অভিমানি ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ---- সাংবাদিকতা ও বাংলা সাহিত্য । প্রসূন কাঞ্জিলাল।
অভিমানি ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ----
সাংবাদিকতা ও বাংলা সাহিত্য ।
প্রসূন কাঞ্জিলাল।
দ্বিশতবর্ষের পরেও বিদ্যাসাগর স্মরণ এবং শ্রদ্ধা এ প্রজন্মের বাঙালিকে করছে ঋদ্ধ। উৎসাহিত করছে এই অন্যতম শ্রেষ্ঠ যুগপুরুষকে জানতে এবং আত্মস্থ করতে। রক্ত-মাংসের এই ঈশ্বরের সামগ্রিক কর্মকান্ডের ক'য়েক শতাংশও যদি থাকত অনুপস্থিত, তবে জাতি হিসেবে বাঙালি যে আজ কতটা দীন থেকে যেত তা কল্পনায় আনলেই শিউরে উঠতে হয়। বিদ্যাসাগরের মতো মহামানবের জন্মের জন্য যেমন অপেক্ষা করতে হয় ক'য়েকটা শতাব্দী, তেমনই যে জাতির একজন বিদ্যাসাগর থাকে সে জাতিকে অন্ধকারের অতল গহ্বর থেকে ক'য়েক শতাব্দী এগিয়ে নিয়ে যায় এই ঈশ্বর। বিদ্যাসাগরের মতো ঈশ্বররা কোনো একটি বিশেষ কাজের জন্যও জন্মান না। এক জীবনে বহু কাজের মাধ্যমে সমগ্র জাতিকে ক'য়েক শতাব্দী এগিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব তুলে নেন কাঁধে।
বিদ্যাসাগরের কর্মময় জীবনের অজস্র ধারার অন্যতম ছিল সাংবাদিকতা। পেশা নয়, তাঁর বহুমুখী কর্মকাণ্ডকে পূর্ণতা দিতেই হাতে তুলে নিতে হয়েছিল সাংবাদিকের কলম। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে বেশ ক'য়েকটি সাময়িক পত্রের দায়িত্ব তাঁকে সামলাতে হয়েছে দীর্ঘদিন। 'তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা', 'সর্বশুভকরী পত্রিকা', 'সোমপ্রকাশ' ও 'হিন্দু পেট্রিয়ট' ছিল তাঁর এই পর্বের কর্মকান্ডের বিচরণ ক্ষেত্র। তত্ত্ববোধিনী ও সোমপ্রকাশ ছিল সেই সময়ের অত্যন্ত প্রভাবশালী দুটি বাংলা পত্রিকা। শিক্ষিত বাঙালি সমাজে অত্যধিক প্রভাবশালী ইংরেজি পত্রিকা ছিল হিন্দু পেট্রিয়ট ।
ব্রাহ্ম সমাজের নিজস্ব সংগঠন তত্ত্ববোধিনী সভা গঠিত হয় ১৮৩৯ সালে। ব্রাহ্ম ধর্মের প্রচার এবং ব্রাহ্ম সমাজের সদস্যদের মধ্যে যোগাযোগের উদ্দেশ্যে ১৮৪৩ সালে জন্ম হয় তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা। পত্রিকার সার্বিক তত্ত্বাবধানে ছিলেন দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর। পত্রিকার জন্য রীতিমতো পরীক্ষা নিয়ে সম্পাদক হিসেবে অক্ষয় কুমার দত্ত কে নিযুক্ত করেন দেবেন্দ্রনাথ। সম্পাদক মন্ডলীর সদস্য হিসেবে কাজ শুরু করেন দেবেন্দ্রনাথ, বিদ্যাসাগর, রাজনারায়ণ বসু ও রাজেন্দ্রলাল মিত্র। তত্ত্ববোধিনী পত্রিকার জন্মলগ্ন থেকে জীবনের প্রায় শেষ লগ্ন পর্যন্ত বিদ্যাসাগর ছিলেন এই পত্রিকার সাথে ওতপ্রোতভাবে ভাবে জড়িত। যদিও পত্রিকার পথ চলা শুরু হয় মূলত ব্রাহ্ম ধর্মের প্রচার ও বেদান্ত সাহিত্য চর্চার উদ্দেশ্যে। কিন্তু অচিরেই এই পত্রিকায় ইতিহাস, বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদ নির্ভর বিভিন্ন লেখা প্রকাশ হতে থাকে। সম্পাদক অক্ষয়কুমার দত্তের ইচ্ছা এবং বিদ্যাসাগরের প্রেরণায় তত্ত্ববোধিনী পত্রিকার এই পরিবর্তন সম্ভব হয়। একটা পর্যায়ে এসে সম্পাদক অক্ষয়কুমারের সাথে নিয়োগকর্তা দেবেন্দ্রনাথের নিয়মিত তর্ক-বিতর্ক ও মতান্তর ঘটেছে মূলতঃ বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদ নির্ভর বিভিন্ন লেখাকে কেন্দ্র করে। কিন্তু প্রতিটি ক্ষেত্রেই বিদ্যাসাগরের সমর্থন ছিল অক্ষয়কুমারের পক্ষে। এই সময় বিদ্যাসাগর এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন তত্ত্ববোধিনীর পথ নির্নয় এবং মান নির্ধারণে। বিভিন্ন বিষয়ে মূল্যবান প্রবন্ধ এমনকি কখনো কখনো সম্পাদকীয় ও লিখতে হতো বিদ্যাসাগরকে। ক্রমশ বিজ্ঞান, ইতিহাস, দর্শন, সমাজতত্ত্বের আলোচনার এক গুরুত্বপূর্ণ পত্রিকা হিসেবে পরিচিতি লাভ করে তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা। বাংলা সাহিত্য, সংস্কৃতি ও সভ্যতার বিকাশে সেই সময় তত্ত্ববোধিনী পত্রিকার অবদান যেমন অস্বীকার করা যাবে না, তেমনই তত্ত্ববোধিনীকে ওই উচ্চতায় পৌঁছে দেওয়ার নেপথ্যে বিদ্যাসাগরের অবদান কে ও স্বীকার না করার স্পর্ধাও করা যায় না।
১৮৫০ সালে পন্ডিত মদনমোহন তর্কালঙ্কারের সহযোগিতায় বিদ্যাসাগর শুরু করেন এক সাময়িকী - 'সর্ব্বশুভকরী' পত্রিকা। পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন মোতিলাল চট্টোপাধ্যায়। কিন্তু আসলে পত্রিকার কান্ডারী ছিলেন দুই পন্ডিত - ঈশ্বরচন্দ্র এবং মদনমোহন। এ পত্রিকা মূলত বিদ্যাসাগরের সমাজ সংস্কার সম্পর্কিত ভাবনা চিন্তা প্রতিফলনের মাধ্যম ছিল। যদিও মাত্র ক'য়েকটি সংখ্যার পর পত্রিকার প্রকাশনা বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু অল্প ক'য়েকটি সংখ্যা তেই বিদ্যাসাগরের সমাজ সংস্কার বিষয়ক অসংখ্য লেখা শিক্ষিত বাঙালি সমাজকে করেছিল যথেষ্ঠ প্রভাবিত। পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত বাঙালি সমাজের পাশাপাশি প্রাচীনপন্থী গোঁড়া সমাজপতিদেরও আলোড়িত করেছিল এই পত্রিকা।
