অভিমানি ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ---- সাংবাদিকতা ও বাংলা সাহিত্য । প্রসূন কাঞ্জিলাল।

অভিমানি ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ---- 
সাংবাদিকতা ও বাংলা সাহিত্য । 

প্রসূন কাঞ্জিলাল। 

দ্বিশতবর্ষের পরেও বিদ্যাসাগর স্মরণ এবং শ্রদ্ধা এ প্রজন্মের বাঙালিকে করছে ঋদ্ধ। উৎসাহিত করছে এই অন্যতম শ্রেষ্ঠ যুগপুরুষকে জানতে এবং আত্মস্থ করতে। রক্ত-মাংসের এই ঈশ্বরের সামগ্রিক কর্মকান্ডের ক'য়েক শতাংশও যদি থাকত অনুপস্থিত, তবে জাতি হিসেবে বাঙালি যে আজ কতটা দীন থেকে যেত তা কল্পনায় আনলেই শিউরে উঠতে হয়। বিদ্যাসাগরের মতো মহামানবের জন্মের  জন্য যেমন অপেক্ষা করতে হয় ক'য়েকটা শতাব্দী, তেমনই যে জাতির একজন বিদ্যাসাগর থাকে সে জাতিকে অন্ধকারের অতল গহ্বর থেকে ক'য়েক শতাব্দী এগিয়ে নিয়ে যায় এই ঈশ্বর। বিদ্যাসাগরের মতো ঈশ্বররা কোনো একটি বিশেষ কাজের জন্যও জন্মান না। এক জীবনে বহু কাজের মাধ্যমে সমগ্র জাতিকে ক'য়েক শতাব্দী এগিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব তুলে নেন কাঁধে। 

বিদ্যাসাগরের কর্মময় জীবনের অজস্র ধারার অন্যতম ছিল সাংবাদিকতা। পেশা নয়, তাঁর বহুমুখী কর্মকাণ্ডকে পূর্ণতা দিতেই হাতে তুলে নিতে হয়েছিল সাংবাদিকের কলম। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে বেশ ক'য়েকটি সাময়িক পত্রের দায়িত্ব তাঁকে সামলাতে হয়েছে দীর্ঘদিন। 'তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা', 'সর্বশুভকরী পত্রিকা', 'সোমপ্রকাশ' ও 'হিন্দু পেট্রিয়ট' ছিল তাঁর এই পর্বের কর্মকান্ডের বিচরণ ক্ষেত্র। তত্ত্ববোধিনী ও সোমপ্রকাশ ছিল সেই সময়ের অত্যন্ত প্রভাবশালী দুটি বাংলা পত্রিকা। শিক্ষিত বাঙালি সমাজে অত্যধিক প্রভাবশালী ইংরেজি পত্রিকা ছিল হিন্দু পেট্রিয়ট ।

ব্রাহ্ম সমাজের নিজস্ব সংগঠন তত্ত্ববোধিনী সভা  গঠিত হয় ১৮৩৯ সালে। ব্রাহ্ম ধর্মের প্রচার এবং ব্রাহ্ম সমাজের সদস্যদের মধ্যে যোগাযোগের উদ্দেশ্যে ১৮৪৩ সালে জন্ম হয় তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা। পত্রিকার সার্বিক তত্ত্বাবধানে ছিলেন দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর। পত্রিকার জন্য রীতিমতো পরীক্ষা নিয়ে সম্পাদক হিসেবে অক্ষয় কুমার দত্ত কে নিযুক্ত করেন দেবেন্দ্রনাথ। সম্পাদক মন্ডলীর সদস্য হিসেবে কাজ শুরু করেন দেবেন্দ্রনাথ, বিদ্যাসাগর, রাজনারায়ণ বসু ও রাজেন্দ্রলাল মিত্র। তত্ত্ববোধিনী পত্রিকার জন্মলগ্ন থেকে জীবনের প্রায় শেষ লগ্ন পর্যন্ত বিদ্যাসাগর ছিলেন এই পত্রিকার সাথে ওতপ্রোতভাবে ভাবে জড়িত। যদিও পত্রিকার পথ চলা শুরু হয় মূলত ব্রাহ্ম ধর্মের প্রচার ও বেদান্ত সাহিত্য চর্চার উদ্দেশ্যে। কিন্তু অচিরেই এই পত্রিকায় ইতিহাস, বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদ নির্ভর বিভিন্ন লেখা প্রকাশ হতে থাকে। সম্পাদক অক্ষয়কুমার দত্তের ইচ্ছা এবং বিদ্যাসাগরের প্রেরণায় তত্ত্ববোধিনী পত্রিকার এই পরিবর্তন সম্ভব হয়। একটা পর্যায়ে এসে সম্পাদক অক্ষয়কুমারের সাথে নিয়োগকর্তা দেবেন্দ্রনাথের নিয়মিত তর্ক-বিতর্ক ও মতান্তর ঘটেছে মূলতঃ বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদ নির্ভর বিভিন্ন লেখাকে কেন্দ্র করে। কিন্তু প্রতিটি ক্ষেত্রেই বিদ্যাসাগরের সমর্থন ছিল অক্ষয়কুমারের পক্ষে। এই সময় বিদ্যাসাগর এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন তত্ত্ববোধিনীর পথ নির্নয় এবং মান নির্ধারণে। বিভিন্ন বিষয়ে মূল্যবান প্রবন্ধ এমনকি কখনো কখনো সম্পাদকীয় ও লিখতে হতো বিদ্যাসাগরকে। ক্রমশ বিজ্ঞান, ইতিহাস, দর্শন, সমাজতত্ত্বের আলোচনার এক গুরুত্বপূর্ণ পত্রিকা হিসেবে পরিচিতি লাভ করে তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা। বাংলা সাহিত্য, সংস্কৃতি ও সভ্যতার বিকাশে সেই সময় তত্ত্ববোধিনী পত্রিকার অবদান যেমন অস্বীকার করা যাবে না, তেমনই তত্ত্ববোধিনীকে ওই উচ্চতায় পৌঁছে দেওয়ার নেপথ্যে বিদ্যাসাগরের অবদান কে ও স্বীকার না করার স্পর্ধাও করা যায় না।

১৮৫০ সালে পন্ডিত মদনমোহন তর্কালঙ্কারের সহযোগিতায় বিদ্যাসাগর শুরু করেন এক সাময়িকী - 'সর্ব্বশুভকরী' পত্রিকা। পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন মোতিলাল চট্টোপাধ্যায়। কিন্তু আসলে পত্রিকার কান্ডারী ছিলেন দুই পন্ডিত - ঈশ্বরচন্দ্র এবং মদনমোহন। এ পত্রিকা মূলত বিদ্যাসাগরের সমাজ সংস্কার সম্পর্কিত ভাবনা চিন্তা প্রতিফলনের মাধ্যম ছিল। যদিও মাত্র ক'য়েকটি সংখ্যার পর পত্রিকার প্রকাশনা বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু অল্প ক'য়েকটি সংখ্যা তেই বিদ্যাসাগরের সমাজ সংস্কার বিষয়ক অসংখ্য লেখা শিক্ষিত বাঙালি সমাজকে করেছিল যথেষ্ঠ প্রভাবিত। পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত বাঙালি সমাজের পাশাপাশি প্রাচীনপন্থী গোঁড়া সমাজপতিদেরও আলোড়িত করেছিল এই পত্রিকা।

১৮৫৮ সালে বিদ্যাসাগর শুরু করলেন সোমপ্রকাশ পত্রিকা। তাঁর বন্ধু ও সহকর্মী দ্বারকানাথ বিদ্যাভূষণ ছিলেন পত্রিকার সম্পাদক। কিন্তু পত্রিকা প্রকাশের প্রাথমিক পরিকল্পনা এবং আত্মপ্রকাশ - সবটাই বিদ্যাসাগরের হাত ধরে। একটি সূত্রে জানা যায় যে, এ পত্রিকার প্রথম সংখ্যার সমস্ত লেখা ই নাকি  বিদ্যাসাগর নিজে লেখেন। পরে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লে সম্পাদনার দায়িত্ব অর্পণ করেন দ্বারকানাথকে। দ্বারকানাথের সম্পাদনা ও বিদ্যাসাগরের সক্রিয় সহযোগিতায় সোমপ্রকাশ হয়ে ওঠে বাংলার প্রথম শ্রেণীর সংবাদ সাময়িকী। বিদ্যাসাগরের সাথেই সংস্কৃত কলেজে অধ্যাপনা করতেন দ্বারকানাথ বিদ্যাভূষণ। দ্বারকানাথের গ্রামের বাড়ি চব্বিশ পরগনার চাংড়িপোতায় (অধুনা সুভাষগ্রাম) একটি মুদ্রণযন্ত্র বসিয়ে ছিলেন তাঁর পিতা। তাই ১৮৬২ সালে মাতলা রেল ( শিয়ালদহ-ক্যানিং ) চালু হবার পর সোমপ্রকাশ প্রকাশিত হতে থাকে চাংড়িপোতা থেকেই। বিদ্যাসাগরের প্রগতিশীল চিন্তা ভাবনা এবং উদ্যোম আর দ্বারকানাথের মুদ্রণযন্ত্র ,আর্থিক সঙ্গতি ও স্বচ্ছ সামাজিক, রাজনৈতিক চেতনা সোমপ্রকাশকে এমন উচ্চতায় নিয়ে যায় যে, বিভিন্ন বিষয়ে জনমত গঠনে অতি প্রভাবশালী ভূমিকা গ্রহণ করে এই পত্রিকা। ১৮৭৮ সালে ব্রিটিশ সরকার জারি করল ভার্নাকুলার প্রেস অ্যক্ট। এই আইনের বিরোধিতা করে বিদ্যাসাগরের সম্মতিতেই এক বছর পত্রিকা প্রকাশ বন্ধ রাখেন দ্বারকানাথ। বাল্য বিবাহ ও কৌলিন্য প্রথার বিরোধীতা করে এবং নারী-শিক্ষা ও বিধবা বিবাহের পক্ষে অজস্র লেখা নিয়মিত প্রকাশিত হতো সোমপ্রকাশে।

বিদ্যাসাগরের সাথে আর যে সাময়িক পত্রের প্রত্যক্ষ সম্পর্ক ছিল সেটা হিন্দু পেট্রিয়ট। ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত উচ্চ ও মধ্যবিত্ত বাঙালির নিজস্ব পত্রিকা ছিল এই সাময়িকী। পত্রিকার সত্ত্বাধিকারী ও সম্পাদক হরিশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের ক্ষুরধার লেখনী নীল বিদ্রোহের সময় যে ভাবে কৃষকদের পক্ষে দাঁড়িয়ে বিদ্রোহকে সমর্থন করেছিল তাতে অজস্র দেশবাসীর শ্রদ্ধা ও সমর্থন পেয়েছিল পত্রিকা। যদিও ব্রিটিশ শাসনের সার্বিক বিরোধিতার পরিবর্তে বিভিন্ন বিষয়ে সহযোগিতা এবং ওদশের পার্লামেন্টে আবেদন-নিবেদনের পক্ষেই সাধারণ অবস্থান ছিল এ পত্রিকার। তথাপি বিরাট অংশের শিক্ষিত মানুষের মধ্যে প্রভাব ছিল হিন্দু পেট্রিয়টের। ১৮৬১ সালে হরিশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের মৃত্যুর পর পত্রিকার মালিকানা কিনে নিয়ে হিন্দু পেট্রিয়ট চালাতে শুরু করেন কালিপ্রসন্ন সিংহ। ক'য়েক মাস পরে তিনি পত্রিকার দায়িত্ব সমর্পন করেন বিদ্যাসাগরকে। পত্রিকার সম্পাদক হিসাবে বিদ্যাসাগর নিয়োগ করেন কৃষ্টদাস পালকে। পরে ১৮৬২ সালে এক ট্রাস্টি গঠন করে পত্রিকার নীতি নির্ধারণের দায়িত্ব তাদের ওপর সমর্পন করেন বিদ্যাসাগর। সেই সময় পত্রিকার প্রভাব প্রতিপত্তি ও পাঠক সংখ্যা যথেষ্ট বৃদ্ধি পায়। পরে এ পত্রিকা দৈনিকেও রূপান্তরিত হয়।  যদিও দৈনিক হিন্দু পেট্রিয়ট স্থায়ী হয়নি বেশি দিন।

সামন্ততন্ত্রের নিগড়ে বাঁধা মধ্যযুগীয় কুসংস্কারাচ্ছন্ন এক জাতিকে অন্ধকারের অতল গহ্বর থেকে টেনে তুলে আধুনিক সভ্যতার আলোয় পৌঁছে দিতে সমস্ত জীবন নিয়োগ করেছিলেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। আর সেই কাজ সম্পূর্ণ করতেই তাঁকে পালন করতে হয় বিভিন্ন ভূমিকা। সাংবাদিকতাও সেই কর্মকান্ডের ই অংশ। আর সে ক্ষেত্রেও তাঁর অবদান অস্বীকার করার স্পর্ধা কোনো বঙ্গভাষীর অন্তত নেই।

  
‘‘জল পড়ে,পাতা নড়ে।’’--- ‘রবীন্দ্রনাথ’ তখন ‘কর, খল’ প্রভৃতি বানানের তুফান কাটিয়ে সবেমাত্র তীরের খোঁজ পেয়েছিলেন। সেদিন যখন তিনি বিদ্যাসাগরের ‘বর্ণপরিচয় প্রথমভাগ’ থেকে ‘‘জল পড়ে, পাতা নড়ে’’ পড়েছিলেন, তখন তাঁর শিশুমনে একটা অপূর্ব অনুভূতি জেগেছিল। ‘জীবনস্মৃতি’তে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন,

‘‘আমার জীবনে এইটেই আদিকবির প্রথম কবিতা। সেদিনের আনন্দ আজও যখন মনে পড়ে তখন বুঝিতে পারি, কবিতার মধ্যে মিল জিনিসটার এত প্রয়ােজন কেন। মিল আছে বলিয়াই কথাটা শেষ হইয়াও শেষ হয় না - তাহার বক্তব্য যখন ফুরায় তখনাে তাহার ঝংকারটা ফুরায় না, মিলটাকে লইয়া কানের সঙ্গে মনের সঙ্গে খেলা চলিতে থাকে। এমনি করিয়া ফিরিয়া ফিরিয়া আমার সমস্ত চৈতন্যের মধ্যে জল পড়িতে ও পাতা নড়িতে লাগিল।’’

‘রবীন্দ্রনাথ’ বিদ্যাসাগরকে ‘আদিকবির সম্মান’ দিয়েছিলেন। সাহিত্যের সমালােচক যাঁরা তাঁরা অবশ্য তা দেননি। তাঁরা বলেন, বিদ্যাসাগর বিদ্যালয়ের ছাত্রদের জন্য পাঠ্যপুস্তক লিখেছিলেন। তা ছাড়া এমন কিছু তিনি রচনা করেননি যা ‘প্রকৃত সাহিত্য’ বলে গণ্য হতে পারে। সমালােচকরা যে বাঁধাধরা ‘মাপাজোকা মানদণ্ড’ দিয়ে সাহিত্যের বিচার করেন তাতে বিদ্যাসাগরকে ‘পাঠ্যপুস্তকের লেখক’ ছাড়া আর কিছু বলা যায় না। কিন্তু সাহিত্য রচনা করতে হলে আগে তার ‘উপযুক্ত ভাষা’ তৈরি করা দরকার। বিদ্যাসাগরের আগে পর্যন্ত ‘বাংলা গদ্যভাষার’ যে বিকাশ হয়েছিল তা দিয়ে ঠিক সাহিত্য রচনা করা সম্ভব ছিল না। বিদ্যাসাগর বাংলাভাষাকে ‘সাহিত্যের উপযােগী’ করে গড়ে তােলার ব্রত গ্রহণ করেছিলেন। তাই তাঁকে ‘বাংলাভাষার আর্কিটেক্ট বা স্থপতি’ বলা যায়। বাংলা ভাষার কাঠামোটাকে অনেকদূর পর্যন্ত কল্পনা করে তাঁকে গড়তে হয়েছিল। বাধ্য হয়ে তাঁকে তাই স্কুলপাঠ্যবই, ‘অনুবাদ ও ভাবানুগামী’ রচনা বেশি লিখতে হয়েছিল। কিন্তু বাংলাভাষাকে যিনি ‘শিশুর অস্ফুট শব্দধ্বনি’ থেকে ‘সুবিন্যস্ত সংহত সাধুভাষায়’ পরিণত করেছিলেন, তাঁর ‘প্রতিভার সমাদর’ ‘রবীন্দ্রনাথের’ মতন প্রতিভাবানই করতে পেরেছিলেন।

বিদ্যাসাগর যখন ‘ফোর্টউইলিয়াম কলেজের শেরেস্তাদার’ নিযুক্ত হয়েছিলেন তখন কলেজের কর্তৃপক্ষ তাঁকে সহজপাঠ্য বই বাংলা গদ্যভাষায় লিখতে বলেছিলেন। তখন বিদ্যাসাগর ‘বাসুদেব চরিত’ রচনা করেছিলেন। বইখানি শেষ পর্যন্ত ছাপা হয়নি। তাঁর সেই বইয়ের পাণ্ডুলিপিতে গদ্যভাষার যে নিদর্শন পাওয়া যায় তা এইরূপ -

‘‘একদিবস মহর্ষি নারদ মথুরায় আসিয়া কংসকে কহিলেন, ‘মহারাজ! তুমি নিশ্চিন্ত রহিয়াছ, কোনও বিষয়ের অনুসন্ধান কর না; এই যাবৎ গােপী ও যাদব দেখিতেছ, ইহারা দেবতা, দৈত্যবধের নিমিত্ত ভূ-মণ্ডলে জন্ম লইয়াছে, এবং শুনিয়াছি, দেবকীর গর্ভে জন্মগ্রহণ করিয়া নারায়ণ তােমার প্রাণসংহার করিবেন’ ...।’’

এই গদ্যভাষা পড়লে মনে হয় না যে এটি ঊনিশ শতকের চল্লিশের গােড়ার দিকের রচনা। বাক্যগঠন ও শব্দবিন্যাসের এই রীতি কিছুদিন আগে পর্যন্ত ‘বাংলা সাহিত্যের সাধুভাষার আদর্শ রীতি’ ছিল। ‘বাসুদেব চরিতে’র পরে ‘বেতালপঞ্চবিংশতি’ (১৮৪৭) থেকে ‘ভূগােলখগােল বর্ণনম’ (১৮৯২) পর্যন্ত বিদ্যাসাগরের লেখা প্রায় ২৭টি বই প্রকাশিত হয়েছিল। এ ছাড়া বেনামীতে লেখা আরও প্রায় পাঁচটি বই তাঁর আছে বলে শােনা যায়। তাঁর সম্পাদিত সংস্কৃত ও বাংলা বইয়ের সংখ্যা প্রায় ১২টি। এইগুলির অধিকাংশই হয় কোন মূলগ্রন্থের অনুবাদ অথবা পাঠ্যবই। ভাব অনুসরণে লেখা হলেও লেখকের নিজস্ব কোন সৃষ্টিশক্তি আছে কিনা তা তাঁর রচনার গুণ থেকেই প্রকাশ পায়। বিদ্যাসাগরের ‘শকুন্তলা’ ও ‘সীতার বনবাস’ পড়লে বােঝা যায় যে তাঁর নিজস্ব রচনা শক্তি যথেষ্ট ছিল এবং ইচ্ছা করলে মৌলিক রচনাও তিনি অনেক লিখে যেতে পারতেন। কিন্তু তা তিনি করেন নি। তিনি ‘বাংলাভাষার কারিগরের কাজ’ই করেছিলেন বেশি।
                    
আগেই বলা হয়েছে, বিদ্যাসাগরের বেশিরভাগ বাংলা রচনাই হল অনুবাদ, সঙ্কলন বা পাঠ্যপুস্তক। তিনি যে বই লিখেছেন তা থেকে তাঁর উদ্দেশ্য সহজেই বোঝা যায়। তিনি ছিলেন বাংলা গদ্যের সৃষ্টিকর্তা - অতএব একটি লিখিত ভাষাকে গড়ে তুলতে হলে যে সব মালমশলার দরকার হয়, সেগুলো সম্বন্ধেই তিনি বেশি মনোযোগী ছিলেন। ‘আধুনিক বাংলা সাহিত্যের জনক’ ‘বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়’ ‘বাংলাভাষা ও সাহিত্যে বিদ্যাসাগরের দান’ সম্বন্ধে লিখেছিলেন - ‘‘প্রবাদ আছে যে রাজা রামমোহন রায় সে সময়ের প্রথম গদ্য লেখক। তাঁহার পরে যে গদ্যের সৃষ্টি হইল, তাহা লৌকিক বাঙ্গলা ভাষা হইতে সম্পূর্ণরূপে ভিন্ন। এমনকি বাঙ্গলা ভাষা দুইটি স্বতন্ত্র বা ভিন্ন ভাষায় পরিণত হইয়াছিল। একটির নাম সাধুভাষা অর্থাৎ সাধুজনের ব্যবহার্য্য ভাষা, আর একটির নাম অপর ভাষা অর্থাৎ সাধু ভিন্ন অপর ব্যক্তিদিগের ব্যবহার্য্য ভাষা। এ স্থলে সাধু অর্থে পণ্ডিত বুঝিতে হইবে ... এই সংস্কৃতানুসারিণী ভাষা প্রথম মহাত্মা ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ও অক্ষয় কুমার দত্তের হাতে কিছুটা সংস্কার প্রাপ্ত হইল। ইহাদিগের ভাষা সংস্কৃতানুসারিণী হইলেও তত দুর্ব্বোধ্য নহে। বিশেষতঃ বিদ্যাসাগর মহাশয়ের ভাষা অতি সুমধুর ও মনোহর। তাঁহার পূর্বে কেহই এরূপ সুমধুর বাঙ্গলা গদ্য লিখিতে পারে নাই এবং তাঁহার পরেও কেউ পারে নাই।’’


