে কালীপুজো ব্যাপারটা মোটে সাধারণ এক উৎসব ছিল না কলকাতাবাসীর কাছে।সময় গড়িয়ে গেল ঢের। গঙ্গার মূল স্রোত সরে এসে আদিগঙ্গাও শুকিয়ে পরিণত হল খালে। সেইসব বাবুয়ানি-রাজ-রাজরাদের কালও শেষ হল। মহানগরীর সেইসব কালীপুজোও মুখ লুকোল ইতিহাসে। বিখ্যাত কালীমন্দিরগুলোর পুজোর কথা অবশ্য আলাদা। প্রথা মেনে তারা আজও বহমান। কিছু সাবেক পুজোও বেঁচে-বর্তে আছে কোথাও কোথাও। কিন্তু, ফাঁকা জমি-জঙ্গলাকীর্ণ আধো আলো-আধো অন্ধকারের সেই গা ছমছমে কলকাতার গায়ে কাঁটা দেওয়া কালীপুজোরা আর নেই। ডাকাতরা নেই, বলির বীভৎসতাও নেই। কিন্তু, ইতিহাসের গপ্পেরা এত সহজে মরে না। আতসবাজির মতো আকাশজুড়ে তাদের ছড়িয়ে পড়তে দেখাও কম লোভনীয় নয়।কত যে কালী কলকাতায়। এমনটা কোনও শহরে নেই। শাক্তধর্মের এমন জনপ্রিয়তা বঙ্গদেশ ছাড়া কোথাও মিলবে না। বিশ্বসৃষ্টির আদিকরণ তিনি। আবার অন্যমতে, ইনিই আদ্যাশক্তি মহাময়ী। তন্ত্র ও পুরাণে কালিকার নানা রূপভেদ যা পূর্বেই আলোচিত হয়েছে। বাংলা জুড়ে অবশ্য তার নানা নাম। কলকাতার উত্তরে দক্ষিণেশ্বরে তিনি মা ভবতারিণী আবার দক্ষিণের কালীঘাটে দেবী কালিকা। আদ্যাপীঠে আদ্যাকালী, কাশীপুরে চিত্তেশ্বরী, ঠনঠনিয়ায় সিদ্ধেশ্বরী, বউবাজারে ফিরিঙ্গি, কেওড়াতলায় শ্মশানকালী, টালিগঞ্জে করুণাময়ী, নিমতলায় আনন্দময়ী। কালীময় কলকাতার কথা কয়েক আঁচড়ে আঁকার চেষ্টা রইল এখানে। অবশ্যই সবার কথা বলা গেল না।ক্ষেত্রবিশেষে কিছু কিছু পুনঃকথন হলেও কলকাতার কিছু কালী মন্দির বিশেষ উল্লেখের দাবী রাখে।কালীঘাটের দেবীকালিকা: কালীঘাটের মন্দিরের গুরুত্ব বেড়েছে প্রকৃতপক্ষে সপ্তদশ শতাব্দীর শেষ দিকে। কালীঘাটে দেবীর চারটি আঙুল পড়েছিল। দেবী কালিকার ভৈরব নকুলেশ্বর। কিংবদন্তী কাশীর মতো পুণ্যক্ষেত্র কালীঘাটে কীটপতঙ্গ মরলেও সঙ্গে সঙ্গে তারা মুক্তি পেয়ে যায়। এই কালীপীঠ গড়ে ওঠার পিছনে নানা কাহিনির জাল বিস্তৃত। এমন একটা কাহিনি হল:যশোরের রাজা প্রতাপাদিত্যের খুল্লতাত শ্রীবসন্ত রায় একটি ছোট মন্দির নির্মাণ করেছিলেন। সেই সময় দেবীর সেবায়েত ছিলেন ভুবনেশ্বর ব্রহ্মচারী। তিনি ছিলেন অপুত্রক। তাঁর দৌহিত্র হালদাররাই বর্তমানে কালীঘাটের বিখ্যাত বংশ। মন্দিরের পূজা এখনও করে চলেছেন তাঁরা। বর্তমান মন্দির নির্মাণ হয় উনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে। শোনা যায় সাবর্ণ চৌধুরীর পরিবারের সন্তোষ রায় পঁচিশ হাজার টাকা ব্যয়ে বাংলার নিজস্ব ঘরানার চার চালা এবং তার উপর আর একটি ছোট চারচালার শিখর সমেত মন্দিরটি নির্মাণ শুরু করেছিলেন। তাঁর পুত্র রামনাথ রায় ও ভ্রাতষ্পুত্র রাজীবলোচন রায় ১৮০৯ সালে মন্দির নির্মাণ সম্পূর্ণ করেন। পরবর্তী কালে আন্দুলের জমিদার কাশীনাথ রায় নাটমন্দির গড়ে দেন। নহবত্‌খানা ও দুটি ভোগের ঘর তৈরি করে দিয়েছিলেন গোরক্ষপুরের টিকা রায়। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিও মন্দিরের জন্য দুশো বিঘা জমি দান করেছিলেন। কালীঘাটের দেবীকালিকার রূপ মাহাত্ম্যের কথা তো আগেই বলা হয়েছে।কালীঘাটের মূল পূজা মূলত আটটি। রক্ষাকালী পুজো, স্নানযাত্রা, জন্মাষ্টমী, মনসাপুজো, চড়ক, গাজন ও রামনবমী। কালীপুজোর রাতে দেবীকে পুজো করা হয় লক্ষ্মীরূপে। কালী-শ্যামা নন দীপাবলিতে আরাধিত হন লক্ষ্মী।দক্ষিণেশ্বরের মা ভবতারিণী: কথিত রয়েছে এক বার কাশীযাত্রার আগের দিন ভোর রাতে জানবাজারের রানি মা রানি রাসমণির স্বপ্নে দেখা দিলেন মা জগদম্বা। রানিকে বললেন গঙ্গার পূর্ববর্তী তীরে মন্দির স্থাপনা করতে। কাশী যাওয়ার দরকার নেই। সেই স্বপ্নাদেশ শিরোধার্য করে ১৮৪৭ খ্রিস্টাব্দে ৬ সেপ্টেম্বর কলকাতা থেকে ছ’কিলোমিটার দূরে ভাগীরথীর তীরে সুপ্রিম কোর্টের অ্যাটর্নি জেমস হেস্টির কাছ থেকে ৬০ বিঘা জমি ৬০ হাজার টাকায় কিনলেন। ১৮৫৫ খ্রিস্টাব্দের ৩১ মে স্নানযাত্রার দিন গড়ে তুললেন সাদা রঙের নবরত্ন মন্দির। কাজটা সহজ ছিল না। কৈর্বত্য হরেকৃষ্ণ দাসের মেয়ে মন্দির গড়বে। এ ‘আস্পর্দা’ সে দিন মেনে নিতে পারেননি কুমারহট্ট হালিশহরের ব্রাহ্মণ ও উচ্চবর্ণের সমাজপতিরা। শেষপর্যন্ত সব বাধা দূর করে প্রতিষ্ঠিত হল কষ্ঠিপাথরের দেবীমূর্তি। সাধ করে রাসমণি তার নাম রাখলেন ভবতারিণী। মন্দিরের মেঝে শ্বেত ও কৃষ্ণ প্রস্তরাবৃত। সোপানযুক্ত উঁচুবেদী। বেদীর উপর সহস্র দল রৌপ্যপদ্ম। তার উপর দক্ষিণে মাথা ও উত্তরে শয়ান শ্বেতপাথরের শিবমূর্তি। মহাদেবের বুকের উপর ত্রিনয়নী ভবতারিণী রঙিন বেনারসি ও মহামূল্যবান রত্নঅলঙ্কারে ভূষিতা। ১৮৫৭-৫৮ খ্রিস্টাব্দে দাদা রামকুমার চট্টোপাধ্যায়ের কাছ থেকে পুজোর দায়িত্ব পান শ্রীরামকৃষ্ণ। এই মন্দিরই এই যুগাবতারের সাধনপীঠ।ঠনঠনিয়ার সিদ্ধেশ্বরী কালী: বর্তমান মন্দিরটি তৈরির অনেক আগেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল সিদ্ধেশ্বরী কালী এমন একটা মত প্রচলিত রয়েছে। জনশ্রুতি, উদয়নারায়ণ-ব্রহ্মচারী নামে এক তান্ত্রিক আনুমানিক ১৭০৩ খ্রিস্টাব্দে মাটি দিয়ে সিদ্ধেশ্বরী রূপের কালীর্মূতি গড়েন। তখন স্থানটি ছিল জঙ্গলাকীর্ণ। ১৮০৬ খ্রিস্টাব্দে শঙ্কর ঘোষ নামে এক ধনী ব্যক্তি কালীমন্দির ও পুষ্পেশ্বর শিবের আটচালা মন্দির নির্মাণ করেন। পুজোর ভারও নেন তিনি। কার্তিক অমাবস্যায় আদিকালীর পুজো ছাড়াও জৈষ্ঠ্যমাসে ফলহারিণী এবং মাঘ মাসে রটন্তী কালীর পুজো হয়।