১৮৫৮ সালে বিদ্যাসাগর শুরু করলেন সোমপ্রকাশ পত্রিকা। তাঁর বন্ধু ও সহকর্মী দ্বারকানাথ বিদ্যাভূষণ ছিলেন পত্রিকার সম্পাদক। কিন্তু পত্রিকা প্রকাশের প্রাথমিক পরিকল্পনা এবং আত্মপ্রকাশ - সবটাই বিদ্যাসাগরের হাত ধরে। একটি সূত্রে জানা যায় যে, এ পত্রিকার প্রথম সংখ্যার সমস্ত লেখা ই নাকি বিদ্যাসাগর নিজে লেখেন। পরে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লে সম্পাদনার দায়িত্ব অর্পণ করেন দ্বারকানাথকে। দ্বারকানাথের সম্পাদনা ও বিদ্যাসাগরের সক্রিয় সহযোগিতায় সোমপ্রকাশ হয়ে ওঠে বাংলার প্রথম শ্রেণীর সংবাদ সাময়িকী। বিদ্যাসাগরের সাথেই সংস্কৃত কলেজে অধ্যাপনা করতেন দ্বারকানাথ বিদ্যাভূষণ। দ্বারকানাথের গ্রামের বাড়ি চব্বিশ পরগনার চাংড়িপোতায় (অধুনা সুভাষগ্রাম) একটি মুদ্রণযন্ত্র বসিয়ে ছিলেন তাঁর পিতা। তাই ১৮৬২ সালে মাতলা রেল ( শিয়ালদহ-ক্যানিং ) চালু হবার পর সোমপ্রকাশ প্রকাশিত হতে থাকে চাংড়িপোতা থেকেই। বিদ্যাসাগরের প্রগতিশীল চিন্তা ভাবনা এবং উদ্যোম আর দ্বারকানাথের মুদ্রণযন্ত্র ,আর্থিক সঙ্গতি ও স্বচ্ছ সামাজিক, রাজনৈতিক চেতনা সোমপ্রকাশকে এমন উচ্চতায় নিয়ে যায় যে, বিভিন্ন বিষয়ে জনমত গঠনে অতি প্রভাবশালী ভূমিকা গ্রহণ করে এই পত্রিকা। ১৮৭৮ সালে ব্রিটিশ সরকার জারি করল ভার্নাকুলার প্রেস অ্যক্ট। এই আইনের বিরোধিতা করে বিদ্যাসাগরের সম্মতিতেই এক বছর পত্রিকা প্রকাশ বন্ধ রাখেন দ্বারকানাথ। বাল্য বিবাহ ও কৌলিন্য প্রথার বিরোধীতা করে এবং নারী-শিক্ষা ও বিধবা বিবাহের পক্ষে অজস্র লেখা নিয়মিত প্রকাশিত হতো সোমপ্রকাশে।
বিদ্যাসাগরের সাথে আর যে সাময়িক পত্রের প্রত্যক্ষ সম্পর্ক ছিল সেটা হিন্দু পেট্রিয়ট। ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত উচ্চ ও মধ্যবিত্ত বাঙালির নিজস্ব পত্রিকা ছিল এই সাময়িকী। পত্রিকার সত্ত্বাধিকারী ও সম্পাদক হরিশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের ক্ষুরধার লেখনী নীল বিদ্রোহের সময় যে ভাবে কৃষকদের পক্ষে দাঁড়িয়ে বিদ্রোহকে সমর্থন করেছিল তাতে অজস্র দেশবাসীর শ্রদ্ধা ও সমর্থন পেয়েছিল পত্রিকা। যদিও ব্রিটিশ শাসনের সার্বিক বিরোধিতার পরিবর্তে বিভিন্ন বিষয়ে সহযোগিতা এবং ওদশের পার্লামেন্টে আবেদন-নিবেদনের পক্ষেই সাধারণ অবস্থান ছিল এ পত্রিকার। তথাপি বিরাট অংশের শিক্ষিত মানুষের মধ্যে প্রভাব ছিল হিন্দু পেট্রিয়টের। ১৮৬১ সালে হরিশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের মৃত্যুর পর পত্রিকার মালিকানা কিনে নিয়ে হিন্দু পেট্রিয়ট চালাতে শুরু করেন কালিপ্রসন্ন সিংহ। ক'য়েক মাস পরে তিনি পত্রিকার দায়িত্ব সমর্পন করেন বিদ্যাসাগরকে। পত্রিকার সম্পাদক হিসাবে বিদ্যাসাগর নিয়োগ করেন কৃষ্টদাস পালকে। পরে ১৮৬২ সালে এক ট্রাস্টি গঠন করে পত্রিকার নীতি নির্ধারণের দায়িত্ব তাদের ওপর সমর্পন করেন বিদ্যাসাগর। সেই সময় পত্রিকার প্রভাব প্রতিপত্তি ও পাঠক সংখ্যা যথেষ্ট বৃদ্ধি পায়। পরে এ পত্রিকা দৈনিকেও রূপান্তরিত হয়। যদিও দৈনিক হিন্দু পেট্রিয়ট স্থায়ী হয়নি বেশি দিন।
সামন্ততন্ত্রের নিগড়ে বাঁধা মধ্যযুগীয় কুসংস্কারাচ্ছন্ন এক জাতিকে অন্ধকারের অতল গহ্বর থেকে টেনে তুলে আধুনিক সভ্যতার আলোয় পৌঁছে দিতে সমস্ত জীবন নিয়োগ করেছিলেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। আর সেই কাজ সম্পূর্ণ করতেই তাঁকে পালন করতে হয় বিভিন্ন ভূমিকা। সাংবাদিকতাও সেই কর্মকান্ডের ই অংশ। আর সে ক্ষেত্রেও তাঁর অবদান অস্বীকার করার স্পর্ধা কোনো বঙ্গভাষীর অন্তত নেই।
‘‘জল পড়ে,পাতা নড়ে।’’--- ‘রবীন্দ্রনাথ’ তখন ‘কর, খল’ প্রভৃতি বানানের তুফান কাটিয়ে সবেমাত্র তীরের খোঁজ পেয়েছিলেন। সেদিন যখন তিনি বিদ্যাসাগরের ‘বর্ণপরিচয় প্রথমভাগ’ থেকে ‘‘জল পড়ে, পাতা নড়ে’’ পড়েছিলেন, তখন তাঁর শিশুমনে একটা অপূর্ব অনুভূতি জেগেছিল। ‘জীবনস্মৃতি’তে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন,
‘‘আমার জীবনে এইটেই আদিকবির প্রথম কবিতা। সেদিনের আনন্দ আজও যখন মনে পড়ে তখন বুঝিতে পারি, কবিতার মধ্যে মিল জিনিসটার এত প্রয়ােজন কেন। মিল আছে বলিয়াই কথাটা শেষ হইয়াও শেষ হয় না - তাহার বক্তব্য যখন ফুরায় তখনাে তাহার ঝংকারটা ফুরায় না, মিলটাকে লইয়া কানের সঙ্গে মনের সঙ্গে খেলা চলিতে থাকে। এমনি করিয়া ফিরিয়া ফিরিয়া আমার সমস্ত চৈতন্যের মধ্যে জল পড়িতে ও পাতা নড়িতে লাগিল।’’
