বিশ্ব পরিবেশ দিবস ---- বিশ্ব ভাবনা 🌏
প্রকৃতিপ্রেমী কবি উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থ তার ‘টিনটার্ন অ্যাবে’ কবিতায় ওয়ে নদীর তীরে নদীর আওয়াজ নয়, শুনতে পেয়েছিলেন কান্নার শব্দ। নদী বুজে যাওয়ার সেই শব্দ জানান দিচ্ছিল সভ্যতা ধ্বংসের। ইংল্যাণ্ডে শিল্প বিপ্লবের পর যে বিষাক্ত পরিণাম পদার্থ ওয়ে নদী বয়ে নিয়ে যাচ্ছিল ওয়ার্ডসওয়ার্থ তা দেখে হতাশ হয়েছিলেন। তাঁর মন বিষাদে ভরে উঠেছিল। কিটস, শেলি, ওয়ার্ডসওয়ার্থ, হুহটম্যান, রবার্ট ফ্রস্ট থেকে বাংলার রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দ দাশ সবাই প্রকৃতির নানাবিধ ক্ষতির বিরুদ্ধে কলম ধরেছেন বারেবারে। এযুগের শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের ‘আমি দেখি’ কবিতায় কবি একান্তভাবে প্রার্থনা জানিয়েছেন, ‘বাগানে গাছ বসাও আমি দেখি’। একাল সেকাল মিলিয়ে আজও আমাদের বলতে হয়- “দাও ফিরে সে অরণ্য , লও এ নগর। লও যত লৌহ লোষ্ট্র কাষ্ঠ ও প্রস্তর।।”
কবিগুরু র কথায়---- “যাহারা তোমার বিষাইছে বায়ু, নিভাইছে তব আলো। তুমি কি তাদের ক্ষমা করিয়াছো, তুমি কি বেসেছ ভালো?”- ‘প্রশ্ন’ কবিতায় কবি রবীন্দ্রনাথ সৃষ্টিকর্তার কাছে যে প্রশ্ন রেখেছেন তা চিরন্তন, রবি ঠাকুরের সেই প্রশ্ন আজ আমাদেরও। নগরসভ্যতার বিকাশের জন্য পরিবেশের সঙ্গে যথেচ্ছাচার একদিন হয়ত আমাদের ধ্বংস করে ফেলবে। আমরা বছরের একটি নির্দিষ্ট দিনে পরিবেশ দিবস পালন করে সত্যিই পরিবেশকে রক্ষা করতে পারব তো ? প্রকৃতি প্রেমিক রবীন্দ্রনাথ শতবর্ষ আগে তা বুঝতে পেরেছিলেন। আর আমরা, বুঝেও অবুঝ!
প্রতি বছর ৫ জুন পালিত হয় ‘বিশ্ব পরিবেশ দিবস’। ১৯৭২ সালের ৫ থেকে ১৬ জুন অবধি জাতিসংঘের মানবিক পরিবেশ কনফারেন্স অনুষ্ঠিত হয়। আর সেখানেই ‘বিশ্ব পরিবেশ দিবস’ পালনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। 'বিশ্ব পরিবেশ দিবস' প্রথম পালিত হয় ১৯৭৩ সালে। প্রতিবছরই এই দিনটি আলাদা আলাদা শহরে, আলাদা আলাদা বিষয় ও উক্তি নিয়ে পালিত হয়। উত্তর গোলার্ধে দিবসটি বসন্তে আর দক্ষিণ গোলার্ধে দিবসটি শরতে পালিত হয়।