‘রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর’ এই বিষয়ে ‘বিদ্যাসাগরের’ যে প্রশংসা করেছিলেন তা ‘বঙ্কিমচন্দ্রের’ চেয়েও বেশি। তিনি তাঁর ‘বিদ্যাসাগর চরিত’ গ্রন্থে লিখেছিলেন - ‘‘তাঁহার প্রধান কীর্তি বঙ্গভাষা। যদি এই ভাষা কখনো সাহিত্যসম্পদে ঐশ্বর্য্যশালিনী হইয়া ওঠে, যদি এই ভাষা অক্ষয় ভাবজননীরূপে মানব সভ্যতার ধাত্রীগণের ও মাতৃগণের মধ্যে গণ্য হয় - যদি এই ভাষা পৃথিবীর শোকদুঃখের মধ্যে এক নতুন সান্ত্বনাস্থল, সংসারের তুচ্ছতা ও ক্ষুদ্র স্বার্থের মধ্যে এক মহত্বের আদর্শলোক, দৈনন্দিন মানবজীবনের অবসাদ ও অস্বাস্থ্যের মধ্যে সৌন্দর্য্যের এক নিভৃত নিকুঞ্জবন রচনা করিতে পারে, তবেই তাঁহার এই কীর্ত্তি তাঁহার উপযুক্ত গৌরব লাভ করিতে পারিবে। ... বিদ্যাসাগর বাংলা ভাষার প্রথম যথার্থ শিল্পী ছিলেন। তৎপূর্ব্বে বাংলায় গদ্য সাহিত্যের সূচনা হইয়াছিল, কিন্তু তিনিই সর্ব্বপ্রথমে বাংলা গদ্যে কলানৈপুণ্যের অবতারণা করেন। ... সৈন্যদলের দ্বারা যুদ্ধ সম্ভব, কেবলমাত্র জনতার দ্বারা নহে। ... বিদ্যাসাগর বাংলা গদ্যভাষার উশৃঙ্খল জনতাকে সুবিভক্ত, সুবিন্যস্ত, সুপরিচ্ছন্ন ও সুসংযত করিয়া তাহাকে সহজ গতি ও কার্য্যকুশলতা দান করিয়াছেন। এখন তাহার দ্বারা অনেক সেনাপতি ভাব প্রকাশের কঠিন বাধা-সকল পরাহত করিয়া সাহিত্যের নব নব ক্ষেত্রে আবিষ্কার ও অধিকার করিয়া লইতে পারেন, - কিন্তু যিনি এই সেনার রচনাকর্তা, যুদ্ধজয়ের যশোভাগ সর্ব্বপ্রথম তাঁহাকেই দিতে হয়। বাংলা ভাষাকে পূর্ব্বপ্রচলিত অনাবশ্যক সমাসড়ম্বরভার হইতে মুক্ত করিয়া, তাহার পদগুলির মধ্যে অংশযোজনার সুনিয়ম স্থাপন করিয়া, বিদ্যাসাগর যে বাংলা গদ্যকে কেবলমাত্র সর্ব্বপ্রকার-ব্যবহারযোগ্য করিয়াই ক্ষান্ত ছিলেন তাহা নহে, তিনি তাহাকে শোভন করিবার জন্যও সর্ব্বদা সচেষ্ট ছিলেন। গদ্যের পদগুলির মধ্যে একটা ধ্বনিসামঞ্জস্য স্থাপন করিয়া তাহার গতির মধ্যে একটা অনতিলক্ষ্য ছন্দস্রোত রক্ষা করিয়া, সৌম্য ও সরল শব্দগুলি নির্ব্বাচন করিয়া, বিদ্যাসাগর বাংলা গদ্যকে সৌন্দর্য্য ও পরিপূর্ণতা দান করিয়াছেন। গ্রাম্য পাণ্ডিত্য ও গ্রাম্য বর্ব্বরতা, উভয়ের হস্ত হইতেই উদ্ধার করিয়া তিনি ইহাকে পৃথিবীর ভদ্রসভার উপযোগী আর্য্য-ভাষারূপে গঠিত করিয়া গিয়াছেন। তৎপূর্ব্বে বাংলা গদ্যের যে অবস্থা ছিল তাহা আলোচনা করিয়া দেখিলে এই ভাষাগঠনে বিদ্যাসাগরের শিল্পপ্রতিভা ও সৃষ্টিক্ষমতার প্রচুর পরিচয় পাওয়া যায়।’’

বিদ্যাসাগর ১৮৫৫ সালে ‘বর্ণ পরিচয়’ নামে শিশুশিক্ষার একটা প্রাথমিক বই লিখেছিলেন। এটা ছিল আধুনিক শিক্ষাপ্রণালীতে লেখা সর্বপ্রথম প্রাথমিক পুস্তক। ‘বর্ণ পরিচয়’ এক শতাব্দীর বেশি সময় ধরে বঙ্গদেশে প্রচলিত ছিল এবং এক সময়ে প্রত্যেক শিশুকেই শিক্ষা শুরু করতে হত ‘বর্ণ পরিচয়’ দিয়ে। বাঙালির কাছে বিদ্যাসাগরের প্রথম পরিচয় হল দু’আনা (তখকনকার মূল্যে) দামের ‘বর্ণ পরিচয়’ গ্রন্থের লেখক হিসেবে, এবং তারপরে একজন সমাজ সংস্কারক হিসেবে।
                     
১৮০০ সালে ‘ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ’ স্থাপিত হবার সঙ্গে সঙ্গে বাংলা গদ্য রচনা শুরু হল বলে মনে করা যেতে পারে। বঙ্গদেশ তখন ব্রিটিশ শাসনের প্রধান কেন্দ্র ছিল। অতএব বিলেত থেকে যেসব ‘ইংরেজ সিভিলিয়ান কর্মচারী’ আসতেন তাঁদের ঐ কলেজে বাংলাভাষা শিখতে হত। খ্যাতনামা ‘ব্যাপটিস্ট ধর্মযাজক’ ‘উইলিয়াম কেরী’ ছিলেন ওই কলেজের বাংলাভাষা ও সাহিত্য বিভাগের প্রধান অধ্যাপক। তাঁর অধীনে কয়েকজন বাঙালি পণ্ডিতকে নিযুক্ত করা হয়েছিল বিদেশী কর্মচারীদের বাংলাভাষা শেখাবার জন্য। কিন্তু তখনকার দিনে উপযুক্ত প্রাথমিক পাঠ্যপুস্তকের বড় অভাব ছিল। ১৮০১ সালে ‘কেরী’ ‘শ্রীরামপুরের ডাক্তার’ ‘রাইল্যান্ড’কে লিখেছিলেন যে তিনি ‘রাম বসু’কে দিয়ে একজন রাজার (‘রাজা প্রতাপাদিত্য চরিত’) ইতিহাস লিখিয়েছেন। এটিই হল ‘বাংলা সাহিত্যের সর্বপ্রথম গদ্য পুস্তক’। ‘কেরী’র তত্বাবধানে আর যেসব পণ্ডিতদের গদ্য পাঠ্যপুস্তক লেখার কাজে নিযুক্ত করা হয়েছিল তাঁদের মধ্যে বিশেষ উল্লেখযোগ্য ছিলেন ‘মৃত্যুঞ্জয় তর্কালঙ্কার’, ‘গোলকনাথ শর্ম্মা’, ‘তারিণীচরণ মিত্র’ ও ‘চণ্ডীচরণ মুন্সী’। গদ্য রচনার এই প্রাথমিক প্রচেষ্টার কোন ‘সাহিত্যিক মূল্য’ নেই, কেবল ‘ঐতিহাসিক মূল্য’ আছে। এই সব রচনার বেশিরভাগই ছিল ‘কথ্যভাষা ও পণ্ডিতীভাষার একটা বিসদৃশ্য সংমিশ্রণ’। একমাত্র ‘মৃত্যুঞ্জয় তর্কালঙ্কার’ই পাঠযোগ্য বাংলা গদ্য রচনায় কিছুটা সফল হয়েছিলেন, কিন্তু সেই গদ্যকে আধুনিক ভাবপ্রকাশের উপযুক্ত করে তুলতে পারেননি।

‘রামমোহন রায়’ই সর্বপ্রথম বাংলা গদ্যের ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছিলেন। তিনি বাংলা গদ্যকে ‘বিতর্কমূলক আলোচনার উপযুক্ত’ করে গড়ে তুলেছিলেন। সেই বাংলা গদ্যের মাধ্যমে তিনি ‘পৌত্তলিকতা’, ‘একাধিক দেবতায় বিশ্বাস’, ‘সহমরণ’ প্রভৃতি বিষয়ে সংরক্ষণশীল সমাজের সঙ্গে অনেক বাগবিতণ্ডা করেছিলেন। এই সব বিতর্কমূলক রচনা ছাড়াও তিনি সর্বপ্রথম কয়েকখানি সংস্কৃত ‘উপনিষদ’ বাংলায় অনুবাদ করেছিলেন। বাংলা গদ্যকে গড়বার জন্য তিনি এসব প্রাথমিক প্রচেষ্টা করেছিলেন বটে, কিন্তু তবুও তিনি ‘বাক্যবিন্যাস ও শব্দচয়ন’ সম্পূর্ণভাবে আয়ত্বাধীনে আনতে পারেননি। তাঁর লেখায় গদ্যের যে প্রধান গুণ অর্থাৎ ‘সামঞ্জস্যপূর্ণ গতিভঙ্গী’ সেই জিনিষটার অভাব ছিল। পরে তৃতীয় দশকে ‘রেভারেন্ড কৃষ্ণমোহন ব্যানার্জী’ এবং ‘ইয়ং বেঙ্গল গোষ্ঠী’ বাংলা গদ্যকে খুব বেশি দূরে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারেননি। প্রধানতঃ ‘ইয়ং বেঙ্গল গোষ্ঠী’র ইংরেজি ঘেঁষা মনোভাবের জন্য বাংলা গদ্য এগোতে পারেনি। চতুর্থ দশকে ‘মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের’ নেতৃত্বে ‘তত্ববোধনী সভা’ ও ‘তত্ববোধনী পত্রিকা’ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এবং সঙ্গে সঙ্গে বাংলা গদ্যের দুই প্রবল শক্তিশালী স্রষ্টা পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ও ‘অক্ষয় কুমার দত্ত’ বাংলা গদ্যের ক্ষেত্রে আবির্ভুত হয়েছিলেন। ‘তত্ববোধনী পত্রিকা’য় ‘ইতিহাস’, ‘দর্শন’, ‘ধর্ম’, ‘নীতিশাস্ত্র’, ‘বিজ্ঞান’, ‘সাহিত্য’, ‘অর্থনীতি’, ‘সমাজনীতি’ প্রভৃতি বিভিন্ন বিষয়ে রচনা লিখতে উৎসাহ দেওয়া হত। এইসব নতুন নতুন জ্ঞানগর্ভ বিষয়ে আলোচনার ফলে চতুর্থ ও পঞ্চম দশকে বাংলা গদ্য খুবই অগ্রসর হয়েছিল। ‘তত্ববোধনী পত্রিকা’র প্রথম সম্পাদক ‘অক্ষয় কুমার দত্ত’ তাঁর শক্তিশালী রচনার দ্বারা বাংলা গদ্যের বিকাশকে আরো এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু এই সময়ে বাংলা গদ্যের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় দান রেখে গিয়েছিলেন বিদ্যাসাগর।


‘বিধবাবিবাহ’, ‘বহুবিবাহ’, ‘বাল্যবিবাহ’ প্রভৃতি বিষয়ে বিতর্কমূলক রচনাতেই হোক বা পাঠ্যপুস্তক, অনুবাদ ও সঙ্কলনমূলক রচনাতেই হোক বিদ্যাসাগরের মূল উদ্দেশ্য ছিল সংস্কৃত ঘেঁষা মার্জিত রচনানীতির কঠিন বাঁধন ও অমার্জিত চলতি ভাষার তুচ্ছতা - এই দুয়ের থেকে বাংলা গদ্যকে মুক্ত করা। তিনি ছিলেন ‘বাংলা গদ্যের সর্বপ্রথম শিল্পসচেতন লেখক’। তিনি জানতেন যে ভাষাকে ‘সাহিত্য ও বিজ্ঞানের উপযুক্ত মাধ্যমরূপে’ গড়ে তোলবার ঐতিহাসিক দায়িত্ব পড়েছিল তাঁর উপর। তিনি যা করে গিয়েছিলেন তার ফলে ‘বঙ্কিম’ ও ‘বঙ্গদর্শন’-এর যুগ আসার পথ প্রশস্ত হয়েছিল। তিনি বাংলা গদ্য রচনাকে বিকাশের শক্তি দিয়েছিলেন। প্রায় একই সময়ে শুরু করে ‘বঙ্কিম’ ও ‘বঙ্গদর্শন’ এই বিকাশকে আরও পূর্ণতার দিকে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন এবং ঊনবিংশ শতাব্দী থেকে বিংশ শতাব্দী পর্যন্ত বাংলা গদ্যকে পূর্ণতর বিকাশের দিকে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন ‘রবীন্দ্রনাথ’।

‘বাংলাভাষা ও সাহিত্যে বিদ্যাসাগরের দান’ কি এবং কতখানি তার ব্যাখ্যা এমনভাবে আর কেউ কবেন নি। এত বড় সম্মান কোন সাহিত্য-সমালােচক বিদ্যাসাগরকে দেন নি। ‘রবীন্দ্রনাথের’ মত অসাধারণ শিল্পীর পক্ষেই ‘বিদ্যাসাগরেব সাহিত্যিক দানেব গুরুত্ব’ পরিপূর্ণরূপে উপলব্ধি করা সম্ভব হয়েছিল। বিদ্যাসাগর সম্বন্ধে রবীন্দ্রনাথের কথাই সত্যি, ‘‘তিনি বাংলাভাষার প্রথম যথার্থ শিল্পী।’’

তিনি ছেলেকে করেছিলেন ত্যাজ্য। বাবা কাশীবাসী। মা সেখানেই কলেরায় মারা গিয়েছেন। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের শেষ জীবন এ রকমই। সাল ১৮৭৫, তারিখ ৩১ মে। স্থান কলকাতা। গভীর রাত।

অভিমানে ক্ষতবিক্ষত এক জন আমহার্স্ট স্ট্রিটের ৬৩ নম্বর বাড়িতে দোতলার একটি ঘরে বসে নিজের হাতে লিখছেন তাঁর ইচ্ছাপত্র বা উইল।

 তাঁকে শুধু তাঁর একমাত্র পুত্র বা পরিবার আহত করেনি, তাঁকে রক্তাক্ত করেছে তথাকথিত শিক্ষিত সমাজ, ইংরেজ শাসক, সেই শাসকদের করুণা-লোভী জমিদার শ্রেণির বাবু সম্প্রদায়, এমনকী তাঁর পরম আরাধ্যা জননী। মাত্র পঞ্চান্ন বছর বয়সেই উইল লিখছেন তিনি।

পঁচিশটি অনুচ্ছেদে সম্পূর্ণ এই উইল। এতে রয়েছে তাঁর নিজের সম্পত্তির তালিকা, পঁয়তাল্লিশ জন নরনারীকে নির্দিষ্ট হারে মাসিক বৃত্তি দেবার নির্দেশ। এর মধ্যে ছাব্বিশ জন তাঁর অনাত্মীয়। এ ছাড়াও ব্যবস্থা আছে দাতব্য চিকিৎসালয় ও মায়ের নামে স্থাপিত বালিকা বিদ্যালয়ের জন্য। 

সব থেকে বিস্ময়কর পঁচিশ নম্বর অনুচ্ছেদ।-----

‘‘আমার পুত্র বলিয়া পরিচিত শ্রীযুক্ত নারায়ণ বন্দ্যোপাধ্যায় যারপরনাই যথেচ্ছাচারী ও কুপথগামী এজন্য, ও অন্য অন্য গুরুতর কারণবশতঃ আমি তাহার সংশ্রব ও সম্পর্ক পরিত্যাগ করিয়াছি। এই হেতু বশতঃ বৃত্তিনির্বন্ধস্থলে তাঁহার নাম পরিত্যক্ত হইয়াছে এবং এই হেতুবশতঃ তিনি চতুর্বিংশধারা নির্দিষ্ট ঋণ পরিশোধকালে বিদ্যমান থাকিলেও আমার উত্তরাধিকারী বলিয়া পরিগণিত অথবা... এই বিনিয়োগ পত্রের কার্যদর্শী নিযুক্ত হইতে পারিবেন না।’’

পাঁচ পুত্রকন্যার মধ্যে নারায়ণচন্দ্র জ্যেষ্ঠ ও একমাত্র পুত্র। তাকে সব কিছু থেকে বঞ্চিত করার পেছনে গভীর বেদনা ছিল নিশ্চয়ই, কিন্তু ক্রোধের বশবর্তী হয়ে কোনও হঠকারিতা ছিল না। 

এই উইল লেখার পর বিদ্যাসাগর ষোলো বছর বেঁচেছিলেন, কিন্তু উইলের একটি শব্দও পরিবর্তন করেননি।

বিদ্যাসাগরের সত্তর বছরের জীবনের অবরোহণ-কাল তার শেষ বত্রিশ বছর। আর উপরোক্ত উইলটি এই সময়ের মধ্যবিন্দুতে রচনা। এই অবরোহণ-কালে ভিড় করে এসেছে বন্ধুমৃত্যু, বন্ধুবিচ্ছেদ, আত্মীয়-বিচ্ছেদ, প্রিয় কন্যাদের বৈধব্য, অর্থাভাব, এমনকী যে পিতামাতার প্রতি তাঁর ভক্তি ছিল প্রবাদপ্রতিম, সেই পিতামাতার সঙ্গেও গভীর মনান্তর। এর শুরু ১৮৫৮ সালের নভেম্বরে, যখন বিদ্যাসাগর পদত্যাগ করলেন সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষের পদ থেকে। আটত্রিশ বছরের যুবকের উদ্যম নিয়ে যখন তিনি শিক্ষা ও সমাজ সংস্কারের কাজে সরকারি ব্যবস্থাকে ব্যবহার করতে চেয়েছেন, ঠিক তখনই প্রতিপত্তি ও স্বাচ্ছন্দ্যের সিংহাসন থেকে তাঁকে নেমে আসতে হয়েছে। বোধহয় তাঁর জীবনের নৈরাশ্যের শুরু সে দিন থেকেই।

এই উইল লেখার এক বছর আগেই অর্থাৎ ১৮৭৪-এ বিদ্যাসাগর নির্দেশ দিয়েছিলেন— নারায়ণ যেন তাঁর বাড়িতে প্রবেশ না করেন। তারও দু’বছর আগে নারায়ণের সঙ্গে তাঁর সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন হল বলে তিনি ঘোষণা করে দিয়েছিলেন। অথচ ১৮৭০ সালে নিজের সমস্ত পরিবার-পরিজন, স্ত্রী ও নিজের মায়ের মতের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে নারায়ণের বিয়ে দিয়েছেন বিধবা কন্যা ভবসুন্দরীর সঙ্গে।

বত্রিশ বছরের ওই দীর্ঘ সময়ে দু’টি মাত্র ঘটনা বিদ্যাসাগরকে আনন্দ দিয়েছিল, মেট্রোপলিটন ইন্সটিটিউশন-এর প্রতিষ্ঠা ও বিকাশ, আর তাঁর ছেলে নারায়ণের বিয়ে।

নারায়ণচন্দ্র বেশি দূর পড়াশোনা করেননি। তাঁর পড়াশোনা শেষ হয়ে যায় গ্রামের পাঠশালাতেই। ঈশ্বরচন্দ্রের দুই ভাই হরচন্দ্র ও হরিশ্চন্দ্র পর পর দু’বছরে কলেরা রোগে মারা যান কলকাতায়। হরিশ্চন্দ্র মারা যাওয়ার পরেই ঠাকুরদাস ঘোষণা করে দিলেন, পৌত্র নারায়ণকে তিনি আর কখনও কলকাতায় পাঠাবেন না। এই ব্যবস্থা কার্যকর হল তাঁর পুত্র ঈশানচন্দ্রের বেলাতেও। বিদ্যাসাগরের স্ত্রী দীনময়ী দেবীও থাকতেন গ্রামের বাড়িতেই।

বাবাকে অনেক বুঝিয়েও এই গোঁ ভাঙতে পারলেন না ঈশ্বরচন্দ্র। ষোলো বছর বয়সেও নারায়ণ আটকে থাকলেন গ্রামের পাঠশালায়। স্নেহান্ধ পিতামহের অতিরিক্ত প্রশ্রয়ে যে ছেলে ঠিকমত মানুষ হচ্ছে না, তা তাঁর চোখ এড়ায়নি। প্রচণ্ড ক্ষোভে এক বার তিনি ঠাকুরদাসকে বলেছিলেন, ‘‘আপনি ঈশান ও নারায়ণের মাথা খাইতেছেন, তথাপি আপনি লোকের নিকট কিরূপে আপনাকে নিরামিষাশী বলিয়া পরিচয় দেন?’’ এর পর কোনও এক সময়ে নারায়ণকে তিনি এক রকম জোর করেই কলকাতায় নিয়ে এসে সংস্কৃত কলেজের বিদ্যালয় বিভাগে ভর্তি করে দেন, কিন্তু নারায়ণ সেখানে পড়েছিলেন মাত্র কয়েক মাস। কিছু দিন পরেই পালিয়ে গ্রামে ফিরে যান। 