‘রবীন্দ্রনাথ’ বিদ্যাসাগরকে ‘আদিকবির সম্মান’ দিয়েছিলেন। সাহিত্যের সমালােচক যাঁরা তাঁরা অবশ্য তা দেননি। তাঁরা বলেন, বিদ্যাসাগর বিদ্যালয়ের ছাত্রদের জন্য পাঠ্যপুস্তক লিখেছিলেন। তা ছাড়া এমন কিছু তিনি রচনা করেননি যা ‘প্রকৃত সাহিত্য’ বলে গণ্য হতে পারে। সমালােচকরা যে বাঁধাধরা ‘মাপাজোকা মানদণ্ড’ দিয়ে সাহিত্যের বিচার করেন তাতে বিদ্যাসাগরকে ‘পাঠ্যপুস্তকের লেখক’ ছাড়া আর কিছু বলা যায় না। কিন্তু সাহিত্য রচনা করতে হলে আগে তার ‘উপযুক্ত ভাষা’ তৈরি করা দরকার। বিদ্যাসাগরের আগে পর্যন্ত ‘বাংলা গদ্যভাষার’ যে বিকাশ হয়েছিল তা দিয়ে ঠিক সাহিত্য রচনা করা সম্ভব ছিল না। বিদ্যাসাগর বাংলাভাষাকে ‘সাহিত্যের উপযােগী’ করে গড়ে তােলার ব্রত গ্রহণ করেছিলেন। তাই তাঁকে ‘বাংলাভাষার আর্কিটেক্ট বা স্থপতি’ বলা যায়। বাংলা ভাষার কাঠামোটাকে অনেকদূর পর্যন্ত কল্পনা করে তাঁকে গড়তে হয়েছিল। বাধ্য হয়ে তাঁকে তাই স্কুলপাঠ্যবই, ‘অনুবাদ ও ভাবানুগামী’ রচনা বেশি লিখতে হয়েছিল। কিন্তু বাংলাভাষাকে যিনি ‘শিশুর অস্ফুট শব্দধ্বনি’ থেকে ‘সুবিন্যস্ত সংহত সাধুভাষায়’ পরিণত করেছিলেন, তাঁর ‘প্রতিভার সমাদর’ ‘রবীন্দ্রনাথের’ মতন প্রতিভাবানই করতে পেরেছিলেন।
বিদ্যাসাগর যখন ‘ফোর্টউইলিয়াম কলেজের শেরেস্তাদার’ নিযুক্ত হয়েছিলেন তখন কলেজের কর্তৃপক্ষ তাঁকে সহজপাঠ্য বই বাংলা গদ্যভাষায় লিখতে বলেছিলেন। তখন বিদ্যাসাগর ‘বাসুদেব চরিত’ রচনা করেছিলেন। বইখানি শেষ পর্যন্ত ছাপা হয়নি। তাঁর সেই বইয়ের পাণ্ডুলিপিতে গদ্যভাষার যে নিদর্শন পাওয়া যায় তা এইরূপ -
‘‘একদিবস মহর্ষি নারদ মথুরায় আসিয়া কংসকে কহিলেন, ‘মহারাজ! তুমি নিশ্চিন্ত রহিয়াছ, কোনও বিষয়ের অনুসন্ধান কর না; এই যাবৎ গােপী ও যাদব দেখিতেছ, ইহারা দেবতা, দৈত্যবধের নিমিত্ত ভূ-মণ্ডলে জন্ম লইয়াছে, এবং শুনিয়াছি, দেবকীর গর্ভে জন্মগ্রহণ করিয়া নারায়ণ তােমার প্রাণসংহার করিবেন’ ...।’’
এই গদ্যভাষা পড়লে মনে হয় না যে এটি ঊনিশ শতকের চল্লিশের গােড়ার দিকের রচনা। বাক্যগঠন ও শব্দবিন্যাসের এই রীতি কিছুদিন আগে পর্যন্ত ‘বাংলা সাহিত্যের সাধুভাষার আদর্শ রীতি’ ছিল। ‘বাসুদেব চরিতে’র পরে ‘বেতালপঞ্চবিংশতি’ (১৮৪৭) থেকে ‘ভূগােলখগােল বর্ণনম’ (১৮৯২) পর্যন্ত বিদ্যাসাগরের লেখা প্রায় ২৭টি বই প্রকাশিত হয়েছিল। এ ছাড়া বেনামীতে লেখা আরও প্রায় পাঁচটি বই তাঁর আছে বলে শােনা যায়। তাঁর সম্পাদিত সংস্কৃত ও বাংলা বইয়ের সংখ্যা প্রায় ১২টি। এইগুলির অধিকাংশই হয় কোন মূলগ্রন্থের অনুবাদ অথবা পাঠ্যবই। ভাব অনুসরণে লেখা হলেও লেখকের নিজস্ব কোন সৃষ্টিশক্তি আছে কিনা তা তাঁর রচনার গুণ থেকেই প্রকাশ পায়। বিদ্যাসাগরের ‘শকুন্তলা’ ও ‘সীতার বনবাস’ পড়লে বােঝা যায় যে তাঁর নিজস্ব রচনা শক্তি যথেষ্ট ছিল এবং ইচ্ছা করলে মৌলিক রচনাও তিনি অনেক লিখে যেতে পারতেন। কিন্তু তা তিনি করেন নি। তিনি ‘বাংলাভাষার কারিগরের কাজ’ই করেছিলেন বেশি।
আগেই বলা হয়েছে, বিদ্যাসাগরের বেশিরভাগ বাংলা রচনাই হল অনুবাদ, সঙ্কলন বা পাঠ্যপুস্তক। তিনি যে বই লিখেছেন তা থেকে তাঁর উদ্দেশ্য সহজেই বোঝা যায়। তিনি ছিলেন বাংলা গদ্যের সৃষ্টিকর্তা - অতএব একটি লিখিত ভাষাকে গড়ে তুলতে হলে যে সব মালমশলার দরকার হয়, সেগুলো সম্বন্ধেই তিনি বেশি মনোযোগী ছিলেন। ‘আধুনিক বাংলা সাহিত্যের জনক’ ‘বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়’ ‘বাংলাভাষা ও সাহিত্যে বিদ্যাসাগরের দান’ সম্বন্ধে লিখেছিলেন - ‘‘প্রবাদ আছে যে রাজা রামমোহন রায় সে সময়ের প্রথম গদ্য লেখক। তাঁহার পরে যে গদ্যের সৃষ্টি হইল, তাহা লৌকিক বাঙ্গলা ভাষা হইতে সম্পূর্ণরূপে ভিন্ন। এমনকি বাঙ্গলা ভাষা দুইটি স্বতন্ত্র বা ভিন্ন ভাষায় পরিণত হইয়াছিল। একটির নাম সাধুভাষা অর্থাৎ সাধুজনের ব্যবহার্য্য ভাষা, আর একটির নাম অপর ভাষা অর্থাৎ সাধু ভিন্ন অপর ব্যক্তিদিগের ব্যবহার্য্য ভাষা। এ স্থলে সাধু অর্থে পণ্ডিত বুঝিতে হইবে ... এই সংস্কৃতানুসারিণী ভাষা প্রথম মহাত্মা ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ও অক্ষয় কুমার দত্তের হাতে কিছুটা সংস্কার প্রাপ্ত হইল। ইহাদিগের ভাষা সংস্কৃতানুসারিণী হইলেও তত দুর্ব্বোধ্য নহে। বিশেষতঃ বিদ্যাসাগর মহাশয়ের ভাষা অতি সুমধুর ও মনোহর। তাঁহার পূর্বে কেহই এরূপ সুমধুর বাঙ্গলা গদ্য লিখিতে পারে নাই এবং তাঁহার পরেও কেউ পারে নাই।’’
‘রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর’ এই বিষয়ে ‘বিদ্যাসাগরের’ যে প্রশংসা করেছিলেন তা ‘বঙ্কিমচন্দ্রের’ চেয়েও বেশি। তিনি তাঁর ‘বিদ্যাসাগর চরিত’ গ্রন্থে লিখেছিলেন - ‘‘তাঁহার প্রধান কীর্তি বঙ্গভাষা। যদি এই ভাষা কখনো সাহিত্যসম্পদে ঐশ্বর্য্যশালিনী হইয়া ওঠে, যদি এই ভাষা অক্ষয় ভাবজননীরূপে মানব সভ্যতার ধাত্রীগণের ও মাতৃগণের মধ্যে গণ্য হয় - যদি এই ভাষা পৃথিবীর শোকদুঃখের মধ্যে এক নতুন সান্ত্বনাস্থল, সংসারের তুচ্ছতা ও ক্ষুদ্র স্বার্থের মধ্যে এক মহত্বের আদর্শলোক, দৈনন্দিন মানবজীবনের অবসাদ ও অস্বাস্থ্যের মধ্যে সৌন্দর্য্যের এক নিভৃত নিকুঞ্জবন রচনা করিতে পারে, তবেই তাঁহার এই কীর্ত্তি তাঁহার উপযুক্ত গৌরব লাভ করিতে পারিবে। ... বিদ্যাসাগর বাংলা ভাষার প্রথম যথার্থ শিল্পী ছিলেন। তৎপূর্ব্বে বাংলায় গদ্য সাহিত্যের সূচনা হইয়াছিল, কিন্তু তিনিই সর্ব্বপ্রথমে বাংলা গদ্যে কলানৈপুণ্যের অবতারণা করেন। ... সৈন্যদলের দ্বারা যুদ্ধ সম্ভব, কেবলমাত্র জনতার দ্বারা নহে। ... বিদ্যাসাগর বাংলা