প্রয়াণ দিবসে শ্রদ্ধাঞ্জলিবিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম**প্রসূন কাঞ্জিলাল*

*প্রয়াণ দিবসে শ্রদ্ধাঞ্জলি
বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম*

*প্রসূন কাঞ্জিলাল*

"আমি চিরতরে দূরে চলে যাব
তবু আমারে দেব না ভুলিতে।"

না, ভুলতে দেননি তিনি ।  প্রেমে আর বিদ্রোহে, গানে আর কবিতায় তিনি বাঙালি সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ ।  বাঙালির চেতনায় মিশে আছেন কাজি নজরুল ইসলাম ।  তবু মাঝে মাঝে কেন জানি মনে হয়, 'কেউ ভোলে না, কেউ ভোলে' !  ''প্রাণ'-এর সঙ্গে নয়নমণি'র সম্মিলনে, 'জাতের নামে বজ্জাতি'র সমূল উৎপাটনে, 'দুস্তর পারাবার' পাড়ি দেবার দুর্বার শপথে নিয়ত পথ দেখান কাজি কবি। 

কাজী নজরুল :---- (১৮৯৯-১৯৭৬) বাংলাদেশের জাতীয় কবি এবং অবিভক্ত বাংলার সাহিত্য, সমাজ ও সংস্কৃতি ক্ষেত্রের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব। নজরুল ১৩০৬ বঙ্গাব্দের ১১ জ্যৈষ্ঠ (২৪ মে ১৮৯৯) পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা কাজী ফকির আহমদ ছিলেন মসজিদের ইমাম ও মাজারের খাদেম। নজরুলের ডাক নাম ছিল ‘দুখু মিয়া’। ১৯০৮ সালে পিতার মৃত্যু হলে নজরুল পরিবারের ভরণ-পোষণের জন্য হাজী পালোয়ানের মাজারের সেবক এবং মসজিদে মুয়াজ্জিনের কাজ করেন। তিনি গ্রামের মকতব থেকে নিম্ন প্রাথমিক পরীক্ষায়ও উত্তীর্ণ হন। শৈশবের এ শিক্ষা ও শিক্ষকতার মধ্য দিয়ে নজরুল অল্পবয়সেই ইসলাম ধর্মের মৌলিক আচার-অনুষ্ঠান, যেমন পবিত্র কুরআন পাঠ, নামাজ, রোজা, হজ্জ, জাকাত প্রভৃতি বিষয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে পরিচিত হওয়ার সুযোগ লাভ করেন। পরবর্তী জীবনে বাংলা সাহিত্য ও সঙ্গীতে ইসলামি ঐতিহ্যের রূপায়ণে ওই অভিজ্ঞতা সহায়ক হয়েছিল।
কাজী ইসলাম নজরুল
বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে তিনি ‘বিদ্রোহী কবি’ এবং আধুনিক বাংলা গানের জগতে ‘বুলবুল’ নামে খ্যাত। রবীন্দ্রনাথের অনুকরণমুক্ত কবিতা রচনায় তাঁর অবদান খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর ব্যতিক্রমধর্মী কবিতার জন্যই ‘ত্রিশোত্তর আধুনিক কবিতা’র সৃষ্টি সহজতর হয়েছিল বলে মনে করা হয়। নজরুল সাহিত্যকর্ম এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মকান্ডের মাধ্যমে অবিভক্ত বাংলায় পরাধীনতা, সাম্প্রদায়িকতা, সাম্রাজ্যবাদ, উপনিবেশবাদ, মৌলবাদ এবং দেশি-বিদেশি শোষণের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেন। এ কারণে ইংরেজ সরকার তাঁর কয়েকটি গ্রন্থ ও পত্রিকা নিষিদ্ধ করে এবং তাঁকে কারাদন্ডে দন্ডিত করে। নজরুলও আদালতে লিখিত রাজবন্দীর জবানবন্দী দিয়ে এবং প্রায় চল্লিশ দিন একটানা অনশন করে ইংরেজ সরকারের জেল-জুলুমের প্রতিবাদ জানিয়ে ইতিহাস সৃষ্টি করেন এবং এর সমর্থনে নোবেল বিজয়ী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁকে গ্রন্থ উৎসর্গ করে শ্রদ্ধা জানান।


নজরুল তাঁর কবিতায় ব্যতিক্রমী এমন সব বিষয় ও শব্দ ব্যবহার করেন, যা আগে কখনও ব্যবহূত হয়নি। কবিতায় তিনি সমকালীন রাজনৈতিক ও সামাজিক যন্ত্রণাকে ধারণ করায় অভূতপূর্ব জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। তবে মানবসভ্যতার কয়েকটি মৌলিক সমস্যাও ছিল তাঁর কবিতার উপজীব্য।
নজরুল তাঁর সৃষ্টিকর্মে হিন্দু-মুসলিম মিশ্র ঐতিহ্যের পরিচর্যা করেন। কবিতা ও গানে তিনি এ মিশ্র ঐতিহ্যচেতনাবশত প্রচলিত বাংলা ছন্দোরীতি ছাড়াও অনেক সংস্কৃত ও আরবি ছন্দ ব্যবহার করেন। নজরুলের ইতিহাস-চেতনায় ছিল সমকালীন এবং দূর ও নিকট অতীতের ইতিহাস, সমভাবে স্বদেশ ও আন্তর্জাতিক বিশ্ব।
বাংলা সঙ্গীতের প্রায় সবকটি ধারার পরিচর্যা ও পরিপুষ্টি, বাংলা গানকে উত্তর ভারতীয় রাগসঙ্গীতের দৃঢ় ভিত্তির ওপর স্থাপন এবং লোকসঙ্গীতাশ্রয়ী বাংলা গানকে উপমহাদেশের বৃহত্তর মার্গসঙ্গীতের ঐতিহ্যের সঙ্গে সংযুক্তি নজরুলের মৌলিক সঙ্গীতপ্রতিভার পরিচায়ক। নজরুলসঙ্গীত বাংলা সঙ্গীতের অণুবিশ্ব, তদুপরি উত্তর ভারতীয় রাগসঙ্গীতের বঙ্গীয় সংস্করণ। বাণী ও সুরের বৈচিত্র্যে নজরুল বাংলা গানকে যথার্থ আধুনিক সঙ্গীতে রূপান্তরিত করেন।
মকতব, মাযার ও মসজিদ-জীবনের পর নজরুল রাঢ় বাংলার (পশ্চিম বাংলার বর্ধমান-বীরভূম অঞ্চল) কবিতা, গান আর নৃত্যের মিশ্র আঙ্গিক লোকনাট্য লেটোদলে যোগদান করেন। ঐসব লোকনাট্যের দলে বালক নজরুল ছিলেন একাধারে পালাগান রচয়িতা ও অভিনেতা। নজরুলের কবি ও শিল্পী জীবনের শুরু এ লেটোদল থেকেই। হিন্দু পুরাণের সঙ্গে নজরুলের পরিচয়ও লেটোদল থেকেই শুরু হয়েছিল।

 তাৎক্ষণিকভাবে কবিতা ও গান রচনার কৌশল নজরুল লেটো বা কবিগানের দলেই রপ্ত করেন। এ সময় লেটোদলের জন্য কিশোর কবি নজরুলের সৃষ্টি চাষার সঙ, শকুনিবধ, রাজা যুধিষ্ঠিরের সঙ, দাতা কর্ণ, আকবর বাদশাহ, কবি কালিদাস, বিদ্যাভূতুম, রাজপুত্রের সঙ, বুড় সালিকের ঘাড়ে রোঁ, মেঘনাদ বধ প্রভৃতি।

১৯১০ সালে নজরুল পুনরায় ছাত্রজীবনে ফিরে যান। প্রথমে তিনি রানীগঞ্জ সিয়ারসোল রাজ স্কুল এবং পরে মাথরুন উচ্চ ইংরেজি স্কুলে (পরে নবীনচন্দ্র ইনস্টিটিউশন) ভর্তি হন। শেষোক্ত স্কুলের হেড-মাস্টার ছিলেন কবি কুমুদরঞ্জন মল্লিক; নজরুল তাঁর সান্নিধ্য লাভ করেন। দুর্ভাগ্যক্রমে আর্থিক অনটনের কারণে ষষ্ঠ শ্রেণির পর নজরুলের ছাত্রজীবনে আবার বিঘ্ন ঘটে। মাথরুন স্কুল ছেড়ে তিনি প্রথমে বাসুদেবের কবিদলে, পরে এক খ্রিস্টান রেলওয়ে গার্ডের খানসামা পদে এবং শেষে আসানসোলে চা-রুটির দোকানে কাজ নেন। এভাবে কিশোর শ্রমিক নজরুল তাঁর বাল্যজীবনেই রূঢ় বাস্তবতার সঙ্গে সম্যকভাবে পরিচিত হন।

চা-রুটির দোকানে চাকরি করার সময় আসানসোলের দারোগা রফিজউল্লার সঙ্গে নজরুলের পরিচয় হয় এবং তাঁর সুবাদেই নজরুল ১৯১৪ সালে ময়মনসিংহ জেলার ত্রিশালের দরিরামপুর স্কুলে সপ্তম শ্রেণিতে ভর্তি হন। এক বছর পর তিনি পুনরায় নিজের গ্রামে ফিরে যান এবং ১৯১৫ সালে আবার রানীগঞ্জ সিয়ারসোল রাজস্কুলে অষ্টম শ্রেণিতে ভর্তি হন। এ স্কুলে নজরুল ১৯১৫-১৭ সালে একটানা অষ্টম থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশুনা করেন। প্রিটেস্ট পরীক্ষার সময় ১৯১৭ সালের শেষদিকে নজরুল সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। ছাত্রজীবনের শেষ বছরগুলিতে নজরুল সিয়ারসোল স্কুলের চারজন শিক্ষক দ্বারা নানাভাবে প্রভাবিত হন। তাঁরা হলেন উচ্চাঙ্গসঙ্গীতে সতীশচন্দ্র কাঞ্জিলাল, বিপ্লবী ভাবধারায় নিবারণচন্দ্র ঘটক, ফারসি সাহিত্যে হাফিজ নুরুন্নবী এবং সাহিত্যচর্চায় নগেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়।

১৯১৭ সালের শেষদিক থেকে ১৯২০ সালের মার্চ-এপ্রিল পর্যন্ত প্রায় আড়াই বছর নজরুলের সামরিক জীবনের পরিধি। এ সময়ের মধ্যে তিনি ৪৯ বেঙ্গলি রেজিমেন্টের একজন সাধারণ সৈনিক থেকে ব্যাটেলিয়ন কোয়ার্টার মাস্টার হাবিলদার পর্যন্ত হয়েছিলেন। রেজিমেন্টের পাঞ্জাবি মৌলবির নিকট তিনি ফারসি ভাষা শেখেন, সঙ্গীতানুরাগী সহসৈনিকদের সঙ্গে দেশি-বিদেশি বাদ্যযন্ত্র সহযোগে সঙ্গীতচর্চা করেন এবং একই সঙ্গে সমভাবে গদ্যে-পদ্যে সাহিত্যচর্চা করেন। করাচি সেনানিবাসে বসে রচিত এবং কলকাতার বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত নজরুলের রচনাবলির মধ্যে রয়েছে ‘বাউন্ডুলের আত্মকাহিনী’ (সওগাত, মে ১৯১৯) নামক প্রথম গদ্য রচনা, প্রথম প্রকাশিত কবিতা ‘মুক্তি’ (বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা, জুলাই ১৯১৯) এবং অন্যান্য রচনা: গল্প ‘হেনা’, ‘ব্যথার দান’, ‘মেহের নেগার’, ‘ঘুমের ঘোরে’; কবিতা ‘আশায়’, ‘কবিতা সমাধি’ প্রভৃতি। উল্লেখযোগ্য যে, করাচি সেনানিবাসে থেকেও তিনি কলকাতার বিভিন্ন সাহিত্যপত্রিকা, যেমন: প্রবাসী, ভারতবর্ষ, ভারতী, মানসী, মর্ম্মবাণী, সবুজপত্র, সওগাত ও বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকার গ্রাহক ছিলেন। তাছাড়া তাঁর কাছে রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র, এমনকি ফারসি কবি হাফিজেরও কিছু গ্রন্থ ছিল। প্রকৃতপক্ষে নজরুলের আনুষ্ঠানিক সাহিত্যচর্চার শুরু করাচির সেনানিবাসে থাকাবস্থায়ই।
প্রথম মহাযুদ্ধ শেষে ১৯২০ সালের মার্চ মাসে নজরুল দেশে ফিরে কলকাতায় সাহিত্যিক-সাংবাদিক জীবন শুরু করেন। কলকাতায় তাঁর প্রথম আশ্রয় ছিল ৩২নং কলেজ স্ট্রীটে বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতি-র অফিসে সমিতির অন্যতম কর্মকর্তা মুজফ্ফর আহমদের সঙ্গে। শুরুতেই মোসলেম ভারত, বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা, উপাসনা প্রভৃতি পত্রিকায় তাঁর সদ্যোরচিত বাঁধন-হারা উপন্যাস এবং ‘বোধন’, ‘শাত-ইল-আরব’, ‘বাদল প্রাতের শরাব’, ‘আগমনী’, ‘খেয়া-পারের তরণী’, ‘কোরবানী’, ‘মোহরর্ম’, ‘ফাতেহা-ই-দোয়াজ্দহম্’ প্রভৃতি কবিতা প্রকাশিত হলে বাংলা সাহিত্য ক্ষেত্রে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। বাংলা সাহিত্যের এ নবীন প্রতিভার প্রতি সাহিত্যানুরাগীদের দৃষ্টি পড়ে। কবি-সমালোচক মোহিতলাল মজুমদার মোসলেম ভারত পত্রিকায় প্রকাশিত এক পত্রের মাধ্যমে নজরুলের ‘খেয়া-পারের তরণী’ এবং ‘বাদল প্রাতের শরাব’ কবিতাদুটির উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেন এবং বাংলার সারস্বত সমাজে তাঁকে স্বাগত জানান। নজরুল বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতির অফিসে মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক, আফজালুল হক, কাজী আবদুল ওদুদ, মুহম্মদ শহীদুল্লাহ প্রমুখ সমকালীন মুসলমান সাহিত্যিকের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হন। অপরদিকে কলকাতার তৎকালীন জমজমাট দুটি সাহিত্যিক আসর ‘গজেনদার আড্ডা’ ও ‘ভারতীয় আড্ডা’য় অতুলপ্রসাদ সেন, দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর, অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত, চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, ওস্তাদ করমতুল্লা খাঁ, প্রেমাঙ্কুর আতর্থী, শিশিরকুমার ভাদুড়ী, হেমেন্দ্রকুমার রায়, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, নির্মলেন্দু লাহিড়ী, ধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় প্রমুখ বাংলার সমকালীন শিল্প, সাহিত্য, সঙ্গীত ও নাট্যজগতের দিকপালদের সঙ্গে পরিচিত ও ঘনিষ্ঠ হবার সুযোগ পান। নজরুল ১৯২১ সালের অক্টোবর মাসে শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন; তখন থেকে ১৯৪১ পর্যন্ত দু দশক বাংলার দু প্রধান কবির মধ্যে যোগাযোগ ও ঘনিষ্ঠতা অক্ষুণ্ণ ছিল।

এ.কে ফজলুল হকের (শেরে-বাংলা) সম্পাদনায় অসহযোগ ও খিলাফত আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে ১৯২০ সালের ১২ জুলাই সান্ধ্য দৈনিক নবযুগ প্রকাশিত হলে তার মাধ্যমেই নজরুলের সাংবাদিক জীবনের সূত্রপাত ঘটে। নজরুলের লেখা ‘মুহাজিরীন হত্যার জন্য দায়ী কে?’ প্রবন্ধের জন্য ওই বছরেরই আগস্ট-সেপ্টেম্বরের দিকে পত্রিকার জামানত বাজেয়াপ্ত হয় এবং নজরুলের ওপর পুলিশের দৃষ্টি পড়ে। নবযুগ পত্রিকার সাংবাদিকরূপে নজরুল যেমন একদিকে স্বদেশ ও আন্তর্জাতিক জগতের রাজনৈতিক-সামাজিক অবস্থা নিয়ে লিখছিলেন, তেমনি মুজফ্ফর আহমদের সঙ্গে বিভিন্ন রাজনৈতিক সভা-সমিতিতে উপস্থিত থেকে সমকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কেও ওয়াকিবহাল হচ্ছিলেন। পাশাপাশি বিভিন্ন ঘরোয়া আসর ও অনুষ্ঠানে যোগদান এবং সঙ্গীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে তরুণ কবির সংস্কৃতিচর্চাও অগ্রসর হচ্ছিল। নজরুল তখনও নিজে গান লিখে সুর করতে শুরু করেন নি, তবে তাঁর কয়েকটি কবিতায় সুর দিয়ে তার স্বরলিপিসহ পত্রপত্রিকায় প্রকাশ করেছিলেন ব্রাহ্মসমাজের সঙ্গীতজ্ঞ মোহিনী সেনগুপ্তা, যেমন: ‘হয়ত তোমার পাব দেখা’, ‘ওরে এ কোন্ স্নেহ-সুরধুনী’। নজরুলের গান ‘বাজাও প্রভু বাজাও ঘন’ প্রথম প্রকাশিত হয় সওগাত পত্রিকার ১৩২৭ সালের বৈশাখ সংখ্যায়।
১৯২১ সালের এপ্রিল-জুন মাস নজরুলের জীবনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ সময়। এ সময় তিনি মুসলিম সাহিত্য সমিতির অফিসে পরিচিত হন পুস্তক প্রকাশক আলী আকবর খানের সঙ্গে এবং তাঁর সঙ্গেই নজরুল প্রথম কুমিল্লায় বিরজাসুন্দরী দেবীর বাড়িতে আসেন। এখানে তিনি প্রমীলার সঙ্গে পরিচিত হন এবং এ পরিচয়ের সূত্র ধরেই পরে তাঁরা পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ হন।