কাশীপুরের চিত্তেশ্বরী সর্বমঙ্গলা: গভীর জঙ্গল ঘেরা এক স্থান। ভাগীরথীর তীরে। সে জঙ্গলে বাস দুর্ষর্ধ ডাকাত দলের। সেই ডাকাত দলের পাণ্ডা রঘু ডাকাত। এই ডাকাত সর্দারের হাতেই প্রতিষ্ঠা পায় চিত্তেশ্বরী। নিয়মিত নরবলি হত এখানে। সর্দারের মৃত্যুর পর দায়িত্ব নেন রামশরণ সিমলাই নামে এক ব্রাহ্মণ। তিনি স্বপ্নাবিষ্ট হয়ে কাশীপুর গান অ্যান্ড শেল ফ্যাক্টারি রোড বা বর্তমানে খগেন চ্যাটার্জি রোডে নতুন বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করেন। রামশরণ প্রতিষ্ঠিত বিগ্রহটি নিমকাঠের রক্তবর্ণা ত্রিনয়নীদেবী চতুর্ভুজা ও সিংহবাহিনী। দেবীর হাত বর, অভয় মুদ্রা, খড়্গ ও কমণ্ডুলে বিভূষিতা। কথিত, রামপ্রসাদ কলকাতা থেকে হালিশহর নৌকাযোগে যেতে যেতে দেবীকে গান শুনিয়েছিলেন, ‘মা তারিণী শঙ্কর বৈরাগী তোর নাং...।’ মূল মন্দিরটি ১৬১০ খ্রিস্টাব্দে নির্মাণ করেছিলেন হুগলি জেলার মনোহর ঘোষ ওরফে মহাদেব ঘোষ।কাশীপুর আদি চিত্তেশ্বরী দুর্গা: এই দেবীর কাহিনিও প্রায় এক। তবে এখানে ডাকাতের নাম চিতু বা চিত্তেশ্বর রায়। ডাকাতি করতে যাওয়ার আগে চিতু ষোড়শপচারে দেবীর পুজো করত। আদি চিত্তেশ্বরী বলার কারণ কথিত প্রায় পাঁচশো বছর আগে এই দেবীর প্রতিষ্ঠা হয়েছিল। দেবীর নামেই জায়গাটির নাম চিত্‌পুর হয়ে ওঠে। এই দেবীও নিমকাঠ দিয়ে তৈরি। দেবীর বিগ্রহের সঙ্গে রয়েছে একটি বাঘের মূর্তি। জমিদার গোবিন্দরাম মিত্র মন্দিরটি পুনঃনির্মাণ করেছিলেন।বউবাজারের ফিরিঙ্গি কালী: ১৪৩৭ খ্রিস্টাব্দে তখন কোথায় কলকাতা কোথায় চিত্তরঞ্জন অ্যাভিনিউ। গভীর জঙ্গল, শ্মশান, অদূরে ভাগীরথী। সেই শ্মশানে ছোট একটি চালা ঘরে প্রতিষ্ঠিত ছিল শিবলিঙ্গ ও দেবীকালিকায় বিগ্রহ। শ্মশানে প্রতিষ্ঠিত হলেও দেবী ছিলেন সিদ্ধেশ্বরী। কালের বিবর্তনে শহর গড়ে উঠল। জনপদ সৃষ্টি হল। আনাগোনা শুরু হল পতুর্গিজ ও ইংরেজদের। তাদের মধ্যে ছিলেন পতুর্গিজ খ্রিস্টান অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি। এই ফিরিঙ্গি কালীভক্তের দৌলতে সিদ্ধেশ্বরী কালী লোকমুখে হয়ে উঠলেন ফিরিঙ্গি কালী। ১৮২০-১৮৮০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত এই মন্দিরের পূজারী ছিলেন শ্রীমন্ত পণ্ডিত। সাড়ে পাঁচ ফুট উচ্চতার বিগ্রহ ত্রিনয়নী। এই মন্দিরে শিব ও সিদ্ধেশ্বরী কালী ছাড়াও দুর্গা, শীতলা, মনসা ও নারায়ণের মূর্তি প্রতিষ্ঠিত রয়েছে। প্রতি পূর্ণিমায় সত্যনারায়ণ ও অমাবস্যায় বিশেষ কালীপুজো হয়ে থাকে।