গদ্যভাষার উশৃঙ্খল জনতাকে সুবিভক্ত, সুবিন্যস্ত, সুপরিচ্ছন্ন ও সুসংযত করিয়া তাহাকে সহজ গতি ও কার্য্যকুশলতা দান করিয়াছেন। এখন তাহার দ্বারা অনেক সেনাপতি ভাব প্রকাশের কঠিন বাধা-সকল পরাহত করিয়া সাহিত্যের নব নব ক্ষেত্রে আবিষ্কার ও অধিকার করিয়া লইতে পারেন, - কিন্তু যিনি এই সেনার রচনাকর্তা, যুদ্ধজয়ের যশোভাগ সর্ব্বপ্রথম তাঁহাকেই দিতে হয়। বাংলা ভাষাকে পূর্ব্বপ্রচলিত অনাবশ্যক সমাসড়ম্বরভার হইতে মুক্ত করিয়া, তাহার পদগুলির মধ্যে অংশযোজনার সুনিয়ম স্থাপন করিয়া, বিদ্যাসাগর যে বাংলা গদ্যকে কেবলমাত্র সর্ব্বপ্রকার-ব্যবহারযোগ্য করিয়াই ক্ষান্ত ছিলেন তাহা নহে, তিনি তাহাকে শোভন করিবার জন্যও সর্ব্বদা সচেষ্ট ছিলেন। গদ্যের পদগুলির মধ্যে একটা ধ্বনিসামঞ্জস্য স্থাপন করিয়া তাহার গতির মধ্যে একটা অনতিলক্ষ্য ছন্দস্রোত রক্ষা করিয়া, সৌম্য ও সরল শব্দগুলি নির্ব্বাচন করিয়া, বিদ্যাসাগর বাংলা গদ্যকে সৌন্দর্য্য ও পরিপূর্ণতা দান করিয়াছেন। গ্রাম্য পাণ্ডিত্য ও গ্রাম্য বর্ব্বরতা, উভয়ের হস্ত হইতেই উদ্ধার করিয়া তিনি ইহাকে পৃথিবীর ভদ্রসভার উপযোগী আর্য্য-ভাষারূপে গঠিত করিয়া গিয়াছেন। তৎপূর্ব্বে বাংলা গদ্যের যে অবস্থা ছিল তাহা আলোচনা করিয়া দেখিলে এই ভাষাগঠনে বিদ্যাসাগরের শিল্পপ্রতিভা ও সৃষ্টিক্ষমতার প্রচুর পরিচয় পাওয়া যায়।’’
বিদ্যাসাগর ১৮৫৫ সালে ‘বর্ণ পরিচয়’ নামে শিশুশিক্ষার একটা প্রাথমিক বই লিখেছিলেন। এটা ছিল আধুনিক শিক্ষাপ্রণালীতে লেখা সর্বপ্রথম প্রাথমিক পুস্তক। ‘বর্ণ পরিচয়’ এক শতাব্দীর বেশি সময় ধরে বঙ্গদেশে প্রচলিত ছিল এবং এক সময়ে প্রত্যেক শিশুকেই শিক্ষা শুরু করতে হত ‘বর্ণ পরিচয়’ দিয়ে। বাঙালির কাছে বিদ্যাসাগরের প্রথম পরিচয় হল দু’আনা (তখকনকার মূল্যে) দামের ‘বর্ণ পরিচয়’ গ্রন্থের লেখক হিসেবে, এবং তারপরে একজন সমাজ সংস্কারক হিসেবে।
১৮০০ সালে ‘ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ’ স্থাপিত হবার সঙ্গে সঙ্গে বাংলা গদ্য রচনা শুরু হল বলে মনে করা যেতে পারে। বঙ্গদেশ তখন ব্রিটিশ শাসনের প্রধান কেন্দ্র ছিল। অতএব বিলেত থেকে যেসব ‘ইংরেজ সিভিলিয়ান কর্মচারী’ আসতেন তাঁদের ঐ কলেজে বাংলাভাষা শিখতে হত। খ্যাতনামা ‘ব্যাপটিস্ট ধর্মযাজক’ ‘উইলিয়াম কেরী’ ছিলেন ওই কলেজের বাংলাভাষা ও সাহিত্য বিভাগের প্রধান অধ্যাপক। তাঁর অধীনে কয়েকজন বাঙালি পণ্ডিতকে নিযুক্ত করা হয়েছিল বিদেশী কর্মচারীদের বাংলাভাষা শেখাবার জন্য। কিন্তু তখনকার দিনে উপযুক্ত প্রাথমিক পাঠ্যপুস্তকের বড় অভাব ছিল। ১৮০১ সালে ‘কেরী’ ‘শ্রীরামপুরের ডাক্তার’ ‘রাইল্যান্ড’কে লিখেছিলেন যে তিনি ‘রাম বসু’কে দিয়ে একজন রাজার (‘রাজা প্রতাপাদিত্য চরিত’) ইতিহাস লিখিয়েছেন। এটিই হল ‘বাংলা সাহিত্যের সর্বপ্রথম গদ্য পুস্তক’। ‘কেরী’র তত্বাবধানে আর যেসব পণ্ডিতদের গদ্য পাঠ্যপুস্তক লেখার কাজে নিযুক্ত করা হয়েছিল তাঁদের মধ্যে বিশেষ উল্লেখযোগ্য ছিলেন ‘মৃত্যুঞ্জয় তর্কালঙ্কার’, ‘গোলকনাথ শর্ম্মা’, ‘তারিণীচরণ মিত্র’ ও ‘চণ্ডীচরণ মুন্সী’। গদ্য রচনার এই প্রাথমিক প্রচেষ্টার কোন ‘সাহিত্যিক মূল্য’ নেই, কেবল ‘ঐতিহাসিক মূল্য’ আছে। এই সব রচনার বেশিরভাগই ছিল ‘কথ্যভাষা ও পণ্ডিতীভাষার একটা বিসদৃশ্য সংমিশ্রণ’। একমাত্র ‘মৃত্যুঞ্জয় তর্কালঙ্কার’ই পাঠযোগ্য বাংলা গদ্য রচনায় কিছুটা সফল হয়েছিলেন, কিন্তু সেই গদ্যকে আধুনিক ভাবপ্রকাশের উপযুক্ত করে তুলতে পারেননি।
‘রামমোহন রায়’ই সর্বপ্রথম বাংলা গদ্যের ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছিলেন। তিনি বাংলা গদ্যকে ‘বিতর্কমূলক আলোচনার উপযুক্ত’ করে গড়ে তুলেছিলেন। সেই বাংলা গদ্যের মাধ্যমে তিনি ‘পৌত্তলিকতা’, ‘একাধিক দেবতায় বিশ্বাস’, ‘সহমরণ’ প্রভৃতি বিষয়ে সংরক্ষণশীল সমাজের সঙ্গে অনেক বাগবিতণ্ডা করেছিলেন। এই সব বিতর্কমূলক রচনা ছাড়াও তিনি সর্বপ্রথম কয়েকখানি সংস্কৃত ‘উপনিষদ’ বাংলায় অনুবাদ করেছিলেন। বাংলা গদ্যকে গড়বার জন্য তিনি এসব প্রাথমিক প্রচেষ্টা করেছিলেন বটে, কিন্তু তবুও তিনি ‘বাক্যবিন্যাস ও শব্দচয়ন’ সম্পূর্ণভাবে আয়ত্বাধীনে আনতে পারেননি। তাঁর লেখায় গদ্যের যে প্রধান গুণ অর্থাৎ ‘সামঞ্জস্যপূর্ণ গতিভঙ্গী’ সেই জিনিষটার অভাব ছিল। পরে তৃতীয় দশকে ‘রেভারেন্ড কৃষ্ণমোহন ব্যানার্জী’ এবং ‘ইয়ং বেঙ্গল গোষ্ঠী’ বাংলা গদ্যকে খুব বেশি দূরে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারেননি। প্রধানতঃ ‘ইয়ং বেঙ্গল গোষ্ঠী’র ইংরেজি ঘেঁষা মনোভাবের জন্য বাংলা গদ্য এগোতে পারেনি। চতুর্থ দশকে ‘মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের’ নেতৃত্বে ‘তত্ববোধনী সভা’ ও ‘তত্ববোধনী পত্রিকা’ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এবং সঙ্গে সঙ্গে বাংলা গদ্যের দুই প্রবল শক্তিশালী স্রষ্টা পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ও ‘অক্ষয় কুমার দত্ত’ বাংলা গদ্যের ক্ষেত্রে আবির্ভুত হয়েছিলেন। ‘তত্ববোধনী পত্রিকা’য় ‘ইতিহাস’, ‘দর্শন’, ‘ধর্ম’, ‘নীতিশাস্ত্র’, ‘বিজ্ঞান’, ‘সাহিত্য’, ‘অর্থনীতি’, ‘সমাজনীতি’ প্রভৃতি বিভিন্ন বিষয়ে রচনা লিখতে উৎসাহ দেওয়া হত। এইসব নতুন নতুন জ্ঞানগর্ভ বিষয়ে আলোচনার ফলে চতুর্থ ও পঞ্চম দশকে বাংলা গদ্য খুবই অগ্রসর হয়েছিল। ‘তত্ববোধনী পত্রিকা’র প্রথম সম্পাদক ‘অক্ষয় কুমার দত্ত’ তাঁর শক্তিশালী রচনার দ্বারা বাংলা গদ্যের বিকাশকে আরো এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু এই সময়ে বাংলা গদ্যের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় দান রেখে গিয়েছিলেন বিদ্যাসাগর।