নারায়ণচন্দ্রের বিয়ের কথা বলবার আগে বলা দরকার তাঁর গ্রামেই অনুষ্ঠিত আর একটি বিধবা- বিবাহের কথা। সালটা ১৮৬৯। ক্ষীরপাই গ্রামের মুচীরাম বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাথে মনমোহিনীর বিয়ে। এই বিয়ের খবরে গ্রামে এলেন ঈশ্বরচন্দ্র। ১৮৬৫-তে ঠাকুরদাস কাশী-যাত্রা করেছেন। ঈশ্বরচন্দ্রই এখন পরিবারের কর্তা। মুচীরাম ছিলেন গ্রামের হালদারদের ধর্মপুত্র। হালদারেরা একযোগে এসে দেখা করলেন ঈশ্বরচন্দ্রের সঙ্গে, অনুরোধ করলেন, যাতে এ বিয়ে না হয়। ঈশ্বরচন্দ্র কথা দিলেন, এ বিয়ে হবে না। কেন এ অনুরোধ, আর কেনই বা বিদ্যাসাগর তা মানলেন, তা জানা যায় না। শুধু বিয়ে হচ্ছে না, এ কথা সবাই জানল। বিদ্যাসাগর মনমোহিনী ও তার মা’কে নিজেদের বাড়ি ফিরে যেতে বললেন।

তখন বর্ষাকাল। সারা রাত ধরে চলছে বৃষ্টি। শেষ রাতে তাঁর ঘুম ভেঙে গেল। বৃষ্টির শব্দ ছাপিয়ে শোনা যাচ্ছে  শাঁখের আওয়াজ। মুচীরাম ও মনমোহিনীর বিয়ে হয়ে গিয়েছে তত ক্ষণে। এর প্রধান উদ্যোক্তা তাঁর নিজের ভায়েরাই, বিশেষত দীনবন্ধু ও তাঁর পুত্র নারায়ণ। এতে জননী ভগবতী দেবী ও স্ত্রী দীনময়ীরও সমর্থন ছিল পুরো মাত্রায়।

ভোর হল। সবাইকে ডাকলেন বিদ্যাসাগর। তিনি যাত্রার জন্য প্রস্তুত। অনেক বার তিনি গ্রামে এসেছেন ও ফিরে গিয়েছেন কলকাতায়। কিন্তু এ বারের ফিরে যাওয়া অন্য রকম। সবাইকে বললেন, ‘‘আমি আমার কথা রাখতে পারলাম না। লোকের কাছে অপদস্থ হলাম।  গ্রাম ছেড়ে চলে যাচ্ছি।  আর কখনও এ গ্রামে ফিরবো না।’’ 

কারও কোনও কথাই শুনলেন না। পিছনে পড়ে রইল গ্রাম, আত্মীয়-পরিজন, জননী, স্ত্রী-পুত্র, নিজের হাতে গড়া স্কুল— সব কিছু। সে বছরই গোড়ার দিকে আগুন লেগে পুরনো বাড়ি পুড়ে গিয়েছিল বলে বিদ্যাসাগর সবার জন্য কয়েকটি বাড়ি তৈরি করিয়ে দিয়েছিলেন। সেই সব বাড়িতে আর তাঁর পা পড়বে না। এর পরেও বাইশ বছর বেঁচে ছিলেন বিদ্যাসাগর, কিন্তু কোনও দিন আর গ্রামে ফিরে যাননি।

বিদ্যাসাগর একটি প্রেস ও বুক ডিপোজিটরি করেছিলেন, যার নাম সংস্কৃত মুদ্রণযন্ত্র। নিজে প্রচণ্ড ব্যস্ত বিধবাবিবাহ ও নানা রকম সমাজ সংস্কারের কাজে, বই লিখছেন, রয়েছে মেট্রোপলিটন ইন্সটিটিউশন ও অন্যান্য বিদ্যালয়ের দায়িত্ব। কাজেই প্রেস ও ডিপোজিটরির কাজ নিজে দেখার সুযোগ পান কমই। বেতনভোগী কর্মচারীরা সে সুযোগ পূর্ণ মাত্রায় গ্রহণ করে চরম বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি করেছে। এ দিকে তিনি ঋণে জর্জর, বিধবাবিবাহ দিতে গিয়ে। তখন পর্যন্ত ষাট জন বিধবার বিয়েতে খরচ করেছেন প্রায় বিরাশি হাজার টাকা। ঋণের আর একটি কারণ হল, ১৮৬৬-’৬৭ সালের দুর্ভিক্ষে বীরসিংহ ও বর্ধমানে নিজের খরচে খোলা অন্নসত্র। ১৮৬৯ সালে মাত্র আট হাজার টাকায় প্রেসের দুই-তৃতীয়াংশ বিক্রি করে দিলেন দু’জনকে। বুক ডিপোজিটরি দান করে দিলেন কৃষ্ণনগরের ব্রজনাথ মুখোপাধ্যায়কে। তখন তাঁর মন যে অত্যন্ত বিক্ষিপ্ত, তা বোঝাই যায়। যা তিনি ব্রজনাথ মুখোপাধ্যায়কে দান করলেন দশ হাজার টাকায়, সেই ডিপোজিটরি কিনে নেওয়ার লোক কিন্তু মজুত ছিল। তাঁর বিপুল ঋণের বোঝা এতে আরও খানিকটা লাঘব হতে পারত। 

এ দিকে শরীরও গিয়েছে ভেঙে। ১৮৬৬ সালের শেষ দিকে এক বিদেশিনি শিক্ষাব্রতী মিস মেরি কার্পেন্টার বিলেত থেকে কলকাতায় এসেছিলেন। লন্ডনে এই মিস কার্পেন্টারের বাবার কাছে আতিথ্য গ্রহণ করেছিলেন রাজা রামমোহন রায়। মেরি এ দেশের স্ত্রীশিক্ষা নিয়ে খুবই আগ্রহী। বেথুন স্কুলে পরিচয় হল বিদ্যাসাগরের সঙ্গে। বিদ্যাসাগরকে সঙ্গে নিয়েই বিভিন্ন স্কুল ঘুরে দেখতে লাগলেন তিনি। ১৮৬৬ সালের ১৬ ডিসেম্বর উত্তরপাড়ায় মেয়েদের একটি স্কুল দেখে ফিরছেন বিদ্যাসাগর। অন্য গাড়িতে আছেন মেরি, ডিপিআই অ্যাটকিনসন এবং ইন্সপেক্টর অব স্কুলস উড্রো সাহেব। 

বালি স্টেশনের কাছে যে গাড়িতে বিদ্যাসাগর ছিলেন সেটা হঠাৎ উলটে গেল। ছিটকে পড়ে প্রচণ্ড আঘাত লাগল, অজ্ঞান হয়ে গেলেন তিনি। মিস কার্পেন্টার পথের মধ্যে বসে কোলে তুলে নিলেন অচেতন বিদ্যাসাগরের মাথা। 

কলকাতায় আনা হলে ডা. মহেন্দ্রলাল সরকার জানালেন, লিভারে প্রচণ্ড আঘাত লেগেছে ও অ্যাবসেস দেখা দিয়েছে। দীর্ঘ চিকিৎসার পর ব্যথা কিছু কমলেও কোনও দিনই আর সুস্থ হননি। ১৮৯১ সালে তাঁর মৃত্যুর কারণ হিসেবেও লেখা হয়েছিল লিভারে ক্যানসার।

তবে কলম বা কাজ, থেমে থাকেনি কোনওটাই। ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত হল ‘ভ্রান্তিবিলাস’। মাত্র পনেরো দিনে লেখা, লেখায় সময় দিয়েছেন প্রতি দিন মাত্র পনেরো মিনিট। ১৮৭০ সালে ডা. মহেন্দ্রলাল সরকারের উদ্যোগে তৈরি হল ‘ইন্ডিয়ান ইন্সটিটিউট ফর দ্য কালটিভেশন অব সায়েন্স’, সেখানে এক হাজার টাকা দান করলেন বিদ্যাসাগর।

পুত্র নারায়ণের সঙ্গে ষোলো বছরের বিধবা কন্যা ভবসুন্দরীর বিয়ে দিলেন ১১ অগস্ট ১৮৭০ সালে, নিজের পুরো পরিবারের বিরুদ্ধে গিয়ে। স্ত্রী বা মা, কেউই সমর্থন করেননি এই বিয়ে। বিয়ে হল মির্জাপুর স্ট্রিটে কালীচরণ ঘোষের বাড়িতে। নারায়ণের মা বা ঠাকুমা, কেউই আসেননি। নববধূকে বরণ করলেন তারানাথ তর্কবাচষ্পতির স্ত্রী। অত্যন্ত আনন্দিত হয়েছিলেন বিদ্যাসাগর। তখনও তিনি জানতেন না, এই পুত্রকে মাত্র দু’বছরের মধ্যে ত্যাগ করতে বাধ্য হবেন তিনি। আর এই পুত্র-বিচ্ছেদের সঙ্গে সঙ্গেই কার্যত পত্নী-বিচ্ছেদ ঘটেছিল মানুষটির। পুত্রের প্রতি অনমনীয় মনোভাব মানতে পারেননি তিনি। দীনময়ী দেবী মারা যান বিদ্যাসাগরের আগে। বিদ্যাসাগর সমস্ত ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন, কিন্তু নিজে বীরসিংহে শ্রাদ্ধবাসরে যাননি।

১৮৭০। এই বছরেই ভগবতী দেবী কাশীবাসী হন। বিদ্যাসাগরের সঙ্গে তাঁর এক বার দেখা হয়েছিল, যখন বিদ্যাসাগর বাবা ও মা’কে দেখতে আসেন কাশীতে। ১৮৭১ সালে কলেরা রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান ভগবতী দেবী। কলকাতায় সে খবর পেয়ে শোকে শিশুর মতো অধীর হয়ে পড়েছিলেন ঈশ্বরচন্দ্র।

বিধবাবিবাহ সংগঠিত করতে গিয়ে বারবার প্রতারিত হয়ে পরম সুহৃদ দুর্গাচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে তিনি লিখছেন, ‘‘আমাদের দেশের লোক এত অসার ও অপদার্থ বলিয়া পূর্বে জানিলে আমি কখনই বিধবাবিবাহ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করিতাম না।’’ এই পরম সুহৃদ দুর্গাচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ও (স্যর সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাবা) চলে গেলেন ১৮৭০ সালে।

জামতাড়া ও মধুপুরের মাঝে ছোট্ট স্টেশন কর্মাটাড়। সেখানে মূলত সাঁওতালদের বাস। একটু শান্তি পাওয়ার জন্য এখানে একটি বাড়ি করেছিলেন বিদ্যাসাগর। এই সব সরল প্রাণবন্ত মানুষের মাঝে কিছুটা শান্তি পেয়েওছিলেন। বিদেশ থেকে হোমিয়োপ্যাথির বই আনিয়ে তা পড়ে তাঁদের চিকিৎসা করতেন তিনি।

১৮৭৯-এর ফেব্রুয়ারিতে তাঁর সৃষ্ট মেট্রোপলিটন ইন্সটিটিউশন বিএ পড়ানোর অনুমতি পেয়ে প্রথম শ্রেণির কলেজে উন্নীত হল।এ দেশে সম্পূর্ণ বেসরকারি পরিচালনায় এটিই প্রথম ডিগ্রি কলেজ। এবং এটিকেই বলা যেতে পারে তাঁর জীবনের শেষ বড় সাফল্য, যা ছিল অনেক অন্ধকারের মধ্যে একটু আলোর মতো।

শরীরের অবস্থা খুবই খারাপ। তাই কলকাতার বাদুড়বাগানের বাড়ি ছেড়ে তিনি মাঝে মাঝে এসে থাকেন চন্দননগরে, গঙ্গার পাড়ে এক ভাড়া বাড়িতে। ভালবাসেন বাউল আর ফকিরদের গান শুনতে। আজ তিনি বড্ড একা। মনে ভিড় করে আসে শোকস্মৃতি। বন্ধু রাজকৃষ্ণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের পৌত্রী প্রভাবতীকে খুব ভালবাসতেন। ১৮৬৫ সালে মাত্র তিন বছর বয়সে সে চলে গেছে। তার কথা মনে পড়ে। তার মৃত্যুতে অধীর হয়ে তিনি লিখেছিলেন ‘‘...বোধহয় যদি এই নৃশংস নরলোকে অধিকদিন থাক, উত্তরকালে অশেষ যন্ত্রণা ভোগ অপরিহার্য, ইহা নিশ্চিত বুঝিতে পারিয়াছিলে।’

১৮৯১ সালের জুন মাসে বাদুড়বাগানের বাড়িতে ফিরলেন পাকাপাকি ভাবে। প্রবল যন্ত্রণায় কাতর, কিন্তু প্রকাশ খুবই কম। ইংরেজ ডাক্তার বার্চ ও ম্যাকনেল ক্যান্সার সন্দেহ করে চিকিৎসার ভার নিতে রাজি হলেন না। দেখতে লাগলেন ডা. মহেন্দ্রলাল সরকার। সুরেন্দ্রনাথ এলেন দেখা করতে। মুখে হাসি টেনে তিনি বললেন, ‘‘সে কী, এর মধ্যেই চুলে পাক ধরল কেন?’’

২৯শে জুলাই, ১৮৯১। রাত এগারোটার পর আর নাড়ি পাওয়া যায়নি।

রাত দু’টো বেজে আঠেরো মিনিট। চোখ খুলে চাইলেন, চোখে পড়ল পায়ের কাছে বসা পুত্রের মুখ। তার পর চিরতরে বন্ধ হয়ে গেল সেই উজ্জ্বল দু’টি চোখ। একটা হাত এসে পড়ল কপালে।
          
তথ্যসূত্র ও গ্রন্থঋণ :----

১.অঞ্জলি বসু (সম্পাদিত) ; ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর : সংসদ বাঙালি চরিতাভিধান, সাহিত্য সংসদ, কলকাতা, ১৯৭৬
২.অমরেন্দ্রকুমার ঘোষ ; যুগপুরুষ বিদ্যাসাগর : তুলিকলম, কলকাতা, ১৯৭৩
৩.অমূল্যকৃষ্ণ ঘোষ ; বিদ্যাসাগর : দ্বিতীয় সংস্করণ, এম সি সরকার, কলকাতা, ১৯১৭
৪.অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় ; বাংলা সাহিত্যে বিদ্যাসাগর : মণ্ডল বুক হাউস, কলকাতা, ১৯৭০
৫.ইন্দ্রমিত্র ; করুণাসাগর বিদ্যাসাগর : আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা, ১৯৬৬
৬.গোপাল হালদার (সম্পাদিত) ; বিদ্যাসাগর রচনা সম্ভার (তিন খণ্ডে) : পশ্চিমবঙ্গ নিরুক্ষরতা দূরীকরণ সমিতি, কলকাতা, ১৯৭৪-৭৬
৭.বদরুদ্দীন উমর ; ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ও উনিশ শতকের বাঙালি সমাজ : দ্বিতীয় সংস্করণ, চিরায়ত, কলকাতা, ১৯৮২
৮.বিনয় ঘোষ ; বিদ্যাসাগর ও বাঙালি সমাজ : বেঙ্গল পাবলিশার্স, কলকাতা, ১৩৫৪ বঙ্গাব্দ
৯.বিনয় ঘোষ ; ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর : অনুবাদক অনিতা বসু, তথ্য ও বেতার মন্ত্রক, নয়াদিল্লি, ১৯৭৫
১০.ব্রজেন্দ্রকুমার দে ; করুণাসিন্ধু বিদ্যাসাগর : মণ্ডল অ্যান্ড সন্স, কলকাতা, ১৯৭০
১১.মহম্মদ আবুল হায় আনিসুজ্জামন ; বিদ্যাসাগর রচনা সংগ্রহ : স্টুডেন্টস ওয়েজ, ঢাকা, ১৯৬৮
১২.যোগেন্দ্রনাথ গুপ্ত ; বিদ্যাসাগর : পঞ্চম সংস্করণ, কলকাতা, ১৯৪১
১৩.যোগীন্দ্রনাথ সরকার ; বিদ্যাসাগর : ১৯০৪
১৪.রজনীকান্ত গুপ্ত ; ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর : ১৮৯৩
১৫.রমাকান্ত চক্রবর্তী (সম্পাদিত) ; শতবর্ষ স্মরণিকা : বিদ্যাসাগর কলেজ, ১৮৭২-১৯৭২ : বিদ্যাসাগর কলেজ, ১৯৭২
১৬.রমেশচন্দ্র মজুমদার ; বিদ্যাসাগর : বাংলা গদ্যের সূচনা ও ভারতের নারী প্রগতি : জেনারেল প্রিন্টার্স অ্যান্ড পাবলিশার্স, কলকাতা, ১৩৭৬ বঙ্গাব্দ
১৭.রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ; বিদ্যাসাগর-চরিত : বিশ্বভারতী গ্রন্থনবিভাগ, কলকাতা
১৮.রাধারমণ মিত্র ; কলিকাতায় বিদ্যাসাগর : জিজ্ঞাসা, কলিকাতা, ১৯৪২
১৯.রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী ; চরিত্র কথা : কলকাতা, ১৯১৩
২০.শঙ্করীপ্রসাদ বসু ; রসসাগর বিদ্যাসাগর : দ্বিতীয় সংস্করণ, দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা, ১৯৯২
২১.শঙ্খ ঘোষ ও দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় (সম্পাদিত) ; বিদ্যাসাগর : ওরিয়েন্ট, কলকাতা
২২.শম্ভুচন্দ্র বিদ্যারত্ন ; বিদ্যাসাগর চরিত : কলকাতা, ১২৯৪ বঙ্গাব্দ
২৩.শম্ভুচন্দ্র বিদ্যারত্ন ; বিদ্যাসাগর জীবনচরিত : কলকাতা
২৪.শম্ভুচন্দ্র বিদ্যারত্ন ; বিদ্যাসাগর চরিত ও ভ্রমণিরাস : চিরায়ত, কলকাতা, ১৯৯২
২৫.শশিভূষণ বিদ্যালঙ্কার ; ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর : জীবনীকোষ, ভারতীয় ঐতিহাসিক, কলকাতা, ১৯৩৬
২৬.শামসুজ্জামান মান ও সেলিম হোসেন ; ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর : চরিতাভিধান : বাংলা একাডেমী, ঢাকা, ১৯৮৫
২৭.সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ও সজনীকান্ত দাস (সম্পাদিত) ; বিদ্যাসাগর গ্রন্থাবলী (তিন খণ্ডে) : বিদ্যাসাগর স্মৃতি সংরক্ষণ সমিতি, কলকাতা, ১৩৪৪-৪৬ বঙ্গাব্দ
২৮.সন্তোষকুমার অধিকারী ; বিদ্যাসাগর জীবনপঞ্জি : সাহিত্যিকা, কলকাতা, ১৯৯২
২৯.সন্তোষকুমার অধিকারী ; আধুনিক মানসিকতা ও বিদ্যাসাগর : বিদ্যাসাগর রিসার্চ সেন্টার, কলকাতা, ১৯৮৪
৩০.হরিসাধন গোস্বামী ; মার্কসীয় দৃষ্টিতে বিদ্যাসাগর : ভারতী বুক স্টল, কলকাতা, ১৯৮৮
৩১.পশ্চিমবঙ্গ পত্রিকার বিদ্যাসাগর সংখ্যা, সেপ্টেম্বর-অক্টোবর ১৯৯৪.
৩২. অনন্য বিদ্যাসাগর, শ্রী অনুনয় চট্টোপাধ্যায়।
৩৩. স্বামী বিবেকানন্দের বানী ও রচনা, নবম খণ্ড, উদ্বোধন, ১৯৭৩।
৩৪. জীবন সন্ধানী বিদ্যাসাগর, রামরঞ্জন রায়।
৩৫. পশ্চিমবঙ্গ পত্রিকা, বিদ্যাসাগর সংখ্যা, ১৪০১ বঙ্গাব্দ।
৩৬. ঊনবিংশ শতাব্দীর যুক্তিবাদী ও বিদ্যাসাগর, শ্রী গৌতম চট্টোপাধ্যায়।
৩৭. বিদ্যাসাগর জীবনচরিত ও ভ্রমনিরাস, শম্ভুচন্দ্র বিদ্যারত্ন, চিরায়ত প্রকাশন, ২০১৪।
৩৮. ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ও উনিশ শতকের বাঙ্গালী সমাজ, বদরুদ্দীন উমর, সুবর্ণ, ২০১৬।
৩৯. বিদ্যাসাগর, বিনয় ঘোষ।
৪০. ইন্টারনেট।