কলকাতার কালী মাহাত্ম্যের এ এক সামান্য অংশ। কলকাতার উত্তর থেকে দক্ষিণ ঐতিহ্যপূর্ণ কালী-মন্দিরের সংখ্যা অন্তত তিন ডজন। রাজ্যে সাধনপীঠ ও সতীপীঠ যোগ করলে সে সংখ্যাটি কমপক্ষে ২২২। এই সংখ্যাটি পরিণত ও জনপ্রিয় কালীমন্দির বা পীঠের। এ ছাড়াও এই শহর ও রাজ্যের নানা প্রান্তে জমিদার ও বনেদিবাড়িগুলিতে রয়েছে বহু কালীমন্দির। কলকাতায় এমনই বিখ্যাত ছয় বনেদিবাড়ি হল, হাটখোলার রামচন্দ্র দত্ত। হাটখোলারই জগত্‌রাম দত্ত। দর্জিপাড়ার নীলমণি মিত্র স্ট্রিটের মিত্রবাড়ি। সিমলার রামদুলাল সরকার ও সিমলারই তারক প্রামাণিকের বাড়ি।কালীর এই ভয়াবহ নগ্নিকা মূর্তি-ভাবনার পিছনে আদিম কোনও ধর্মধারা বা ‘কাল্ট’ এর প্রভাব রয়েছে বলে অনুমান করেন সমাজবিদেরা। তাঁদের অনেকেরই মতে কালী আদতে কোনও বৈদিক দেবী নয়। এ দেশের লোকায়ত মাটি থেকেই তার উদ্ভব। কোনও এক নগ্নিকা খড়্গ-মুণ্ডমালা শোভিতা যখন দেবী হিসাবে পূজিত হচ্ছেন তখন তা আদিম অরণ্যচারী মানুষের সংস্কৃতির কোনও ঐতিহ্যকে বহন করছে বলে মনে করা হয়। পরবর্তী কালে আর্য ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতির দেবীভাবনার সঙ্গে যুক্ত হয়ে কালী হিন্দু-ব্রাহ্মণ্যতন্ত্রের দেবীতে রূপান্তরিত হয়েছেন।"ওঁ ক্রীং কালিকায়ৈ নমঃ"তথ্যসূত্র:---১- Tantric visions of the divine feminine: th e ten mahavidyas By David R. Kinsley.২- Mother of my heart, daughter of my dreams By Rachel Fell McDermott.৩- Encountering Kali: in the margins, at the center, in the West By Rachel Fell McDermott, Jeffrey John Kripal.৪- The camphor flame: popular Hinduism and society in India By Christopher John Fuller..৫. বঙ্গদর্শন ও আনন্দবাজার পত্রিকা। ৬. পণ্ডিত শ্যামাচরণ কবিরত্ন বিরচিত শ্রী শ্রী কালীপূজা পদ্ধতি।৭. শ্রী শ্রী চণ্ডী // নীলিমা সান্যাল।৮. ইন্টারনেট // গুগল সার্চ।৯. বিশেষ কৃতজ্ঞতা স্বীকারঃ শুভজিৎ মুখার্জী।

কর্মতাপস আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় আদতে এক প্রফুল্ল স্মৃতি ।

একটি নারীই সবচেয়ে শক্তিশালী ও কার্যকর নেতৃত্ব দিতে পারেন ।।