কুমিল্লা থেকে নজরুল দৌলতপুর গ্রামে আলী আকবর খানের বাড়িতে গিয়ে কিছুকাল অবস্থান করেন। সেখান থেকে ১৯ জুন পুনরায় কুমিল্লায় ফিরে তিনি ১৭ দিন অবস্থান করেন। তখন অসহযোগ আন্দোলনে কুমিল্লা উদ্বেলিত। নজরুল বিভিন্ন শোভাযাত্রা ও সভায় যোগ দিয়ে গাইলেন সদ্যোরচিত ও সুরারোপিত স্বদেশী গান: ‘এ কোনো পাগল পথিক ছুটে এলো বন্দিনী মার আঙ্গিনায়’, ‘আজি রক্ত-নিশি ভোরে/ একি এ শুনি ওরে/ মুক্তি-কোলাহল বন্দী-শৃঙ্খলে’ প্রভৃতি। এভাবেই কলকাতার সৌখিন গীতিকার ও গায়ক নজরুল কুমিল্লায় অসহযোগ আন্দোলনে যোগদান এবং পরাধীনতার বিরুদ্ধে জাগরণী গান রচনা ও পরিবেশনার মধ্য দিয়ে স্বদেশী গান রচয়িতা ও রাজনৈতিক কর্মীতে পরিণত হন।
১৯২১ সালের নভেম্বর মাসে নজরুল আবার কুমিল্লা যান। ২১ নভেম্বর ভারতব্যাপী হরতাল ছিল। নজরুল পুনরায় পথে নামেন এবং অসহযোগ মিছিলের সঙ্গে শহর প্রদক্ষিণ করে গাইলেন: ‘ভিক্ষা দাও! ভিক্ষা দাও! ফিরে চাও ওগো পুরবাসী।’ এ সময় তুরস্কে মধ্যযুগীয় সামন্ত শাসন টিকিয়ে রাখার জন্য ভারতে মুসলমানরা খিলাফত আন্দোলন করছিল। মহাত্মা গান্ধীর নেতৃত্বে অসহযোগ আর মওলানা মোহাম্মদ আলী ও শওকত আলীর নেতৃত্বে খিলাফত আন্দোলনের দর্শনে নজরুল আস্থাশীল ছিলেন না। স্বদেশে সশস্ত্র বিপ্লবের মাধ্যমে স্বরাজ বা স্বাধীনতা অর্জন আর মোস্তফা কামাল আতাতুর্কের নেতৃত্বে তুরস্কের সালতানাত উচ্ছেদকারী নব্য তুর্কি আন্দোলনের প্রতি নজরুলের সমর্থন ছিল; তথাপি ভারতের হিন্দু ও মুসলমান সম্প্রদায়ের সম্মিলিত সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী সংগ্রামের জন্যই তিনি ওই দুটি আন্দোলনে যোগদান করেন।

১৯২১ সালের ডিসেম্বর মাসে কুমিল্লা থেকে কলকাতা ফেরার পর নজরুলের দুটি ঐতিহাসিক ও বৈপ্লবিক সৃষ্টিকর্ম হচ্ছে ‘বিদ্রোহী’ কবিতা ও ‘ভাঙার গান’ সঙ্গীত। এ দুটি রচনা বাংলা কবিতা ও গানের ধারাকে সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছিল; ‘বিদ্রোহী’ কবিতার জন্য নজরুল বিপুল খ্যাতি ও জনপ্রিয়তা অর্জন করেন।
১৯২১ সালের শেষদিকে নজরুল আরেকটি বিখ্যাত কবিতা ‘কামাল পাশা’ রচনা করেন, যার মাধ্যমে তাঁর সমকালীন আন্তর্জাতিক ইতিহাস-চেতনা এবং ভারতীয় মুসলমানদের খিলাফত আন্দোলনের অসারতার পরিচয় পাওয়া যায়। নজরুল তাঁর রাষ্ট্রীয় ধ্যান-ধারণায় সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হয়েছিলেন মোস্তফা কামাল পাশার নেতৃত্ব দ্বারা, কারণ তিনি সামন্ততান্ত্রিক খিলাফত বা তুরস্কের সুলতানকে উচ্ছেদ করে তুরস্ককে একটি আধুনিক ধর্মনিরপেক্ষ প্রজাতন্ত্রে রূপান্তরিত করেছিলেন। তুরস্কের সমাজজীবন থেকে মোস্তফা কামাল যে মৌলবাদ ও পর্দাপ্রথা দূর করেছিলেন, তা নজরুলকে বেশি অনুপ্রাণিত করেছিল। তিনি ভেবেছিলেন, তুরস্কে যা সম্ভবপর, ভারত ও বাংলায় তা সম্ভবপর নয় কেন? বস্ত্তত, গোঁড়ামি, রক্ষণশীলতা, ধর্মান্ধতা, কুসংস্কার ও আচারসর্বস্বতা থেকে দেশবাসী, বিশেষত স্বধর্মীদের মুক্তির জন্য নজরুল আজীবন সংগ্রাম করে গেছেন। ১৯১৭ সালের রুশ সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবও নজরুলকে নানাভাবে প্রভাবিত করেছিল। নজরুলের লাঙল ও গণবাণী পত্রিকায় প্রকাশিত ‘সাম্যবাদী’ ও ‘সর্বহারা’ কবিতাগুচ্ছ এবং কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনাল-এর অনুবাদ ‘জাগ অনশন বন্দী ওঠ রে যত’ এবং ‘রেড ফ্লাগ’ অবলম্বনে রক্তপতাকার গান এর প্রমাণ।

১৯২২ সালে নজরুলের যেসব সাহিত্যকর্ম প্রকাশিত হয় সেসবের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ ছিল গল্প-সংকলন ব্যথার দান, কবিতা-সংকলন অগ্নি-বীণা ও প্রবন্ধ-সংকলন যুগবাণী। বাংলা কবিতার পালাবদলকারী কাব্য অগ্নি-বীণা প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে এর প্রথম সংস্করণ শেষ হয়ে যায় এবং পরপর কয়েকটি নতুন সংস্করণ প্রকাশ করতে হয়; কারণ এ কাব্যে নজরুলের ‘প্রলয়োল্লাস’, ‘আগমনী’, ‘খেয়াপারের তরণী’, ‘শাত-ইল্-আরব’, ‘বিদ্রোহী’, ‘কামাল পাশা’ প্রভৃতি বাংলা সাহিত্যে সাড়া জাগানো এবং বাংলা কবিতার মোড় ফেরানো কবিতা সংকলিত হয়েছিল।

১৯২২ সালে নজরুলের অপর বিপ্লবী উদ্যম হলো ধূমকেতু পত্রিকার প্রকাশ (১২ আগস্ট)। পত্রিকাটি সপ্তাহে দুবার প্রকাশিত হতো। বিশের দশকে অসহযোগ ও খিলাফত আন্দোলনের ব্যর্থতার পর সশস্ত্র বিপ্লববাদের পুনরাবির্ভাবে ধূমকেতু পত্রিকার তাৎপর্যপূর্ণ অবদান ছিল। এক অর্থে এ পত্রিকা হয়ে উঠেছিল সশস্ত্র বিপ্লবীদের মুখপত্র। পত্রিকাটি প্রকাশিত হতো ‘কাজী নজরুল ইসলাম কল্যাণীয়েষু, আয় চলে আয়রে ধূমকেতু। অাঁধারে বাঁধ অগ্নিসেতু, দুর্দিনের এ দুর্গশিরে উড়িয়ে দে তোর বিজয় কেতন।’ রবীন্দ্রনাথের এ আশীর্বাণী শীর্ষে ধারণ করে। ধূমকেতুর ২৬ সেপ্টেম্বর ১৯২২ সংখ্যায় নজরুলের প্রচ্ছন্ন রাজনৈতিক কবিতা ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ প্রকাশিত হলে ৮ নভেম্বর পত্রিকার ওই সংখ্যাটি নিষিদ্ধ করা হয়। নজরুলের প্রবন্ধগ্রন্থ যুগবাণী বাজেয়াপ্ত হয় ২৩ নভেম্বর ১৯২২। একই দিনে নজরুলকে কুমিল্লা থেকে গ্রেফতার করে কলকাতায় আনা হয়। বিচারাধীন বন্দি হিসেবে ১৯২৩ সালের ৭ জানুয়ারি নজরুল আত্মপক্ষ সমর্থন করে চিফ প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেট সুইনহোর আদালতে যে জবানবন্দী প্রদান করেন, বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে তা ‘রাজবন্দীর জবানবন্দী’ নামে সাহিত্য-মর্যাদা পেয়ে আসছে। ১৬ জানুয়ারি বিচারের রায়ে নজরুল এক বছর সশ্রম কারাদন্ডে দন্ডিত হন।
নজরুল যখন আলীপুর সেন্ট্রাল জেলে বন্দি তখন রবীন্দ্রনাথ তাঁর বসন্ত গীতিনাট্য তাঁকে উৎসর্গ করেন (২২ জানুয়ারি ১৯২৩)। এ ঘটনায় উল্লসিত নজরুল জেলখানায় বসে তাঁর অনুপম কবিতা ‘আজ সৃষ্টি সুখের উল্লাসে’ রচনা করেন।

 সমকালীন অনেক রবীন্দ্রভক্ত ও অনুরাগী কবি-সাহিত্যিক বিষয়টি ভালো চোখে দেখেন নি। এ ব্যাপারে কেউ কেউ অভিযোগ করলে রবীন্দ্রনাথ তাঁদের নজরুল-কাব্যপাঠের পরামর্শ দেন এবং বলেন, ‘...যুগের মনকে যা প্রতিফলিত করে, তা শুধু কাব্য নয়, মহাকাব্য।’
১৯২৩ সালের ১৪ এপ্রিল নজরুলকে হুগলি জেলে স্থানান্তর করা হয়। রাজবন্দিদের প্রতি ইংরেজ জেল-সুপারের দুর্ব্যবহারের প্রতিবাদে ওই দিন থেকেই তিনি অনশন ধর্মঘট শুরু করেন। রবীন্দ্রনাথ অনশন ভঙ্গ করার অনুরোধ জানিয়ে নজরুলকে টেলিগ্রাম করেন: ‘Give up hunger strike, our literature claims you.’ অবশ্য জেল কর্তৃপক্ষের বিরূপ মনোভাবের কারণে নজরুল টেলিগ্রামটি পান নি। এদিকে জনমতের চাপে ১৯২৩ সালের ২২ মে জেল-পরিদর্শক ড. আবদুল্লাহ সোহরাওয়ার্দী হুগলি জেল পরিদর্শন করেন এবং তাঁর আশ্বাস ও অনুরোধে ওই দিনই নজরুল চল্লিশ দিনের অনশন ভঙ্গ করেন। নজরুলকে ১৯২৩ সালের ১৮ জুন বহরমপুর জেলে স্থানান্তর করা হয় এবং এক বছর তিন সপ্তাহ কারাবাসের পর ১৫ ডিসেম্বর তাঁকে মুক্তি দেওয়া হয়। হুগলি জেলে বসে নজরুল রচনা করেন ‘এই শিকল-পরা ছল মোদের এ শিকল-পরা ছল’, আর বহরমপুর জেলে ‘জাতের নামে বজ্জাতি সব জাত-জালিয়াৎ খেল্ছে জুয়া’ এ বিখ্যাত গান দুটি।
নজরুলের প্রেম ও প্রকৃতির কবিতার প্রথম সংকলন দোলন-চাঁপা প্রকাশিত হয় ১৯২৩ সালের অক্টোবরে। এতে সংকলিত দীর্ঘ কবিতা ‘পূজারিণী’-তে নজরুলের রোমান্টিক প্রেম-চেতনার বহুমাত্রিক স্বরূপ প্রকাশিত হয়েছে।

১৯২৪ সালের ২৫ এপ্রিল কলকাতায় নজরুল ও প্রমীলার বিবাহ সম্পন্ন হয়। প্রমীলা ছিলেন ব্রাহ্মসমাজভুক্ত। তাঁর মা গিরিবালা দেবী ছাড়া পরিবারের অন্যরা এ বিবাহ সমর্থন করেননি। নজরুলও আত্মীয়-স্বজন থেকে বিচ্ছিন্ন ছিলেন। হুগলির মহীয়সী মহিলা মিসেস মাসুমা রহমান বিবাহপর্বে প্রধান ভূমিকা পালন করেন। নজরুল হুগলিতে সংসার পাতেন।
১৯২৪ সালের ১০ আগস্ট নজরুলের গান ও কবিতা সংকলন বিষের বাঁশী এবং একই মাসে ভাঙ্গার গান প্রকাশিত হয়। দুটি গ্রন্থই ওই বছর অক্টোবর ও নভেম্বর মাসে সরকার কর্তৃক বাজেয়াপ্ত হয়।

১৯২৫ সালে নজরুলের গানের প্রথম রেকর্ড প্রকাশিত হয় হিজ মাস্টার্স ভয়েস (এইচ.এম.ভি) কোম্পানি থেকে, যদিও ১৯২৮ সালের আগে নজরুল গ্রামোফোন কোম্পানির সঙ্গে সরাসরি সংশ্লিষ্ট হন নি। শিল্পী হরেন্দ্রনাথ দত্তের কণ্ঠে ‘জাতের নামে বজ্জাতি সব জাত-জালিয়াৎ খেল্ছে জুয়া’ ও ‘যাক পুড়ে যাক বিধির বিধান সত্য হোক’ গান দুটি রেকর্ড করা হয়।
নজরুল এ সময় বিভিন্ন রাজনৈতিক সভা-সমিতি ও অনুষ্ঠানে যোগ দিতেন এবং স্বরচিত স্বদেশী গান পরিবেশন করে পরাধীনতার বিরুদ্ধে সংগ্রামে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করতেন। তিনি তাঁর একটি জনপ্রিয় স্বদেশী গান ‘ঘোর্ রে ঘোর্ রে আমার সাধের চর্কা ঘোর’ ১৯২৫ সালের মে মাসে ফরিদপুরে অনুষ্ঠিত কংগ্রেসের অধিবেশনে মহাত্মা গান্ধী ও দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের উপস্থিতিতে পরিবেশন করেন। ১৯২৫ সালের শেষ দিকে নজরুল প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে যোগদান করেন। তিনি কুমিল্লা, মেদিনীপুর, হুগলি, ফরিদপুর, বাঁকুড়া এবং বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে রাজনৈতিক সভা-সমিতিতে অংশগ্রহণ করেন। নজরুল এ সময় বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেসের সদস্য হওয়া ছাড়াও শ্রমিক ও কৃষক আন্দোলনের জন্য ‘শ্রমিক-প্রজা-স্বরাজ দল’ গঠনে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। রাজনীতিক নজরুলের একটি উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ ছিল সাপ্তাহিক লাঙ্গল পত্রিকা প্রকাশ (১৬ ডিসেম্বর ১৯২৫)। তিনি এ পত্রিকার প্রধান সম্পাদক ছিলেন। এর প্রথম সংখ্যাতেই নজরুলের ‘সাম্যবাদী’ কবিতাসমষ্টি মুদ্রিত হয়। লাঙ্গল ছিল বাংলা ভাষায় প্রকাশিত প্রথম শ্রেণিসচেতন সাপ্তাহিক পত্রিকা। এতে প্রকাশিত ‘শ্রমিক-প্রজা-স্বরাজ দলে’র ম্যানিফেস্টোতে প্রথম ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতার দাবি উত্থাপিত হয়। এ সময় নজরুল পেশাজীবী শ্রমিক-কৃষক সংগঠনের উপযোগী সাম্যবাদী ও সর্বহারা কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ করেন।