      -------------------------------------------------------------

Popular posts from this blog

*সংক্ষিপ্ত কালী সংহিতা**.........প্রসূন কাঞ্জিলাল।* সনাতন ধর্মমতে কালী বা কালিকা হচ্ছেন শক্তির দেবী। কাল শব্দটির অর্থ সময় হতে পারে, আবার এটা রঙও বুঝাতে পারে। কাল তথা কৃষ্ণবর্ণ, এর অর্থ হতে পারে মৃত্যুবোধক। যেমন আমরা বলি- ‘কাল’এসে গেছে, মৃত্যুর সময় সমাসন্ন, মহাকাল এসে গেছে। দেবীর নাম মহাকালীও বটে। কালীর নাম কাল না হয়ে কালী হলো এ কারণে যে শিবের অপর নাম কাল, যা অনন্ত সময়কাল বোধক। কালী হচ্ছে কাল-এর স্ত্রীলিঙ্গ বোধক। মা কালী মা দুর্গা বা পার্বতী’র সংহারী রূপ। ঊনবিংশ শতাব্দীর সংস্কৃত ভাষার বিখ্যাত অভিধান শব্দকল্পদ্রুম এ বলা হচ্ছে ‘কাল শিবহ্। তস্য পত্নতি কালী।’ অর্থাৎ শিবই কাল বা কালবোধক। তাঁর পত্নী কালী। কালী হচ্ছেন মা দুর্গার বা পার্বতীর অপর ভয়াল রূপ। তিনি সময়ের, পরিবর্তনের, শক্তির, সংহারের দেবী। তিনি কৃষ্ণবর্ণা বা মেঘবর্ণা এবং ভয়ংকরী। সনাতন ধর্মাবলম্বীরা ভয়ংকরেরও পূজা করেন। তিনি অশুভ শক্তির বিনাশ করেন। তাঁর এই শক্তির পূজা সনাতন সমাজকে প্রভাবিত করেছে, বিশুদ্ধ শক্তি সঞ্চারিত করেছে, অন্তর শুদ্ধি দিয়েছে, দুর্দিনের দুর্বলতায় সাহস দিয়েছে। শাক্ত সৃষ্টিতত্ত্ব মতে এবং শাক্ত-তান্ত্রিক বিশ্বাস মতে তিনিই পরম ব্রহ্ম। কালীকে এই সংহারী রূপের পরেও আমরা মাতা সম্বোধন করি। তিনি সন্তানের কল্যাণ চান, তিনি মঙ্গলময়ী, তিনি কল্যাণী--- এটাই তাঁর প্রতি সনাতন ধর্মীয় বিশ্বাসের মূল আস্থা ও নির্যাস। একটা ধারণা আমাদের মধ্যে বর্তমান আছে যে, শিব পার্বতীর স্বামী এবং মা কালীর ভাসুর। কথাটি আদৌ সত্য নয়। অসুররক্ত স্নাত কোপান্বিতা এই দেবীর সংহারী মূর্তিতে কিছুটা নিবৃত্ত ও প্রশমিত করতে শিব তাঁর চলার পথে শুয়ে থাকলেন। দেবী পথ চলতে গিয়ে তাঁর স্বামী শিবকে পায়ে মাড়ালেন। এই পাদস্পৃষ্ঠতার লজ্জায় ও তার অনুশোচনায় মায়ের জিহ্বায় কামড় পড়লো। তাঁর কোপভাব স্থিমিত হলো, ছেদ পড়লো।কালীকে যদি বলি কল্পনা, তবে সেই কল্পনাও ধর্মে বর্ণিত হয়েছে বর্তমান বিজ্ঞানের ধারণার হাজার হাজার বছর আগে। এ কথা বিজ্ঞান প্রথমতঃ স্বীকার করে যে, সৃষ্টির আদি যুগে অনন্ত ব্রহ্মা- ছিল নিকষ কালো অন্ধকারে নিমজ্জিত, নিশ্ছিদ্র তমসায় আবৃত, অনন্ত সৃষ্টিতে তখনো আলোর সৃষ্টি হয়নি। রবি শশী তারা বা কোন আলোকবর্তিকা তখনো ছিলনা। বিজ্ঞান মতে আলোর সৃষ্টির আগে অন্ধকার ছিল। এ বর্ণনায় কান পেতে শুনলে আমরা দেখি কৃষ্ণবর্ণা মা কালী সেই যুগের প্রতিনিধিত্ব করছেন। ধর্ম ও বিজ্ঞানের এখানে অপূর্ব সমন্বয় ঘটেছে। দ্বিতীয়তঃ বিজ্ঞানের ‘বিগ্ ব্যাংগ্ তত্ত্ব’ মতে কাল বা সময় তখন সবে মাত্র সৃষ্টি হয়েছে, কাল্ বা সময় যখন সৃষ্টি হলো তথা যে দিন ভূমিষ্ঠ হলো, সেদিন নির্ধারিত হলো সেই কালেরও শেষ আছে, সংহার আছে। বিশ্ব ব্রহ্মা- সৃষ্টি যখন হয়েছে সময় এলে তা ধ্বংসও হবে। তার লয়ও অবশ্যম্ভাবী। কালী এই সংহারের প্রতিভূ, তিনি কাল এর জীবন্তকালের সীমারেখার নির্ধারণকৃত। তৃতীয়তঃ বিজ্ঞানীরা সৃষ্টির প্রথম যুগের মহাবিশ্বের যে বর্ণনা দেন তা ভয়াল ভীষণ, তার মধ্যে সৃষ্টির চাইতে ধ্বংসই বেশী। প্রবল সংহারের মধ্যে দিয়ে অনন্ত ব্রহ্মার সৃষ্টি। মা কালী সেই সংহারের প্রতিভূ তিনি ভয়াল দর্শনা সংহারের দেবী। সৃষ্টির সেই ক্রমবিকাশের যুগেই মা কালী মা জগজ্জননী প্রবল সংহারের মধ্যে দিয়েই তাঁর সৃষ্টি ও তাঁর কল্যাণময় রূপকে আমাদের কাছে তুলে ধরেছেন। মা কালী যুগপৎ কাল, কৃষ্ণবর্ণ এবং সংহারের দেবী। কিছুই ছিল না, তখন দেবী ছিলেন। এই মাতৃপূজা তথা মাতৃমূর্তি হিন্দুধর্মের আদিকথা।অথর্ব বেদ-এ কালীর উল্লেখ থাকলেও বিশেষ হিসেবে কথক গ্রাহ্য সূত্রে (১৯.৭) প্রথমবার কালীর উল্লেখ ঘটে। কালী অগ্নিদেবের সাতটি জিহ্বার একটি নাম, অগ্নিদেব হচ্ছেন আগুনের ঋগ্বেদীয় দেবতা যার উপস্থিতি মুণ্ডুক উপনিষদে বর্তমান; তবে এখানে কালী বলতে দেবী কালীকেই উল্লেখ করা হয়েছে এটা নির্ণীত করা কঠিন। কালী’র বর্তমান রূপের উপস্থিতি আমরা পাই মহাভারতের সুপ্তিকা পার্বণে, যেখানে তিনি কালরাত্রি হিসেবে অভিহিতা, যিনি পাণ্ডব সৈন্যদের স্বপ্নে দৃশ্যমান এবং পরে দ্রোণাচার্য পুত্র অশ্বত্থামা যখন তাদের আক্রমণ করলেন তখন তিনি প্রকৃত স্বরূপে আবির্ভূতা। মহাদেবী’র একটি শক্তি হিসেবে তিনি ষষ্ঠ শতাব্দীর ‘দেবী মাহাত্ম্যম’এ প্রসিদ্ধ, এবং ‘রক্তবীজ’ নামক অসুরকে পরাভূতকারী দেবী হিসেবে গুরুত্ব সহকারে উল্লেখিত। রক্তবীজকে নিশ্চিহ্ন করতে দেবী নরসিংহী, বৈষ্ণবী, কুমারী, মহেশ্বরী, ব্রাহ্মী, বরাহী, ঐন্দ্রী, চামু- বা কালী এই অষ্ট-মাতৃকা রূপে সংস্থিতা। দশম শতাব্দীর ‘কালিকা পুরাণে’ পরম সত্য হিসেবে কালীকে স্তুতি করা হয়। তবে ভিন্ন ও স্বতন্ত্র এক দেবী হিসেবে ষষ্ঠ শতাব্দীতে কালী প্রথম উল্লেখিতা। এবং এ সকল তন্ত্রে গ্রন্থে তিনি বহির্বৃত্তে বা প্রান্তিক সীমায় বা যুদ্ধ ক্ষেত্রে স্থিতা বা দণ্ডায়মানা দেবী। অধিকাংশ ক্ষেত্রে তিনি শিবের শক্তিরূপে চিহ্নিতা, এবং বিবিধ পুরাণে শিবের উপস্থিতির সঙ্গে তিনি ওতপ্রোতভাবে সম্পৃক্তা। কালিকা পুরাণে তাঁকে বলা হচ্ছে ‘আদি শক্তি’, তিনি প্রকৃতির সীমার বাইরেও অধিষ্ঠাত্রী ‘পরা প্রকৃতি’।১৬৯৯ শকাব্দে (১৭৭৭ খ্রীষ্টাব্দে) কাশীনাথ বিরচিত ‘শ্যামাসপর্যায়বিধি-তে এ পূজার সর্বপ্রথম উল্লেখ লক্ষণীয়। পূজার প্রমাণস্বরূপ এ গ্রন্থে পুরাণ ও তন্ত্রের বচন উল্লেখিত। সপ্তদশ শতাব্দীতে বলরাম বিরচিত কালিকা মঙ্গলকাব্যে একটি বাৎসরিক ধর্মীয় অনুষ্ঠান কালীকে নিবেদিত এই মর্মে উল্লেখিত। অষ্টাদশ শতাব্দীতে নবদ্বীপের রাজা কৃষ্ণচন্দ্র বাংলায় প্রথম কালীপূজার প্রবর্তন করেন। ঊনবিংশ শতাব্দীতে কালীপূজা বাংলায় বিশেষ প্রাধান্য লাভ করে। রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের পৌত্র ঈশানচন্দ্র এবং কলকাতার সমাজের বিত্তবান ও উচ্চশ্রেণীর লোকজনের মধ্যে এ পূজার প্রচলন বৃদ্ধি পায়। ক্রমে দুর্গা পূজার সাথে সাথে কালী পূজাও বিশেষত বাংলায় একটি প্রধান হিন্দু ধর্মীয় উৎসবে পরিণত হয়। পরে এবিষয়ে বিস্তারিত আলোচনায় আসা যাবে।শিবের উপর দণ্ডায়মানা কেন, তার তিনটি ব্যাখ্যা বর্তমান এর একটি প্রচলিত কাহিনী, একটি পৌরাণিক, অন্যটি তান্ত্রিক ব্যাখ্যা। এটা বলা হয়ে থাকে যে শক্তি ছাড়া শিব হচ্ছে শব। শিবের উপর দন্ডায়মানা কালী এটাই বুঝায় যে শক্তি বাদ দিলে বস্তু মৃতমাত্র। পৌরাণিক ব্যাখ্যা মতে, পার্বতী একদিন স্বামীকে প্রশ্ন করলেন তার দশটি রূপের মধ্যে কোনটি শিবের পছন্দ ? বিস্মিত পার্বতী শুনলেন, কালীর ভয়াল মূর্ত্তিতেই শিবের সাচ্ছন্দ্য। এই ধারণাটি দেবী ভাগবত পুরাণে ব্যাখ্যা করা আছে। দ্বাদশ থেকে পঞ্চদশ শতাব্দীর ভক্তিমূলক শ্যামাসঙ্গীতেও মায়ের বর্তমান রূপের এই ধারণাটি গুরুত্ব পেয়েছে। তান্ত্রিক পদ্ধতিতে তাঁর ভয়াল রূপ সত্ত্বেও রাত দুপুরে শ্মশানে তাঁর মুখোমুখি হওয়ার সাহস অর্জন এবং অন্যদিকে তাঁর প্রতি বাঙালিদের শিশুর মতো শর্তহীন ভালবাসা উভয় ক্ষেত্রে মৃত্যুর সঙ্গে পরিচিত হওয়া ও তাকে মেনে নেওয়াই মুখ্য কাজ।দুর্গার মতো কালীও সাধারণ সর্বজনীন হিসেবে বিবেচিত। সবচেয়ে সরাসরি বহুল ভাবে তিনি পূজিতা হন মহাকালী বা ভদ্রকালী রূপে। আদি পরাপ্রকৃতি (দেবী দুর্গা) অথবা ভাগ্যবতীর দশমহাবিদ্যা রূপের একটি রূপে কালী পূজিতা হন। দেবী বন্দনার এই স্তোত্রকে বলা হয় দেবী অর্গলা স্তোত্রম্ যা নিম্নরূপঃ'‘ওঁ জয় ত্বং দেবী চামুণ্ডে জয় ভূত অপহারিণি।জয় সর্বগতে দেবী কালরাত্রি নমোহস্তুতে।। ১জয়ন্তী মঙ্গলা কালী ভদ্রকালী কপালিনী।দুর্গা শিবা ক্ষমা ধাত্রী স্বাহা স্বধা নমোহস্তুতে।। ২’'আবার 'শ্রী শ্রী চন্ডী'-র একাদশ অধ্যায় তথা উত্তর-চরিত্র, 'নারায়ণীস্তুতি'-র দশম শ্লোক অনুযায়ী,"সর্বমঙ্গলা মঙ্গল্যে শিবে সর্বার্থসাধিকে। শরণ্যে ত্র্যম্বকে গৌরী নারায়নী নমহোস্তুতে।।১০"যা উপরে বর্ণিত একই ব্যঞ্জনার দ্যোতক।মধ্যযুগের শেষের দিকে বাঙালীর ভক্তিমূলক সাহিত্যে কালী ব্যাপক স্থান নিয়ে বিরাজমান। সাধক রামপ্রসাদ সেন(১৭১৮-১৭৭৫) এর মতো কালীভক্ত উপাসকরা কালীকে নিয়ে রচনা করেছেন অসংখ্য ভক্তিমূলক গান। অথচ শিবপত্নী হিসেবে পার্বতীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হয়ে নানা কাহিনীতে উচ্চারিত হওয়া ছাড়া কালীকে অষ্টাদশ শতাব্দীর আগে বাঙালীর ঘরে ঘরে আবাহনী গেয়ে পূজিত হতে কদাচিৎ দেখা গেছে। আর বাঙালির ঘরে তাঁর ভয়াল রূপের বর্ণনা, বৈশিষ্ট, অভ্যাসসমূহ উল্লেখযোগ্য কোন রূপান্তর ঘটেনি। বাংলাদেশে অনেক কালী মন্দির আছে। এর অনেকগুলোই সুপ্রাচীন। অধুনা লুপ্ত ঢাকার রমনা কালী মন্দির তেমনি একটি পুরাতন কালী মন্দির। ব্রহ্মযামলে উল্লেখ আছে ‘কালিকা বঙ্গদেশে চ’, অর্থাৎ, ‘বঙ্গদেশে দেবী কালিকা বা কালী নামে পূজিতা হন।’ নানা রূপে নানা স্থানে কালী পূজিতা হন, যেমন দক্ষিণাকালী, শ্মশানকালী, ভদ্রকালী, রক্ষাকালী গুহ্যকালী, মহাকালী, চামুণ্ডা ইত্যাদি নামে মাহাত্ম্যে এ কালীর মধ্যে কিছু কিছু ভিন্নতা বর্তমান। অন্যদিকে বিভিন্ন মন্দিরে দশমহাবিদ্যা ব্রহ্মময়ী, ভবতারিণী, আনন্দময়ী, করুণাময়ী ইত্যাদি নামে কালী’র পূজা হয়। চট্টগ্রাম শহরের চট্টেশ্বরী শ্রী কালীবাড়ী, গোলপাহাড় শ্মশান কালীবাড়ী, দেওয়ানহাটের দেওয়ানেশ্বরী কালীবাড়ী,সদরঘাট কালীবাড়ী, পটিয়া পিঙ্গলা কালীবাড়ী, ধলঘাট বুড়াকালীবাড়ী সহ চট্টগ্রামে অনেক প্রসিদ্ধ কালী মন্দির বর্তমান। এছাড়াও আসামের কামরূপ কামাখ্যা দেবীর পূজাও বিশেষ প্রসিদ্ধ। এর প্রায় প্রত্যেকটিতে প্রত্যেক শনি ও মঙ্গলবার এবং অমাবস্যায় কালীপূজা হয়। কার্ত্তিক মাসের অমাবস্যা তিথিতে দীপান্বিতার দিন কালীপূজা বিশেষভাবে পালিত হয়।সর্বজনীন মণ্ডপে যেখানে দুর্গাপূজা হয় সেখানে অধিকাংশ মণ্ডপে কালীপূজাও হয়ে থাকে। অনেক কালীসাধক বিখ্যাত এবং শ্রদ্ধার্হ। শ্রীরামকৃষ্ণ কালীর উপাসক ছিলেন। স্বামী বিবেকানন্দও কালীর ভক্ত ছিলেন। কালী প্রশস্তিমূলক গান তথা শ্যামাসঙ্গীত বাংলা গানের একটি ভিন্ন ধারা। কালীসাধক রাম প্রসাদ সেন, কমলাকান্ত ভট্টাচার্য এ ধারায় অন্যতম অবদান রাখেন। দ্বিজেন্দ্রলাল রায় এবং কাজী নজরুল ইসলামও এ ধারার উৎকৃষ্ট মানের গান রেখে গেছেন। নিরক্ষর শ্রীরামকৃষ্ণ দেবী কালী সচেতনতায় সিক্ত হয়ে অনবদ্য বাণী উচ্চারণ করতেন যা শ্রী'ম রচিত অমর গ্রন্থ ‘রামকৃষ্ণ কথামৃত’তে স্থান পেয়েছে। ‘মৃত্যুরূপা কালী’, দেবী কালীকে নিয়ে আছে স্বামী বিবেকানন্দ রচিত একটি বিখ্যাত সুদীর্ঘ কবিতা। ভগিনী নিবেদিতা মাতৃরূপা কালী নামক একটি কালী বিষয়ক গ্রন্থ রচনা করেছিলেন।দীপাবলী বা দীপান্বিতা বা কার্ত্তিকী অমাবস্যায় অনুষ্ঠিত কালীপূজা উপলক্ষে দেবী মূর্তির দক্ষিণা কালীর অবয়বে তৈরী হয়, এক্ষেত্রে দেবী বৈশিষ্ট হচ্ছে দেবী করালবদনা, কৃষ্ণবর্ণা, নীলবর্ণা বা মহামেঘবর্ণা। দেবী আলুলায়িত কেশা। রামপ্রসাদী গানে ভক্তিভরে মাকে বলা হচ্ছে,‘…এলোকেশী সর্বনাশী..’,মা এলোকেশী, রক্তচক্ষু, লোল জিহ্বা, চতুর্ভূজা, নৃমুণ্ড-মালিনী,, নরহস্তের কোমরবন্ধ, বাম ঊর্ধ্ব করে উন্মুক্ত খড়্গ এবং অধো হস্তে নরমুণ্ড, দক্ষিণ করদ্বয়ে বর ও অভয়মুদ্রা। দক্ষিণা কালীর দক্ষিণ পা শিববক্ষে স্পর্শমান, বাম পা খানিকটা দূরত্বে। স্বামীর গায়ে পা পড়ায় অসুর-রক্ত পানে সিক্ত জিহ্বায় কামড়। ত্রিনয়নী মা অসুর হত্যার মহাঘোরে হাস্যরতা ও ভয়াল দর্শনা। মায়ের গলায় নৃমুণ্ড মালায় সাধারণত ১০৮টি অথবা ৫১ টি নরমুণ্ড বর্তমান। ১০৮ হিন্দুদের জন্য একটি পবিত্র সংখ্যা, দেবনাগরী বর্ণমালায় সর্বসমেত ৫১টি বর্ণ আছে। হিন্দুদের বিশ্বাস সংস্কৃত একটি চলমান জীবন্ত ভাষা এবং এর ৫১ টি বর্ণমালায় অপার শক্তি নিহিত আছে।