‘বিধবাবিবাহ’, ‘বহুবিবাহ’, ‘বাল্যবিবাহ’ প্রভৃতি বিষয়ে বিতর্কমূলক রচনাতেই হোক বা পাঠ্যপুস্তক, অনুবাদ ও সঙ্কলনমূলক রচনাতেই হোক বিদ্যাসাগরের মূল উদ্দেশ্য ছিল সংস্কৃত ঘেঁষা মার্জিত রচনানীতির কঠিন বাঁধন ও অমার্জিত চলতি ভাষার তুচ্ছতা - এই দুয়ের থেকে বাংলা গদ্যকে মুক্ত করা। তিনি ছিলেন ‘বাংলা গদ্যের সর্বপ্রথম শিল্পসচেতন লেখক’। তিনি জানতেন যে ভাষাকে ‘সাহিত্য ও বিজ্ঞানের উপযুক্ত মাধ্যমরূপে’ গড়ে তোলবার ঐতিহাসিক দায়িত্ব পড়েছিল তাঁর উপর। তিনি যা করে গিয়েছিলেন তার ফলে ‘বঙ্কিম’ ও ‘বঙ্গদর্শন’-এর যুগ আসার পথ প্রশস্ত হয়েছিল। তিনি বাংলা গদ্য রচনাকে বিকাশের শক্তি দিয়েছিলেন। প্রায় একই সময়ে শুরু করে ‘বঙ্কিম’ ও ‘বঙ্গদর্শন’ এই বিকাশকে আরও পূর্ণতার দিকে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন এবং ঊনবিংশ শতাব্দী থেকে বিংশ শতাব্দী পর্যন্ত বাংলা গদ্যকে পূর্ণতর বিকাশের দিকে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন ‘রবীন্দ্রনাথ’।
‘বাংলাভাষা ও সাহিত্যে বিদ্যাসাগরের দান’ কি এবং কতখানি তার ব্যাখ্যা এমনভাবে আর কেউ কবেন নি। এত বড় সম্মান কোন সাহিত্য-সমালােচক বিদ্যাসাগরকে দেন নি। ‘রবীন্দ্রনাথের’ মত অসাধারণ শিল্পীর পক্ষেই ‘বিদ্যাসাগরেব সাহিত্যিক দানেব গুরুত্ব’ পরিপূর্ণরূপে উপলব্ধি করা সম্ভব হয়েছিল। বিদ্যাসাগর সম্বন্ধে রবীন্দ্রনাথের কথাই সত্যি, ‘‘তিনি বাংলাভাষার প্রথম যথার্থ শিল্পী।’’
তিনি ছেলেকে করেছিলেন ত্যাজ্য। বাবা কাশীবাসী। মা সেখানেই কলেরায় মারা গিয়েছেন। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের শেষ জীবন এ রকমই। সাল ১৮৭৫, তারিখ ৩১ মে। স্থান কলকাতা। গভীর রাত।
অভিমানে ক্ষতবিক্ষত এক জন আমহার্স্ট স্ট্রিটের ৬৩ নম্বর বাড়িতে দোতলার একটি ঘরে বসে নিজের হাতে লিখছেন তাঁর ইচ্ছাপত্র বা উইল।
তাঁকে শুধু তাঁর একমাত্র পুত্র বা পরিবার আহত করেনি, তাঁকে রক্তাক্ত করেছে তথাকথিত শিক্ষিত সমাজ, ইংরেজ শাসক, সেই শাসকদের করুণা-লোভী জমিদার শ্রেণির বাবু সম্প্রদায়, এমনকী তাঁর পরম আরাধ্যা জননী। মাত্র পঞ্চান্ন বছর বয়সেই উইল লিখছেন তিনি।
পঁচিশটি অনুচ্ছেদে সম্পূর্ণ এই উইল। এতে রয়েছে তাঁর নিজের সম্পত্তির তালিকা, পঁয়তাল্লিশ জন নরনারীকে নির্দিষ্ট হারে মাসিক বৃত্তি দেবার নির্দেশ। এর মধ্যে ছাব্বিশ জন তাঁর অনাত্মীয়। এ ছাড়াও ব্যবস্থা আছে দাতব্য চিকিৎসালয় ও মায়ের নামে স্থাপিত বালিকা বিদ্যালয়ের জন্য।
সব থেকে বিস্ময়কর পঁচিশ নম্বর অনুচ্ছেদ।-----
‘‘আমার পুত্র বলিয়া পরিচিত শ্রীযুক্ত নারায়ণ বন্দ্যোপাধ্যায় যারপরনাই যথেচ্ছাচারী ও কুপথগামী এজন্য, ও অন্য অন্য গুরুতর কারণবশতঃ আমি তাহার সংশ্রব ও সম্পর্ক পরিত্যাগ করিয়াছি। এই হেতু বশতঃ বৃত্তিনির্বন্ধস্থলে তাঁহার নাম পরিত্যক্ত হইয়াছে এবং এই হেতুবশতঃ তিনি চতুর্বিংশধারা নির্দিষ্ট ঋণ পরিশোধকালে বিদ্যমান থাকিলেও আমার উত্তরাধিকারী বলিয়া পরিগণিত অথবা... এই বিনিয়োগ পত্রের কার্যদর্শী নিযুক্ত হইতে পারিবেন না।’’
পাঁচ পুত্রকন্যার মধ্যে নারায়ণচন্দ্র জ্যেষ্ঠ ও একমাত্র পুত্র। তাকে সব কিছু থেকে বঞ্চিত করার পেছনে গভীর বেদনা ছিল নিশ্চয়ই, কিন্তু ক্রোধের বশবর্তী হয়ে কোনও হঠকারিতা ছিল না।
এই উইল লেখার পর বিদ্যাসাগর ষোলো বছর বেঁচেছিলেন, কিন্তু উইলের একটি শব্দও পরিবর্তন করেননি।
বিদ্যাসাগরের সত্তর বছরের জীবনের অবরোহণ-কাল তার শেষ বত্রিশ বছর। আর উপরোক্ত উইলটি এই সময়ের মধ্যবিন্দুতে রচনা। এই অবরোহণ-কালে ভিড় করে এসেছে বন্ধুমৃত্যু, বন্ধুবিচ্ছেদ, আত্মীয়-বিচ্ছেদ, প্রিয় কন্যাদের বৈধব্য, অর্থাভাব, এমনকী যে পিতামাতার প্রতি তাঁর ভক্তি ছিল প্রবাদপ্রতিম, সেই পিতামাতার সঙ্গেও গভীর মনান্তর। এর শুরু ১৮৫৮ সালের নভেম্বরে, যখন বিদ্যাসাগর পদত্যাগ করলেন সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষের পদ থেকে। আটত্রিশ বছরের যুবকের উদ্যম নিয়ে যখন তিনি শিক্ষা ও সমাজ সংস্কারের কাজে সরকারি ব্যবস্থাকে ব্যবহার করতে চেয়েছেন, ঠিক তখনই প্রতিপত্তি ও স্বাচ্ছন্দ্যের সিংহাসন থেকে তাঁকে নেমে আসতে হয়েছে। বোধহয় তাঁর জীবনের নৈরাশ্যের শুরু সে দিন থেকেই।