কলকাতার জমিদার বংশের সন্তান রবি ঠাকুর একবার বলেছিলেন, “ কলকাতায় থাকলে প্রকৃতিকে ভুলে যেতে হয়।” সত্যিই তাই , জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে মানুষ হয়েও একদা বালক রবিকে বলতে শোনা গেছিল- "বিশ্ব প্রকৃতিকে আড়াল আবডাল হইতে দেখিতে হইত"। প্রকৃতির মাঝে মানবের অস্তিত্ব খুঁজে পেয়েছিলেন তিনি। জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ি ছাড়াও কুষ্টিয়ার শিলাইদহ, নওগাঁর পতিসর বা সিরাজগঞ্জের সাহজাদপুরে যখন তিনি তাঁর জমিদারির কাজে গেছেন এবং থেকেছেন, তখন কবির দীর্ঘসময় কেটেছে নদীর সঙ্গে— পদ্মা, নাগর, করতোয়া, ইছামতী, বড়াল, আত্রেয়ী, যমুনা নদীতে ভেসে বেড়িয়েছেন।‘পদ্মা’ নামের বজরায় তিনি ঘুরে বেরিয়েছেন বাংলার নদীপথ।
রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যেও প্রকৃতির উপস্থিতি অবাধ। তাঁর গান, গল্প, নাটক, উপন্যাস, কাব্য সর্বত্রই প্রকৃতিকে ঘিরে।"ছিন্নপত্র" পাঠ করলে আমরা বুঝতে পারি রবীন্দ্রনাথ কতখানি প্রকৃতি প্রেমিক মানুষ ছিলেন। রবীন্দ্রনাথ শুধু মানুষের সঙ্গে প্রকৃতির সম্পর্ক নিয়ে বিস্তৃতভাবেই লেখেননি, তিনি শান্তিনিকেতন প্রতিষ্ঠা করে তার বাস্তব রূপও দেখিয়েছিলেন। সবদিকে সবুজবেষ্টনী দ্বারা শান্তিনিকেতন ঘেরা, যে শান্তিকেতন একসময় ছিল রুক্ষশুষ্ক তাকেই তিনি এক নতুন রূপ দিলেন। শান্তিনিকেতন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে রবীন্দ্রনাথ দেখিয়েছিলেন মুক্তচিন্তার মধ্য দিয়ে প্রকৃতির সঙ্গে একাত্ম হওয়ার পথ। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন পরিবেশবাদী। তাই কবি প্রকৃতির প্রতি সচেতন হয়ে ‘বৃক্ষরোপণ’ নামে গাছ লাগানোর একটি উৎসবেরও সূচনা করেছিলেন শান্তিনিকেতনে।
বড়ো বড়ো গাছ গুরুদেব খুব পছন্দ করতেন। বলতন, আমি ভালোবাসি অরণ্য - বড়ো বড়ো গাছ, বনস্পতি। তার ছায়া প্রাণ মাতিয়ে তোলে। অনেকে আবার তা সহ্য করতে পারেন না; যখনই দেখেন গাছ বড়ো হল, অমনি কাট তাকে। ঐ একটু একটু গাছে একটু একটু রঙ নিয়েই তারা খুশি। আশ্চর্য, বড়ো গাছের মাথায় যখন মেঘ করে আসে, তার সৌন্দর্যের কি তুলনা হয় - যখন সেই মেঘের ছায়া এসে পড়ে ঐ একটু একটু গাছের উপরে - তার সঙ্গে?