মায়ের কোন চিরস্থায়ী গুণ বা প্রকৃতি নেই, যার মানে দাঁড়ায় বিশ্ব-প্রকৃতি ধ্বংসের পরেও তিনি বর্তমান থাকবেন। হিন্দু শাস্ত্রে পূজিতা দেবীদের মধ্যে কালীর রূপ ও চরিত্র সর্বাধিক রোমাঞ্চকর ও বিস্ময় উদ্রেককারী। ঘোর অমাবস্যার গভীর রাতে তাঁর পূজা সম্পন্ন হয়। কালী ভীষণ দর্শনা, ক্রোধান্বিতা, লজ্জাহীনা। কালী ভয়ঙ্কর যোদ্ধা, রক্তপিয়াসী। কালী চির ব্যতিক্রমী। ঐশী সংযোগ সত্ত্বেও এক দীর্ঘকালীন উপেক্ষার আখ্যান। তবে দুর্বল, দ্বিধান্বিত মন যখনই শক্তি প্রার্থনা করেছে, বল ভিক্ষা করেছে, ওই করাল বদনা মহাতেজার শরনাপন্ন হয়েছে। ঘোর আমানিশায় জনমানবহীন মধ্যরাতের নিভৃত পূজাতেই ছিল তাঁর অধিকার। কোনো ক্ষেত্রে সূর্যের আলো স্পর্শ ও ছিল নিষিদ্ধ। হাজার বছরের বিমুখতা অতিক্রম করে আজকের দীপাবলী উৎসবে যথেষ্ট ধূমধাম সহযোগে তাঁর উপাসনা হয়ে থাকে। তবে বাঙালীর উৎসবমুখীতাই যে এই পূজার জনপ্রিয়তার অংশত কারণ তাতে সন্দেহের অবকাশ নেই। কারণ বহু ধুমধাম সহযোগে সম্বৎসরের এই মাতৃ আরাধনা তথা শক্তি পূজা আমাদের সমাজে নারীর অবস্থান ও গ্রহণযোগ্যতাকে বিন্দু মাত্র প্রভাবিত করে না। বর্তমান সময়ের দীপান্বিতা উৎসব যদি মোহনা হয়, তবে এই তরঙ্গিনীর উৎস সম্পর্কে আগ্রহ স্বাভাবিক। এই অনুসন্ধান সহজ নয়। কালের প্রবাহে উপনদীর মতো অসংখ্য উপগাথা এসে মিশে গেছে মূল তথ্যে - আজ তাদের পৃথক করা বেশ কঠিন কাজ। অনেক সময়ই অসম্ভব। তবে প্রতিটি অংশই অতীব চিত্তাকর্ষক তাতে সন্দেহ নেই। পুরান তথা বিভিন্ন সাহিত্য থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী কালীর বর্তমান রূপ পরিগ্রহে সময় লেগেছে অন্তত দুই হাজার বছর। কালীর বৈদিক পরিচয় অথর্ব বেদের সুত্রে। এই বেদে প্রথম কালীর স্বরূপ প্রকাশিত হয়। তবে মার্কণ্ডেয় পুরাণ, কালিকা পুরাণ ইত্যাদিতেও কালীর উল্ল্যেখ পাওয়া যায়। মহাভারতের সৌপ্তিক পর্বে কালরাত্রি নাম্নী এক দেবীর বর্ণনা পাই। এই দেবী কালিকারই অন্য রূপ বলে উল্লিখিত হয়ে থাকে। উৎস খুঁজতে গিয়ে দেবী কালীর প্রথম পর্যায়ের সাথে অনার্য সম্বন্ধের সম্ভাবনা জোরালো ভাবে উঠে আসে। হরপ্পা - মহেঞ্জদরো সভ্যতায় মাতৃ পূজা প্রচলিত ছিল বলে জানা যায়। এই সভ্যতা ছিল মাতৃতান্ত্রিক। পূজিতা এই দেবীর সাথে দেবী কালিকার প্রভূত সাদৃশ্য পাওয়া যায়। আবার কেউ কেউ কালীকে আদিবাসি সম্প্রদায়ের দেবী রূপেও বর্ণনা করে থাকেন। সপ্তম - অষ্টম দশকের কিছু লেখায় এর উল্ল্যেখ আছে তবে ঈষৎ ভিন্ন ভাবে। যেমন বান ভট্টের নাটক কাদম্বরীতে দেবী চণ্ডীর উপাখ্যান পাওয়া যায়। ইনি শবর জাতির দ্বারা পূজিতা হতেন। সমকালীন কবি বাকপতি বিরচিত " গৌড় বহও " নামক প্রাকৃত ভাষায় রচিত কাব্য গ্রন্থে বিন্ধ্যবাসিনি নামে এক দেবীর কথা আছে যিনি ছিলেন শবরদের আরাধ্যা। তাঁর সাথে ও কালীর বিশেষ মিল পাওয়া যায়। মূল বর্ণনা অনুযায়ী এই দেবী ভীষণ দর্শনা, মুণ্ডমালিনী, প্রায় নগ্ন এক মূর্তি। খ্রিস্ট পূর্ব ৩০০ থেকে প্রায় ৬০০ খ্রিস্টাব্দ অবধি কালী মূলত যুদ্ধের দেবী রূপে পূজিতা হতেন। বৈদিক দেবী হলেও তৎকালীন সময়ে সনাতন হিন্দু ধর্মের মূল স্রোতে তিনি কিছুটা ব্রাত্যই ছিলেন। কালীর আরাধনা বিশেষত নিম্ন বর্ণ বা অবৈদিক সমাজেই বিশেষ জনপ্রিয় ছিল। নগরের বাইরে শ্মশানের কাছাকাছি অঞ্চলেই কালী মন্দিরের অবস্থান বেশি পরিলক্ষিত হয়। তবে ষষ্ঠ শতকের 'দেবী মাহাত্মম' রচনায় মহাকালী রূপে কালীর রূপ ও মাহাত্ম্যের বিস্তৃত বর্ণনা পাই। অশুভ বিনাশ করে ইনি শুভ শক্তির প্রতিষ্ঠা করেন। দেবী দুর্গার ললাট উৎপন্না মহা শক্তিশালিনী দেবী রূপে তিনি স্বীকৃতি পান। আবার স্বামী অভেদানন্দের মতে বৈদিক দেবী 'রাত্রি' পরবর্তীতে দেবি কালিকা হয়ে ওঠেন। তবে তন্ত্র সাধনার সাথে সুনিবিড় যোগাযোগ এক সুদীর্ঘ সময় কালীকে সাধারন মানুষের থেকে দূরে সরিয়ে রাখে। এক ভয় মিশ্রিত শ্রদ্ধা এর কারণ হয়তো। তবে পরবর্তীতে এই সম্পর্ক ধীরে ধীরে সহজ হয়। সতেরোশ খ্রিস্টাব্দ-উত্তর সময়ে কালী সাধনা এক অন্য রূপ পায়। ভয়াল ভয়ঙ্কর রক্ত পিপাসু দেবী, স্নেহময়ী মা হয়ে ওঠেন। সাধক রাম প্রসাদ, সাধক বামাখ্যাপা তথা শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংস দেবের ন্যায় কালী উপাসকেরা দেবী কালিকার ভবতারিণী মাতৃ রূপ পূজা প্রচার করেন। ক্রমশ এই রূপ সাধারন বাঙালী মনের কাছাকাছি আসে । বাঙালী হৃদয় আসনে তখন থেকেই তাঁর করুনাঘন অবস্থান।ব্রিটিশ শাসিত বাংলা তথা ভারতে কালী উপাসনা বিশেষ তাৎপর্য পূর্ণ হয়ে উঠেছিল। পরাধীন জাতির অন্তরের ক্ষোভ আর প্রতিবাদের উচ্চারণ কালীর দৃপ্ত ব্যক্তিত্বকে অনুসরন করতে চাইত। সশস্ত্র স্বাধীনতা সংগ্রামের অংশ হিসেবে শক্তি আরাধনা তথা কালী উপাসনার প্রচলনের বহু প্রমান পাওয়া যায়। কালীর তেজোময়ী, লড়াকু ভাবময়তা তৎকালীন বিপ্লবীদের মধ্যে যথেষ্ট জনপ্রিয়তা অর্জন করে। প্রখর নারী সত্ত্বা, যা ছিল উপেক্ষিত, বিপর্যয়ের ক্ষণে তা দৈবী স্বরূপে স্বীকৃত হয়। অপর কারণটি ছিল কালী সম্পর্কে শাসক জাতির অবহেলা মিশ্রিত আতঙ্ক ও ভয়। এই উগ্র ভয়াল প্রায় নগ্ন রূপ ব্রিটিশ মানসিকতাকে সজোরে আঘাত করে। রক্তপিপাসু এবং যৌনতার প্রতীক রূপেই কালীর পরিচয় হয়। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, শ্রীমৎ দক্ষিণাকালিকার ধ্যান মণ্ত্রে সর্বশেষ পঙ্ক্তির আগের পঙ্ক্তির অংশ বিশেষ ---".... মহাকালেন চ সমং বিপরীতরতাতুরাম ।।"অর্থাৎ, দেবী বিপরীত-রতাতুরা -- দেবীর ভৈরব মহাকাল। মহাকালের সাথে দেবী বিপরীত রতিতে সঙ্গতা হয়ে রয়েছেন। ( রতিকালে শায়িত পুরুষোপরি নারী আরোহণ করে ক্রীয়া নিষ্পন্ন করলে তাকে বিপরীত রতি বলে )। এক্ষেত্রে, ব্রক্ষ্মচৈতণ্যকে অধিষ্ঠান করে মায়াশক্তিরূপিণী কালী জগত সৃষ্টি করে চলেছেন। আর এখানেই প্রচ্ছন্ন ভাবে লুকিয়ে আছে যৌনতা ও সৃষ্টির পারস্পরিক মেলবন্ধন।কালীকে নিয়ে অবজ্ঞা ভাব তখনকার বহু বিদেশী বিদ্বদজনের মধ্যেও দেখা যায়। এমনকি পণ্ডিত ম্যাক্সমুলার ও কালীকে নিয়ে বিশেষ আগ্রহ দেখান নি। তবে পরবর্তীতে বিশেষত উনিশশো ষাট ও সত্তরের দশকে কালীর এই ব্যতিক্রমী স্ত্রী সত্ত্বা বহু গবেষণার মূল বিষয় হয়ে ওঠে। কালী শব্দের ব্যুৎপত্তি ও অর্থ সম্পর্কিত প্রচলিত ধারনা সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত উল্ল্যেখ ব্যতিরেকে এই আলোচনা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। কু ধাতুর উত্তরে অল্ + কর্তৃবাচ্যে অন্ যুক্ত হয়ে কাল পদটি হয়। এর অর্থ হলো মৃত্যু বা মহাকাল অর্থাৎ মহাদেব। এই কাল শব্দের উত্তরে স্ত্রীলিঙ্গে ঈপ্ প্রত্যয় যুক্ত হয় কালী শব্দটির সৃষ্টি হয়েছে। অর্থ হলো মহাকালের বিশেষ শক্তি কালী। দশমহাবিদ্যার ইনিই প্রথম মহাবিদ্যা। অনন্তকালের সৃষ্টিরুপিণী পরমা প্রকৃতির রূপ এই মহাশক্তি কালী। শ্রী শ্রী চণ্ডী মতে কালী তিনি, যিনি 'কাল' নিয়ন্ত্রন করেন। 'কাল' অর্থে সময়। বেদ তত্ত্ব অনুসারে তিনি আদি শক্তি - মহাকাল শিবের অর্ধাঙ্গিনী! শক্তি উপাসনা এ ক্ষেত্রে অনেকাংশেই পুরুষ তথা শিব নির্ভর। তবে তন্ত্র মতে কালীর দৈবী সত্ত্বা বহুলাংশে স্বাধীন ও একক। এই মতবাদ অনুযায়ী কালী শব্দের মধ্যে 'কল' ধাতু আছে। কল্ ধাতুর ভাবগত অর্থ হলো গণনা, গতি, আশ্রয়, শব্দ, সংখ্যা ! তাই কালী শব্দের তাৎপর্য হলো সংখ্যায়নী গতি সম্পন্না যিনি। শিবের বুকের উপর দণ্ডায়মান কালী - এটা সৃষ্টি তত্ত্বের প্রথমিক পর্যায়ের ইঙ্গিতবাহী। সাংখ্য দর্শন বলে পুরুষ অক্রিয় , প্রকৃতির সংস্পর্শে তিনি সক্রিয় হয়ে ওঠেন। তাই পুরুষ শিব এখানে শব রূপে শায়িত। বস্তুবাদী এই দর্শন অনুসারে পুরুষ স্থানু বা স্থির ধর্মী , প্রকান্তরে তীব্র ধনাত্মক শক্তি। আর নারী চরিষ্ণু বা ঋণাত্মক। এই দুই বিপরীতধর্মী শক্তির পারস্পরিক মিলনে সৃষ্টির সূচনা। আর তারই প্রতীক নিস্ক্রিয় শিবের বুকে চঞ্চলা কালীর পদ চারণা! মধ্যযুগীয় তন্ত্র মতোবাদের প্রসারে এই সাংখ্য দর্শনের যথেষ্ট প্রভাব দেখা যায়।কালী নারী সত্ত্বার এমন এক রূপ যা স্বয়ংসম্পূর্ণ, প্রচলিত স্ত্রী ভাবনার পরিপন্থী, অনন্য। তাঁর দৈবী ভাবমূর্তি বিতর্কিত ও বটে। কারণ কালী পৃথক - লোল জিহ্বা, উন্মুক্ত স্তন, নগ্ন জঙ্ঘা অথচ অনায়াস সাবলীল ভঙ্গিমায় এক ব্যতিক্রমী চরিত্র। আবহমান কাল ধরেই ভক্তি মার্গে তাঁর আসনে উপেক্ষার ছায়া। তাঁর রণরঙ্গিণী রক্ত লোলুপ নির্লজ্জ রূপে তথা কথিত সভ্য মন সদা বিব্রত - সে একাল হোক বা সেকাল। বেদ ও পুরানের অকুণ্ঠ সমর্থন সত্ত্বেও তাঁর ঐশী অস্তিত্বের সামগ্রিক গ্রহনীয়তা দীর্ঘসময় ধরে ছিল অবহেলিত। এখানে এও এক লড়াইয়ের কাহিনি--- আপস না করার লড়াই। অতি প্রাচীনকাল থেকেই কালী আধুনিক। তাঁর বলিষ্ঠ ব্যক্তিত্বকে কখনই আরোপিত মনে হয় না। যুদ্ধ ক্ষেত্রে প্রবল পরাক্রমে অসুর নিধন তাকে কখনই অসহজ করে তোলে না। এই স্বাচ্ছন্দ্যই হয়তো নারী ক্ষমতায়নের প্রথম সোপান।শ্রীশ্রী মা কালীর নাম উৎপত্তি ও রূপভেদ:--- ব্রহ্মযামল নামক তন্ত্রগ্রন্থের মতে, কালী বঙ্গদেশের অধিষ্ঠাত্রী দেবী। ‘কালী’ শব্দটি ‘কাল’ শব্দের স্ত্রীলিঙ্গ। এই শব্দের অর্থ ‘কৃষ্ণ’ (কালো) বা ‘ঘোর বর্ণ’। মহাকাব্য মহাভারত-এ যে ভদ্রকালীর উল্লেখ আছে, তা দেবী দুর্গারই একটি রূপ। মহাভারত-এ ‘কালরাত্রি’ বা ‘কালী’ নামে আরও এক দেবীর উল্লেখ পাওয়া যায়। ইনি যুদ্ধে নিহত যোদ্ধৃবর্গ ও পশুদের আত্মা বহন করেন। আবার হরিবংশ গ্রন্থে কালী নামে এক দানবীর উল্লেখ পাওয়া যায়। ‘কাল’ শব্দের দুটি অর্থ রয়েছে: ‘নির্ধারিত সময়’ ও ‘মৃত্যু’। কিন্তু দেবী প্রসঙ্গে এই শব্দের মানে "সময়ের থেকে উচ্চতর"। সমোচ্চারিত শব্দ ‘কালো’র সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক না থাকলেও, সংস্কৃত সাহিত্যের বিশিষ্ট গবেষক টমাস কবার্নের মতে, ‘কালী’ শব্দটি ‘কৃষ্ণবর্ণ’ বোঝানোর জন্যও ব্যবহৃত হতে পারে।★ রূপভেদ- তন্ত্র পুরাণে দেবী কালীর একাধিক রূপভেদের উল্লেখ পাওয়া যায়। তোড়লতন্ত্র অনুসারে, কালী আট প্রকার। যথা: দক্ষিণকালিকা, সিদ্ধকালিকা, গুহ্যকালিকা, শ্রীকালিকা, ভদ্রকালী, চামুণ্ডাকালিকা, শ্মশানকালিকা ও মহাকালী। মহাকাল সংহিতার অনুস্মৃতিপ্রকরণে নয় প্রকার কালীর উল্লেখ পাওয়া যায়। যথা: দক্ষিণাকালী, ভদ্রকালী, শ্মশানকালী, কালকালী, গুহ্যকালী, কামকলাকালী, ধণকালিকা, সিদ্ধিকালী, চণ্ডিকালিকা। শ্রী অভিনব গুপ্তের তন্ত্রালোক ও তন্ত্রসার গ্রন্থদ্বয়ে কালীর ১৩টি রূপের উল্লেখ আছে। যথা: সৃষ্টিকালী, স্থিতিকালী, সংহারকালী, রক্তকালী, যমকালী, মৃত্যুকালী, রুদ্রকালী, পরমার্ককালী, মার্তণ্ডকালী, কালাগ্নিরুদ্রকালী, মহাকালী, মহাভৈরবঘোর ও চণ্ডকালী। জয়দ্রথ যামল গ্রন্থে কালীর যে রূপগুলির নাম পাওয়া যায়, সেগুলি হল: ডম্বরকালী, রক্ষাকালী, ইন্দীবরকালিকা, ধনদকালিকা, রমণীকালিকা, ঈশানকালিকা, জীবকালী, বীর্যকালী, প্রজ্ঞাকালী ও সপ্তার্নকালী। নিম্নে মা কালীর মূল রূপগুলির (অষ্টধা কালী) ব্যাখ্যা দেবার চেষ্টা করলাম।● দক্ষিণাকালী- দক্ষিণাকালী হলো কালীর সর্বাপেক্ষা প্রসিদ্ধ মূর্তি। ইনি প্রচলিত ভাষায় শ্যামাকালী নামেও আখ্যাতা। দক্ষিণাকালী করালবদনা, ঘোরা, মুক্তকেশী, চতুর্ভূজা এবং মুণ্ডমালাবিভূষিতা। তাঁর বামকরযুগলে সদ্যছিন্ন নরমুণ্ড ও খড়্গ; দক্ষিণকরযুলে বর ও অভয় মুদ্রা। তাঁর গাত্রবর্ণ মহামেঘের ন্যায়; তিনি দিগম্বরী। তাঁর গলায় মুণ্ডমালার হার; কর্ণে দুই ভয়ানক শবরূপী কর্ণাবতংস; কটিদেশে নরহস্তের কটিবাস। তাঁর দন্ত ভয়ানক; তাঁর স্তনযুগল উন্নত; তিনি ত্রিনয়নী এবং মহাদেব শিবের বুকে দণ্ডায়মান। তাঁর দক্ষিণপদ শিবের বক্ষে স্থাপিত। তিনি মহাভীমা, হাস্যযুক্তা ও মুহুর্মুহু রক্তপানকারিনী। তাত্ত্বিকের তাঁর নামের যে ব্যাখ্যা দেন তা নিম্নরূপ: দক্ষিণদিকের অধিপতি যম যে কালীর ভয়ে পলায়ন করেন, তাঁর নাম দক্ষিণাকালী। তাঁর পূজা করলে ত্রিবর্ণা তো বটেই সর্বোপরি সর্বশ্রেষ্ঠ ফলও দক্ষিণাস্বরূপ পাওয়া যায়।● সিদ্ধকালী- সিদ্ধকালী কালীর একটি অখ্যাত রূপ। গৃহস্থের বাড়িতে সিদ্ধকালীর পূজা হয় না; তিনি মূলত সিদ্ধ সাধকদের ধ্যান আরাধ্যা। কালীতন্ত্র-এ তাঁকে দ্বিভূজা রূপে কল্পনা করা হয়েছে। অন্যত্র তিনি ব্রহ্মরূপা ভুবনেশ্বরী। তাঁর মূর্তিটি নিম্নরূপ: দক্ষিণহস্তে ধৃত খড়্গের আঘাতে চন্দ্রমণ্ডল থেকে নিঃসৃত অমৃত রসে প্লাবিত হয়ে বামহস্তে ধৃত একটি কপালপাত্রে সেই অমৃত ধারণ করে পরমানন্দে পানরতা। তিনি সালংকারা। তাঁর বাম পদ শিবের বুকে ও দক্ষিণ পদ শিবের উরুদ্বয়ের মধ্যস্থলে সংস্থাপিত।● গুহ্যকালী- গুহ্যকালী বা আকালীর রূপ গৃহস্থের নিকট অপ্রকাশ্য। তিনি সাধকদের আরাধ্য। তাঁর রূপকল্প ভয়ংকর: গুহ্যকালীর গাত্রবর্ণ গাঢ় মেঘের ন্যায়; তিনি লোলজিহ্বা ও দ্বিভূজা; গলায় পঞ্চাশটি নরমুণ্ডের মালা; কটিতে ক্ষুদ্র কৃষ্ণবস্ত্র; স্কন্ধে নাগযজ্ঞোপবীত; মস্তকে জটা ও অর্ধচন্দ্র; কর্ণে শবদেহরূপী অলংকার; হাস্যযুক্তা, চতুর্দিকে নাগফণা দ্বারা বেষ্টিতা ও নাগাসনে উপবিষ্টা; বামকঙ্কণে তক্ষক সর্পরাজ ও দক্ষিণকঙ্কণে অনন্ত নাগরাজ; বামে বৎসরূপী শিব; তিনি নবরত্নভূষিতা; নারদাদিঋষিগণ শিবমোহিনী গুহ্যকালীর সেবা করেন; তিনি অট্টহাস্যকারিণী, মহাভীমা ও সাধকের অভিষ্ট ফলপ্রদায়িনী। গুহ্যকালী নিয়মিত শবমাংস ভক্ষণে অভ্যস্তা। মুর্শিদাবাদ-বীরভূম সীমান্তবর্তী আকালীপুর গ্রামে মহারাজা নন্দকুমার প্রতিষ্ঠিত গুহ্যকালীর মন্দিরের কথা জানা যায়। মহাকাল সংহিতা মতে, নববিধা কালীর মধ্যে গুহ্যকালীই সর্বপ্রধানা। তাঁর মন্ত্র বহু – প্রায় আঠারো প্রকারের।● মহাকালী- তন্ত্রসার গ্রন্থমতে, মহাকালী পঞ্চবক্ত্রা ও পঞ্চদশনয়না। তবে শ্রীশ্রীচণ্ডী-তে তাঁকে আদ্যাশক্তি, দশবক্ত্রা, দশভূজা, দশপদী ও ত্রিংশলোচনা রূপে কল্পনা করা হয়েছে। তাঁর দশ হাতে রয়েছে যথাক্রমে খড়্গ, চক্র, গদা, ধনুক, বাণ, পরিঘ, শূল, ভূসুণ্ডি, নরমুণ্ড ও শঙ্খ। ইনিও ভৈরবী; তবে গুহ্যকালীর সঙ্গে এঁর পার্থক্য রয়েছে। ইনি সাধনপর্বে ভক্তকে উৎকট ভীতি প্রদর্শন করলেও অন্তে তাঁকে রূপ, সৌভাগ্য, কান্তি ও শ্রী প্রদান করেন।