১৯২৬ সালে নজরুল কৃষ্ণনগরে বসবাস শুরু করেন এবং বাংলা গানে এক নতুন ধারার সংযোজন করেন। তিনি স্বদেশী গানকে স্বাধীনতা ও দেশাত্মবোধের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সর্বহারা শ্রেণির গণসঙ্গীতে রূপান্তরিত করেন। স্মরণীয় যে, ১৯২৭ সালের এপ্রিল মাসে নজরুল কলকাতার প্রথম বামপন্থী সাপ্তাহিক গণবাণীর (১৯২৭ সালের ১২ আগস্ট থেকে গণবাণী ও লাঙ্গল একীভূত হয়) জন্য রচনা করেন ‘কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনাল’ ও ‘রেড ফ্লাগ’ অবলম্বনে ‘জাগো অনশন বন্দী’, ‘রক্তপতাকার গান’ ইত্যাদি। ১৯২৫ সালে নজরুলের প্রকাশনাসমূহের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল: গল্প-সংকলন রিক্তের বেদন, কবিতা ও গানের সংকলন চিত্তনামা, ছায়ানট, সাম্যবাদী ও পূবের হাওয়া। হিন্দু-মুসলমান ঐক্যের অগ্রদূত দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের অকাল মৃত্যুতে (১৬ জুন ১৯২৫) শোকাহত নজরুল কর্তৃক রচিত গান ও কবিতা নিয়ে চিত্তনামা গ্রন্থটি সংকলিত হয়।
১৯২৬ সালের নভেম্বরে অনুষ্ঠিত কেন্দ্রীয় আইনসভার উচ্চ পরিষদের সদস্যপদের জন্য পূর্ববঙ্গ থেকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা নজরুলের রাজনৈতিক জীবনে একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। এ উপলক্ষে তিনি পূর্ববাংলায়, বিশেষত ঢাকা বিভাগে ব্যাপকভাবে সফর করেন। স্কুলজীবনে ত্রিশাল-দরিরামপুরে থাকাকালে এ অঞ্চল সম্পর্কে তাঁর যে অভিজ্ঞতার সূত্রপাত হয়, রাজনৈতিক ও বৈবাহিক কারণে তা আরও গভীর হয়।
নজরুল ছিলেন বাংলা গজল গানের স্রষ্টা। গণসঙ্গীত ও গজলে যৌবনের দুটি বিশিষ্ট দিক সংগ্রাম ও প্রেমের পরিচর্যাই ছিল মুখ্য। নজরুল গজল আঙ্গিক সংযোজনের মাধ্যমে বাংলা গানের প্রচলিত ধারায় বৈচিত্র্য আনয়ন করেন। তাঁর অধিকাংশ গজলের বাণীই উৎকৃষ্ট কবিতা এবং তার সুর রাগভিত্তিক। আঙ্গিকের দিক থেকে সেগুলি উর্দু গজলের মতো তালযুক্ত ও তালছাড়া গীত। নজরুলের বাংলা গজল গানের জনপ্রিয়তা সমকালীন বাংলা গানের ইতিহাসে ছিল তুলনাহীন। ১৯২৬-২৭ সালে কৃষ্ণনগর জীবনে নজরুল উভয় ধারায় বহুসংখ্যক গান রচনা করেন। ওই সময়ে তিনি নিজের গানের স্বরলিপি প্রকাশ করতে থাকেন। এসব গান থেকে স্পষ্ট হয় যে, নজরুলের সৃজনশীল মৌলিক সঙ্গীত প্রতিভার প্রথম স্ফুরণ ঘটে ১৯২৬-২৭ সালে কৃষ্ণনগরে। অথচ নজরুলের কৃষ্ণনগর জীবন ছিল অভাব-অনটন, রোগ-শোক ও দুঃখ-দারিদ্র্যক্লিষ্ট। তখনও পর্যন্ত নজরুল কোনো প্রচার মাধ্যমের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হন নি, তবে দিলীপকুমার রায় ও সাহানা দেবীর মতো বড় মাপের শিল্পী ও সঙ্গীতজ্ঞ নজরুলের গানকে বিভিন্ন আসরে ও অনুষ্ঠানে পরিবেশন করে জনপ্রিয় করে তোলেন।

১৯২৭ সালে একদিকে সাপ্তাহিক শনিবারের চিঠি-তে রক্ষণশীল হিন্দু বিশেষত ব্রাহ্মণসমাজের একটি অংশ থেকে, অপরদিকে মৌলবাদী মুসলমান সমাজের ইসলাম দর্শন, মোসলেম দর্পণ প্রভৃতি পত্রিকায় নজরুল-সাহিত্যের বিরূপ সমালোচনার ঝড় ওঠে। শনিবারের চিঠি-তে নজরুলের বিভিন্ন রচনার প্যারডি প্রকাশিত হতে থাকে। তবে নজরুলের সমর্থনে কল্লোল, কালিকলম প্রভৃতি প্রগতিশীল পত্রিকা এগিয়ে আসে। ১৯২৭ সালে নজরুলের কবিতা ও গানের সংকলন ফণি-মনসা এবং পত্রোপন্যাস বাঁধন হারা প্রকাশিত হয়।


১৯২৭ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি নজরুল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের প্রবক্তা মুসলিম সাহিত্য সমাজ-এর প্রথম বার্ষিক সম্মেলনে যোগদান করেন। ১৯২৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে নজরুল মুসলিম সাহিত্য সমাজ-এর দ্বিতীয় বার্ষিক সম্মেলনে যোগদানের জন্য পুনরায় ঢাকা আসেন। সেবার তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কাজী মোতাহার হোসেন, ছাত্র বুদ্ধদেব বসু, অজিত দত্ত এবং গণিতের ছাত্রী ফজিলাতুন্নেসার সঙ্গে পরিচিত হন। একই বছর জুন মাসে পুনরায় ঢাকা এলে সঙ্গীত চর্চাকেন্দ্রের রানু সোম (প্রতিভা বসু) ও উমা মৈত্রের (লোটন) সঙ্গে কবির ঘনিষ্ঠতা হয়। অর্থাৎ এ সময় পরপর তিনবার ঢাকায় এসে নজরুল ঢাকার প্রগতিশীল অধ্যাপক, ছাত্র ও শিল্পীদের সঙ্গে পরিচিত হয়ে ওঠেন। ওদিকে ১৯২৮ সালে কলকাতায় মওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ-র মাসিক মোহাম্মদী পত্রিকায় নজরুল-বিরোধিতা শুরু হয়, কিন্তু মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীনের সওগাত পত্রিকা বলিষ্ঠভাবে নজরুলকে সমর্থন করে। নজরুল সওগাতে যোগদান করে একটি রম্য বিভাগ পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। সওগাতে প্রকাশিত এক প্রবন্ধে আবুল কালাম শামসুদ্দীন নজরুলকে যুগপ্রবর্তক কবি ও বাংলার জাতীয় কবি হিসেবে আখ্যায়িত করেন।
নজরুল ১৯২৮ সালে গ্রামোফোন কোম্পানির সঙ্গে, ১৯২৯ সালে বেতার ও মঞ্চের সঙ্গে এবং ১৯৩৪ সালে চলচ্চিত্রের সঙ্গে যুক্ত হন। ১৯২৮ থেকে ১৯৩২ সাল পর্যন্ত তিনি এইচ.এম.ভি গ্রামোফোন কোম্পানির সঙ্গে সঙ্গীত-রচয়িতা ও প্রশিক্ষকরূপে যুক্ত ছিলেন। এইচ.এম.ভি-তে নজরুলের প্রশিক্ষণে প্রথম রেকর্ডকৃত তাঁর দুটি গান ‘ভুলি কেমনে’ ও ‘এত জল ও কাজল চোখে’ গেয়েছিলেন আঙ্গুরবালা। নজরুলের নিজের প্রথম রেকর্ড ছিল স্বরচিত ‘নারী’ কবিতার আবৃত্তি। নজরুল কলকাতা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রথম অনুষ্ঠান প্রচার করেন ১৯২৯ সালের ১২ নভেম্বর সান্ধ্য অধিবেশনে। ১৯২৯ সালে মনোমোহন থিয়েটারে প্রথম মঞ্চস্থ শচীন্দ্রনাথ সেনগুপ্তের রক্তকমল নাটকের জন্য নজরুল গান রচনা ও সুর সংযোজনা করেন। শচীন্দ্রনাথ ওই নাটকটি নজরুলকে উৎসর্গ করেন। ১৯৩০ সালে মঞ্চস্থ মন্মথ রায়ের চাঞ্চল্য সৃষ্টিকারী নাটক কারাগার-এ নজরুলের আটটি গান ছিল, নাটকটি একটানা ১৮ রজনী মঞ্চস্থ হওয়ার পর সরকার নিষিদ্ধ করে।

১৯২৯ সালের ১০ ডিসেম্বর কলকাতার এলবার্ট হলে বাঙালিদের পক্ষ থেকে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামকে এক বর্ণাঢ্য সংবর্ধনা দেওয়া হয়। তাতে সভাপতিত্ব করেন আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়, অভিনন্দন-পত্র পাঠ করেন ব্যারিস্টার এস ওয়াজেদ আলি, শুভেচ্ছা ভাষণ দেন বিশিষ্ট রাজনীতিক সুভাষচন্দ্র বসু (নেতাজী) এবং রায়বাহাদুর জলধর সেন। কবিকে সোনার দোয়াত-কলম উপহার দেওয়া হয়। এ সংবর্ধনা সভায় প্রফুল্লচন্দ্র রায় বলেছিলেন, ‘আমার বিশ্বাস, নজরুল ইসলামের কবিতা পাঠে আমাদের ভাবী বংশধরেরা এক একটি অতি মানুষে পরিণত হইবে।’ সুভাষচন্দ্র বসু বলেছিলেন, ‘আমরা যখন যুদ্ধ ক্ষেত্রে যাব তখন সেখানে নজরুলের যুদ্ধের গান গাওয়া হবে! আমরা যখন কারাগারে যাব, তখনও তাঁর গান গাইব।’
১৯২৯ সালের জানুয়ারি মাসে নজরুল চট্টগ্রাম সফরে আসেন এবং হবীবুল্লাহ বাহার ও শামসুন্নাহার ভাইবোনের আতিথ্য গ্রহণ করেন; বন্ধু কমরেড মুজফ্ফর আহমদের জন্মস্থান সনদ্বীপও ভ্রমণ করেন। ১৯২৮-২৯ সালে নজরুলের প্রকাশিত কবিতা ও গানের সংকলনের মধ্যে ছিল: সিন্ধু-হিন্দোল (১৯২৮), সঞ্চিতা (১৯২৮); বুলবুল (১৯২৮), জিঞ্জীর (১৯২৮) ও চক্রবাক (১৯২৯)। ১৯২৯ সালে কবির তৃতীয় পুত্র কাজী সব্যসাচীর জন্ম হয়, আর মে মাসে চার বছরের প্রিয়পুত্র বুলবুল বসন্ত রোগে মারা যায়। কবি এতে প্রচন্ড আঘাত পান। অনেকে বলেন এ মৃত্যু কবির জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। তিনি ক্রমশ অন্তর্মুখী হয়ে ওঠেন এবং আধ্যাত্মিক সাধনার দিকে ঝুঁকে পড়েন। বুলবুলের রোগশয্যায় বসে নজরুল হাফিজের রুবাইয়াৎ অনুবাদ করছিলেন, যা পরে রুবাইয়াৎ-ই-হাফিজ নামে প্রকাশিত হয়। ১৯৩০ সালে প্রকাশিত হয়েছিল নজরুলের রাজনৈতিক উপন্যাস মৃত্যুক্ষুধা, গানের সংকলন নজরুল-গীতিকা, নাটিকা ঝিলিমিলি এবং কবিতা ও গানের সংকলন প্রলয়-শিখা ও চন্দ্রবিন্দু। শেষোক্ত গ্রন্থটি বাজেয়াপ্ত এবং প্রলয়-শিখা-র জন্য নজরুলের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের ও গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়। ১৯৩০ সালের ১৬ ডিসেম্বর প্রকাশিত আদালতের রায়ে নজরুলের ছয় মাসের সশ্রম কারাদন্ডের আদেশ হয়, নজরুল হাইকোর্টে আপিল ও জামিন লাভ করেন। ইতোমধ্যে গান্ধী-আরউইন চুক্তির ফলে হাইকোর্ট কর্তৃক নজরুলের বিরুদ্ধে মামলা খারিজের আদেশ দেওয়া হয়, ফলে নজরুলকে দ্বিতীয়বার কারাবাস করতে হয় নি।
১৯৩১ সালের জুন মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে জুলাই মাসের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত নজরুল দার্জিলিং সফর করেন। রবীন্দ্রনাথও তখন দার্জিলিং-এ ছিলেন। তাঁর সঙ্গে নজরুলের সাক্ষাৎ হয়। এ বছর প্রকাশিত হয় নজরুলের উপন্যাস কুহেলিকা, গল্প-সংকলন শিউলিমালা, গানের স্বরলিপি নজরুল-স্বরলিপি এবং গীতিনাট্য আলেয়া। নজরুলের এ নাটকটি কলকাতার নাট্যনিকেতনে (৩ পৌষ ১৩৩৮) প্রথম মঞ্চস্থ হয়। এতে গানের সংখ্যা ছিল ২৮টি। ওই বছর নজরুল আরও যেসব নাটকের জন্য গান রচনা ও সুরারোপ করেন সেসবের মধ্যে ছিল যতীন্দ্রমোহন সিংহের ধ্রুবতারা উপন্যাসের নাট্যরূপের চারটি গান (কেবল সুর সংযোজন), মন্মথ রায়ের সাবিত্রী নাটকের ১৩টি গান (রচনা ও সুরারোপ)। ১৯৩২ সালে কলকাতা বেতার থেকে প্রচারিত মন্মথ রায়ের মহুয়া নাটকের গানগুলির রচয়িতাও ছিলেন নজরুল।
১৯৩২ সালের নভেম্বর মাসে নজরুল সিরাজগঞ্জে বঙ্গীয় মুসলমান তরুণ সম্মেলনে এবং ২৫ ও ২৬ ডিসেম্বর কলকাতা এলবার্ট হলে বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সম্মেলনে যোগদান করেন। সম্মেলনের সভাপতি কবি কায়কোবাদ নজরুলকে মাল্যভূষিত করেন। ১৯৩২ সালে নজরুলের প্রকাশনার মধ্যে সবগুলিই ছিল গীতিসংকলন, যেমন: সুর-সাকী, জুলফিকার ও বন-গীতি।

১৯৩২-৩৩ সাল এক বছর নজরুল এইচ.এম.ভি ছেড়ে মেগাফোন রেকর্ড কোম্পানির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিলেন। এ কোম্পানির রেকর্ড করা প্রথম দুটি নজরুলসঙ্গীত ছিল ধীরেন দাসের গাওয়া ‘জয় বাণী বিদ্যাদায়িনী’ ও ‘লক্ষ্মী মা তুই’। ১৯৩৩ সালে নজরুল এক্সক্লুসিভ কম্পোজাররূপে এইচ.এম.ভি-তে পুনরায় যোগদান করেন। এ সময় তাঁর অনেক গান রেকর্ড হয়। ১৯৩৩ সালে নজরুল তিনটি মূল্যবান অনুবাদ-কর্ম সমাপ্ত করেন: রুবাইয়াৎ-ই-হাফিজ, রুবাইয়াৎ-ই-ওমর খৈয়াম এবং কাব্য আমপারা।
রেকর্ড, বেতার ও মঞ্চের পর নজরুল ১৯৩৪ সালে চলচ্চিত্রের সঙ্গে যুক্ত হন। তিনি প্রথমে যে ছায়াছবির জন্য কাজ করেন সেটি ছিল গিরিশচন্দ্র ঘোষের কাহিনী ভক্ত ধ্রুব (১৯৩৪)। এ ছায়াছবির পরিচালনা, সঙ্গীত রচনা, সুর সংযোজনা ও পরিচালনা এবং নারদের ভূমিকায় অভিনয় ও নারদের চারটি গানের প্লেব্যাক নজরুল নিজেই করেন। ছবির আঠারোটি গানের মধ্যে সতেরোটির রচয়িতা ও সুরকার ছিলেন নজরুল। এ ছাড়া তিনি আর যেসব চলচ্চিত্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিলেন সেগুলি হলো: পাতালপুরী (১৯৩৫), গ্রহের ফের (১৯৩৭), বিদ্যাপতি (বাংলা ও হিন্দি ১৯৩৮), গোরা (১৯৩৮), নন্দিনী (১৯৪৫) এবং অভিনয় নয় (১৯৪৫)। বিভিন্ন ছায়াছবিতে ১৯৪৫ সালের মধ্যে ব্যবহূত নজরুলসঙ্গীতের সংখ্যা প্রায় অর্ধশত। চলচ্চিত্রের মতো মঞ্চনাটকের সঙ্গেও নজরুল ত্রিশের দশকে সম্পৃক্ত ছিলেন। ১৯২৯ থেকে ১৯৪১ সালের মধ্যে কলকাতার বিভিন্ন মঞ্চে নিজের রচিত দুটি নাটক আলেয়া ও মধুমালা সহ প্রায় ২০টি মঞ্চ নাটকের সঙ্গে নজরুল যুক্ত ছিলেন এবং সেসবে প্রায় ১৮২টি নজরুলসঙ্গীত অন্তর্ভুক্ত ছিল। এরূপ কয়েকটি নাটক হলো: রক্তকমল, মহুয়া, জাহাঙ্গীর, কারাগার, সাবিত্রী, আলেয়া, সর্বহারা, সতী, সিরাজদ্দৌলা, দেবীদুর্গা, মধুমালা, অন্নপূর্ণা, নন্দিনী, হরপার্বতী, অর্জুনবিজয়, ব্ল্যাক আউট ইত্যাদি। ১৯৩৪ সালে নজরুল-প্রকাশনার সবই ছিল সঙ্গীত-বিষয়ক, যেমন: গীতি-শতদল ও গানের মালা গীতিসংকলন এবং সুরলিপি ও সুরমুকুর স্বরলিপি সংগ্রহ।
১৯৩৯ সালের অক্টোবর মাস থেকে নজরুল কলকাতা বেতারের সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত হন এবং তাঁর তত্ত্বাবধানে অনেক মূল্যবান সঙ্গীতানুষ্ঠান প্রচারিত হয়। অনুষ্ঠানগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল ‘হারামণি’, ‘মেল-মিলন’ ও ‘নবরাগমালিকা’। ১৯৩৯ থেকে ১৯৪২ সালের মধ্যে নজরুল বিশিষ্ট সঙ্গীতজ্ঞ সুরেশচন্দ্র চক্রবর্তীর সহযোগিতায় কলকাতা বেতার থেকে অনেক রাগভিত্তিক ব্যতিক্রমধর্মী সঙ্গীতানুষ্ঠান পরিবেশন করেন, যা ছিল নজরুলের সঙ্গীতজীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ১৯৩৯ সালে নজরুল বেতারের সঙ্গে বিশেষভাবে জড়িত থাকলেও এইচ.এম.ভি, মেগাফোন, টুইন ছাড়াও কলম্বিয়া, হিন্দুস্থান, সেনোলা, পাইওনিয়ার, ভিয়েলোফোন প্রভৃতি থেকেও নজরুলসঙ্গীতের রেকর্ড প্রকাশিত হয়। ১৯৫০ সালের মধ্যে নজরুলের এইচ.এম.ভি থেকে ৫৬৭টি, টুইন থেকে ২৮০টি, মেগাফোন থেকে ৯১টি, কলম্বিয়া থেকে ৪৪টি, হিন্দুস্থান থেকে ১৫টি, সেনোলা থেকে ১৩টি, পাইওনিয়ার থেকে ২টি, ভিয়েলোফোন থেকে ২টি এবং রিগ্যান থেকে ১টি মিলে প্রায় সহস্রাধিক গানের রেকর্ড প্রকাশিত হয়। সব মিলে নজরুলের গানের সংখ্যা দ্বিসহস্রাধিক।