এই উইল লেখার এক বছর আগেই অর্থাৎ ১৮৭৪-এ বিদ্যাসাগর নির্দেশ দিয়েছিলেন— নারায়ণ যেন তাঁর বাড়িতে প্রবেশ না করেন। তারও দু’বছর আগে নারায়ণের সঙ্গে তাঁর সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন হল বলে তিনি ঘোষণা করে দিয়েছিলেন। অথচ ১৮৭০ সালে নিজের সমস্ত পরিবার-পরিজন, স্ত্রী ও নিজের মায়ের মতের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে নারায়ণের বিয়ে দিয়েছেন বিধবা কন্যা ভবসুন্দরীর সঙ্গে।
বত্রিশ বছরের ওই দীর্ঘ সময়ে দু’টি মাত্র ঘটনা বিদ্যাসাগরকে আনন্দ দিয়েছিল, মেট্রোপলিটন ইন্সটিটিউশন-এর প্রতিষ্ঠা ও বিকাশ, আর তাঁর ছেলে নারায়ণের বিয়ে।
নারায়ণচন্দ্র বেশি দূর পড়াশোনা করেননি। তাঁর পড়াশোনা শেষ হয়ে যায় গ্রামের পাঠশালাতেই। ঈশ্বরচন্দ্রের দুই ভাই হরচন্দ্র ও হরিশ্চন্দ্র পর পর দু’বছরে কলেরা রোগে মারা যান কলকাতায়। হরিশ্চন্দ্র মারা যাওয়ার পরেই ঠাকুরদাস ঘোষণা করে দিলেন, পৌত্র নারায়ণকে তিনি আর কখনও কলকাতায় পাঠাবেন না। এই ব্যবস্থা কার্যকর হল তাঁর পুত্র ঈশানচন্দ্রের বেলাতেও। বিদ্যাসাগরের স্ত্রী দীনময়ী দেবীও থাকতেন গ্রামের বাড়িতেই।
বাবাকে অনেক বুঝিয়েও এই গোঁ ভাঙতে পারলেন না ঈশ্বরচন্দ্র। ষোলো বছর বয়সেও নারায়ণ আটকে থাকলেন গ্রামের পাঠশালায়। স্নেহান্ধ পিতামহের অতিরিক্ত প্রশ্রয়ে যে ছেলে ঠিকমত মানুষ হচ্ছে না, তা তাঁর চোখ এড়ায়নি। প্রচণ্ড ক্ষোভে এক বার তিনি ঠাকুরদাসকে বলেছিলেন, ‘‘আপনি ঈশান ও নারায়ণের মাথা খাইতেছেন, তথাপি আপনি লোকের নিকট কিরূপে আপনাকে নিরামিষাশী বলিয়া পরিচয় দেন?’’ এর পর কোনও এক সময়ে নারায়ণকে তিনি এক রকম জোর করেই কলকাতায় নিয়ে এসে সংস্কৃত কলেজের বিদ্যালয় বিভাগে ভর্তি করে দেন, কিন্তু নারায়ণ সেখানে পড়েছিলেন মাত্র কয়েক মাস। কিছু দিন পরেই পালিয়ে গ্রামে ফিরে যান।
নারায়ণচন্দ্রের বিয়ের কথা বলবার আগে বলা দরকার তাঁর গ্রামেই অনুষ্ঠিত আর একটি বিধবা- বিবাহের কথা। সালটা ১৮৬৯। ক্ষীরপাই গ্রামের মুচীরাম বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাথে মনমোহিনীর বিয়ে। এই বিয়ের খবরে গ্রামে এলেন ঈশ্বরচন্দ্র। ১৮৬৫-তে ঠাকুরদাস কাশী-যাত্রা করেছেন। ঈশ্বরচন্দ্রই এখন পরিবারের কর্তা। মুচীরাম ছিলেন গ্রামের হালদারদের ধর্মপুত্র। হালদারেরা একযোগে এসে দেখা করলেন ঈশ্বরচন্দ্রের সঙ্গে, অনুরোধ করলেন, যাতে এ বিয়ে না হয়। ঈশ্বরচন্দ্র কথা দিলেন, এ বিয়ে হবে না। কেন এ অনুরোধ, আর কেনই বা বিদ্যাসাগর তা মানলেন, তা জানা যায় না। শুধু বিয়ে হচ্ছে না, এ কথা সবাই জানল। বিদ্যাসাগর মনমোহিনী ও তার মা’কে নিজেদের বাড়ি ফিরে যেতে বললেন।
তখন বর্ষাকাল। সারা রাত ধরে চলছে বৃষ্টি। শেষ রাতে তাঁর ঘুম ভেঙে গেল। বৃষ্টির শব্দ ছাপিয়ে শোনা যাচ্ছে শাঁখের আওয়াজ। মুচীরাম ও মনমোহিনীর বিয়ে হয়ে গিয়েছে তত ক্ষণে। এর প্রধান উদ্যোক্তা তাঁর নিজের ভায়েরাই, বিশেষত দীনবন্ধু ও তাঁর পুত্র নারায়ণ। এতে জননী ভগবতী দেবী ও স্ত্রী দীনময়ীরও সমর্থন ছিল পুরো মাত্রায়।
ভোর হল। সবাইকে ডাকলেন বিদ্যাসাগর। তিনি যাত্রার জন্য প্রস্তুত। অনেক বার তিনি গ্রামে এসেছেন ও ফিরে গিয়েছেন কলকাতায়। কিন্তু এ বারের ফিরে যাওয়া অন্য রকম। সবাইকে বললেন, ‘‘আমি আমার কথা রাখতে পারলাম না। লোকের কাছে অপদস্থ হলাম। গ্রাম ছেড়ে চলে যাচ্ছি। আর কখনও এ গ্রামে ফিরবো না।’’
কারও কোনও কথাই শুনলেন না। পিছনে পড়ে রইল গ্রাম, আত্মীয়-পরিজন, জননী, স্ত্রী-পুত্র, নিজের হাতে গড়া স্কুল— সব কিছু। সে বছরই গোড়ার দিকে আগুন লেগে পুরনো বাড়ি পুড়ে গিয়েছিল বলে বিদ্যাসাগর সবার জন্য কয়েকটি বাড়ি তৈরি করিয়ে দিয়েছিলেন। সেই সব বাড়িতে আর তাঁর পা পড়বে না। এর পরেও বাইশ বছর বেঁচে ছিলেন বিদ্যাসাগর, কিন্তু কোনও দিন আর গ্রামে ফিরে যাননি।
বিদ্যাসাগর একটি প্রেস ও বুক ডিপোজিটরি করেছিলেন, যার নাম সংস্কৃত মুদ্রণযন্ত্র। নিজে প্রচণ্ড ব্যস্ত বিধবাবিবাহ ও নানা রকম সমাজ সংস্কারের কাজে, বই লিখছেন, রয়েছে মেট্রোপলিটন ইন্সটিটিউশন ও অন্যান্য বিদ্যালয়ের দায়িত্ব। কাজেই প্রেস ও ডিপোজিটরির কাজ নিজে দেখার সুযোগ পান কমই। বেতনভোগী কর্মচারীরা সে সুযোগ পূর্ণ মাত্রায় গ্রহণ করে চরম বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি করেছে। এ দিকে তিনি ঋণে জর্জর, বিধবাবিবাহ দিতে গিয়ে। তখন পর্যন্ত ষাট জন বিধবার বিয়েতে খরচ করেছেন প্রায় বিরাশি হাজার টাকা। ঋণের আর একটি কারণ হল, ১৮৬৬-’৬৭ সালের দুর্ভিক্ষে বীরসিংহ ও বর্ধমানে নিজের খরচে খোলা অন্নসত্র। ১৮৬৯ সালে মাত্র আট হাজার টাকায় প্রেসের দুই-তৃতীয়াংশ বিক্রি করে দিলেন দু’জনকে। বুক ডিপোজিটরি দান করে দিলেন কৃষ্ণনগরের ব্রজনাথ মুখোপাধ্যায়কে। তখন তাঁর মন যে অত্যন্ত বিক্ষিপ্ত, তা বোঝাই যায়। যা তিনি ব্রজনাথ মুখোপাধ্যায়কে দান করলেন দশ হাজার টাকায়, সেই ডিপোজিটরি কিনে নেওয়ার লোক কিন্তু মজুত ছিল। তাঁর বিপুল ঋণের বোঝা এতে আরও খানিকটা লাঘব হতে পারত।