● ভদ্রকালী- ভদ্রকালী নামের ভদ্র শব্দের অর্থ কল্যাণ এবং কাল শব্দের অর্থ শেষ সময়। যিনি মরণকালে জীবের মঙ্গলবিধান করেন, তিনিই ভদ্রকালী। ভদ্রকালী নামটি অবশ্য শাস্ত্রে দুর্গা ও সরস্বতী দেবীর অপর নাম রূপেও ব্যবহৃত হয়েছে। কালিকাপুরাণ মতে, ভদ্রকালীর গাত্রবর্ণ অতসীপুষ্পের ন্যায়, মাথায় জটাজুট, ললাটে অর্ধচন্দ্র ও গলদেশে কণ্ঠহার। তন্ত্রমতে অবশ্য তিনি মসীর ন্যায় কৃষ্ণবর্ণা, কোটরাক্ষী, সর্বদা ক্ষুধিতা, মুক্তকেশী; তিনি জগৎকে গ্রাস করছেন; তাঁর হাতে জ্বলন্ত অগ্নিশিখা ও পাশযুগ্ম। গ্রামবাংলায় অনেক স্থলে ভদ্রকালীর বিগ্রহ নিষ্ঠাসহকারে পূজিত হয়। এই দেবীরও একাধিক মন্ত্র রয়েছে। তবে প্রসিদ্ধ চতুর্দশাক্ষর মন্ত্রটি হল – ‘হৌঁ কালি মহাকালী কিলি কিলি ফট স্বাহা’।● চামুণ্ডাকালী- চামুণ্ডাকালী বা চামুণ্ডা ভক্ত ও সাধকদের কাছে কালীর একটি প্রসিদ্ধ রূপ। দেবীভাগবত পুরাণ ও মার্কণ্ডেয় পুরাণ-এর বর্ণনা অনুযায়ী, চামুণ্ডা চণ্ড ও মুণ্ড নামক দুই অসুর বধের নিমিত্ত দেবী দুর্গার ভ্রুকুটিকুটিল ললাট থেকে উৎপন্ন হন। তাঁর গাত্রবর্ণ নীল পদ্মের ন্যায়, হস্তে অস্ত্র, দণ্ড ও চন্দ্রহাস; পরিধানে ব্যাঘ্রচর্ম; অস্তিচর্মসার শরীর ও বিকট দাঁত। দুর্গাপূজায় মহাষ্টমী ও মহানবমীর সন্ধিক্ষণে আয়োজিত সন্ধিপূজার সময় দেবী চামুণ্ডার পূজা হয়। পূজক অশুভ শত্রুবিনাশের জন্য শক্তি প্রার্থনা করে তাঁর পূজা করেন। অগ্নিপুরাণ-এ আট প্রকার চামুণ্ডার কথা বলা হয়েছে। তাঁর মন্ত্রও অনেক। বৃহন্নন্দীকেশ্বর পুরাণে বর্ণিত চামুণ্ডা দেবীর ধ্যানমন্ত্রটি এইরূপ - নীলোৎপলদলশ্যামা চতুর্বাহুসমন্বিতা । খট্বাঙ্গ চন্দ্রহাসঞ্চ বিভ্রতী দক্ষিণে করে ।। বামে চর্ম্ম চ পাশঞ্চ ঊর্দ্ধাধোভাগতঃ পুনঃ । দধতী মুণ্ডমালাঞ্চ ব্যাঘ্রচর্মধরাম্বরা ।। কৃশোদরী দীর্ঘদংষ্ট্রা অতিদীর্ঘাতিভীষণা । লোলজিহ্বা নিমগ্নারক্তনয়নারাবভীষণা ।। কবন্ধবাহনাসীনা বিস্তারা শ্রবণাননা । এষা কালী সমাখ্যাতা চামুণ্ডা ইতি কথ্যতে ।।● শ্মশানকালী- কালীর "শ্মশানকালী" রূপটির পূজা সাধারণত শ্মশানঘাটে হয়ে থাকে। এই দেবীকে শ্মশানের অধিষ্ঠাত্রী দেবী মনে করা হয়। তন্ত্রসাধক কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ রচিত বৃহৎ তন্ত্রসার অনুসারে এই দেবীর ধ্যানসম্মত মূর্তিটি নিম্নরূপ:----"শ্মশানকালী দেবীর গায়ের রং কাজলের মতো কালো। তিনি সর্বদা বাস করেন। তাঁর চোখদুটি রক্তপিঙ্গল বর্ণের। চুলগুলি আলুলায়িত, দেহটি শুকনো ও ভয়ংকর, বাঁ-হাতে মদ ও মাংসে ভরা পানপাত্র, ডান হাতে সদ্য কাটা মানুষের মাথা। দেবী হাস্যমুখে আমমাংস খাচ্ছেন। তাঁর গায়ে নানারকম অলংকার থাকলেও, তিনি উলঙ্গ এবং মদ্যপান করে উন্মত্ত হয়ে উঠেছেন।"শ্মশানকালীর আরেকটি রূপে তাঁর বাঁ-পাটি শিবের বুকে স্থাপিত এবং ডান হাতে ধরা খড়্গ। এই রূপটিও ভয়ংকর রূপ। তন্ত্রসাধকেরা মনে করেন, শ্মশানে শ্মশানকালীর পূজা করলে শীঘ্র সিদ্ধ হওয়া যায়। রামকৃষ্ণ পরমহংসের স্ত্রী সারদা দেবী দক্ষিণেশ্বরে শ্মশানকালীর পূজা করেছিলেন। কাপালিকরা শবসাধনার সময় কালীর শ্মশানকালী রূপটির ধ্যান করতেন। সেকালের ডাকাতেরা ডাকাতি করতে যাবার আগে শ্মশানঘাটে নরবলি দিয়ে শ্মশানকালীর পূজা করতেন। পশ্চিমবঙ্গের অনেক প্রাচীন শ্মশানঘাটে এখনও শ্মশানকালীর পূজা হয়। তবে গৃহস্থবাড়িতে বা পাড়ায় সর্বজনীনভাবে শ্মশানকালীর পূজা হয় না। রামকৃষ্ণ পরমহংস বলেছিলেন, শ্মশানকালীর ছবিও গৃহস্থের বাড়িতে রাখা উচিত নয়।● শ্রীকালী- গুণ ও কর্ম অনুসারে শ্রীকালী কালীর আরেক রূপ। অনেকের মতে এই রূপে তিনি দারুক নামক অসুর নাশ করেন। ইনি মহাদেবের শরীরে প্রবেশ করে তাঁর কণ্ঠের বিষে কৃষ্ণবর্ণা হয়েছেন। শিবের ন্যায় ইনিও ত্রিশূলধারিনী ও সর্পযুক্তা।সেকালের কালী পূজা:----আজ আমরা যে কালীমূর্তির আরাধনা সর্বত্র দেখতে পাই, তার রূপটি (দক্ষিণাকালী) সর্বপ্রথম বিখ্যাত তন্ত্রসাধক কৃষ্ণানন্দ আগমবাগিশ (১৬ শতক) কল্পনা করেছিলেন বলে কথিত আছে। শোনা যায়, তিনি অমাবস্যার রাতে স্বহস্তে কালীমূর্তি তৈরি করে সে-রাতেই নিজে পূজা সম্পন্ন করে প্রতিমা বিসর্জন দিতেন। অবশ্য অনেকে মনে করেন যে, তাঁর আগেও বাঙলায় কালী আরাধনা প্রচলিত ছিল। এ-ভাবেই বাঙলার কালী আরাধনার সঙ্গে যুক্ত হয়ে গেছে কৃষ্ণনগরের মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্রের নাম। জনশ্রুতি এই যে, এই কালীভক্ত রাজা আদেশ দিয়েছিলেন যে, তাঁর রাজ্যে প্রতি গৃহস্থকে কার্তিকী অমাবস্যায় তার বাড়িতে কালীপূজা করতে হবে, অন্যথায় শাস্তি পেতে হবে। তাঁর পরবর্তী দুই পুরুষও এই আদেশ বহাল রাখেন। এর ফলে শুধু কৃষ্ণনগর জেলাতেই নাকি দশ সহস্রাধিক বাড়িতে কালীপূজা অনুষ্ঠিত হতো, যার পরিণতিতে ঐ অঞ্চলে শ্যামাপূজার রাত্রিতে পূজারী ব্রাহ্মণের অভাব দেখা দেয়। কালীপূজায় ঐ জেলায় পশুবলিও নাকি হতো প্রায় দশ হাজারের মতো। চিন্তাহরণ চক্রবর্তী রচিত ‘বাঙলার পূজাপার্বন’ বইটিতে এই তথ্য পাওয়া যায়। এই লেখকের মতে আঠারো শতকের শেষের দিকেও কালীপূজা বাংলাদেশে ততটা জনপ্রিয় হয়নি। ‘তন্ত্রসার’-এর মতো প্রাচীন কোনো গ্রন্থে কালীপূজার উল্লেখ নেই। যে ‘শ্যামাসপর্যা’ গ্রন্থে এই পূজার উল্লেখ পাওয়া যায়, তা অপেক্ষাকৃত আধুনিক।রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের পৌত্র ঈশানচন্দ্রের কালী আরাধনা নিয়েও অনেক কাহিনী শোনা যায়। কালীপূজায় তাঁর এক হাজার মণ মিষ্টান্ন ও সেই ওজনের চিনি, চাল-কলা ইত্যাদি সহ এক হাজারটি শাড়ি ও মেয়েদের এক হাজার রেশমি পোশাক ইত্যাদির হাজার রকমের ভোগ নিবেদনের কাহিনী পাওয়া যায়। ঐ কাহিনী অনুসারে এই কালীপূজায় মহিষ, পাঁঠা ও ভেড়া (প্রতিটি এক হাজার করে) বলি দেবার খরচ পড়েছিল প্রায় দশ হাজার টাকা আর পূজার অন্যান্য খরচ ধরলে আরও প্রায় কুড়ি হাজার টাকা! এই বেহিসেবী ব্যয় মেটাতে গিয়ে ঈশানচন্দ্রকে নাকি সর্বস্বান্ত হতে হয়েছিল।কালীপূজার আড়ম্বরে এমনই নিঃস্ব হয়ে যাওয়া আর এক রাজার গল্প পাওয়া যায় শ্রীরামপুরের মিশনারি উইলিয়াম ওয়ার্ডের লেখায় (১৮১৫)। এই রাজা রামকৃষ্ণ বরানগরে কালীর এক মর্মরমূর্তি প্রতিষ্ঠার উৎসবে নাকি তখনকার দিনে এক লক্ষ টাকা ব্যয় করেছিলেন। ওয়ার্ড লিখেছেন, কালীর নামে রাজা বিপুল সম্পত্তি দান করেছিলেন, সেই সম্পত্তির আয় থেকে দৈনিক পাঁচশ’ লোক খাওয়ানো হয়।... কালীপূজার খরচের ফলে এখন তিনি প্রায় সর্বস্ব হারিয়েছেন।সারা বাংলাদেশ জুড়ে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য ‎ঐতিহ্যমন্ডিত কালী-আরাধনার কেন্দ্র আর তাদের নিয়ে প্রচলিত নানা কাহিনীরও শেষ নেই! যেমন, মুর্শিদাবাদের ডাহাপাড়ার দেবী কীরিটেশ্বরী, জনশ্রুতি - বাংলার নবাব মীরজাফর অসুস্থ অবস্থায় এই দেবীর চরণামৃত পান করতেন। এ-রকম আরো কয়েকটি কালীমন্দিরের মধ্যে উল্লেখযোগ্য শান্তিপুরে শাক্ত কৃষ্ণানন্দ আগমবাগিশ আর বৈষ্ণব অদ্বৈত আচার্যের বংশধরদের প্রতিষ্ঠিত কালী, রামপ্রসাদের সাধনপীঠ কুমারহট্টের (হালিশহর) ও কমলাকান্তের কোটালহাটের কালী, ভদ্রপুরে মহারাজা নন্দকুমারের প্রতিষ্ঠিত দ্বিভুজা কালী, বিষ্ণুপুরের ময়নাপুরে প্রাচীন কালী, কালনা, সিঙ্গুর ও রাণাঘাটের সিদ্ধেশ্বরী, সিউড়ি ও নবদ্বীপের ভবতারিণী, চূঁচুড়ার দয়াময়ী, নলহাটির ললাটেশ্বরী, শেওড়াফুলির নিস্তারিনী, বাগনানের মহাকালী, বর্ধমানের কঙ্কালেশ্বরী ইত্যাদি ইত্যাদি। এছাড়া বীরভূমে বীরসিংহপুরের কালী, অম্বিকা-কালনার দারুময়ী অম্বিকা ও ২৪ পরগ্ণার ময়দার কালীও বিখ্যাত।পশ্চিমবঙ্গের বাইরেও বিশ্রুত কালীক্ষেত্রের সংখ্যা নেহাত কম নয়। ঝাড়খন্ডে ধানবাদের নিকটবর্তী কল্যাণেশ্বরী ও রাজরাপ্পার ছিন্নমস্তার মন্দির ভক্তদের কাছে সুপরিচিত। এ ছাড়া পূর্ববঙ্গে (বাংলাদেশ) বিক্রমপুরে সোনারঙের কালী, ঢাকার জয়দেবপুরে শ্মশানকালী, বগুড়ার কালঙ্কেশ্বরী (বা প্রেতাসনা কালী), ত্রিপুরার মেহারে মেহার-কালী ইত্যাদিও সুপরিচিত। তমলুকের দেবী বর্গভীমা এবং কাঁথির কপালকুণ্ডলার নামাঙ্কিত মন্দির বা বাঁশবেড়িয়ার হংসেশ্বরী মন্দিরে পূজিতা দেবীও আদতে কালীরই নানা রূপ। বীরভূমের তারাপীঠে পূজিতা দেবী কালীর নিকটতম রূপান্তর তারার মন্দিরের কথা ছেড়ে দিলেও সেখানে রয়েছে বোলপুরের কাছে কঙ্কালী, ভাঙ্গালি ও বর্ধমান সীমান্তে অট্টহাস ইত্যাদি কালী-উপাসনা স্থলগুলি, যার মধ্যে কয়েকটি শক্তিপীঠ হিসেবে পরিগণিত হয়ে থাকে। এছাড়াও রয়েছে নানা ডাকাতের নামের সঙ্গে জড়িত অগণিত কালীমন্দির।এ-রকমই একটি, সিঙ্গুরের ডাকাতকালীর মন্দির দেখতে যাবার এক বিবরণ মেলে যোগেন্দ্রনাথ গুপ্তের বিখ্যাত বই ‘বাংলার ডাকাত’-এ। শেওড়াফুলি যাবার পথের বর্ণনা দিয়ে তিনি লিখছেন, “শীর্ণ সংকীর্ণ সর্পিল পথ। চৈত্র মাস। শুষ্ক পথের পাশে স্থানে স্থানে জঙ্গলঘেরা ডোবা। অতিকষ্টে মন্দিরের কাছে আসিলাম। ডাকাত কালীর মন্দির ভগ্ন ও জীর্ণ। ইঁট খসিয়া পড়িতেছে। এদিক ওদিক সাপ ছোটাছুটি করিতেছে। দিনের বেলায়ও অন্ধকার। মন্দিরে ভীষণাকৃতি কালীমূর্তি। ভিতরে আবর্জনা পূর্ণ।......একপাশে একটি বড় হাড়িকাঠভূমিতে পড়িয়া আছে।......আমি ডাকাতে কালীকে দেখিতে আসিয়া ভয়ে বিস্ময়ে শিহরিয়া উঠিলাম...। নানা আগাছায় পূর্ণ ভয়াল স্থান। দিনের বেলায়ও ভয় করে।...” সিঙ্গুরের এই ডাকাতে কালীর মন্দির কিন্তু আজও আছে, যদিও প্রাচীন জরাজীর্ণ মন্দিরের সংস্কার হয়েছে। এই কালীর নাম সিদ্ধেশ্বরী। গগন সর্দার, সনাতন বাগদি, রঘু ডাকাত ইত্যাদি নানা ডাকাতের নাম ও গল্প সিঙ্গুরের এই কালীর সঙ্গে জড়িত।এই সূত্রে কালীপূজোয় আরও দুটি বিদেশী-লিখিত নরবলির বিবরণের উল্লেখ এখানে করা যায়। একটি পর্তুগীজ জার্নালে ক্যাপটেন নরোনহা নামে এক ধর্মভীরু পর্তুগীজের বিবরণ পাওয়া যায়। মেদিনীপুরের কাছাকাছি কোনো স্থানে ডাকাতদের সঙ্গে গিয়ে তিনি এক বটগাছের নীচে তিনি তাদের আরাধ্যা কালীমূর্তি দেখতে পান। বলি হিসেবে সেখানে দু’টি অর্ধমূর্ছিত বালক ও অদুরে সিঁদুর মাখানো খড়গ দেখে তিনি ভয়ে সেখান থেকে পালিয়ে যান। আর একটি বিবরণ যার লেখা, তিনি ধর্মে ক্যাথলিক হলেও পেশায় ছিলেন ডাকাত। এক স্থানীয় জমিদারের পৃষ্ঠপোষকতায় তিনি খুলনা ও নোয়াখালি অঞ্চলে ডাকাতি করতেন, পরে পালিয়ে যান সুন্দরবনের গভীরে। সেখানে তিনি ‘ভবানীপূজা’র আয়োজন করেন বলে জানিয়েছেন, যাতে নরবলির জন্য মানুষ কেনাবেচার কথা পাওয়া যাচ্ছে ও বলির যোগ্য মানুষের লক্ষণ মিলিয়ে সওদা করছেন স্ব্য়ং পুরোহিত!ওয়ার্ডের বিবরণে এরকম আরো কালীভক্তদের বিবরণ মেলে, যারা কালীপূজো উপলক্ষে বিপুল ব্যয় করতেন, যেমন ধরা যাক, খিদিরপুরের ন্যায়নারায়ণ ঘোষাল বা গোপীমোহন নামে কলকাতার এক বৈষ্ণব ব্রাহ্মণ। প্রথমজন নাকি ১৭৯৫ সাল নাগাদ কালীপূজায় পঁচিশ হাজার টাকা ব্যয় করে ২৫টি মহিষ, ১০৮টি পাঁঠা ও ৫টি ভেড়া বলি দিয়েছিলেন। অপর ব্যক্তি ১৮১১ সালে কালীপূজায় দশ হাজার টাকা ব্যয় করেছিলেন।কলকাতার আরেক বাবু শোভাবাজারের কালীশঙ্কর ঘোষের বাড়ির কালীপূজার আড়ম্বরের বিবরণ পাওয়া যায় হরিহর শেঠের লেখায়ঃ- “কালীশঙ্কর ঘোষের বাটীতে তান্ত্রিকমতে অতি ভয়ানক ভাবে কালীপূজা হইত। শ্যামাপূজার রাত্রে মদ্যপান অব্যাহতভাবে চলিত এবং বলির রক্তে প্রাঙ্গণ ভরিয়া যাইত, নর্দমা দিয়া রক্তস্রোত বহিয়া যাইত।” এই বাড়ির পূজোতেই পশুবলির বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছেন পূর্বে উল্লিখিত পাদ্‌রি ওয়ার্ড তাঁর বইয়ে। বাড়ির মাঝখানে খোলা আঙিনায় রয়েছে বলির পশুগুলি, পাশেই স্ব্য়ং কালীশংকর। তাঁর কয়েকজন সঙ্গী ও বলির কাজে সহায়তার জন্য জনা বিশেক লোক। আঙ্গিনার চারদিক ঘিরে দালান, তার একটি ঘরে উত্তরমুখী করে প্রতিমা বসানো, অপর কয়েকটি ঘর দর্শকে ঠাসা। এর পর এই পাদরি জানিয়েছেন যে, প্রথমে বলি পড়ে পাঁঠা, তারপর মহিষ ও সবশেষে দু’ তিনটি ভেড়া। ওয়ার্ডের বর্ণনা কিছুটা শোনা যাকঃ- “একজন পূজারী বলি দেওয়া পাঁঠার মুন্ডুটি ধরে নাচতে নাচতে মূর্তির সামনে নিয়ে গেল। সদ্য কাটা মুন্ড থেকে তাজা রক্ত তার সর্বাঙ্গে গড়িয়ে পড়তে থাকে। বলিদান শেষ হলে কালীশঙ্কর, যে লোকটি বলি দিল, তাকে গাঢ় আলিঙ্গনে আবদ্ধ করলেন। তাকে বস্ত্র ইত্যাদি প্রভূত জিনিষপত্র দান করা হলো। পশুর মুন্ড, রক্ত, দেহের বিভিন্ন অংশের মাংস পূজারী দেবীকে নিবেদন করলেন। তারপর বালির ওপর আগুন জ্বেলে ঘৃত সহযোগে হোম শুরু হলো। তখন সারা আঙিনা রক্তে ভাসছে।” এ-ছাড়াও কালীপূজার বিষয়ে ওয়ার্ড যে-সব তথ্য জানিয়েছেন, তার মধ্যে আছে, দেবীকে যে মদ্য নিবেদন করা হয়, তা কর্তা ও তাঁর ঘনিষ্ঠ মহলের লোকেরা একান্তে পান করে। আর প্রতিমার সম্মুখে নৃত্যগীতের মধ্য দিয়ে উৎসবের সমাপ্তি ঘটে।