১৯৪১ সালের ৭ আগস্ট (২২ শ্রাবণ ১৩৪৮) রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুতে শোকাহত নজরুল তাৎক্ষণিকভাবে রচনা করেন ‘রবিহারা’ ও ‘সালাম অস্তরবি’ কবিতা এবং ‘ঘুমাইতে দাও শ্রান্ত রবিরে’ শোকসঙ্গীত। ‘রবিহারা’ কবিত্র্রা নজরুল স্বকণ্ঠে আবৃত্তি করেন কলকাতা বেতারে, গ্রামোফোন রেকর্ডে। ‘ঘুমাইতে দাও’ গানটিও কয়েকজন শিল্পীকে নিয়ে স্বকণ্ঠে গেয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর বছরখানেকের মধ্যেই নজরুল নিজেও অসুস্থ এবং ক্রমশ নির্বাক ও সম্বিতহারা হয়ে যান। দেশে ও বিদেশে কবির চিকিৎসার ব্যবস্থা হয় বটে, কিন্তু কোনো সুফল পাওয়া যায় নি। ১৯৪২ সালের জুলাই থেকে ১৯৭৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত দীর্ঘ ৩৪টি বছর কবির এ অসহনীয় নির্বাক জীবনকাল অতিবাহিত হয়।
ভারত সরকারের অনুমতিক্রমে ১৯৭২ সালের ২৪ মে কবিকে সপরিবারে স্বাধীন বাংলাদেশে আনা হয়। বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে কবির অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৭৪ সালের ৯ ডিসেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এক বিশেষ সমাবর্তনে কবিকে সম্মানসূচক ডি.লিট উপাধিতে ভূষিত করে। ১৯৭৬ সালের জানুয়ারি মাসে নজরুলকে বাংলাদেশ সরকার বাংলাদেশের নাগরিকত্ব প্রদান এবং ২১ ফেব্রুয়ারি ‘একুশে পদকে’ ভূষিত করে। ২৯ আগস্ট ১৯৭৬ (১২ ভাদ্র ১৩৮৩) ঢাকার পিজি হাসপাতালে কবি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মসজিদের উত্তর পার্শ্বে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত করা হয় বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামকে।

১৮৯৯ খ্রিস্টাব্দের ২৫ মে, ১৩০৬ বঙ্গাব্দের ১১ জ্যৈষ্ঠ ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার আসানসোল মহকুমার চুরুলিয়া গ্রামে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। পিতামহ কাজী আমিন উল্লাহর পুত্র কাজী ফকির আহমদের দ্বিতীয় স্ত্রী জাহেদা খাতুনের ষষ্ঠ সন্তান এই বিদ্রেহী কবি। তার বাবা ফকির আহমদ ছিলেন স্থানীয় মসজিদের ইমাম এবং মাযারের খাদেম।

১৯৭১-এ স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম। বাহাত্তরের মে মাসে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ইন্দিরা গান্ধীর কাছে আবেদন জানালেন, কবির তিয়াত্তরতম জন্মদিনটি তাঁরা উদযাপন করতে চান স্বাধীন বাংলাদেশে। নজরুল সেই যে বাংলাদেশে গেলেন আর তাঁর ভারতে ফেরা হল না। 

তাঁর দেখভালের সুন্দর ব্যবস্থা করলেন বঙ্গবন্ধু। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে তো ১৯৭৫ সালের জানুয়ারি মাসে তাঁকে নাগরিকত্বই দেওয়া হল। অবশ্য পরে ধানমণ্ডির সুরম্য বাড়ি থেকে তাঁকে শেষ পর্যন্ত হাসপাতালের কেবিনে সরানো হল। কবির পাশে তখন ছিলেন না আপনজন কেউই। কবির মৃত্যুর পরে তাঁর দেহ সমাহিত করা হল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণবর্তী মসজিদ সংলগ্ন কবরস্থানে। 

মনে রাখা হল তাঁর সেই বিখ্যাত চরণ: ---

‘মসজিদেরই পাশে আমায় কবর দিও ভাই / 
যেন গোরে থেকেও মোয়াজ্জিনের 
আজান শুনতে পাই।’ 

কিন্তু মনে রাখা হল না, কবিপত্নী তাঁর প্রিয়তমা পত্নী প্রমীলার সমাধির পাশে যেন তাঁকে সমাহিত করা হয় বলে গিয়েছিলেন। কবির শেষ মুহূর্তে তাঁকে শেষ দেখা দেখতে পেলেন না তাঁর জ্যেষ্ঠপুত্র কাজি সব্যসাচী। বিমানের গোলযোগে তাঁর পৌঁছবার আগেই সমাহিত করা হল বাংলাদেশের জাতীয় কবিকে। 

বুঝি ঘটনা পরম্পরা লক্ষ্য করে এই অভিমানেই যে-অন্নদাশঙ্কর ১৯৪৯-এ লিখেছিলেন,

 ‘ভুল হয়ে গেছে বিলকুল/ 
আর সব কিছু ভাগ হয়ে গেছে/
 ভাগ হয়নিকো নজরুল’, 

তিনিই আবার  ছিয়াত্তর সালে লিখলেন, 

‘হায় কী বেদন!/ 
হায় কী রোদন!/ 
সন্তান অভাগার/ 
পিতার কবরে একমুঠো মাটি/ 
দেওয়া হল না কো আর।/ 
কেউ জানল না ইতিহাসে ফের/ 
ভুল হয়ে গেছে বিলকুল/ 
এতকাল পরে ধর্মের নামে/ 
ভাগ হয়ে গেল নজরুল।’ 

এ নজরুলের অন্তিম পর্বের ইতিহাস। কবির অশক্ত শরীর নিয়ে দুই দেশের মধ্যে মধ্যে অধিকারের টানাপোড়েন। কিন্তু কবিসত্তার নিরিখে দুই বাংলাতেই নজরুলচর্চা অব্যাহত। সেই নজরুল সাহিত্যের মৌলবাদী সংশোধনবাদীরাও আজ আর নেই। সংকীর্ণ ধর্মীয় পরিচয়ের বেড়াজালে নয়, নজরুলকে উত্তরকালের বাংলা গ্রহণ করেছে তাঁর সমগ্র কবিসত্তায়। তাই জন্যই বুঝি অন্নদাশঙ্করের ১৯৪৯-এর লাইনটিই প্রবাদপ্রতিম হয়ে আম বাঙালির কানে-মনে বসে গেছে আর ছিয়াত্তরের লাইনগুলি ভুলে গিয়ে বুঝি ভালোই হয়েছে!

গ্রন্থঋণ :----

 ১.নজরুল-জীবনী - অরুণকুমার বসু
(৬০০.০০), আনন্দ. 