বর্ষার জল পেয়ে মাটির তলার কবেকার কোন্ শুকনো বীজ অঙ্কুরিত হয়ে এখানে-ওখানে মাথা তুলত; গুরুদেব খুব খুশি হয়ে উঠতেন, ঘুরে ঘুরে দেখে বেড়াতেন। সেই সেই গাছ সেখানেই বাড়তে দিতেন। বড়ো গাছ কেউ কাটলে তিনি প্রাণে ব্যথা পেতেন। আগে আশ্রমে আতা গাছ ছিল না। আতা যে সে মাটিতে হতে পারে তা জানা ছিল না কারো। একবার দু-তিনটে আতা গাছ হল উত্তরায়ণে, খুব ভালো আতা ফলল। গুরুদেব আতা খেয়ে বীজগুলি প্লেটে না রেখে হাতে নিয়ে দু দিকে ছুঁড়ে ছুঁড়ে ফেলতেন। বলতেন, হোক গাছ - যেখানে যেখানে ঠাঁই পাবে শিকড় মেলুক এরা; পথ-চলতি লোকেরাও তুলে নিয়ে খাবে একদিন এ ফল।
সেই বীজ হতে পরে অনেক গাছ হয়েছিল উত্তরায়ণে। 'শ্যামলী' বাড়ির ধারে এক সময়ে আতা গাছের বেড়াই তৈরি হল গুরুদেবের ফেলা বীজ হতে। কত তাল, জাম, হিমুঝুরি, মহানিম হয়েছে এখানে-ওখানে আশ্রমে বর্ষার জলে আপনা হতে।
'কোনার্ক' বাড়ির সামনের বারান্দার ঠিক সামনে উঠল এক শিশু শিমুল এক বর্ষার শেষে। গুরুদেব দেখে খুব খুশি। দিনে দিনে তাকে লালন করেন, গোড়ায় জল নিয়মিত ঢালান। কবিপুত্র রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর ভয় পান, শিমুলগাছ আকারে বেজায় বাড়ে, আর তেমনই তার পলকা দেহ। ঝড়ে হাওয়ায় ভেঙে যদি পড়ে কখনো, বারান্দার ছাদ যাবে ধসে। গাছটাকে ওখানে হতে না-দেওয়াই ভালো।
গুরুদেব দুঃখ পান শুনে। দিনে দিনে সে গাছ মাথা ছাপিয়ে ওঠে। আর এক বর্ষায় মালতীলতা দেখা দেয় তার তলায়, গুরুদেব মালতীর লিকলিকে কচি লতাটি তুলে জড়িয়ে দেন কিশোর শিমুলের গায়ে। লতা বেড়ে উঠুক আশ্রয় পেয়ে। সেই শিমুল শেষে একদিন মহীরুহতে পরিণত হল। মালতী তার সর্বাঙ্গে পাকে পাকে জড়িয়ে আছে আজও। এই শিমুলের ছায়ায় গুরুদেব কত সকালে কত বিকেলে বসে চা খেয়েছেন, গল্প করেছেন। মাথার উপরে ডালে ডালে কচি পল্লব দুলেছে, মাটিতে শিমুল ফুল লুটিয়ে পড়েছে, ফল ফেটে হাওয়ায় তুলোর ঝরনা ঝরেছে। বর্ষায় শুভ্র মালতী লাল কাঁকরের উপর সাদা গালিচা বিছিয়েছে। এই মালতীকে নিয়েই গুরুদেব গান গেয়েছেন, "তব ভবনদ্বারে রোপিলে যে মালতী সে মালতী আজি বিকশিতা"।
বারান্দার একপাশে ছিল নীলমণি লতা, এধারে ওধারে মধুমালতী, ছিল কুরচি গোলঞ্চ হেনার মঞ্জরী। সবাইকে নিয়ে জড়িয়ে যেন থাকতেন তিনি। কার কবে কুঁড়ি এল, কে কবে ফুল ফোটাল, কখন তারা কোন্ সময়ে পাতা ঝরিয়ে দিল, দিনে দিনে চেয়ে দেখতেন। যেন কথা কইতেন তাদের সঙ্গে। যেন তারা ছিল তাঁর বড়ো আপন জন।