পশুবলি অবশ্য গৃহস্থ বাড়ির কালীপূজোয় ছিল বহুল প্রচলিত প্রথা। কাঁসারিপাড়ার মল্লিকবাড়িতে আর সিমলার হোগলকুঁড়িয়ায় গুহবাড়িতে কালীপূজোয় মহিষ বলির প্রথা ছিল বলে জানা যায়। পাঁঠা বলি তো ছিল সাধারণ ব্যাপার! আবার বিখ্যাত ধনী আশুতোষ দেবের (ছাতুবাবু) বাড়ির কালীপূজায় কোনো বলিই হতো না। ১৭৫৭ সালে সুতানুটি অঞ্চলে রাজা মাণিক বন্দ্যোপাধ্যায় প্রতিষ্ঠিত পুঁটে-কালীর মন্দিরে বৈশিষ্ট্যই ছিল অসংখ্য বলিদান। পলাশির যুদ্ধের সমকালে যখন কলকাতার অধিকাংশ জায়গা ছিল জঙ্গলাকীর্ণ, তখন ডাকাতি করতে যাবার আগে কালীমূর্তির সামনে এমন কি, নরবলি দেবার গল্পও শোনা যায়। চিতু ডাকাতের প্রতিষ্ঠিত চিত্তেশ্বরী কালী মন্দিরে ১৭৭৮ সালের গ্রীষ্মের এক অমাবস্যায় এমনই নরবলি হয়েছিল বলে জানা যায়। কালীঘাটেও কোম্পানির আমলে নাকি একবার নরবলির জন্য একজনের ফাঁসি হয়েছিল বলে ডঃ ডাফের বিবরণে উল্লিখিত আছে। কলকাতার সবচেয়ে বিখ্যাত কালীক্ষেত্র কালীঘাটের মন্দিরে কার্তিকী অমাবস্যায় কালী আরাধনার আড়ম্বরের উল্লেখ করে মিশনারি ওয়ার্ড জানিয়েছেন যে, এই পূজায় প্রায় হাজার চারেক লোকের সমাগম হতো। অনেকেই পূজা উপলক্ষে প্রচুর খরচ করত। ১৭৬৫ সালে রাজা নবকৃষ্ণ নাকি এই কালীমন্দিরের পূজোয় লাখ খানেক টাকা ব্যয় করেন ও মূর্তির জন্য দান করেন সোনার মুন্ডমালা। পাদরি ওয়ার্ডের বিবরণ অনুযায়ী এই রাজা কালীমূর্তির জন্য দান করেন হাজার টাকা মূল্যের সোনার হার সহ অন্যান্য অলঙ্কার ও রুপোর বাসনপত্র। তিনি দু’ হাজার আতুরকে অর্থদান করেন ও যে-পরিমাণ ভোজ্যবস্তু ও মিষ্টি দান করেন, তা দিয়ে খাওয়ানো হয়েছিল এক হাজার মানুষকে। এই বিশ্রুত কালীমন্দিরে কালীর নিত্যপূজাও হতো এবং সে সূত্রে এর সঙ্গে নানা ধনাঢ্য মানুষের নাম শোনা যায় নানাজনের লেখা বিবরণে ও সমকালের সংবাদপত্রের পাতায়। শোভাবাজারের রাজা গোপীমোহন দেব ১৮২২ সালে একবার কাড়ানাকাড়া বাজিয়ে ধূমধাম সহকারে কালীঘাটে পূজো দিয়েছিলেন ও এই পূজো দেখতে এত ভীড় হয় যে শান্তিরক্ষায় পুলিশের প্রয়োজন হয়েছিল। রাজা বাহাদুর কালীমূর্তির হাতের রুপোর খড়্গ আর সোনার নরমুন্ড গড়িয়ে দেওয়া ছাড়াও নানা রকমের অলঙ্কার পট্টবস্ত্র আর শাল-দোশালায় মূর্তিকে মন্ডিত করেন।অতীত বাঙলার, এমন কি, ভারত ও নেপালের নানা ধনী ভক্তজন নানা সময়ে কালীঘাটের কালীমূর্তির জন্য বিভিন্ন আভরণ দান করেন বলে শোনা যায়। দেবীর চারটি রুপোর হাত দিয়েছিলেন খিদিরপুরের গোকুলচন্দ্র ঘোষাল। পরে চারটি সোনার হাত দেন কলকাতার কালীচরণ মল্লিক। বেলেঘাটার রামনারায়ণ সরকার দিয়েছিলেন সোনার একটি মুকুট আর পাইকপাড়ার রাজা ইন্দ্রচন্দ্র সিংহ দেবীর সোনার জিভটি গড়িয়ে দেন। পাতিয়ালার মহারাজা দিয়েছিলেন দেবীমূর্তির গলার একশো আটটি নরমুন্ডের মালা, মূর্তির মাথার ওপরের রুপোর ছাতাটি নাকি দেন নেপালের প্রধান সেনাপতি জঙবাহাদুর।মূর্তির পরেই কালীঘাটের মন্দিরের ও মন্দির পরিসরের নানা অংশের নির্মাণেও রয়েছে নানা বিচিত্র মানুষের যোগদান। ১৭৭০-৭১ সাল নাগাদ মন্দিরের সামনের গঙ্গার ঘাটটি এক বিশ্বস্ত পাঞ্জাবি সৈনিক হুজুরিমল্লের শেষ ইচ্ছানুযায়ী বাঁধিয়ে দেয় ইংরেজ সরকার। কালীর বর্তমান মন্দিরটির নির্মাণ হয়েছিল বরিশার জমিদার সন্তোষ রায়চৌধুরী ও তাঁর উত্তরাধিকারীদের সৌজন্যে। এছাড়াও শ্যামরায়ের মন্দির, তোরণদ্বার, বিভিন্ন ভোগঘর, নহবতখানা ইত্যাদির নির্মাণের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাওয়ালির বৈষ্ণব জমিদার উদয়নারায়ণ মণ্ডল, গোরখপুরের টীকা রায়, শ্রীপুরের জমিদার তারকচন্দ্র চৌধুরী, তেলেনিপাড়ার জমিদার কাশীনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখের নাম। ১৮৩৫ সালে নাটমন্দিরটি তৈরি করান আন্দুলের জমিদার রাজা কাশীনাথ রায়। এখানে উল্লেখ করা যায় যে, এই নাটমন্দিরেই ১৮৯৯ সালে কালী সম্পর্কে তাঁর বিখ্যাত বক্তৃতা দিয়েছিলেন স্বামী বিবেকানন্দের বিদেশিনী শিষ্যা ভগিনী নিবেদিতা। সে এক অন্য কাহিনী!অ্যালবার্ট হলে [অর্থাৎ এখনকার কফি হাউস] কালী বিষয়ে তাঁর প্রথম বক্তৃতাটি দিয়েছিলেন আইরিশ দুহিতা নিবেদিতা। শ্রোতাদের মধ্যে ছিলেন কলকাতার শিক্ষিত সমুদায় ও ব্রাহ্মসমাজের নানা বিশিষ্ট ব্যক্তি, যেমন সত্যেন্দ্রমোহন ঠাকুর, ব্রজেন্দ্রনাথ গুপ্ত, ডাঃ নিশিকান্ত চ্যাটার্জি ও ড: মহেন্দ্রলাল সরকার প্রমুখ। সাধারণ শ্রোতারা নিবেদিতার ভাষণে সন্তুষ্ট হলেও কিছু তথাকথিত প্রগতিশীল ব্যক্তি তাঁর বক্তব্যের প্রতিবাদ করেন। নিবেদিতা এই বক্তৃতায় কুসংস্কারকে প্রশ্রয় দিচ্ছেন বলে সবচেয়ে তীব্র ভাষায় আক্রমণ করেন মহেন্দ্রলাল। কলকাতার কালীবিরোধীদের বক্তব্যের জবাব দেবার সুযোগ আসে যখন কালীঘাট মন্দিরের সেবায়েত হালদারেরা নিবেদিতাকে মন্দির প্রাঙ্গনে বক্তৃতা দিতে আমন্ত্রণ জানান। এই কালীঘাটেই নাটমন্দিরের চত্বরে নিবেদিতা ২৮শে মে শ্রোতায় ঠাসা এক সভায় কালী আরাধনার বলিপ্রথা, মূর্তিপূজা ও মূর্তির তথাকথিত কুৎসিত রূপ ইত্যাদি অভিযোগের জবাব দিয়েছিলেন। পরে তাঁর এই বক্তৃতা পুস্তিকাকারে প্রকাশ করেন মন্দির কর্তৃপক্ষ। উল্লেখযোগ্য যে, ‘কালী দি মাদার’ নামে নিবেদিতার একটি বইও আছে।কালীঘাটের কালীর প্রতি শুধু যে বাঙালি বা হিন্দুরাই ভক্তি বা বিশ্বাস পোষণ করতেন, এমন কিন্তু নয়। শোনা যায়, পাঞ্জাব আর বার্মা দখল করবার পর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির তরফে কালীঘাটে ষোড়শোপচারে পূজো পাঠানো হয়েছিল। মার্শম্যানের বিবরণেও এর সমর্থন মেলে। কালীপূজোয় কোম্পানির এই এলাহি খরচের পেছনে অবশ্য ভক্তির চেয়ে দেশী সেপাইদের সন্তুষ্ট করার বাসনাই সম্ভবত কাজ করেছিল। কিন্তু পাদরি ওয়ার্ড কালীঘাট সহ বিভিন্ন কালীমন্দিরে অহিন্দু ভক্তদের আনাগোনার কথা লিখেছেন। তিনি জানাচ্ছেন, “শুধু হিন্দুরাই যে এই কালো পাথরের দেবীমুর্তির পূজা করে, এমন কিন্তু নয়। আমি জানতে পেরেছি, অনেক ইয়োরোপীয় বা তাদের এ-দেশীয় স্ত্রীরা কালী মন্দিরে যায় ও দেবীর আরাধনায় হাজার হাজার টাকা ব্যয় করে। আমি যে-ব্রাহ্মণের সাহায্য নিয়ে এই বিবরণ প্রস্তুত করেছি, তিনি বলেছেন, তিনি...... বহুবার সাহেব-মেমদের কালী মন্দিরে পূজো দিতে পালকি করে আসতে দেখেছেন।...... তাঁকে মন্দিরের কর্তৃপক্ষ সুনিশ্চিত ভাবে জানিয়েছেন, কোনো প্রার্থনা নিয়ে কালীর কাছে দিতে ইয়োরোপীয়রা প্রায়ই এসে থাকে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির এক বিশিষ্ট কর্মচারী সম্প্রতি মামলা জিতে কালীদেবীকে দু’ তিন হাজার টাকা মূল্যের নানা সামগ্রী দান করেছেন।”কালীঘাটের মন্দির সম্পর্কে পাদ্রি ওয়ার্ড লিখেছেন, “কলকাতার কাছে কালীর এক বিখ্যাত মন্দির রয়েছে। সমগ্র এশিয়া, এমন কি, সমগ্র বিশ্বের হিন্দু এই দেবীর পূজা করে।” ওয়ার্ডের বিবরণে এই অতিরিক্ত সংবাদও পাওয়া যায় যে, প্রায় পাঁচশো মুসলমান নাকি প্রতি মাসে কালীকে পূজো দিয়ে যেতেন। এর পরে তাঁর অধিকন্তু মন্তব্যঃ- “কি আশ্চর্য ভাবেই না এই দেবীমূর্তি সাধারণ লোকের মনে প্রভাব বিস্তার করেছে! ......বাংলার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সমসংখ্যক গণিকারা এসেও মন্দিরে পূজো দিয়ে যায়। তাদের কারো প্রার্থনা উপপতির রোগমুক্তি, কেউ বা চায় তার ঘরে আরও বেশি লোকের আগমন!” পবিত্রকুমার ঘোষ জানিয়েছেন, একসময় অবিভক্ত বাংলার, পরে পূর্ব পাকিস্তানের জননেতা শহিদ সুরাওয়ার্দি নাকি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হবার বাসনায় কালীঘাটে মানত করেছিলেন ও কলকাতায় দু’জন লোক পাঠিয়ে তাঁর হিন্দু বন্ধুদের মারফৎ ‘বিরাট ডালা সাজিয়ে’ কালীঘাটে পূজো দেবার ব্যবস্থা করেছিলেন। আর একজন বিখ্যাত বাঙালি শিল্পপতি স্যার বীরেন মুখার্জিও নাকি প্রতি সপ্তাহে কালীঘাটের মন্দিরে পূজো দিতেন।কালীঘাট ব্যতিরেকে কলকাতার অন্যান্য প্রাচীন কালী মন্দিরগুলি নিয়েও আড়ম্বর-বৈচিত্র্যের কাহিনী কম নেই। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রতিপত্তিশালী দেওয়ান গোবিন্দরাম মিত্রের প্রতিষ্ঠিত সিদ্ধেশ্বরী কালীর মন্দির ছিল কলকাতার মনুমেন্টের থেকেও উঁচু, আর তা খ্যাত ছিল ‘ব্ল্যাক প্যাগোডা’ নামে। এই মন্দির বেশ কয়েকবার ঝড়ে আর ভূমিকম্পে ভেঙে পড়ে ও তা পুনরায় তৈরি করা হয়। তাঁর কালীপূজোর ঘটাও নাকি ছিল খুব বিখ্যাত।কলকাতার কালীমন্দিরগুলোর মধ্যে সম্ভবত প্রাচীনতা আর খ্যাতির বিচারে কালীঘাটের পরেই চিত্তেশ্বরী মন্দিরের নাম উল্লেখ্য। অতীতের সেই যুগে গঙ্গার তীর ধরে তীর্থযাত্রীরা চিৎপুরে দেবী চিত্তেশ্বরী বা চিত্রেশ্বরী কালীমন্দিরে পূজো দেবার পর মশাল জ্বালিয়ে দল বেঁধে যেত কালীঘাটে। জনশ্রুতি আছে, এই পথের ধারেই তীর্থযাত্রীদের ওপর লুঠপাট চালাতো চিতে ডাকাত, এমন কি, এইসব অসহায় যাত্রীকে ধরে নাকি বলিও দিত কালীর সামনে। এই চিতু ডাকাতের নাম থকেই দেবী চিত্তেশ্বরী বা চিৎপুর নামের জন্ম হয়েছে (বা এর উল্টোটাও হতে পারে), এমন লোকশ্রুতিও আছে (কলকাতা কলেক্টরেটের ১৭৬১ সালের এক পাট্টায়ও এ কথার উল্লেখ আছে)। জঙ্গলাকীর্ণ এই পায়ে চলা রাস্তাটি ইংরেজদের নথিতে পরিচিত ছিল পিলগ্রিমস রোড নামে। বর্তমানে এই চিত্তেশ্বরী মন্দিরে (কাশীপুরে) প্রতিষ্ঠিত বিগ্রহটি দুর্গা বা চন্ডীর হলেও কলকাতার আদিযুগে এটি যে কালীমন্দির হিসেবেই পরিচিত ছিল, তার বহু প্রমাণ আছে। ‘ক্যালকাটা রিভিয়ু’ পত্রিকায় ১৮৪৫ সালে লেখা হয়েছিল, “Chitrapur was noted for the temple of ChitreswariDeby or the goddess of Chitru, known among Europeans as the temple of Kali at Chitpore”। এখানে আরও লেখা হয়েছিল, “This was the spot where the largest number of human sacrifices was offered to the goddess in Bengal before the establishment of the British Government.” একই ধরনের কথা পাওয়া যায় কটন সাহেবের ‘ক্যালকাটাওল্ড অ্যান্ড নিউ’ গ্রন্থেও। এই বইটির মতে এই স্থানটি ছিল “noted for the temple of Chitru or Kalee, renowned for the number of human sacrifices formerly offered at her shrine.”কলকাতা বা তার উপকন্ঠের আর একটি প্রসিদ্ধ কালীক্ষেত্র দক্ষিণেশ্বর, যা রানি রাসমণি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ১৮৫৫ সালের ৩১শে মে এই মন্দিরে ভবতারিণী কালীর মূর্তি প্রতিষ্ঠার দিনের কাহিনী পাওয়া যায় ‘সমাচার দর্পণে’। সেদিন নাকি “কলিকাতার বাজার দূরে থাকুক্‌, পাণিহাটি, বৈদ্যবাটি, ত্রিবেণী ইত্যাদি স্থানের বাজারেও সন্দেশাদি মিষ্টান্নের বাজার আগুন হইয়া উঠে। এইমত জনরব যে পাঁচশত মণ সন্দেশ লাগে।” এই দক্ষিণেশ্বরের ভবতারিণীর পূজারী হিসেবে নিযুক্ত রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের দৌলতে এই মন্দির পরবর্তী কালে বিশ্বখ্যাত হয়ে ওঠে। অথচ একথা আজ হয়তো অনেকেই জানেন না, শ্রীরামকৃষ্ণের প্রধান শিষ্য বিবেকানন্দের এই মন্দিরে প্রবেশ নিষিদ্ধ হয়েছিল সমুদ্র অতিক্রম করে ম্লেচ্ছদেশে যাবার কারণে! এই মন্দিরের কালীকে নিয়ে ইংরেজিতে চমৎকার একটি কবিতা লিখেছিলেন হরীন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়।কলকাতার প্রাচীন ও প্রথম বারোয়ারি (সম্ভবত বাংলার প্রথম বারোয়ারি কালীপূজা), মধ্য কলকাতার "আদি বারোয়ারি কালী পূজা" নামে উদযাপিত হয়ে থাকে। ১৮৫৮ সালে, জনৈক শ্রী বিহারী লাল বসুর হাতে এই পূজাটি শুরু হয়। ১৯২৪-২৬ সালের মধ্যে পূজাটি বারোয়ারি কালী পূজায় পরিণত হয়। উল্লেখ্য যে সেই সময় বাংলায় কালী পূজার প্রচলন (সর্বজনীন ভাবে) সেই রকম ভাবে ছিল না।কলিকাতা কালিকাক্ষেত্রের গল্প-ইতিহাস “এই কলিকাতা কালিকাক্ষেত্র, কাহিনী ইহার সবার শ্রুত” সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের কবিতার এই কথাগুলো কিন্তু ফেলনা নয়। কলকাতার সঙ্গে কালীর সম্পর্ক এমনকি দুর্গাঠাকুরের চেয়েও বেশি পুরোনো। কলকাতা শহর গড়ে ওঠার আগেই দূর-দূরান্ত থেকে মানুষরা এসে ভিড় করে পুজো দিতেন কালীঘাটের মন্দিরে। কেউ কেউ তো ‘কলিকাতা’ নামের পিছনেও ‘কালী’ শব্দটির খোঁজ পেয়েছেন। সে হয়তো কষ্ট-কল্পনা, কিন্তু তা বলে কালীপুজোর সঙ্গে এই শহরের সম্পর্ক খুঁজতে কল্পনাবিলাসী হওয়ার প্রয়োজন নেই। এমনিতেই শহরজোড়া একাধিক বিখ্যাত কালীমন্দির। কালীঘাটের মন্দির ছাড়াও চিৎপুরের ডাকাতে কালী, ঠনঠনিয়ার সিদ্ধেশ্বরী কালী, ফিরিঙ্গি কালী বা দক্ষিণেশ্বরের ভবতারিণী। এইসব বিখ্যাত কালীমন্দিরের সঙ্গে জড়িয়ে কত রোমাঞ্চকর ইতিহাস। নেহাত ভক্তিরসের সামগ্রী নয় সেইসব গল্প। আর, কলকাতার কালীপুজো বলতে এই বিখ্যাত মন্দিরের বাইরেও হাজারো ইতিহাস। রাজ-রাজরা, ডাকাত, জমিদার, লালমুখো সাহেব, বড়োলোক সবাই সমাপতিত সেখানে। কলকাতার সবচাইতে বিখ্যাত কালীমন্দির কালীঘাটের পুজো নিয়েই গল্পের শেষ নেই। অনেকের মতে, এই কালীই কলকাতার অধিষ্ঠাত্রী দেবী। আর, এই মন্দিরে রাজাদের দানধ্যান-ব্যয়ের কথা বললে তো শেষই হবে নাকি। রাজা নবকৃষ্ণ, শোভাবাজারের রাজা গোপীমোহন দেব, খিদিরপুরের গোকুলচন্দ্র ঘোষাল, কালীচরণ মল্লিক, ইন্দ্রচন্দ্র সিংহ, পাতিয়ালার মহারাজ, নেপালের প্রধান সেনাপতি জঙ বাহাদুর প্রভৃতি ব্যক্তির দানের কথা আগেই বলা হয়েছে।