২. ও অন্যান্য

Popular posts from this blog

*সংক্ষিপ্ত কালী সংহিতা**.........প্রসূন কাঞ্জিলাল।* সনাতন ধর্মমতে কালী বা কালিকা হচ্ছেন শক্তির দেবী। কাল শব্দটির অর্থ সময় হতে পারে, আবার এটা রঙও বুঝাতে পারে। কাল তথা কৃষ্ণবর্ণ, এর অর্থ হতে পারে মৃত্যুবোধক। যেমন আমরা বলি- ‘কাল’এসে গেছে, মৃত্যুর সময় সমাসন্ন, মহাকাল এসে গেছে। দেবীর নাম মহাকালীও বটে। কালীর নাম কাল না হয়ে কালী হলো এ কারণে যে শিবের অপর নাম কাল, যা অনন্ত সময়কাল বোধক। কালী হচ্ছে কাল-এর স্ত্রীলিঙ্গ বোধক। মা কালী মা দুর্গা বা পার্বতী’র সংহারী রূপ। ঊনবিংশ শতাব্দীর সংস্কৃত ভাষার বিখ্যাত অভিধান শব্দকল্পদ্রুম এ বলা হচ্ছে ‘কাল শিবহ্। তস্য পত্নতি কালী।’ অর্থাৎ শিবই কাল বা কালবোধক। তাঁর পত্নী কালী। কালী হচ্ছেন মা দুর্গার বা পার্বতীর অপর ভয়াল রূপ। তিনি সময়ের, পরিবর্তনের, শক্তির, সংহারের দেবী। তিনি কৃষ্ণবর্ণা বা মেঘবর্ণা এবং ভয়ংকরী। সনাতন ধর্মাবলম্বীরা ভয়ংকরেরও পূজা করেন। তিনি অশুভ শক্তির বিনাশ করেন। তাঁর এই শক্তির পূজা সনাতন সমাজকে প্রভাবিত করেছে, বিশুদ্ধ শক্তি সঞ্চারিত করেছে, অন্তর শুদ্ধি দিয়েছে, দুর্দিনের দুর্বলতায় সাহস দিয়েছে। শাক্ত সৃষ্টিতত্ত্ব মতে এবং শাক্ত-তান্ত্রিক বিশ্বাস মতে তিনিই পরম ব্রহ্ম। কালীকে এই সংহারী রূপের পরেও আমরা মাতা সম্বোধন করি। তিনি সন্তানের কল্যাণ চান, তিনি মঙ্গলময়ী, তিনি কল্যাণী--- এটাই তাঁর প্রতি সনাতন ধর্মীয় বিশ্বাসের মূল আস্থা ও নির্যাস। একটা ধারণা আমাদের মধ্যে বর্তমান আছে যে, শিব পার্বতীর স্বামী এবং মা কালীর ভাসুর। কথাটি আদৌ সত্য নয়। অসুররক্ত স্নাত কোপান্বিতা এই দেবীর সংহারী মূর্তিতে কিছুটা নিবৃত্ত ও প্রশমিত করতে শিব তাঁর চলার পথে শুয়ে থাকলেন। দেবী পথ চলতে গিয়ে তাঁর স্বামী শিবকে পায়ে মাড়ালেন। এই পাদস্পৃষ্ঠতার লজ্জায় ও তার অনুশোচনায় মায়ের জিহ্বায় কামড় পড়লো। তাঁর কোপভাব স্থিমিত হলো, ছেদ পড়লো।কালীকে যদি বলি কল্পনা, তবে সেই কল্পনাও ধর্মে বর্ণিত হয়েছে বর্তমান বিজ্ঞানের ধারণার হাজার হাজার বছর আগে। এ কথা বিজ্ঞান প্রথমতঃ স্বীকার করে যে, সৃষ্টির আদি যুগে অনন্ত ব্রহ্মা- ছিল নিকষ কালো অন্ধকারে নিমজ্জিত, নিশ্ছিদ্র তমসায় আবৃত, অনন্ত সৃষ্টিতে তখনো আলোর সৃষ্টি হয়নি। রবি শশী তারা বা কোন আলোকবর্তিকা তখনো ছিলনা। বিজ্ঞান মতে আলোর সৃষ্টির আগে অন্ধকার ছিল। এ বর্ণনায় কান পেতে শুনলে আমরা দেখি কৃষ্ণবর্ণা মা কালী সেই যুগের প্রতিনিধিত্ব করছেন। ধর্ম ও বিজ্ঞানের এখানে অপূর্ব সমন্বয় ঘটেছে। দ্বিতীয়তঃ বিজ্ঞানের ‘বিগ্ ব্যাংগ্ তত্ত্ব’ মতে কাল বা সময় তখন সবে মাত্র সৃষ্টি হয়েছে, কাল্ বা সময় যখন সৃষ্টি হলো তথা যে দিন ভূমিষ্ঠ হলো, সেদিন নির্ধারিত হলো সেই কালেরও শেষ আছে, সংহার আছে। বিশ্ব ব্রহ্মা- সৃষ্টি যখন হয়েছে সময় এলে তা ধ্বংসও হবে। তার লয়ও অবশ্যম্ভাবী। কালী এই সংহারের প্রতিভূ, তিনি কাল এর জীবন্তকালের সীমারেখার নির্ধারণকৃত। তৃতীয়তঃ বিজ্ঞানীরা সৃষ্টির প্রথম যুগের মহাবিশ্বের যে বর্ণনা দেন তা ভয়াল ভীষণ, তার মধ্যে সৃষ্টির চাইতে ধ্বংসই বেশী। প্রবল সংহারের মধ্যে দিয়ে অনন্ত ব্রহ্মার সৃষ্টি। মা কালী সেই সংহারের প্রতিভূ তিনি ভয়াল দর্শনা সংহারের দেবী। সৃষ্টির সেই ক্রমবিকাশের যুগেই মা কালী মা জগজ্জননী প্রবল সংহারের মধ্যে দিয়েই তাঁর সৃষ্টি ও তাঁর কল্যাণময় রূপকে আমাদের কাছে তুলে ধরেছেন। মা কালী যুগপৎ কাল, কৃষ্ণবর্ণ এবং সংহারের দেবী। কিছুই ছিল না, তখন দেবী ছিলেন। এই মাতৃপূজা তথা মাতৃমূর্তি হিন্দুধর্মের আদিকথা।অথর্ব বেদ-এ কালীর উল্লেখ থাকলেও বিশেষ হিসেবে কথক গ্রাহ্য সূত্রে (১৯.৭) প্রথমবার কালীর উল্লেখ ঘটে। কালী অগ্নিদেবের সাতটি জিহ্বার একটি নাম, অগ্নিদেব হচ্ছেন আগুনের ঋগ্বেদীয় দেবতা যার উপস্থিতি মুণ্ডুক উপনিষদে বর্তমান; তবে এখানে কালী বলতে দেবী কালীকেই উল্লেখ করা হয়েছে এটা নির্ণীত করা কঠিন। কালী’র বর্তমান রূপের উপস্থিতি আমরা পাই মহাভারতের সুপ্তিকা পার্বণে, যেখানে তিনি কালরাত্রি হিসেবে অভিহিতা, যিনি পাণ্ডব সৈন্যদের স্বপ্নে দৃশ্যমান এবং পরে দ্রোণাচার্য পুত্র অশ্বত্থামা যখন তাদের আক্রমণ করলেন তখন তিনি প্রকৃত স্বরূপে আবির্ভূতা। মহাদেবী’র একটি শক্তি হিসেবে তিনি ষষ্ঠ শতাব্দীর ‘দেবী মাহাত্ম্যম’এ প্রসিদ্ধ, এবং ‘রক্তবীজ’ নামক অসুরকে পরাভূতকারী দেবী হিসেবে গুরুত্ব সহকারে উল্লেখিত। রক্তবীজকে নিশ্চিহ্ন করতে দেবী নরসিংহী, বৈষ্ণবী, কুমারী, মহেশ্বরী, ব্রাহ্মী, বরাহী, ঐন্দ্রী, চামু- বা কালী এই অষ্ট-মাতৃকা রূপে সংস্থিতা। দশম শতাব্দীর ‘কালিকা পুরাণে’ পরম সত্য হিসেবে কালীকে স্তুতি করা হয়। তবে ভিন্ন ও স্বতন্ত্র এক দেবী হিসেবে ষষ্ঠ শতাব্দীতে কালী প্রথম উল্লেখিতা। এবং এ সকল তন্ত্রে গ্রন্থে তিনি বহির্বৃত্তে বা প্রান্তিক সীমায় বা যুদ্ধ ক্ষেত্রে স্থিতা বা দণ্ডায়মানা দেবী। অধিকাংশ ক্ষেত্রে তিনি শিবের শক্তিরূপে চিহ্নিতা, এবং বিবিধ পুরাণে শিবের উপস্থিতির সঙ্গে তিনি ওতপ্রোতভাবে সম্পৃক্তা। কালিকা পুরাণে তাঁকে বলা হচ্ছে ‘আদি শক্তি’, তিনি প্রকৃতির সীমার বাইরেও অধিষ্ঠাত্রী ‘পরা প্রকৃতি’।১৬৯৯ শকাব্দে (১৭৭৭ খ্রীষ্টাব্দে) কাশীনাথ বিরচিত ‘শ্যামাসপর্যায়বিধি-তে এ পূজার সর্বপ্রথম উল্লেখ লক্ষণীয়। পূজার প্রমাণস্বরূপ এ গ্রন্থে পুরাণ ও তন্ত্রের বচন উল্লেখিত। সপ্তদশ শতাব্দীতে বলরাম বিরচিত কালিকা মঙ্গলকাব্যে একটি বাৎসরিক ধর্মীয় অনুষ্ঠান কালীকে নিবেদিত এই মর্মে উল্লেখিত। অষ্টাদশ শতাব্দীতে নবদ্বীপের রাজা কৃষ্ণচন্দ্র বাংলায় প্রথম কালীপূজার প্রবর্তন করেন। ঊনবিংশ শতাব্দীতে কালীপূজা বাংলায় বিশেষ প্রাধান্য লাভ করে। রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের পৌত্র ঈশানচন্দ্র এবং কলকাতার সমাজের বিত্তবান ও উচ্চশ্রেণীর লোকজনের মধ্যে এ পূজার প্রচলন বৃদ্ধি পায়। ক্রমে দুর্গা পূজার সাথে সাথে কালী পূজাও বিশেষত বাংলায় একটি প্রধান হিন্দু ধর্মীয় উৎসবে পরিণত হয়। পরে এবিষয়ে বিস্তারিত আলোচনায় আসা যাবে।শিবের উপর দণ্ডায়মানা কেন, তার তিনটি ব্যাখ্যা বর্তমান এর একটি প্রচলিত কাহিনী, একটি পৌরাণিক, অন্যটি তান্ত্রিক ব্যাখ্যা। এটা বলা হয়ে থাকে যে শক্তি ছাড়া শিব হচ্ছে শব। শিবের উপর দন্ডায়মানা কালী এটাই বুঝায় যে শক্তি বাদ দিলে বস্তু মৃতমাত্র। পৌরাণিক ব্যাখ্যা মতে, পার্বতী একদিন স্বামীকে প্রশ্ন করলেন তার দশটি রূপের মধ্যে কোনটি শিবের পছন্দ ? বিস্মিত পার্বতী শুনলেন, কালীর ভয়াল মূর্ত্তিতেই শিবের সাচ্ছন্দ্য। এই ধারণাটি দেবী ভাগবত পুরাণে ব্যাখ্যা করা আছে। দ্বাদশ থেকে পঞ্চদশ শতাব্দীর ভক্তিমূলক শ্যামাসঙ্গীতেও মায়ের বর্তমান রূপের এই ধারণাটি গুরুত্ব পেয়েছে। তান্ত্রিক পদ্ধতিতে তাঁর ভয়াল রূপ সত্ত্বেও রাত দুপুরে শ্মশানে তাঁর মুখোমুখি হওয়ার সাহস অর্জন এবং অন্যদিকে তাঁর প্রতি বাঙালিদের শিশুর মতো শর্তহীন ভালবাসা উভয় ক্ষেত্রে মৃত্যুর সঙ্গে পরিচিত হওয়া ও তাকে মেনে নেওয়াই মুখ্য কাজ।দুর্গার মতো কালীও সাধারণ সর্বজনীন হিসেবে বিবেচিত। সবচেয়ে সরাসরি বহুল ভাবে তিনি পূজিতা হন মহাকালী বা ভদ্রকালী রূপে। আদি পরাপ্রকৃতি (দেবী দুর্গা) অথবা ভাগ্যবতীর দশমহাবিদ্যা রূপের একটি রূপে কালী পূজিতা হন। দেবী বন্দনার এই স্তোত্রকে বলা হয় দেবী অর্গলা স্তোত্রম্ যা নিম্নরূপঃ'‘ওঁ জয় ত্বং দেবী চামুণ্ডে জয় ভূত অপহারিণি।জয় সর্বগতে দেবী কালরাত্রি নমোহস্তুতে।। ১জয়ন্তী মঙ্গলা কালী ভদ্রকালী কপালিনী।দুর্গা শিবা ক্ষমা ধাত্রী স্বাহা স্বধা নমোহস্তুতে।। ২’'আবার 'শ্রী শ্রী চন্ডী'-র একাদশ অধ্যায় তথা উত্তর-চরিত্র, 'নারায়ণীস্তুতি'-র দশম শ্লোক অনুযায়ী,"সর্বমঙ্গলা মঙ্গল্যে শিবে সর্বার্থসাধিকে। শরণ্যে ত্র্যম্বকে গৌরী নারায়নী নমহোস্তুতে।।১০"যা উপরে বর্ণিত একই ব্যঞ্জনার দ্যোতক।মধ্যযুগের শেষের দিকে বাঙালীর ভক্তিমূলক সাহিত্যে কালী ব্যাপক স্থান নিয়ে বিরাজমান। সাধক রামপ্রসাদ সেন(১৭১৮-১৭৭৫) এর মতো কালীভক্ত উপাসকরা কালীকে নিয়ে রচনা করেছেন অসংখ্য ভক্তিমূলক গান। অথচ শিবপত্নী হিসেবে পার্বতীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হয়ে নানা কাহিনীতে উচ্চারিত হওয়া ছাড়া কালীকে অষ্টাদশ শতাব্দীর আগে বাঙালীর ঘরে ঘরে আবাহনী গেয়ে পূজিত হতে কদাচিৎ দেখা গেছে। আর বাঙালির ঘরে তাঁর ভয়াল রূপের বর্ণনা, বৈশিষ্ট, অভ্যাসসমূহ উল্লেখযোগ্য কোন রূপান্তর ঘটেনি। বাংলাদেশে অনেক কালী মন্দির আছে। এর অনেকগুলোই সুপ্রাচীন। অধুনা লুপ্ত ঢাকার রমনা কালী মন্দির তেমনি একটি পুরাতন কালী মন্দির। ব্রহ্মযামলে উল্লেখ আছে ‘কালিকা বঙ্গদেশে চ’, অর্থাৎ, ‘বঙ্গদেশে দেবী কালিকা বা কালী নামে পূজিতা হন।’ নানা রূপে নানা স্থানে কালী পূজিতা হন, যেমন দক্ষিণাকালী, শ্মশানকালী, ভদ্রকালী, রক্ষাকালী গুহ্যকালী, মহাকালী, চামুণ্ডা ইত্যাদি নামে মাহাত্ম্যে এ কালীর মধ্যে কিছু কিছু ভিন্নতা বর্তমান। অন্যদিকে বিভিন্ন মন্দিরে দশমহাবিদ্যা ব্রহ্মময়ী, ভবতারিণী, আনন্দময়ী, করুণাময়ী ইত্যাদি নামে কালী’র পূজা হয়। চট্টগ্রাম শহরের চট্টেশ্বরী শ্রী কালীবাড়ী, গোলপাহাড় শ্মশান কালীবাড়ী, দেওয়ানহাটের দেওয়ানেশ্বরী কালীবাড়ী,সদরঘাট কালীবাড়ী, পটিয়া পিঙ্গলা কালীবাড়ী, ধলঘাট বুড়াকালীবাড়ী সহ চট্টগ্রামে অনেক প্রসিদ্ধ কালী মন্দির বর্তমান। এছাড়াও আসামের কামরূপ কামাখ্যা দেবীর পূজাও বিশেষ প্রসিদ্ধ। এর প্রায় প্রত্যেকটিতে প্রত্যেক শনি ও মঙ্গলবার এবং অমাবস্যায় কালীপূজা হয়। কার্ত্তিক মাসের অমাবস্যা তিথিতে দীপান্বিতার দিন কালীপূজা বিশেষভাবে পালিত হয়।সর্বজনীন মণ্ডপে যেখানে দুর্গাপূজা হয় সেখানে অধিকাংশ মণ্ডপে কালীপূজাও হয়ে থাকে। অনেক কালীসাধক বিখ্যাত এবং শ্রদ্ধার্হ। শ্রীরামকৃষ্ণ কালীর উপাসক ছিলেন। স্বামী বিবেকানন্দও কালীর ভক্ত ছিলেন। কালী প্রশস্তিমূলক গান তথা শ্যামাসঙ্গীত বাংলা গানের একটি ভিন্ন ধারা। কালীসাধক রাম প্রসাদ সেন, কমলাকান্ত ভট্টাচার্য এ ধারায় অন্যতম অবদান রাখেন। দ্বিজেন্দ্রলাল রায় এবং কাজী নজরুল ইসলামও এ ধারার উৎকৃষ্ট মানের গান রেখে গেছেন। নিরক্ষর শ্রীরামকৃষ্ণ দেবী কালী সচেতনতায় সিক্ত হয়ে অনবদ্য বাণী উচ্চারণ করতেন যা শ্রী'ম রচিত অমর গ্রন্থ ‘রামকৃষ্ণ কথামৃত’তে স্থান পেয়েছে। ‘মৃত্যুরূপা কালী’, দেবী কালীকে নিয়ে আছে স্বামী বিবেকানন্দ রচিত একটি বিখ্যাত সুদীর্ঘ কবিতা। ভগিনী নিবেদিতা মাতৃরূপা কালী নামক একটি কালী বিষয়ক গ্রন্থ রচনা করেছিলেন।দীপাবলী বা দীপান্বিতা বা কার্ত্তিকী অমাবস্যায় অনুষ্ঠিত কালীপূজা উপলক্ষে দেবী মূর্তির দক্ষিণা কালীর অবয়বে তৈরী হয়, এক্ষেত্রে দেবী বৈশিষ্ট হচ্ছে দেবী করালবদনা, কৃষ্ণবর্ণা, নীলবর্ণা বা মহামেঘবর্ণা। দেবী আলুলায়িত কেশা। রামপ্রসাদী গানে ভক্তিভরে মাকে বলা হচ্ছে,‘…এলোকেশী সর্বনাশী..’,মা এলোকেশী, রক্তচক্ষু, লোল জিহ্বা, চতুর্ভূজা, নৃমুণ্ড-মালিনী,, নরহস্তের কোমরবন্ধ, বাম ঊর্ধ্ব করে উন্মুক্ত খড়্গ এবং অধো হস্তে নরমুণ্ড, দক্ষিণ করদ্বয়ে বর ও অভয়মুদ্রা। দক্ষিণা কালীর দক্ষিণ পা শিববক্ষে স্পর্শমান, বাম পা খানিকটা দূরত্বে। স্বামীর গায়ে পা পড়ায় অসুর-রক্ত পানে সিক্ত জিহ্বায় কামড়। ত্রিনয়নী মা অসুর হত্যার মহাঘোরে হাস্যরতা ও ভয়াল দর্শনা। মায়ের গলায় নৃমুণ্ড মালায় সাধারণত ১০৮টি অথবা ৫১ টি নরমুণ্ড বর্তমান। ১০৮ হিন্দুদের জন্য একটি পবিত্র সংখ্যা, দেবনাগরী বর্ণমালায় সর্বসমেত ৫১টি বর্ণ আছে। হিন্দুদের বিশ্বাস সংস্কৃত একটি চলমান জীবন্ত ভাষা এবং এর ৫১ টি বর্ণমালায় অপার শক্তি নিহিত আছে।