গুরুদেব ‘হলকর্ষণ’ নামে একটি প্রবন্ধ রচনা করেছিলেন। ১৯২৫ সালের ২৫ বৈশাখ কবির জন্মোৎসব পালিত হয় শান্তিনিকেতনে। ‘বৃক্ষরোপণ’ উপলক্ষে সেদিন কবির সদ্য রচিত গানও গাওয়া হয়। রবীন্দ্রনাথ তাঁর পুত্র রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও বন্ধুপুত্র সন্তোষচন্দ্র মজুমদারকে আমেরিকার ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠিয়েছিলেন। কনিষ্ঠা কন্যা মীরার বিয়ের পর জামাতা নগেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়কে বিদেশ পাঠান কৃষিবিদ্যা শেখার জন্য। যে যুগে সন্তানদের আইসিএস বা ব্যারিস্টার বানানো ছিল উচ্চবিত্ত বাঙালি জমিদার পরিবারগুলির 'এলিট রীতি', সে সময় রবি ঠাকুর জমিদারের পুত্র হয়েও জামাতা আর বন্ধুপুত্রকে চাষাবাদ শিখতে বিদেশ পাঠানোর মত একটা বৈপ্লবিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। শুধু তাই নয়, সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িতও করছেন তিনি। কবিপুত্র এবং কবির বন্ধুপুত্র বিদেশ থেকে ফিরে কবির নির্দেশনায় শুরু করেন বৈজ্ঞানিক প্রথায় চাষ। সার, বীজ, সেচ ইত্যাদির ব্যবহার সম্বলিত কৃষিকাজ শুরু করলেন তাঁরা।
এছাড়াও কুটির শিল্প স্থাপন করে রবীন্দ্রনাথ গ্রামীণ মানুষকে কৃষিজ-শিল্পে উৎসাহিত করতে দেখা যায়।এটিও তার পরিবেশ সচেতনতার অংশ। একজন একনিষ্ঠ প্রকৃতি-কর্মী হিসাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন তিনি। কৃষি ব্যাঙ্ক স্থাপন, ক্ষুদ্র ঋণ বিতরণ ও কৃষিকাজের নানাবিধ উন্নতি সাধন করেন তিনি। পরিবেশকে বিপর্যস্ত ও বিপন্ন হতে দেখে কবি বারেবারে বিচলিত হয়েছেন।১৯১৪ সালের ঘটনা, জাপান যাওয়ার পথে একটি জাহাজ থেকে তেল পড়তে দেখে তিনি অবাক হয়ে যান। আধুনিক মানুষের প্রকৃতির প্রতি এই উদাসীন মনোভাব রবিকে তীব্র ভাবে নাড়া দেয়। রবীন্দ্রনাথ অবশ্যই উন্নয়নে বিশ্বাসী ছিলেন কিন্তু পরিবেশকে বিপর্যস্ত করে একেবারেই নয়।
রবীন্দ্রনাথ শতবর্ষ আগে পরিবেশের রুগ্ন দশা দেখে তা রক্ষার ব্যাপারে সোচ্চার হয়েছিলেন তাঁর লেখনীর মাধ্যমে। ‘শিল্পায়ন, নগরায়ণে'র নামে ফসলি জমির যে ক্ষতি হচ্ছে রবীন্দ্রনাথ তা দেখে বিচলিত হন। লেখেন একের পর এক প্রবন্ধ - ‘পল্লী-প্রকৃতি’ ‘ভূমিলক্ষী’ ,‘দেশের কাজ’, ‘শ্রীনিকেতন’ ,‘পল্লী সেবা’ ও ‘উপেক্ষিতা পল্লী’। একটি শিমুল গাছের প্রতি প্রেম থেকে লেখেন ‘বলাই’ গল্পটি। একাধিক লেখায় রবীন্দ্রনাথ বুঝিয়েছেন তিনি একজন প্রথম সারির পরিবেশ সচেতন দার্শনিক।রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যে তাই প্রকৃতির উপস্থিতি অবাধ। তাঁর গান, গল্প, নাটক, উপন্যাস, কাব্য সর্বত্রই প্রকৃতিকে ঘিরে। ‘ছিন্নপত্র’ পাঠ করলে আমরা বুঝতে পারি কতখানি প্রকৃতি প্রেমিক মানুষ ছিলেন।
কবি সুকান্তের কথায় ----
"...........জীর্ণ পৃথিবীতে ব্যর্থ, মৃত আর ধ্বংসস্তূপ-পিঠে।
চলে যেতে হবে আমাদের।
চলে যাব-
তবু আজ যতক্ষণ দেহে আছে প্রাণ
প্রাণপণে পৃথিবীর সরাব জঞ্জাল,
এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য করে যাব আমি—
নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার।......"