এ দিকে শরীরও গিয়েছে ভেঙে। ১৮৬৬ সালের শেষ দিকে এক বিদেশিনি শিক্ষাব্রতী মিস মেরি কার্পেন্টার বিলেত থেকে কলকাতায় এসেছিলেন। লন্ডনে এই মিস কার্পেন্টারের বাবার কাছে আতিথ্য গ্রহণ করেছিলেন রাজা রামমোহন রায়। মেরি এ দেশের স্ত্রীশিক্ষা নিয়ে খুবই আগ্রহী। বেথুন স্কুলে পরিচয় হল বিদ্যাসাগরের সঙ্গে। বিদ্যাসাগরকে সঙ্গে নিয়েই বিভিন্ন স্কুল ঘুরে দেখতে লাগলেন তিনি। ১৮৬৬ সালের ১৬ ডিসেম্বর উত্তরপাড়ায় মেয়েদের একটি স্কুল দেখে ফিরছেন বিদ্যাসাগর। অন্য গাড়িতে আছেন মেরি, ডিপিআই অ্যাটকিনসন এবং ইন্সপেক্টর অব স্কুলস উড্রো সাহেব।
বালি স্টেশনের কাছে যে গাড়িতে বিদ্যাসাগর ছিলেন সেটা হঠাৎ উলটে গেল। ছিটকে পড়ে প্রচণ্ড আঘাত লাগল, অজ্ঞান হয়ে গেলেন তিনি। মিস কার্পেন্টার পথের মধ্যে বসে কোলে তুলে নিলেন অচেতন বিদ্যাসাগরের মাথা।
কলকাতায় আনা হলে ডা. মহেন্দ্রলাল সরকার জানালেন, লিভারে প্রচণ্ড আঘাত লেগেছে ও অ্যাবসেস দেখা দিয়েছে। দীর্ঘ চিকিৎসার পর ব্যথা কিছু কমলেও কোনও দিনই আর সুস্থ হননি। ১৮৯১ সালে তাঁর মৃত্যুর কারণ হিসেবেও লেখা হয়েছিল লিভারে ক্যানসার।
তবে কলম বা কাজ, থেমে থাকেনি কোনওটাই। ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত হল ‘ভ্রান্তিবিলাস’। মাত্র পনেরো দিনে লেখা, লেখায় সময় দিয়েছেন প্রতি দিন মাত্র পনেরো মিনিট। ১৮৭০ সালে ডা. মহেন্দ্রলাল সরকারের উদ্যোগে তৈরি হল ‘ইন্ডিয়ান ইন্সটিটিউট ফর দ্য কালটিভেশন অব সায়েন্স’, সেখানে এক হাজার টাকা দান করলেন বিদ্যাসাগর।
পুত্র নারায়ণের সঙ্গে ষোলো বছরের বিধবা কন্যা ভবসুন্দরীর বিয়ে দিলেন ১১ অগস্ট ১৮৭০ সালে, নিজের পুরো পরিবারের বিরুদ্ধে গিয়ে। স্ত্রী বা মা, কেউই সমর্থন করেননি এই বিয়ে। বিয়ে হল মির্জাপুর স্ট্রিটে কালীচরণ ঘোষের বাড়িতে। নারায়ণের মা বা ঠাকুমা, কেউই আসেননি। নববধূকে বরণ করলেন তারানাথ তর্কবাচষ্পতির স্ত্রী। অত্যন্ত আনন্দিত হয়েছিলেন বিদ্যাসাগর। তখনও তিনি জানতেন না, এই পুত্রকে মাত্র দু’বছরের মধ্যে ত্যাগ করতে বাধ্য হবেন তিনি। আর এই পুত্র-বিচ্ছেদের সঙ্গে সঙ্গেই কার্যত পত্নী-বিচ্ছেদ ঘটেছিল মানুষটির। পুত্রের প্রতি অনমনীয় মনোভাব মানতে পারেননি তিনি। দীনময়ী দেবী মারা যান বিদ্যাসাগরের আগে। বিদ্যাসাগর সমস্ত ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন, কিন্তু নিজে বীরসিংহে শ্রাদ্ধবাসরে যাননি।
১৮৭০। এই বছরেই ভগবতী দেবী কাশীবাসী হন। বিদ্যাসাগরের সঙ্গে তাঁর এক বার দেখা হয়েছিল, যখন বিদ্যাসাগর বাবা ও মা’কে দেখতে আসেন কাশীতে। ১৮৭১ সালে কলেরা রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান ভগবতী দেবী। কলকাতায় সে খবর পেয়ে শোকে শিশুর মতো অধীর হয়ে পড়েছিলেন ঈশ্বরচন্দ্র।
বিধবাবিবাহ সংগঠিত করতে গিয়ে বারবার প্রতারিত হয়ে পরম সুহৃদ দুর্গাচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে তিনি লিখছেন, ‘‘আমাদের দেশের লোক এত অসার ও অপদার্থ বলিয়া পূর্বে জানিলে আমি কখনই বিধবাবিবাহ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করিতাম না।’’ এই পরম সুহৃদ দুর্গাচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ও (স্যর সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাবা) চলে গেলেন ১৮৭০ সালে।
জামতাড়া ও মধুপুরের মাঝে ছোট্ট স্টেশন কর্মাটাড়। সেখানে মূলত সাঁওতালদের বাস। একটু শান্তি পাওয়ার জন্য এখানে একটি বাড়ি করেছিলেন বিদ্যাসাগর। এই সব সরল প্রাণবন্ত মানুষের মাঝে কিছুটা শান্তি পেয়েওছিলেন। বিদেশ থেকে হোমিয়োপ্যাথির বই আনিয়ে তা পড়ে তাঁদের চিকিৎসা করতেন তিনি।
১৮৭৯-এর ফেব্রুয়ারিতে তাঁর সৃষ্ট মেট্রোপলিটন ইন্সটিটিউশন বিএ পড়ানোর অনুমতি পেয়ে প্রথম শ্রেণির কলেজে উন্নীত হল।এ দেশে সম্পূর্ণ বেসরকারি পরিচালনায় এটিই প্রথম ডিগ্রি কলেজ। এবং এটিকেই বলা যেতে পারে তাঁর জীবনের শেষ বড় সাফল্য, যা ছিল অনেক অন্ধকারের মধ্যে একটু আলোর মতো।
শরীরের অবস্থা খুবই খারাপ। তাই কলকাতার বাদুড়বাগানের বাড়ি ছেড়ে তিনি মাঝে মাঝে এসে থাকেন চন্দননগরে, গঙ্গার পাড়ে এক ভাড়া বাড়িতে। ভালবাসেন বাউল আর ফকিরদের গান শুনতে। আজ তিনি বড্ড একা। মনে ভিড় করে আসে শোকস্মৃতি। বন্ধু রাজকৃষ্ণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের পৌত্রী প্রভাবতীকে খুব ভালবাসতেন। ১৮৬৫ সালে মাত্র তিন বছর বয়সে সে চলে গেছে। তার কথা মনে পড়ে। তার মৃত্যুতে অধীর হয়ে তিনি লিখেছিলেন ‘‘...বোধহয় যদি এই নৃশংস নরলোকে অধিকদিন থাক, উত্তরকালে অশেষ যন্ত্রণা ভোগ অপরিহার্য, ইহা নিশ্চিত বুঝিতে পারিয়াছিলে।’
১৮৯১ সালের জুন মাসে বাদুড়বাগানের বাড়িতে ফিরলেন পাকাপাকি ভাবে। প্রবল যন্ত্রণায় কাতর, কিন্তু প্রকাশ খুবই কম। ইংরেজ ডাক্তার বার্চ ও ম্যাকনেল ক্যান্সার সন্দেহ করে চিকিৎসার ভার নিতে রাজি হলেন না। দেখতে লাগলেন ডা. মহেন্দ্রলাল সরকার। সুরেন্দ্রনাথ এলেন দেখা করতে। মুখে হাসি টেনে তিনি বললেন, ‘‘সে কী, এর মধ্যেই চুলে পাক ধরল কেন?’’