মায়ের কোন চিরস্থায়ী গুণ বা প্রকৃতি নেই, যার মানে দাঁড়ায় বিশ্ব-প্রকৃতি ধ্বংসের পরেও তিনি বর্তমান থাকবেন। হিন্দু শাস্ত্রে পূজিতা দেবীদের মধ্যে কালীর রূপ ও চরিত্র সর্বাধিক রোমাঞ্চকর ও বিস্ময় উদ্রেককারী। ঘোর অমাবস্যার গভীর রাতে তাঁর পূজা সম্পন্ন হয়। কালী ভীষণ দর্শনা, ক্রোধান্বিতা, লজ্জাহীনা। কালী ভয়ঙ্কর যোদ্ধা, রক্তপিয়াসী। কালী চির ব্যতিক্রমী। ঐশী সংযোগ সত্ত্বেও এক দীর্ঘকালীন উপেক্ষার আখ্যান। তবে দুর্বল, দ্বিধান্বিত মন যখনই শক্তি প্রার্থনা করেছে, বল ভিক্ষা করেছে, ওই করাল বদনা মহাতেজার শরনাপন্ন হয়েছে। ঘোর আমানিশায় জনমানবহীন মধ্যরাতের নিভৃত পূজাতেই ছিল তাঁর অধিকার। কোনো ক্ষেত্রে সূর্যের আলো স্পর্শ ও ছিল নিষিদ্ধ। হাজার বছরের বিমুখতা অতিক্রম করে আজকের দীপাবলী উৎসবে যথেষ্ট ধূমধাম সহযোগে তাঁর উপাসনা হয়ে থাকে। তবে বাঙালীর উৎসবমুখীতাই যে এই পূজার জনপ্রিয়তার অংশত কারণ তাতে সন্দেহের অবকাশ নেই। কারণ বহু ধুমধাম সহযোগে সম্বৎসরের এই মাতৃ আরাধনা তথা শক্তি পূজা আমাদের সমাজে নারীর অবস্থান ও গ্রহণযোগ্যতাকে বিন্দু মাত্র প্রভাবিত করে না। বর্তমান সময়ের দীপান্বিতা উৎসব যদি মোহনা হয়, তবে এই তরঙ্গিনীর উৎস সম্পর্কে আগ্রহ স্বাভাবিক। এই অনুসন্ধান সহজ নয়। কালের প্রবাহে উপনদীর মতো অসংখ্য উপগাথা এসে মিশে গেছে মূল তথ্যে - আজ তাদের পৃথক করা বেশ কঠিন কাজ। অনেক সময়ই অসম্ভব। তবে প্রতিটি অংশই অতীব চিত্তাকর্ষক তাতে সন্দেহ নেই। পুরান তথা বিভিন্ন সাহিত্য থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী কালীর বর্তমান রূপ পরিগ্রহে সময় লেগেছে অন্তত দুই হাজার বছর। কালীর বৈদিক পরিচয় অথর্ব বেদের সুত্রে। এই বেদে প্রথম কালীর স্বরূপ প্রকাশিত হয়। তবে মার্কণ্ডেয় পুরাণ, কালিকা পুরাণ ইত্যাদিতেও কালীর উল্ল্যেখ পাওয়া যায়। মহাভারতের সৌপ্তিক পর্বে কালরাত্রি নাম্নী এক দেবীর বর্ণনা পাই। এই দেবী কালিকারই অন্য রূপ বলে উল্লিখিত হয়ে থাকে। উৎস খুঁজতে গিয়ে দেবী কালীর প্রথম পর্যায়ের সাথে অনার্য সম্বন্ধের সম্ভাবনা জোরালো ভাবে উঠে আসে। হরপ্পা - মহেঞ্জদরো সভ্যতায় মাতৃ পূজা প্রচলিত ছিল বলে জানা যায়। এই সভ্যতা ছিল মাতৃতান্ত্রিক। পূজিতা এই দেবীর সাথে দেবী কালিকার প্রভূত সাদৃশ্য পাওয়া যায়। আবার কেউ কেউ কালীকে আদিবাসি সম্প্রদায়ের দেবী রূপেও বর্ণনা করে থাকেন। সপ্তম - অষ্টম দশকের কিছু লেখায় এর উল্ল্যেখ আছে তবে ঈষৎ ভিন্ন ভাবে। যেমন বান ভট্টের নাটক কাদম্বরীতে দেবী চণ্ডীর উপাখ্যান পাওয়া যায়। ইনি শবর জাতির দ্বারা পূজিতা হতেন। সমকালীন কবি বাকপতি বিরচিত " গৌড় বহও " নামক প্রাকৃত ভাষায় রচিত কাব্য গ্রন্থে বিন্ধ্যবাসিনি নামে এক দেবীর কথা আছে যিনি ছিলেন শবরদের আরাধ্যা। তাঁর সাথে ও কালীর বিশেষ মিল পাওয়া যায়। মূল বর্ণনা অনুযায়ী এই দেবী ভীষণ দর্শনা, মুণ্ডমালিনী, প্রায় নগ্ন এক মূর্তি। খ্রিস্ট পূর্ব ৩০০ থেকে প্রায় ৬০০ খ্রিস্টাব্দ অবধি কালী মূলত যুদ্ধের দেবী রূপে পূজিতা হতেন। বৈদিক দেবী হলেও তৎকালীন সময়ে সনাতন হিন্দু ধর্মের মূল স্রোতে তিনি কিছুটা ব্রাত্যই ছিলেন। কালীর আরাধনা বিশেষত নিম্ন বর্ণ বা অবৈদিক সমাজেই বিশেষ জনপ্রিয় ছিল। নগরের বাইরে শ্মশানের কাছাকাছি অঞ্চলেই কালী মন্দিরের অবস্থান বেশি পরিলক্ষিত হয়। তবে ষষ্ঠ শতকের 'দেবী মাহাত্মম' রচনায় মহাকালী রূপে কালীর রূপ ও মাহাত্ম্যের বিস্তৃত বর্ণনা পাই। অশুভ বিনাশ করে ইনি শুভ শক্তির প্রতিষ্ঠা করেন। দেবী দুর্গার ললাট উৎপন্না মহা শক্তিশালিনী দেবী রূপে তিনি স্বীকৃতি পান। আবার স্বামী অভেদানন্দের মতে বৈদিক দেবী 'রাত্রি' পরবর্তীতে দেবি কালিকা হয়ে ওঠেন। তবে তন্ত্র সাধনার সাথে সুনিবিড় যোগাযোগ এক সুদীর্ঘ সময় কালীকে সাধারন মানুষের থেকে দূরে সরিয়ে রাখে। এক ভয় মিশ্রিত শ্রদ্ধা এর কারণ হয়তো। তবে পরবর্তীতে এই সম্পর্ক ধীরে ধীরে সহজ হয়। সতেরোশ খ্রিস্টাব্দ-উত্তর সময়ে কালী সাধনা এক অন্য রূপ পায়। ভয়াল ভয়ঙ্কর রক্ত পিপাসু দেবী, স্নেহময়ী মা হয়ে ওঠেন। সাধক রাম প্রসাদ, সাধক বামাখ্যাপা তথা শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংস দেবের ন্যায় কালী উপাসকেরা দেবী কালিকার ভবতারিণী মাতৃ রূপ পূজা প্রচার করেন। ক্রমশ এই রূপ সাধারন বাঙালী মনের কাছাকাছি আসে । বাঙালী হৃদয় আসনে তখন থেকেই তাঁর করুনাঘন অবস্থান।ব্রিটিশ শাসিত বাংলা তথা ভারতে কালী উপাসনা বিশেষ তাৎপর্য পূর্ণ হয়ে উঠেছিল। পরাধীন জাতির অন্তরের ক্ষোভ আর প্রতিবাদের উচ্চারণ কালীর দৃপ্ত ব্যক্তিত্বকে অনুসরন করতে চাইত। সশস্ত্র স্বাধীনতা সংগ্রামের অংশ হিসেবে শক্তি আরাধনা তথা কালী উপাসনার প্রচলনের বহু প্রমান পাওয়া যায়। কালীর তেজোময়ী, লড়াকু ভাবময়তা তৎকালীন বিপ্লবীদের মধ্যে যথেষ্ট জনপ্রিয়তা অর্জন করে। প্রখর নারী সত্ত্বা, যা ছিল উপেক্ষিত, বিপর্যয়ের ক্ষণে তা দৈবী স্বরূপে স্বীকৃত হয়। অপর কারণটি ছিল কালী সম্পর্কে শাসক জাতির অবহেলা মিশ্রিত আতঙ্ক ও ভয়। এই উগ্র ভয়াল প্রায় নগ্ন রূপ ব্রিটিশ মানসিকতাকে সজোরে আঘাত করে। রক্তপিপাসু এবং যৌনতার প্রতীক রূপেই কালীর পরিচয় হয়। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, শ্রীমৎ দক্ষিণাকালিকার ধ্যান মণ্ত্রে সর্বশেষ পঙ্ক্তির আগের পঙ্ক্তির অংশ বিশেষ ---".... মহাকালেন চ সমং বিপরীতরতাতুরাম ।।"অর্থাৎ, দেবী বিপরীত-রতাতুরা -- দেবীর ভৈরব মহাকাল। মহাকালের সাথে দেবী বিপরীত রতিতে সঙ্গতা হয়ে রয়েছেন। ( রতিকালে শায়িত পুরুষোপরি নারী আরোহণ করে ক্রীয়া নিষ্পন্ন করলে তাকে বিপরীত রতি বলে )। এক্ষেত্রে, ব্রক্ষ্মচৈতণ্যকে অধিষ্ঠান করে মায়াশক্তিরূপিণী কালী জগত সৃষ্টি করে চলেছেন। আর এখানেই প্রচ্ছন্ন ভাবে লুকিয়ে আছে যৌনতা ও সৃষ্টির পারস্পরিক মেলবন্ধন।কালীকে নিয়ে অবজ্ঞা ভাব তখনকার বহু বিদেশী বিদ্বদজনের মধ্যেও দেখা যায়। এমনকি পণ্ডিত ম্যাক্সমুলার ও কালীকে নিয়ে বিশেষ আগ্রহ দেখান নি। তবে পরবর্তীতে বিশেষত উনিশশো ষাট ও সত্তরের দশকে কালীর এই ব্যতিক্রমী স্ত্রী সত্ত্বা বহু গবেষণার মূল বিষয় হয়ে ওঠে। কালী শব্দের ব্যুৎপত্তি ও অর্থ সম্পর্কিত প্রচলিত ধারনা সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত উল্ল্যেখ ব্যতিরেকে এই আলোচনা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। কু ধাতুর উত্তরে অল্ + কর্তৃবাচ্যে অন্ যুক্ত হয়ে কাল পদটি হয়। এর অর্থ হলো মৃত্যু বা মহাকাল অর্থাৎ মহাদেব। এই কাল শব্দের উত্তরে স্ত্রীলিঙ্গে ঈপ্ প্রত্যয় যুক্ত হয় কালী শব্দটির সৃষ্টি হয়েছে। অর্থ হলো মহাকালের বিশেষ শক্তি কালী। দশমহাবিদ্যার ইনিই প্রথম মহাবিদ্যা। অনন্তকালের সৃষ্টিরুপিণী পরমা প্রকৃতির রূপ এই মহাশক্তি কালী। শ্রী শ্রী চণ্ডী মতে কালী তিনি, যিনি 'কাল' নিয়ন্ত্রন করেন। 'কাল' অর্থে সময়। বেদ তত্ত্ব অনুসারে তিনি আদি শক্তি - মহাকাল শিবের অর্ধাঙ্গিনী! শক্তি উপাসনা এ ক্ষেত্রে অনেকাংশেই পুরুষ তথা শিব নির্ভর। তবে তন্ত্র মতে কালীর দৈবী সত্ত্বা বহুলাংশে স্বাধীন ও একক। এই মতবাদ অনুযায়ী কালী শব্দের মধ্যে 'কল' ধাতু আছে। কল্ ধাতুর ভাবগত অর্থ হলো গণনা, গতি, আশ্রয়, শব্দ, সংখ্যা ! তাই কালী শব্দের তাৎপর্য হলো সংখ্যায়নী গতি সম্পন্না যিনি। শিবের বুকের উপর দণ্ডায়মান কালী - এটা সৃষ্টি তত্ত্বের প্রথমিক পর্যায়ের ইঙ্গিতবাহী। সাংখ্য দর্শন বলে পুরুষ অক্রিয় , প্রকৃতির সংস্পর্শে তিনি সক্রিয় হয়ে ওঠেন। তাই পুরুষ শিব এখানে শব রূপে শায়িত। বস্তুবাদী এই দর্শন অনুসারে পুরুষ স্থানু বা স্থির ধর্মী , প্রকান্তরে তীব্র ধনাত্মক শক্তি। আর নারী চরিষ্ণু বা ঋণাত্মক। এই দুই বিপরীতধর্মী শক্তির পারস্পরিক মিলনে সৃষ্টির সূচনা। আর তারই প্রতীক নিস্ক্রিয় শিবের বুকে চঞ্চলা কালীর পদ চারণা! মধ্যযুগীয় তন্ত্র মতোবাদের প্রসারে এই সাংখ্য দর্শনের যথেষ্ট প্রভাব দেখা যায়।কালী নারী সত্ত্বার এমন এক রূপ যা স্বয়ংসম্পূর্ণ, প্রচলিত স্ত্রী ভাবনার পরিপন্থী, অনন্য। তাঁর দৈবী ভাবমূর্তি বিতর্কিত ও বটে। কারণ কালী পৃথক - লোল জিহ্বা, উন্মুক্ত স্তন, নগ্ন জঙ্ঘা অথচ অনায়াস সাবলীল ভঙ্গিমায় এক ব্যতিক্রমী চরিত্র। আবহমান কাল ধরেই ভক্তি মার্গে তাঁর আসনে উপেক্ষার ছায়া। তাঁর রণরঙ্গিণী রক্ত লোলুপ নির্লজ্জ রূপে তথা কথিত সভ্য মন সদা বিব্রত - সে একাল হোক বা সেকাল। বেদ ও পুরানের অকুণ্ঠ সমর্থন সত্ত্বেও তাঁর ঐশী অস্তিত্বের সামগ্রিক গ্রহনীয়তা দীর্ঘসময় ধরে ছিল অবহেলিত। এখানে এও এক লড়াইয়ের কাহিনি--- আপস না করার লড়াই। অতি প্রাচীনকাল থেকেই কালী আধুনিক। তাঁর বলিষ্ঠ ব্যক্তিত্বকে কখনই আরোপিত মনে হয় না। যুদ্ধ ক্ষেত্রে প্রবল পরাক্রমে অসুর নিধন তাকে কখনই অসহজ করে তোলে না। এই স্বাচ্ছন্দ্যই হয়তো নারী ক্ষমতায়নের প্রথম সোপান।শ্রীশ্রী মা কালীর নাম উৎপত্তি ও রূপভেদ:--- ব্রহ্মযামল নামক তন্ত্রগ্রন্থের মতে, কালী বঙ্গদেশের অধিষ্ঠাত্রী দেবী। ‘কালী’ শব্দটি ‘কাল’ শব্দের স্ত্রীলিঙ্গ। এই শব্দের অর্থ ‘কৃষ্ণ’ (কালো) বা ‘ঘোর বর্ণ’। মহাকাব্য মহাভারত-এ যে ভদ্রকালীর উল্লেখ আছে, তা দেবী দুর্গারই একটি রূপ। মহাভারত-এ ‘কালরাত্রি’ বা ‘কালী’ নামে আরও এক দেবীর উল্লেখ পাওয়া যায়। ইনি যুদ্ধে নিহত যোদ্ধৃবর্গ ও পশুদের আত্মা বহন করেন। আবার হরিবংশ গ্রন্থে কালী নামে এক দানবীর উল্লেখ পাওয়া যায়। ‘কাল’ শব্দের দুটি অর্থ রয়েছে: ‘নির্ধারিত সময়’ ও ‘মৃত্যু’। কিন্তু দেবী প্রসঙ্গে এই শব্দের মানে "সময়ের থেকে উচ্চতর"। সমোচ্চারিত শব্দ ‘কালো’র সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক না থাকলেও, সংস্কৃত সাহিত্যের বিশিষ্ট গবেষক টমাস কবার্নের মতে, ‘কালী’ শব্দটি ‘কৃষ্ণবর্ণ’ বোঝানোর জন্যও ব্যবহৃত হতে পারে।★ রূপভেদ- তন্ত্র পুরাণে দেবী কালীর একাধিক রূপভেদের উল্লেখ পাওয়া যায়। তোড়লতন্ত্র অনুসারে, কালী আট প্রকার। যথা: দক্ষিণকালিকা, সিদ্ধকালিকা, গুহ্যকালিকা, শ্রীকালিকা, ভদ্রকালী, চামুণ্ডাকালিকা, শ্মশানকালিকা ও মহাকালী। মহাকাল সংহিতার অনুস্মৃতিপ্রকরণে নয় প্রকার কালীর উল্লেখ পাওয়া যায়। যথা: দক্ষিণাকালী, ভদ্রকালী, শ্মশানকালী, কালকালী, গুহ্যকালী, কামকলাকালী, ধণকালিকা, সিদ্ধিকালী, চণ্ডিকালিকা। শ্রী অভিনব গুপ্তের তন্ত্রালোক ও তন্ত্রসার গ্রন্থদ্বয়ে কালীর ১৩টি রূপের উল্লেখ আছে। যথা: সৃষ্টিকালী, স্থিতিকালী, সংহারকালী, রক্তকালী, যমকালী, মৃত্যুকালী, রুদ্রকালী, পরমার্ককালী, মার্তণ্ডকালী, কালাগ্নিরুদ্রকালী, মহাকালী, মহাভৈরবঘোর ও চণ্ডকালী। জয়দ্রথ যামল গ্রন্থে কালীর যে রূপগুলির নাম পাওয়া যায়, সেগুলি হল: ডম্বরকালী, রক্ষাকালী, ইন্দীবরকালিকা, ধনদকালিকা, রমণীকালিকা, ঈশানকালিকা, জীবকালী, বীর্যকালী, প্রজ্ঞাকালী ও সপ্তার্নকালী। নিম্নে মা কালীর মূল রূপগুলির (অষ্টধা কালী) ব্যাখ্যা দেবার চেষ্টা করলাম।● দক্ষিণাকালী- দক্ষিণাকালী হলো কালীর সর্বাপেক্ষা প্রসিদ্ধ মূর্তি। ইনি প্রচলিত ভাষায় শ্যামাকালী নামেও আখ্যাতা। দক্ষিণাকালী করালবদনা, ঘোরা, মুক্তকেশী, চতুর্ভূজা এবং মুণ্ডমালাবিভূষিতা। তাঁর বামকরযুগলে সদ্যছিন্ন নরমুণ্ড ও খড়্গ; দক্ষিণকরযুলে বর ও অভয় মুদ্রা। তাঁর গাত্রবর্ণ মহামেঘের ন্যায়; তিনি দিগম্বরী। তাঁর গলায় মুণ্ডমালার হার; কর্ণে দুই ভয়ানক শবরূপী কর্ণাবতংস; কটিদেশে নরহস্তের কটিবাস। তাঁর দন্ত ভয়ানক; তাঁর স্তনযুগল উন্নত; তিনি ত্রিনয়নী এবং মহাদেব শিবের বুকে দণ্ডায়মান। তাঁর দক্ষিণপদ শিবের বক্ষে স্থাপিত। তিনি মহাভীমা, হাস্যযুক্তা ও মুহুর্মুহু রক্তপানকারিনী। তাত্ত্বিকের তাঁর নামের যে ব্যাখ্যা দেন তা নিম্নরূপ: দক্ষিণদিকের অধিপতি যম যে কালীর ভয়ে পলায়ন করেন, তাঁর নাম দক্ষিণাকালী। তাঁর পূজা করলে ত্রিবর্ণা তো বটেই সর্বোপরি সর্বশ্রেষ্ঠ ফলও দক্ষিণাস্বরূপ পাওয়া যায়।● সিদ্ধকালী- সিদ্ধকালী কালীর একটি অখ্যাত রূপ। গৃহস্থের বাড়িতে সিদ্ধকালীর পূজা হয় না; তিনি মূলত সিদ্ধ সাধকদের ধ্যান আরাধ্যা। কালীতন্ত্র-এ তাঁকে দ্বিভূজা রূপে কল্পনা করা হয়েছে। অন্যত্র তিনি ব্রহ্মরূপা ভুবনেশ্বরী। তাঁর মূর্তিটি নিম্নরূপ: দক্ষিণহস্তে ধৃত খড়্গের আঘাতে চন্দ্রমণ্ডল থেকে নিঃসৃত অমৃত রসে প্লাবিত হয়ে বামহস্তে ধৃত একটি কপালপাত্রে সেই অমৃত ধারণ করে পরমানন্দে পানরতা। তিনি সালংকারা। তাঁর বাম পদ শিবের বুকে ও দক্ষিণ পদ শিবের উরুদ্বয়ের মধ্যস্থলে সংস্থাপিত।