দেবীর অঙ্গসজ্জার পাশাপাশি এই মন্দিরের গড়ে ওঠার, সেজে ওঠারও বিচিত্র ইতিহাস যা ইতিপূর্বেই সংক্ষেপে বর্ণিত হয়েছে, যার তথ্য গুনে শেষ করা যাবে না। শুধু কালীঘাট নয়, কলকাতার অন্যান্য সাবেক কালীমন্দিরগুলোর ইতিহাসও কম রঙিন নয়। ‘ব্ল্যাক প্যাগোডা’নামে প্রচলিত কোম্পানীর দেওয়ান গোবিন্দরাম মিত্র প্রতিষ্ঠিত সিদ্ধেশ্বরী কালীমন্দির, , দক্ষিণেশ্বরের ভবতারিণী মন্দির, অথবা কলকাতায় নানা বড়োলোক-অভিজাত মানুষদের বাড়ির কালীপুজোয় জাঁক-জমকের অন্ত ছিল না। পাশাপাশি, বড়লোকের বাড়ির কালীপূজায় অবধারিত ছিল পশুবলি। খিদিরপুরের ন্যায়নারায়ণ ঘোষালের পুজোয় বা শোভাবাজারের কালীশঙ্কর ঘোষের বাড়ির কালীপূজার টাকার পাশাপাশি মদ্য ও রক্তেরও বন্যা বইত। শুধু পশুবলিই নয়, নরবলির ঘটনাও শোনা যেত তখন কলকাতায়। অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে কলকাতা তখন জঙ্গলাকীর্ণ এক শহর। এখানে-সেখানে ডাকাতদের ডেরা। চিতু ডাকাত-প্রতিষ্ঠিত চিত্তেশ্বরী কালী মন্দিরে ১৭৭৮ সালের এক অমাবস্যায় নাকি নরবলি হয়েছিল। কালীঘাটেও নাকি নরবলি দেওয়া হয়েছিল একবার। ডঃ ডাফ লিখেছেন, এই নরবলির ঘটনায় কোম্পানির শাসকরা ফাঁসিতেও ঝুলিয়েছিলেন কয়েকজনকে। সেদিনের কলকাতা শহর আজকের তিলোত্তমা মহানগরী নয়। তার কালীপুজোর ধরণেও তাই ভক্তিরসের সঙ্গে অনায়াসে মিশে যায় বীভৎসতারস। পশুবলিকে ঘিরে রাজা-বাবুদের উদ্দামতার বিবরণ শুনে গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে। এবং, এরই পাশাপাশি মিশে থাকে বাবু-জমিদারদের আড়ম্বরের কথাও। কালীপুজোর রাতে কারণবারি তো ‘প্রসাদ’। তার নেশা সাত্ত্বিক নেশা। সেই ‘কারণবারি’ হোক না বিলিতি। ক্ষতি কী? মহেন্দ্রনাথ দত্ত লিখেছেন, শিমলার বসুবাড়ির বিখ্যাত কালীপুজোয় ততোধিক বিখ্যাত মদ্যপানের কথা। গৃহস্থ-ভক্ত সবাই মিলে মাটির গামলায় কারণবারি নিয়ে গোল হয়ে ঘিরে বসতেন। তারপর স্ট্র থুড়ি নল দিয়ে টানতেন সুরা। আবার শোভাবাজারের কালীশঙ্কর ঘোষের বাড়িতে তো ভৃত্য-গৃহিণী কেউই সুরারসে বঞ্চিত হতেন না। একবার নাকি নেশার ঘোরে পুরুতকেই বলি দেবার উপক্রম হয়েছিল। এই নিয়ে প্রাণকৃষ্ণের মজার গল্প আছে একখানা। কারণবারি প্রসাদে চুর এক ভৃত্য পদসেবা করতে গিয়ে কিছুতেই আর বাবুর পা খুঁজে পাচ্ছে না। গোটা বাড়ি জুড়ে পায়ের খোঁজে হইহই পড়ে গেল। বাবুর পা কোথায় গেল? পুজোমণ্ডপেও পা নেই। এদিকে পায়ের অভাবে বাবু নামতে-হাঁটতে পারছেন না। শেষে গিন্নিমা আদেশ দিলেন পুরুতমশাইয়ের বাড়িতে গিয়ে খোঁজ করার। নৈবেদ্যর সঙ্গে পা-টাও ভুলক্রমে চলে গেছে হয়তো। পুরুতমশাই সব শুনে খুবই বিনয়ের সঙ্গে বললেন, এত নৈবেদ্যর মধ্যে বাবুর পা খুঁজতে রাত কাবার হয়ে যাবে। খুঁজে পেলে কাল সকালে তিনি স্বয়ং বাবুকে পা ফিরিয়ে দিয়ে আসবেন।শুধু মদ্যপানে কি আর জমে পুজো? তাই, পুজোর পরে পার্টি হত। সেই পার্টিতে সাহেব-মেমরা আসতেন। বাইজি নাচ, কবিগান, পাঁচালি, তরজা, আখড়াই-হাফ আখড়াইতে মেতে থাকত আসর। পরে যুক্ত হল যাত্রাগান আর জেলেপাড়ার সঙ। তাছাড়া ছিল আতসবাজির পসরা। কালীপ্রতিমা নিয়ে বাজনা-আলো সহকারে শোভাযাত্রাতেও বেরোতেন বাবুরা। সেই শোভাযাত্রার জাঁক নিয়ে পরস্পরের মধ্যে রেষারিষিও ছিল তীব্র। সব মিলিয়ে কালীপুজো ব্যাপারটা মোটে সাধারণ এক উৎসব ছিল না কলকাতাবাসীর কাছে।সময় গড়িয়ে গেল ঢের। গঙ্গার মূল স্রোত সরে এসে আদিগঙ্গাও শুকিয়ে পরিণত হল খালে। সেইসব বাবুয়ানি-রাজ-রাজরাদের কালও শেষ হল। মহানগরীর সেইসব কালীপুজোও মুখ লুকোল ইতিহাসে। বিখ্যাত কালীমন্দিরগুলোর পুজোর কথা অবশ্য আলাদা। প্রথা মেনে তারা আজও বহমান। কিছু সাবেক পুজোও বেঁচে-বর্তে আছে কোথাও কোথাও। কিন্তু, ফাঁকা জমি-জঙ্গলাকীর্ণ আধো আলো-আধো অন্ধকারের সেই গা ছমছমে কলকাতার গায়ে কাঁটা দেওয়া কালীপুজোরা আর নেই। ডাকাতরা নেই, বলির বীভৎসতাও নেই। কিন্তু, ইতিহাসের গপ্পেরা এত সহজে মরে না। আতসবাজির মতো আকাশজুড়ে তাদের ছড়িয়ে পড়তে দেখাও কম লোভনীয় নয়।কত যে কালী কলকাতায়। এমনটা কোনও শহরে নেই। শাক্তধর্মের এমন জনপ্রিয়তা বঙ্গদেশ ছাড়া কোথাও মিলবে না। বিশ্বসৃষ্টির আদিকরণ তিনি। আবার অন্যমতে, ইনিই আদ্যাশক্তি মহাময়ী। তন্ত্র ও পুরাণে কালিকার নানা রূপভেদ যা পূর্বেই আলোচিত হয়েছে। বাংলা জুড়ে অবশ্য তার নানা নাম। কলকাতার উত্তরে দক্ষিণেশ্বরে তিনি মা ভবতারিণী আবার দক্ষিণের কালীঘাটে দেবী কালিকা। আদ্যাপীঠে আদ্যাকালী, কাশীপুরে চিত্তেশ্বরী, ঠনঠনিয়ায় সিদ্ধেশ্বরী, বউবাজারে ফিরিঙ্গি, কেওড়াতলায় শ্মশানকালী, টালিগঞ্জে করুণাময়ী, নিমতলায় আনন্দময়ী। কালীময় কলকাতার কথা কয়েক আঁচড়ে আঁকার চেষ্টা রইল এখানে। অবশ্যই সবার কথা বলা গেল না।ক্ষেত্রবিশেষে কিছু কিছু পুনঃকথন হলেও কলকাতার কিছু কালী মন্দির বিশেষ উল্লেখের দাবী রাখে।কালীঘাটের দেবীকালিকা: কালীঘাটের মন্দিরের গুরুত্ব বেড়েছে প্রকৃতপক্ষে সপ্তদশ শতাব্দীর শেষ দিকে। কালীঘাটে দেবীর চারটি আঙুল পড়েছিল। দেবী কালিকার ভৈরব নকুলেশ্বর। কিংবদন্তী কাশীর মতো পুণ্যক্ষেত্র কালীঘাটে কীটপতঙ্গ মরলেও সঙ্গে সঙ্গে তারা মুক্তি পেয়ে যায়। এই কালীপীঠ গড়ে ওঠার পিছনে নানা কাহিনির জাল বিস্তৃত। এমন একটা কাহিনি হল:যশোরের রাজা প্রতাপাদিত্যের খুল্লতাত শ্রীবসন্ত রায় একটি ছোট মন্দির নির্মাণ করেছিলেন। সেই সময় দেবীর সেবায়েত ছিলেন ভুবনেশ্বর ব্রহ্মচারী। তিনি ছিলেন অপুত্রক। তাঁর দৌহিত্র হালদাররাই বর্তমানে কালীঘাটের বিখ্যাত বংশ। মন্দিরের পূজা এখনও করে চলেছেন তাঁরা। বর্তমান মন্দির নির্মাণ হয় উনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে। শোনা যায় সাবর্ণ চৌধুরীর পরিবারের সন্তোষ রায় পঁচিশ হাজার টাকা ব্যয়ে বাংলার নিজস্ব ঘরানার চার চালা এবং তার উপর আর একটি ছোট চারচালার শিখর সমেত মন্দিরটি নির্মাণ শুরু করেছিলেন। তাঁর পুত্র রামনাথ রায় ও ভ্রাতষ্পুত্র রাজীবলোচন রায় ১৮০৯ সালে মন্দির নির্মাণ সম্পূর্ণ করেন। পরবর্তী কালে আন্দুলের জমিদার কাশীনাথ রায় নাটমন্দির গড়ে দেন। নহবত্‌খানা ও দুটি ভোগের ঘর তৈরি করে দিয়েছিলেন গোরক্ষপুরের টিকা রায়। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিও মন্দিরের জন্য দুশো বিঘা জমি দান করেছিলেন। কালীঘাটের দেবীকালিকার রূপ মাহাত্ম্যের কথা তো আগেই বলা হয়েছে।কালীঘাটের মূল পূজা মূলত আটটি। রক্ষাকালী পুজো, স্নানযাত্রা, জন্মাষ্টমী, মনসাপুজো, চড়ক, গাজন ও রামনবমী। কালীপুজোর রাতে দেবীকে পুজো করা হয় লক্ষ্মীরূপে। কালী-শ্যামা নন দীপাবলিতে আরাধিত হন লক্ষ্মী।দক্ষিণেশ্বরের মা ভবতারিণী: কথিত রয়েছে এক বার কাশীযাত্রার আগের দিন ভোর রাতে জানবাজারের রানি মা রানি রাসমণির স্বপ্নে দেখা দিলেন মা জগদম্বা। রানিকে বললেন গঙ্গার পূর্ববর্তী তীরে মন্দির স্থাপনা করতে। কাশী যাওয়ার দরকার নেই। সেই স্বপ্নাদেশ শিরোধার্য করে ১৮৪৭ খ্রিস্টাব্দে ৬ সেপ্টেম্বর কলকাতা থেকে ছ’কিলোমিটার দূরে ভাগীরথীর তীরে সুপ্রিম কোর্টের অ্যাটর্নি জেমস হেস্টির কাছ থেকে ৬০ বিঘা জমি ৬০ হাজার টাকায় কিনলেন। ১৮৫৫ খ্রিস্টাব্দের ৩১ মে স্নানযাত্রার দিন গড়ে তুললেন সাদা রঙের নবরত্ন মন্দির। কাজটা সহজ ছিল না। কৈর্বত্য হরেকৃষ্ণ দাসের মেয়ে মন্দির গড়বে। এ ‘আস্পর্দা’ সে দিন মেনে নিতে পারেননি কুমারহট্ট হালিশহরের ব্রাহ্মণ ও উচ্চবর্ণের সমাজপতিরা। শেষপর্যন্ত সব বাধা দূর করে প্রতিষ্ঠিত হল কষ্ঠিপাথরের দেবীমূর্তি। সাধ করে রাসমণি তার নাম রাখলেন ভবতারিণী। মন্দিরের মেঝে শ্বেত ও কৃষ্ণ প্রস্তরাবৃত। সোপানযুক্ত উঁচুবেদী। বেদীর উপর সহস্র দল রৌপ্যপদ্ম। তার উপর দক্ষিণে মাথা ও উত্তরে শয়ান শ্বেতপাথরের শিবমূর্তি। মহাদেবের বুকের উপর ত্রিনয়নী ভবতারিণী রঙিন বেনারসি ও মহামূল্যবান রত্নঅলঙ্কারে ভূষিতা। ১৮৫৭-৫৮ খ্রিস্টাব্দে দাদা রামকুমার চট্টোপাধ্যায়ের কাছ থেকে পুজোর দায়িত্ব পান শ্রীরামকৃষ্ণ। এই মন্দিরই এই যুগাবতারের সাধনপীঠ।ঠনঠনিয়ার সিদ্ধেশ্বরী কালী: বর্তমান মন্দিরটি তৈরির অনেক আগেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল সিদ্ধেশ্বরী কালী এমন একটা মত প্রচলিত রয়েছে। জনশ্রুতি, উদয়নারায়ণ-ব্রহ্মচারী নামে এক তান্ত্রিক আনুমানিক ১৭০৩ খ্রিস্টাব্দে মাটি দিয়ে সিদ্ধেশ্বরী রূপের কালীর্মূতি গড়েন। তখন স্থানটি ছিল জঙ্গলাকীর্ণ। ১৮০৬ খ্রিস্টাব্দে শঙ্কর ঘোষ নামে এক ধনী ব্যক্তি কালীমন্দির ও পুষ্পেশ্বর শিবের আটচালা মন্দির নির্মাণ করেন। পুজোর ভারও নেন তিনি। কার্তিক অমাবস্যায় আদিকালীর পুজো ছাড়াও জৈষ্ঠ্যমাসে ফলহারিণী এবং মাঘ মাসে রটন্তী কালীর পুজো হয়।কাশীপুরের চিত্তেশ্বরী সর্বমঙ্গলা: গভীর জঙ্গল ঘেরা এক স্থান। ভাগীরথীর তীরে। সে জঙ্গলে বাস দুর্ষর্ধ ডাকাত দলের। সেই ডাকাত দলের পাণ্ডা রঘু ডাকাত। এই ডাকাত সর্দারের হাতেই প্রতিষ্ঠা পায় চিত্তেশ্বরী। নিয়মিত নরবলি হত এখানে। সর্দারের মৃত্যুর পর দায়িত্ব নেন রামশরণ সিমলাই নামে এক ব্রাহ্মণ। তিনি স্বপ্নাবিষ্ট হয়ে কাশীপুর গান অ্যান্ড শেল ফ্যাক্টারি রোড বা বর্তমানে খগেন চ্যাটার্জি রোডে নতুন বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করেন। রামশরণ প্রতিষ্ঠিত বিগ্রহটি নিমকাঠের রক্তবর্ণা ত্রিনয়নীদেবী চতুর্ভুজা ও সিংহবাহিনী। দেবীর হাত বর, অভয় মুদ্রা, খড়্গ ও কমণ্ডুলে বিভূষিতা। কথিত, রামপ্রসাদ কলকাতা থেকে হালিশহর নৌকাযোগে যেতে যেতে দেবীকে গান শুনিয়েছিলেন, ‘মা তারিণী শঙ্কর বৈরাগী তোর নাং...।’ মূল মন্দিরটি ১৬১০ খ্রিস্টাব্দে নির্মাণ করেছিলেন হুগলি জেলার মনোহর ঘোষ ওরফে মহাদেব ঘোষ।কাশীপুর আদি চিত্তেশ্বরী দুর্গা: এই দেবীর কাহিনিও প্রায় এক। তবে এখানে ডাকাতের নাম চিতু বা চিত্তেশ্বর রায়। ডাকাতি করতে যাওয়ার আগে চিতু ষোড়শপচারে দেবীর পুজো করত। আদি চিত্তেশ্বরী বলার কারণ কথিত প্রায় পাঁচশো বছর আগে এই দেবীর প্রতিষ্ঠা হয়েছিল। দেবীর নামেই জায়গাটির নাম চিত্‌পুর হয়ে ওঠে। এই দেবীও নিমকাঠ দিয়ে তৈরি। দেবীর বিগ্রহের সঙ্গে রয়েছে একটি বাঘের মূর্তি। জমিদার গোবিন্দরাম মিত্র মন্দিরটি পুনঃনির্মাণ করেছিলেন।বউবাজারের ফিরিঙ্গি কালী: ১৪৩৭ খ্রিস্টাব্দে তখন কোথায় কলকাতা কোথায় চিত্তরঞ্জন অ্যাভিনিউ। গভীর জঙ্গল, শ্মশান, অদূরে ভাগীরথী। সেই শ্মশানে ছোট একটি চালা ঘরে প্রতিষ্ঠিত ছিল শিবলিঙ্গ ও দেবীকালিকায় বিগ্রহ। শ্মশানে প্রতিষ্ঠিত হলেও দেবী ছিলেন সিদ্ধেশ্বরী। কালের বিবর্তনে শহর গড়ে উঠল। জনপদ সৃষ্টি হল। আনাগোনা শুরু হল পতুর্গিজ ও ইংরেজদের। তাদের মধ্যে ছিলেন পতুর্গিজ খ্রিস্টান অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি। এই ফিরিঙ্গি কালীভক্তের দৌলতে সিদ্ধেশ্বরী কালী লোকমুখে হয়ে উঠলেন ফিরিঙ্গি কালী। ১৮২০-১৮৮০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত এই মন্দিরের পূজারী ছিলেন শ্রীমন্ত পণ্ডিত। সাড়ে পাঁচ ফুট উচ্চতার বিগ্রহ ত্রিনয়নী। এই মন্দিরে শিব ও সিদ্ধেশ্বরী কালী ছাড়াও দুর্গা, শীতলা, মনসা ও নারায়ণের মূর্তি প্রতিষ্ঠিত রয়েছে। প্রতি পূর্ণিমায় সত্যনারায়ণ ও অমাবস্যায় বিশেষ কালীপুজো হয়ে থাকে।কলকাতার কালী মাহাত্ম্যের এ এক সামান্য অংশ। কলকাতার উত্তর থেকে দক্ষিণ ঐতিহ্যপূর্ণ কালী-মন্দিরের সংখ্যা অন্তত তিন ডজন। রাজ্যে সাধনপীঠ ও সতীপীঠ যোগ করলে সে সংখ্যাটি কমপক্ষে ২২২। এই সংখ্যাটি পরিণত ও জনপ্রিয় কালীমন্দির বা পীঠের। এ ছাড়াও এই শহর ও রাজ্যের নানা প্রান্তে জমিদার ও বনেদিবাড়িগুলিতে রয়েছে বহু কালীমন্দির। কলকাতায় এমনই বিখ্যাত ছয় বনেদিবাড়ি হল, হাটখোলার রামচন্দ্র দত্ত। হাটখোলারই জগত্‌রাম দত্ত। দর্জিপাড়ার নীলমণি মিত্র স্ট্রিটের মিত্রবাড়ি। সিমলার রামদুলাল সরকার ও সিমলারই তারক প্রামাণিকের বাড়ি।কালীর এই ভয়াবহ নগ্নিকা মূর্তি-ভাবনার পিছনে আদিম কোনও ধর্মধারা বা ‘কাল্ট’ এর প্রভাব রয়েছে বলে অনুমান করেন সমাজবিদেরা। তাঁদের অনেকেরই মতে কালী আদতে কোনও বৈদিক দেবী নয়। এ দেশের লোকায়ত মাটি থেকেই তার উদ্ভব। কোনও এক নগ্নিকা খড়্গ-মুণ্ডমালা শোভিতা যখন দেবী হিসাবে পূজিত হচ্ছেন তখন তা আদিম অরণ্যচারী মানুষের সংস্কৃতির কোনও ঐতিহ্যকে বহন করছে বলে মনে করা হয়। পরবর্তী কালে আর্য ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতির দেবীভাবনার সঙ্গে যুক্ত হয়ে কালী হিন্দু-ব্রাহ্মণ্যতন্ত্রের দেবীতে রূপান্তরিত হয়েছেন।"ওঁ ক্রীং কালিকায়ৈ নমঃ"তথ্যসূত্র:---১- Tantric visions of the divine feminine: th e ten mahavidyas By David R. Kinsley.২- Mother of my heart, daughter of my dreams By Rachel Fell McDermott.৩- Encountering Kali: in the margins, at the center, in the West By Rachel Fell McDermott, Jeffrey John Kripal.৪- The camphor flame: popular Hinduism and society in India By Christopher John Fuller..৫. বঙ্গদর্শন ও আনন্দবাজার পত্রিকা। ৬. পণ্ডিত শ্যামাচরণ কবিরত্ন বিরচিত শ্রী শ্রী কালীপূজা পদ্ধতি।৭. শ্রী শ্রী চণ্ডী // নীলিমা সান্যাল।৮. ইন্টারনেট // গুগল সার্চ।৯. বিশেষ কৃতজ্ঞতা স্বীকারঃ শুভজিৎ মুখার্জী।

কর্মতাপস আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় আদতে এক প্রফুল্ল স্মৃতি ।

একটি নারীই সবচেয়ে শক্তিশালী ও কার্যকর নেতৃত্ব দিতে পারেন ।।