২৯শে জুলাই, ১৮৯১। রাত এগারোটার পর আর নাড়ি পাওয়া যায়নি।
রাত দু’টো বেজে আঠেরো মিনিট। চোখ খুলে চাইলেন, চোখে পড়ল পায়ের কাছে বসা পুত্রের মুখ। তার পর চিরতরে বন্ধ হয়ে গেল সেই উজ্জ্বল দু’টি চোখ। একটা হাত এসে পড়ল কপালে।
তথ্যসূত্র ও গ্রন্থঋণ :----
১.অঞ্জলি বসু (সম্পাদিত) ; ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর : সংসদ বাঙালি চরিতাভিধান, সাহিত্য সংসদ, কলকাতা, ১৯৭৬
২.অমরেন্দ্রকুমার ঘোষ ; যুগপুরুষ বিদ্যাসাগর : তুলিকলম, কলকাতা, ১৯৭৩
৩.অমূল্যকৃষ্ণ ঘোষ ; বিদ্যাসাগর : দ্বিতীয় সংস্করণ, এম সি সরকার, কলকাতা, ১৯১৭
৪.অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় ; বাংলা সাহিত্যে বিদ্যাসাগর : মণ্ডল বুক হাউস, কলকাতা, ১৯৭০
৫.ইন্দ্রমিত্র ; করুণাসাগর বিদ্যাসাগর : আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা, ১৯৬৬
৬.গোপাল হালদার (সম্পাদিত) ; বিদ্যাসাগর রচনা সম্ভার (তিন খণ্ডে) : পশ্চিমবঙ্গ নিরুক্ষরতা দূরীকরণ সমিতি, কলকাতা, ১৯৭৪-৭৬
৭.বদরুদ্দীন উমর ; ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ও উনিশ শতকের বাঙালি সমাজ : দ্বিতীয় সংস্করণ, চিরায়ত, কলকাতা, ১৯৮২
৮.বিনয় ঘোষ ; বিদ্যাসাগর ও বাঙালি সমাজ : বেঙ্গল পাবলিশার্স, কলকাতা, ১৩৫৪ বঙ্গাব্দ
৯.বিনয় ঘোষ ; ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর : অনুবাদক অনিতা বসু, তথ্য ও বেতার মন্ত্রক, নয়াদিল্লি, ১৯৭৫
১০.ব্রজেন্দ্রকুমার দে ; করুণাসিন্ধু বিদ্যাসাগর : মণ্ডল অ্যান্ড সন্স, কলকাতা, ১৯৭০
১১.মহম্মদ আবুল হায় আনিসুজ্জামন ; বিদ্যাসাগর রচনা সংগ্রহ : স্টুডেন্টস ওয়েজ, ঢাকা, ১৯৬৮
১২.যোগেন্দ্রনাথ গুপ্ত ; বিদ্যাসাগর : পঞ্চম সংস্করণ, কলকাতা, ১৯৪১
১৩.যোগীন্দ্রনাথ সরকার ; বিদ্যাসাগর : ১৯০৪
১৪.রজনীকান্ত গুপ্ত ; ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর : ১৮৯৩
১৫.রমাকান্ত চক্রবর্তী (সম্পাদিত) ; শতবর্ষ স্মরণিকা : বিদ্যাসাগর কলেজ, ১৮৭২-১৯৭২ : বিদ্যাসাগর কলেজ, ১৯৭২
১৬.রমেশচন্দ্র মজুমদার ; বিদ্যাসাগর : বাংলা গদ্যের সূচনা ও ভারতের নারী প্রগতি : জেনারেল প্রিন্টার্স অ্যান্ড পাবলিশার্স, কলকাতা, ১৩৭৬ বঙ্গাব্দ
১৭.রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ; বিদ্যাসাগর-চরিত : বিশ্বভারতী গ্রন্থনবিভাগ, কলকাতা
১৮.রাধারমণ মিত্র ; কলিকাতায় বিদ্যাসাগর : জিজ্ঞাসা, কলিকাতা, ১৯৪২
১৯.রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী ; চরিত্র কথা : কলকাতা, ১৯১৩
২০.শঙ্করীপ্রসাদ বসু ; রসসাগর বিদ্যাসাগর : দ্বিতীয় সংস্করণ, দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা, ১৯৯২
২১.শঙ্খ ঘোষ ও দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় (সম্পাদিত) ; বিদ্যাসাগর : ওরিয়েন্ট, কলকাতা
২২.শম্ভুচন্দ্র বিদ্যারত্ন ; বিদ্যাসাগর চরিত : কলকাতা, ১২৯৪ বঙ্গাব্দ
২৩.শম্ভুচন্দ্র বিদ্যারত্ন ; বিদ্যাসাগর জীবনচরিত : কলকাতা
২৪.শম্ভুচন্দ্র বিদ্যারত্ন ; বিদ্যাসাগর চরিত ও ভ্রমণিরাস : চিরায়ত, কলকাতা, ১৯৯২
২৫.শশিভূষণ বিদ্যালঙ্কার ; ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর : জীবনীকোষ, ভারতীয় ঐতিহাসিক, কলকাতা, ১৯৩৬
২৬.শামসুজ্জামান মান ও সেলিম হোসেন ; ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর : চরিতাভিধান : বাংলা একাডেমী, ঢাকা, ১৯৮৫
২৭.সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ও সজনীকান্ত দাস (সম্পাদিত) ; বিদ্যাসাগর গ্রন্থাবলী (তিন খণ্ডে) : বিদ্যাসাগর স্মৃতি সংরক্ষণ সমিতি, কলকাতা, ১৩৪৪-৪৬ বঙ্গাব্দ
২৮.সন্তোষকুমার অধিকারী ; বিদ্যাসাগর জীবনপঞ্জি : সাহিত্যিকা, কলকাতা, ১৯৯২
২৯.সন্তোষকুমার অধিকারী ; আধুনিক মানসিকতা ও বিদ্যাসাগর : বিদ্যাসাগর রিসার্চ সেন্টার, কলকাতা, ১৯৮৪
৩০.হরিসাধন গোস্বামী ; মার্কসীয় দৃষ্টিতে বিদ্যাসাগর : ভারতী বুক স্টল, কলকাতা, ১৯৮৮
৩১.পশ্চিমবঙ্গ পত্রিকার বিদ্যাসাগর সংখ্যা, সেপ্টেম্বর-অক্টোবর ১৯৯৪.
৩২. অনন্য বিদ্যাসাগর, শ্রী অনুনয় চট্টোপাধ্যায়।
৩৩. স্বামী বিবেকানন্দের বানী ও রচনা, নবম খণ্ড, উদ্বোধন, ১৯৭৩।
৩৪. জীবন সন্ধানী বিদ্যাসাগর, রামরঞ্জন রায়।
৩৫. পশ্চিমবঙ্গ পত্রিকা, বিদ্যাসাগর সংখ্যা, ১৪০১ বঙ্গাব্দ।
৩৬. ঊনবিংশ শতাব্দীর যুক্তিবাদী ও বিদ্যাসাগর, শ্রী গৌতম চট্টোপাধ্যায়।
৩৭. বিদ্যাসাগর জীবনচরিত ও ভ্রমনিরাস, শম্ভুচন্দ্র বিদ্যারত্ন, চিরায়ত প্রকাশন, ২০১৪।
৩৮. ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ও উনিশ শতকের বাঙ্গালী সমাজ, বদরুদ্দীন উমর, সুবর্ণ, ২০১৬।
৩৯. বিদ্যাসাগর, বিনয় ঘোষ।
৪০. ইন্টারনেট।
-------------------------------------------------------------