● গুহ্যকালী- গুহ্যকালী বা আকালীর রূপ গৃহস্থের নিকট অপ্রকাশ্য। তিনি সাধকদের আরাধ্য। তাঁর রূপকল্প ভয়ংকর: গুহ্যকালীর গাত্রবর্ণ গাঢ় মেঘের ন্যায়; তিনি লোলজিহ্বা ও দ্বিভূজা; গলায় পঞ্চাশটি নরমুণ্ডের মালা; কটিতে ক্ষুদ্র কৃষ্ণবস্ত্র; স্কন্ধে নাগযজ্ঞোপবীত; মস্তকে জটা ও অর্ধচন্দ্র; কর্ণে শবদেহরূপী অলংকার; হাস্যযুক্তা, চতুর্দিকে নাগফণা দ্বারা বেষ্টিতা ও নাগাসনে উপবিষ্টা; বামকঙ্কণে তক্ষক সর্পরাজ ও দক্ষিণকঙ্কণে অনন্ত নাগরাজ; বামে বৎসরূপী শিব; তিনি নবরত্নভূষিতা; নারদাদিঋষিগণ শিবমোহিনী গুহ্যকালীর সেবা করেন; তিনি অট্টহাস্যকারিণী, মহাভীমা ও সাধকের অভিষ্ট ফলপ্রদায়িনী। গুহ্যকালী নিয়মিত শবমাংস ভক্ষণে অভ্যস্তা। মুর্শিদাবাদ-বীরভূম সীমান্তবর্তী আকালীপুর গ্রামে মহারাজা নন্দকুমার প্রতিষ্ঠিত গুহ্যকালীর মন্দিরের কথা জানা যায়। মহাকাল সংহিতা মতে, নববিধা কালীর মধ্যে গুহ্যকালীই সর্বপ্রধানা। তাঁর মন্ত্র বহু – প্রায় আঠারো প্রকারের।● মহাকালী- তন্ত্রসার গ্রন্থমতে, মহাকালী পঞ্চবক্ত্রা ও পঞ্চদশনয়না। তবে শ্রীশ্রীচণ্ডী-তে তাঁকে আদ্যাশক্তি, দশবক্ত্রা, দশভূজা, দশপদী ও ত্রিংশলোচনা রূপে কল্পনা করা হয়েছে। তাঁর দশ হাতে রয়েছে যথাক্রমে খড়্গ, চক্র, গদা, ধনুক, বাণ, পরিঘ, শূল, ভূসুণ্ডি, নরমুণ্ড ও শঙ্খ। ইনিও ভৈরবী; তবে গুহ্যকালীর সঙ্গে এঁর পার্থক্য রয়েছে। ইনি সাধনপর্বে ভক্তকে উৎকট ভীতি প্রদর্শন করলেও অন্তে তাঁকে রূপ, সৌভাগ্য, কান্তি ও শ্রী প্রদান করেন।● ভদ্রকালী- ভদ্রকালী নামের ভদ্র শব্দের অর্থ কল্যাণ এবং কাল শব্দের অর্থ শেষ সময়। যিনি মরণকালে জীবের মঙ্গলবিধান করেন, তিনিই ভদ্রকালী। ভদ্রকালী নামটি অবশ্য শাস্ত্রে দুর্গা ও সরস্বতী দেবীর অপর নাম রূপেও ব্যবহৃত হয়েছে। কালিকাপুরাণ মতে, ভদ্রকালীর গাত্রবর্ণ অতসীপুষ্পের ন্যায়, মাথায় জটাজুট, ললাটে অর্ধচন্দ্র ও গলদেশে কণ্ঠহার। তন্ত্রমতে অবশ্য তিনি মসীর ন্যায় কৃষ্ণবর্ণা, কোটরাক্ষী, সর্বদা ক্ষুধিতা, মুক্তকেশী; তিনি জগৎকে গ্রাস করছেন; তাঁর হাতে জ্বলন্ত অগ্নিশিখা ও পাশযুগ্ম। গ্রামবাংলায় অনেক স্থলে ভদ্রকালীর বিগ্রহ নিষ্ঠাসহকারে পূজিত হয়। এই দেবীরও একাধিক মন্ত্র রয়েছে। তবে প্রসিদ্ধ চতুর্দশাক্ষর মন্ত্রটি হল – ‘হৌঁ কালি মহাকালী কিলি কিলি ফট স্বাহা’।● চামুণ্ডাকালী- চামুণ্ডাকালী বা চামুণ্ডা ভক্ত ও সাধকদের কাছে কালীর একটি প্রসিদ্ধ রূপ। দেবীভাগবত পুরাণ ও মার্কণ্ডেয় পুরাণ-এর বর্ণনা অনুযায়ী, চামুণ্ডা চণ্ড ও মুণ্ড নামক দুই অসুর বধের নিমিত্ত দেবী দুর্গার ভ্রুকুটিকুটিল ললাট থেকে উৎপন্ন হন। তাঁর গাত্রবর্ণ নীল পদ্মের ন্যায়, হস্তে অস্ত্র, দণ্ড ও চন্দ্রহাস; পরিধানে ব্যাঘ্রচর্ম; অস্তিচর্মসার শরীর ও বিকট দাঁত। দুর্গাপূজায় মহাষ্টমী ও মহানবমীর সন্ধিক্ষণে আয়োজিত সন্ধিপূজার সময় দেবী চামুণ্ডার পূজা হয়। পূজক অশুভ শত্রুবিনাশের জন্য শক্তি প্রার্থনা করে তাঁর পূজা করেন। অগ্নিপুরাণ-এ আট প্রকার চামুণ্ডার কথা বলা হয়েছে। তাঁর মন্ত্রও অনেক। বৃহন্নন্দীকেশ্বর পুরাণে বর্ণিত চামুণ্ডা দেবীর ধ্যানমন্ত্রটি এইরূপ - নীলোৎপলদলশ্যামা চতুর্বাহুসমন্বিতা । খট্বাঙ্গ চন্দ্রহাসঞ্চ বিভ্রতী দক্ষিণে করে ।। বামে চর্ম্ম চ পাশঞ্চ ঊর্দ্ধাধোভাগতঃ পুনঃ । দধতী মুণ্ডমালাঞ্চ ব্যাঘ্রচর্মধরাম্বরা ।। কৃশোদরী দীর্ঘদংষ্ট্রা অতিদীর্ঘাতিভীষণা । লোলজিহ্বা নিমগ্নারক্তনয়নারাবভীষণা ।। কবন্ধবাহনাসীনা বিস্তারা শ্রবণাননা । এষা কালী সমাখ্যাতা চামুণ্ডা ইতি কথ্যতে ।।● শ্মশানকালী- কালীর "শ্মশানকালী" রূপটির পূজা সাধারণত শ্মশানঘাটে হয়ে থাকে। এই দেবীকে শ্মশানের অধিষ্ঠাত্রী দেবী মনে করা হয়। তন্ত্রসাধক কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ রচিত বৃহৎ তন্ত্রসার অনুসারে এই দেবীর ধ্যানসম্মত মূর্তিটি নিম্নরূপ:----"শ্মশানকালী দেবীর গায়ের রং কাজলের মতো কালো। তিনি সর্বদা বাস করেন। তাঁর চোখদুটি রক্তপিঙ্গল বর্ণের। চুলগুলি আলুলায়িত, দেহটি শুকনো ও ভয়ংকর, বাঁ-হাতে মদ ও মাংসে ভরা পানপাত্র, ডান হাতে সদ্য কাটা মানুষের মাথা। দেবী হাস্যমুখে আমমাংস খাচ্ছেন। তাঁর গায়ে নানারকম অলংকার থাকলেও, তিনি উলঙ্গ এবং মদ্যপান করে উন্মত্ত হয়ে উঠেছেন।"শ্মশানকালীর আরেকটি রূপে তাঁর বাঁ-পাটি শিবের বুকে স্থাপিত এবং ডান হাতে ধরা খড়্গ। এই রূপটিও ভয়ংকর রূপ। তন্ত্রসাধকেরা মনে করেন, শ্মশানে শ্মশানকালীর পূজা করলে শীঘ্র সিদ্ধ হওয়া যায়। রামকৃষ্ণ পরমহংসের স্ত্রী সারদা দেবী দক্ষিণেশ্বরে শ্মশানকালীর পূজা করেছিলেন। কাপালিকরা শবসাধনার সময় কালীর শ্মশানকালী রূপটির ধ্যান করতেন। সেকালের ডাকাতেরা ডাকাতি করতে যাবার আগে শ্মশানঘাটে নরবলি দিয়ে শ্মশানকালীর পূজা করতেন। পশ্চিমবঙ্গের অনেক প্রাচীন শ্মশানঘাটে এখনও শ্মশানকালীর পূজা হয়। তবে গৃহস্থবাড়িতে বা পাড়ায় সর্বজনীনভাবে শ্মশানকালীর পূজা হয় না। রামকৃষ্ণ পরমহংস বলেছিলেন, শ্মশানকালীর ছবিও গৃহস্থের বাড়িতে রাখা উচিত নয়।● শ্রীকালী- গুণ ও কর্ম অনুসারে শ্রীকালী কালীর আরেক রূপ। অনেকের মতে এই রূপে তিনি দারুক নামক অসুর নাশ করেন। ইনি মহাদেবের শরীরে প্রবেশ করে তাঁর কণ্ঠের বিষে কৃষ্ণবর্ণা হয়েছেন। শিবের ন্যায় ইনিও ত্রিশূলধারিনী ও সর্পযুক্তা।সেকালের কালী পূজা:----আজ আমরা যে কালীমূর্তির আরাধনা সর্বত্র দেখতে পাই, তার রূপটি (দক্ষিণাকালী) সর্বপ্রথম বিখ্যাত তন্ত্রসাধক কৃষ্ণানন্দ আগমবাগিশ (১৬ শতক) কল্পনা করেছিলেন বলে কথিত আছে। শোনা যায়, তিনি অমাবস্যার রাতে স্বহস্তে কালীমূর্তি তৈরি করে সে-রাতেই নিজে পূজা সম্পন্ন করে প্রতিমা বিসর্জন দিতেন। অবশ্য অনেকে মনে করেন যে, তাঁর আগেও বাঙলায় কালী আরাধনা প্রচলিত ছিল। এ-ভাবেই বাঙলার কালী আরাধনার সঙ্গে যুক্ত হয়ে গেছে কৃষ্ণনগরের মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্রের নাম। জনশ্রুতি এই যে, এই কালীভক্ত রাজা আদেশ দিয়েছিলেন যে, তাঁর রাজ্যে প্রতি গৃহস্থকে কার্তিকী অমাবস্যায় তার বাড়িতে কালীপূজা করতে হবে, অন্যথায় শাস্তি পেতে হবে। তাঁর পরবর্তী দুই পুরুষও এই আদেশ বহাল রাখেন। এর ফলে শুধু কৃষ্ণনগর জেলাতেই নাকি দশ সহস্রাধিক বাড়িতে কালীপূজা অনুষ্ঠিত হতো, যার পরিণতিতে ঐ অঞ্চলে শ্যামাপূজার রাত্রিতে পূজারী ব্রাহ্মণের অভাব দেখা দেয়। কালীপূজায় ঐ জেলায় পশুবলিও নাকি হতো প্রায় দশ হাজারের মতো। চিন্তাহরণ চক্রবর্তী রচিত ‘বাঙলার পূজাপার্বন’ বইটিতে এই তথ্য পাওয়া যায়। এই লেখকের মতে আঠারো শতকের শেষের দিকেও কালীপূজা বাংলাদেশে ততটা জনপ্রিয় হয়নি। ‘তন্ত্রসার’-এর মতো প্রাচীন কোনো গ্রন্থে কালীপূজার উল্লেখ নেই। যে ‘শ্যামাসপর্যা’ গ্রন্থে এই পূজার উল্লেখ পাওয়া যায়, তা অপেক্ষাকৃত আধুনিক।রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের পৌত্র ঈশানচন্দ্রের কালী আরাধনা নিয়েও অনেক কাহিনী শোনা যায়। কালীপূজায় তাঁর এক হাজার মণ মিষ্টান্ন ও সেই ওজনের চিনি, চাল-কলা ইত্যাদি সহ এক হাজারটি শাড়ি ও মেয়েদের এক হাজার রেশমি পোশাক ইত্যাদির হাজার রকমের ভোগ নিবেদনের কাহিনী পাওয়া যায়। ঐ কাহিনী অনুসারে এই কালীপূজায় মহিষ, পাঁঠা ও ভেড়া (প্রতিটি এক হাজার করে) বলি দেবার খরচ পড়েছিল প্রায় দশ হাজার টাকা আর পূজার অন্যান্য খরচ ধরলে আরও প্রায় কুড়ি হাজার টাকা! এই বেহিসেবী ব্যয় মেটাতে গিয়ে ঈশানচন্দ্রকে নাকি সর্বস্বান্ত হতে হয়েছিল।কালীপূজার আড়ম্বরে এমনই নিঃস্ব হয়ে যাওয়া আর এক রাজার গল্প পাওয়া যায় শ্রীরামপুরের মিশনারি উইলিয়াম ওয়ার্ডের লেখায় (১৮১৫)। এই রাজা রামকৃষ্ণ বরানগরে কালীর এক মর্মরমূর্তি প্রতিষ্ঠার উৎসবে নাকি তখনকার দিনে এক লক্ষ টাকা ব্যয় করেছিলেন। ওয়ার্ড লিখেছেন, কালীর নামে রাজা বিপুল সম্পত্তি দান করেছিলেন, সেই সম্পত্তির আয় থেকে দৈনিক পাঁচশ’ লোক খাওয়ানো হয়।... কালীপূজার খরচের ফলে এখন তিনি প্রায় সর্বস্ব হারিয়েছেন।সারা বাংলাদেশ জুড়ে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য ‎ঐতিহ্যমন্ডিত কালী-আরাধনার কেন্দ্র আর তাদের নিয়ে প্রচলিত নানা কাহিনীরও শেষ নেই! যেমন, মুর্শিদাবাদের ডাহাপাড়ার দেবী কীরিটেশ্বরী, জনশ্রুতি - বাংলার নবাব মীরজাফর অসুস্থ অবস্থায় এই দেবীর চরণামৃত পান করতেন। এ-রকম আরো কয়েকটি কালীমন্দিরের মধ্যে উল্লেখযোগ্য শান্তিপুরে শাক্ত কৃষ্ণানন্দ আগমবাগিশ আর বৈষ্ণব অদ্বৈত আচার্যের বংশধরদের প্রতিষ্ঠিত কালী, রামপ্রসাদের সাধনপীঠ কুমারহট্টের (হালিশহর) ও কমলাকান্তের কোটালহাটের কালী, ভদ্রপুরে মহারাজা নন্দকুমারের প্রতিষ্ঠিত দ্বিভুজা কালী, বিষ্ণুপুরের ময়নাপুরে প্রাচীন কালী, কালনা, সিঙ্গুর ও রাণাঘাটের সিদ্ধেশ্বরী, সিউড়ি ও নবদ্বীপের ভবতারিণী, চূঁচুড়ার দয়াময়ী, নলহাটির ললাটেশ্বরী, শেওড়াফুলির নিস্তারিনী, বাগনানের মহাকালী, বর্ধমানের কঙ্কালেশ্বরী ইত্যাদি ইত্যাদি। এছাড়া বীরভূমে বীরসিংহপুরের কালী, অম্বিকা-কালনার দারুময়ী অম্বিকা ও ২৪ পরগ্ণার ময়দার কালীও বিখ্যাত।পশ্চিমবঙ্গের বাইরেও বিশ্রুত কালীক্ষেত্রের সংখ্যা নেহাত কম নয়। ঝাড়খন্ডে ধানবাদের নিকটবর্তী কল্যাণেশ্বরী ও রাজরাপ্পার ছিন্নমস্তার মন্দির ভক্তদের কাছে সুপরিচিত। এ ছাড়া পূর্ববঙ্গে (বাংলাদেশ) বিক্রমপুরে সোনারঙের কালী, ঢাকার জয়দেবপুরে শ্মশানকালী, বগুড়ার কালঙ্কেশ্বরী (বা প্রেতাসনা কালী), ত্রিপুরার মেহারে মেহার-কালী ইত্যাদিও সুপরিচিত। তমলুকের দেবী বর্গভীমা এবং কাঁথির কপালকুণ্ডলার নামাঙ্কিত মন্দির বা বাঁশবেড়িয়ার হংসেশ্বরী মন্দিরে পূজিতা দেবীও আদতে কালীরই নানা রূপ। বীরভূমের তারাপীঠে পূজিতা দেবী কালীর নিকটতম রূপান্তর তারার মন্দিরের কথা ছেড়ে দিলেও সেখানে রয়েছে বোলপুরের কাছে কঙ্কালী, ভাঙ্গালি ও বর্ধমান সীমান্তে অট্টহাস ইত্যাদি কালী-উপাসনা স্থলগুলি, যার মধ্যে কয়েকটি শক্তিপীঠ হিসেবে পরিগণিত হয়ে থাকে। এছাড়াও রয়েছে নানা ডাকাতের নামের সঙ্গে জড়িত অগণিত কালীমন্দির।এ-রকমই একটি, সিঙ্গুরের ডাকাতকালীর মন্দির দেখতে যাবার এক বিবরণ মেলে যোগেন্দ্রনাথ গুপ্তের বিখ্যাত বই ‘বাংলার ডাকাত’-এ। শেওড়াফুলি যাবার পথের বর্ণনা দিয়ে তিনি লিখছেন, “শীর্ণ সংকীর্ণ সর্পিল পথ। চৈত্র মাস। শুষ্ক পথের পাশে স্থানে স্থানে জঙ্গলঘেরা ডোবা। অতিকষ্টে মন্দিরের কাছে আসিলাম। ডাকাত কালীর মন্দির ভগ্ন ও জীর্ণ। ইঁট খসিয়া পড়িতেছে। এদিক ওদিক সাপ ছোটাছুটি করিতেছে। দিনের বেলায়ও অন্ধকার। মন্দিরে ভীষণাকৃতি কালীমূর্তি। ভিতরে আবর্জনা পূর্ণ।......একপাশে একটি বড় হাড়িকাঠভূমিতে পড়িয়া আছে।......আমি ডাকাতে কালীকে দেখিতে আসিয়া ভয়ে বিস্ময়ে শিহরিয়া উঠিলাম...। নানা আগাছায় পূর্ণ ভয়াল স্থান। দিনের বেলায়ও ভয় করে।...” সিঙ্গুরের এই ডাকাতে কালীর মন্দির কিন্তু আজও আছে, যদিও প্রাচীন জরাজীর্ণ মন্দিরের সংস্কার হয়েছে। এই কালীর নাম সিদ্ধেশ্বরী। গগন সর্দার, সনাতন বাগদি, রঘু ডাকাত ইত্যাদি নানা ডাকাতের নাম ও গল্প সিঙ্গুরের এই কালীর সঙ্গে জড়িত।এই সূত্রে কালীপূজোয় আরও দুটি বিদেশী-লিখিত নরবলির বিবরণের উল্লেখ এখানে করা যায়। একটি পর্তুগীজ জার্নালে ক্যাপটেন নরোনহা নামে এক ধর্মভীরু পর্তুগীজের বিবরণ পাওয়া যায়। মেদিনীপুরের কাছাকাছি কোনো স্থানে ডাকাতদের সঙ্গে গিয়ে তিনি এক বটগাছের নীচে তিনি তাদের আরাধ্যা কালীমূর্তি দেখতে পান। বলি হিসেবে সেখানে দু’টি অর্ধমূর্ছিত বালক ও অদুরে সিঁদুর মাখানো খড়গ দেখে তিনি ভয়ে সেখান থেকে পালিয়ে যান। আর একটি বিবরণ যার লেখা, তিনি ধর্মে ক্যাথলিক হলেও পেশায় ছিলেন ডাকাত। এক স্থানীয় জমিদারের পৃষ্ঠপোষকতায় তিনি খুলনা ও নোয়াখালি অঞ্চলে ডাকাতি করতেন, পরে পালিয়ে যান সুন্দরবনের গভীরে। সেখানে তিনি ‘ভবানীপূজা’র আয়োজন করেন বলে জানিয়েছেন, যাতে নরবলির জন্য মানুষ কেনাবেচার কথা পাওয়া যাচ্ছে ও বলির যোগ্য মানুষের লক্ষণ মিলিয়ে সওদা করছেন স্ব্য়ং পুরোহিত!ওয়ার্ডের বিবরণে এরকম আরো কালীভক্তদের বিবরণ মেলে, যারা কালীপূজো উপলক্ষে বিপুল ব্যয় করতেন, যেমন ধরা যাক, খিদিরপুরের ন্যায়নারায়ণ ঘোষাল বা গোপীমোহন নামে কলকাতার এক বৈষ্ণব ব্রাহ্মণ। প্রথমজন নাকি ১৭৯৫ সাল নাগাদ কালীপূজায় পঁচিশ হাজার টাকা ব্যয় করে ২৫টি মহিষ, ১০৮টি পাঁঠা ও ৫টি ভেড়া বলি দিয়েছিলেন। অপর ব্যক্তি ১৮১১ সালে কালীপূজায় দশ হাজার টাকা ব্যয় করেছিলেন।কলকাতার আরেক বাবু শোভাবাজারের কালীশঙ্কর ঘোষের বাড়ির কালীপূজার আড়ম্বরের বিবরণ পাওয়া যায় হরিহর শেঠের লেখায়ঃ- “কালীশঙ্কর ঘোষের বাটীতে তান্ত্রিকমতে অতি ভয়ানক ভাবে কালীপূজা হইত। শ্যামাপূজার রাত্রে মদ্যপান অব্যাহতভাবে চলিত এবং বলির রক্তে প্রাঙ্গণ ভরিয়া যাইত, নর্দমা দিয়া রক্তস্রোত বহিয়া যাইত।” এই বাড়ির পূজোতেই পশুবলির বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছেন পূর্বে উল্লিখিত পাদ্‌রি ওয়ার্ড তাঁর বইয়ে। বাড়ির মাঝখানে খোলা আঙিনায় রয়েছে বলির পশুগুলি, পাশেই স্ব্য়ং কালীশংকর। তাঁর কয়েকজন সঙ্গী ও বলির কাজে সহায়তার জন্য জনা বিশেক লোক। আঙ্গিনার চারদিক ঘিরে দালান, তার একটি ঘরে উত্তরমুখী করে প্রতিমা বসানো, অপর কয়েকটি ঘর দর্শকে ঠাসা। এর পর এই পাদরি জানিয়েছেন যে, প্রথমে বলি পড়ে পাঁঠা, তারপর মহিষ ও সবশেষে দু’ তিনটি ভেড়া। ওয়ার্ডের বর্ণনা কিছুটা শোনা যাকঃ- “একজন পূজারী বলি দেওয়া পাঁঠার মুন্ডুটি ধরে নাচতে নাচতে মূর্তির সামনে নিয়ে গেল। সদ্য কাটা মুন্ড থেকে তাজা রক্ত তার সর্বাঙ্গে গড়িয়ে পড়তে থাকে। বলিদান শেষ হলে কালীশঙ্কর, যে লোকটি বলি দিল, তাকে গাঢ় আলিঙ্গনে আবদ্ধ করলেন। তাকে বস্ত্র ইত্যাদি প্রভূত জিনিষপত্র দান করা হলো। পশুর মুন্ড, রক্ত, দেহের বিভিন্ন অংশের মাংস পূজারী দেবীকে নিবেদন করলেন। তারপর বালির ওপর আগুন জ্বেলে ঘৃত সহযোগে হোম শুরু হলো। তখন সারা আঙিনা রক্তে ভাসছে।” এ-ছাড়াও কালীপূজার বিষয়ে ওয়ার্ড যে-সব তথ্য জানিয়েছেন, তার মধ্যে আছে, দেবীকে যে মদ্য নিবেদন করা হয়, তা কর্তা ও তাঁর ঘনিষ্ঠ মহলের লোকেরা একান্তে পান করে। আর প্রতিমার সম্মুখে নৃত্যগীতের মধ্য দিয়ে উৎসবের সমাপ্তি ঘটে।পশুবলি অবশ্য গৃহস্থ বাড়ির কালীপূজোয় ছিল বহুল প্রচলিত প্রথা। কাঁসারিপাড়ার মল্লিকবাড়িতে আর সিমলার হোগলকুঁড়িয়ায় গুহবাড়িতে কালীপূজোয় মহিষ বলির প্রথা ছিল বলে জানা যায়। পাঁঠা বলি তো ছিল সাধারণ ব্যাপার! আবার বিখ্যাত ধনী আশুতোষ দেবের (ছাতুবাবু) বাড়ির কালীপূজায় কোনো বলিই হতো না। ১৭৫৭ সালে সুতানুটি অঞ্চলে রাজা মাণিক বন্দ্যোপাধ্যায় প্রতিষ্ঠিত পুঁটে-কালীর মন্দিরে বৈশিষ্ট্যই ছিল অসংখ্য বলিদান। পলাশির যুদ্ধের সমকালে যখন কলকাতার অধিকাংশ জায়গা ছিল জঙ্গলাকীর্ণ, তখন ডাকাতি করতে যাবার আগে কালীমূর্তির সামনে এমন কি, নরবলি দেবার গল্পও শোনা যায়। চিতু ডাকাতের প্রতিষ্ঠিত চিত্তেশ্বরী কালী মন্দিরে ১৭৭৮ সালের গ্রীষ্মের এক অমাবস্যায় এমনই নরবলি হয়েছিল বলে জানা যায়। কালীঘাটেও কোম্পানির আমলে নাকি একবার নরবলির জন্য একজনের ফাঁসি হয়েছিল বলে ডঃ ডাফের বিবরণে উল্লিখিত আছে। কলকাতার সবচেয়ে বিখ্যাত কালীক্ষেত্র কালীঘাটের মন্দিরে কার্তিকী অমাবস্যায় কালী আরাধনার আড়ম্বরের উল্লেখ করে মিশনারি ওয়ার্ড জানিয়েছেন যে, এই পূজায় প্রায় হাজার চারেক লোকের সমাগম হতো। অনেকেই পূজা উপলক্ষে প্রচুর খরচ করত। ১৭৬৫ সালে রাজা নবকৃষ্ণ নাকি এই কালীমন্দিরের পূজোয় লাখ খানেক টাকা ব্যয় করেন ও মূর্তির জন্য দান করেন সোনার মুন্ডমালা। পাদরি ওয়ার্ডের বিবরণ অনুযায়ী এই রাজা কালীমূর্তির জন্য দান করেন হাজার টাকা মূল্যের সোনার হার সহ অন্যান্য অলঙ্কার ও রুপোর বাসনপত্র। তিনি দু’ হাজার আতুরকে অর্থদান করেন ও যে-পরিমাণ ভোজ্যবস্তু ও মিষ্টি দান করেন, তা দিয়ে খাওয়ানো হয়েছিল এক হাজার মানুষকে। এই বিশ্রুত কালীমন্দিরে কালীর নিত্যপূজাও হতো এবং সে সূত্রে এর সঙ্গে নানা ধনাঢ্য মানুষের নাম শোনা যায় নানাজনের লেখা বিবরণে ও সমকালের সংবাদপত্রের পাতায়। শোভাবাজারের রাজা গোপীমোহন দেব ১৮২২ সালে একবার কাড়ানাকাড়া বাজিয়ে ধূমধাম সহকারে কালীঘাটে পূজো দিয়েছিলেন ও এই পূজো দেখতে এত ভীড় হয় যে শান্তিরক্ষায় পুলিশের প্রয়োজন হয়েছিল। রাজা বাহাদুর কালীমূর্তির হাতের রুপোর খড়্গ আর সোনার নরমুন্ড গড়িয়ে দেওয়া ছাড়াও নানা রকমের অলঙ্কার পট্টবস্ত্র আর শাল-দোশালায় মূর্তিকে মন্ডিত করেন।অতীত বাঙলার, এমন কি, ভারত ও নেপালের নানা ধনী ভক্তজন নানা সময়ে কালীঘাটের কালীমূর্তির জন্য বিভিন্ন আভরণ দান করেন বলে শোনা যায়। দেবীর চারটি রুপোর হাত দিয়েছিলেন খিদিরপুরের গোকুলচন্দ্র ঘোষাল। পরে চারটি সোনার হাত দেন কলকাতার কালীচরণ মল্লিক। বেলেঘাটার রামনারায়ণ সরকার দিয়েছিলেন সোনার একটি মুকুট আর পাইকপাড়ার রাজা ইন্দ্রচন্দ্র সিংহ দেবীর সোনার জিভটি গড়িয়ে দেন। পাতিয়ালার মহারাজা দিয়েছিলেন দেবীমূর্তির গলার একশো আটটি নরমুন্ডের মালা, মূর্তির মাথার ওপরের রুপোর ছাতাটি নাকি দেন নেপালের প্রধান সেনাপতি জঙবাহাদুর।মূর্তির পরেই কালীঘাটের মন্দিরের ও মন্দির পরিসরের নানা অংশের নির্মাণেও রয়েছে নানা বিচিত্র মানুষের যোগদান। ১৭৭০-৭১ সাল নাগাদ মন্দিরের সামনের গঙ্গার ঘাটটি এক বিশ্বস্ত পাঞ্জাবি সৈনিক হুজুরিমল্লের শেষ ইচ্ছানুযায়ী বাঁধিয়ে দেয় ইংরেজ সরকার। কালীর বর্তমান মন্দিরটির নির্মাণ হয়েছিল বরিশার জমিদার সন্তোষ রায়চৌধুরী ও তাঁর উত্তরাধিকারীদের সৌজন্যে। এছাড়াও শ্যামরায়ের মন্দির, তোরণদ্বার, বিভিন্ন ভোগঘর, নহবতখানা ইত্যাদির নির্মাণের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাওয়ালির বৈষ্ণব জমিদার উদয়নারায়ণ মণ্ডল, গোরখপুরের টীকা রায়, শ্রীপুরের জমিদার তারকচন্দ্র চৌধুরী, তেলেনিপাড়ার জমিদার কাশীনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখের নাম। ১৮৩৫ সালে নাটমন্দিরটি তৈরি করান আন্দুলের জমিদার রাজা কাশীনাথ রায়। এখানে উল্লেখ করা যায় যে, এই নাটমন্দিরেই ১৮৯৯ সালে কালী সম্পর্কে তাঁর বিখ্যাত বক্তৃতা দিয়েছিলেন স্বামী বিবেকানন্দের বিদেশিনী শিষ্যা ভগিনী নিবেদিতা। সে এক অন্য কাহিনী!অ্যালবার্ট হলে [অর্থাৎ এখনকার কফি হাউস] কালী বিষয়ে তাঁর প্রথম বক্তৃতাটি দিয়েছিলেন আইরিশ দুহিতা নিবেদিতা। শ্রোতাদের মধ্যে ছিলেন কলকাতার শিক্ষিত সমুদায় ও ব্রাহ্মসমাজের নানা বিশিষ্ট ব্যক্তি, যেমন সত্যেন্দ্রমোহন ঠাকুর, ব্রজেন্দ্রনাথ গুপ্ত, ডাঃ নিশিকান্ত চ্যাটার্জি ও ড: মহেন্দ্রলাল সরকার প্রমুখ। সাধারণ শ্রোতারা নিবেদিতার ভাষণে সন্তুষ্ট হলেও কিছু তথাকথিত প্রগতিশীল ব্যক্তি তাঁর বক্তব্যের প্রতিবাদ করেন। নিবেদিতা এই বক্তৃতায় কুসংস্কারকে প্রশ্রয় দিচ্ছেন বলে সবচেয়ে তীব্র ভাষায় আক্রমণ করেন মহেন্দ্রলাল। কলকাতার কালীবিরোধীদের বক্তব্যের জবাব দেবার সুযোগ আসে যখন কালীঘাট মন্দিরের সেবায়েত হালদারেরা নিবেদিতাকে মন্দির প্রাঙ্গনে বক্তৃতা দিতে আমন্ত্রণ জানান। এই কালীঘাটেই নাটমন্দিরের চত্বরে নিবেদিতা ২৮শে মে শ্রোতায় ঠাসা এক সভায় কালী আরাধনার বলিপ্রথা, মূর্তিপূজা ও মূর্তির তথাকথিত কুৎসিত রূপ ইত্যাদি অভিযোগের জবাব দিয়েছিলেন। পরে তাঁর এই বক্তৃতা পুস্তিকাকারে প্রকাশ করেন মন্দির কর্তৃপক্ষ। উল্লেখযোগ্য যে, ‘কালী দি মাদার’ নামে নিবেদিতার একটি বইও আছে।কালীঘাটের কালীর প্রতি শুধু যে বাঙালি বা হিন্দুরাই ভক্তি বা বিশ্বাস পোষণ করতেন, এমন কিন্তু নয়। শোনা যায়, পাঞ্জাব আর বার্মা দখল করবার পর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির তরফে কালীঘাটে ষোড়শোপচারে পূজো পাঠানো হয়েছিল। মার্শম্যানের বিবরণেও এর সমর্থন মেলে। কালীপূজোয় কোম্পানির এই এলাহি খরচের পেছনে অবশ্য ভক্তির চেয়ে দেশী সেপাইদের সন্তুষ্ট করার বাসনাই সম্ভবত কাজ করেছিল। কিন্তু পাদরি ওয়ার্ড কালীঘাট সহ বিভিন্ন কালীমন্দিরে অহিন্দু ভক্তদের আনাগোনার কথা লিখেছেন। তিনি জানাচ্ছেন, “শুধু হিন্দুরাই যে এই কালো পাথরের দেবীমুর্তির পূজা করে, এমন কিন্তু নয়। আমি জানতে পেরেছি, অনেক ইয়োরোপীয় বা তাদের এ-দেশীয় স্ত্রীরা কালী মন্দিরে যায় ও দেবীর আরাধনায় হাজার হাজার টাকা ব্যয় করে। আমি যে-ব্রাহ্মণের সাহায্য নিয়ে এই বিবরণ প্রস্তুত করেছি, তিনি বলেছেন, তিনি...... বহুবার সাহেব-মেমদের কালী মন্দিরে পূজো দিতে পালকি করে আসতে দেখেছেন।...... তাঁকে মন্দিরের কর্তৃপক্ষ সুনিশ্চিত ভাবে জানিয়েছেন, কোনো প্রার্থনা নিয়ে কালীর কাছে দিতে ইয়োরোপীয়রা প্রায়ই এসে থাকে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির এক বিশিষ্ট কর্মচারী সম্প্রতি মামলা জিতে কালীদেবীকে দু’ তিন হাজার টাকা মূল্যের নানা সামগ্রী দান করেছেন।”কালীঘাটের মন্দির সম্পর্কে পাদ্রি ওয়ার্ড লিখেছেন, “কলকাতার কাছে কালীর এক বিখ্যাত মন্দির রয়েছে। সমগ্র এশিয়া, এমন কি, সমগ্র বিশ্বের হিন্দু এই দেবীর পূজা করে।” ওয়ার্ডের বিবরণে এই অতিরিক্ত সংবাদও পাওয়া যায় যে, প্রায় পাঁচশো মুসলমান নাকি প্রতি মাসে কালীকে পূজো দিয়ে যেতেন। এর পরে তাঁর অধিকন্তু মন্তব্যঃ- “কি আশ্চর্য ভাবেই না এই দেবীমূর্তি সাধারণ লোকের মনে প্রভাব বিস্তার করেছে! ......বাংলার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সমসংখ্যক গণিকারা এসেও মন্দিরে পূজো দিয়ে যায়। তাদের কারো প্রার্থনা উপপতির রোগমুক্তি, কেউ বা চায় তার ঘরে আরও বেশি লোকের আগমন!” পবিত্রকুমার ঘোষ জানিয়েছেন, একসময় অবিভক্ত বাংলার, পরে পূর্ব পাকিস্তানের জননেতা শহিদ সুরাওয়ার্দি নাকি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হবার বাসনায় কালীঘাটে মানত করেছিলেন ও কলকাতায় দু’জন লোক পাঠিয়ে তাঁর হিন্দু বন্ধুদের মারফৎ ‘বিরাট ডালা সাজিয়ে’ কালীঘাটে পূজো দেবার ব্যবস্থা করেছিলেন। আর একজন বিখ্যাত বাঙালি শিল্পপতি স্যার বীরেন মুখার্জিও নাকি প্রতি সপ্তাহে কালীঘাটের মন্দিরে পূজো দিতেন।কালীঘাট ব্যতিরেকে কলকাতার অন্যান্য প্রাচীন কালী মন্দিরগুলি নিয়েও আড়ম্বর-বৈচিত্র্যের কাহিনী কম নেই। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রতিপত্তিশালী দেওয়ান গোবিন্দরাম মিত্রের প্রতিষ্ঠিত সিদ্ধেশ্বরী কালীর মন্দির ছিল কলকাতার মনুমেন্টের থেকেও উঁচু, আর তা খ্যাত ছিল ‘ব্ল্যাক প্যাগোডা’ নামে। এই মন্দির বেশ কয়েকবার ঝড়ে আর ভূমিকম্পে ভেঙে পড়ে ও তা পুনরায় তৈরি করা হয়। তাঁর কালীপূজোর ঘটাও নাকি ছিল খুব বিখ্যাত।কলকাতার কালীমন্দিরগুলোর মধ্যে সম্ভবত প্রাচীনতা আর খ্যাতির বিচারে কালীঘাটের পরেই চিত্তেশ্বরী মন্দিরের নাম উল্লেখ্য। অতীতের সেই যুগে গঙ্গার তীর ধরে তীর্থযাত্রীরা চিৎপুরে দেবী চিত্তেশ্বরী বা চিত্রেশ্বরী কালীমন্দিরে পূজো দেবার পর মশাল জ্বালিয়ে দল বেঁধে যেত কালীঘাটে। জনশ্রুতি আছে, এই পথের ধারেই তীর্থযাত্রীদের ওপর লুঠপাট চালাতো চিতে ডাকাত, এমন কি, এইসব অসহায় যাত্রীকে ধরে নাকি বলিও দিত কালীর সামনে। এই চিতু ডাকাতের নাম থকেই দেবী চিত্তেশ্বরী বা চিৎপুর নামের জন্ম হয়েছে (বা এর উল্টোটাও হতে পারে), এমন লোকশ্রুতিও আছে (কলকাতা কলেক্টরেটের ১৭৬১ সালের এক পাট্টায়ও এ কথার উল্লেখ আছে)। জঙ্গলাকীর্ণ এই পায়ে চলা রাস্তাটি ইংরেজদের নথিতে পরিচিত ছিল পিলগ্রিমস রোড নামে। বর্তমানে এই চিত্তেশ্বরী মন্দিরে (কাশীপুরে) প্রতিষ্ঠিত বিগ্রহটি দুর্গা বা চন্ডীর হলেও কলকাতার আদিযুগে এটি যে কালীমন্দির হিসেবেই পরিচিত ছিল, তার বহু প্রমাণ আছে। ‘ক্যালকাটা রিভিয়ু’ পত্রিকায় ১৮৪৫ সালে লেখা হয়েছিল, “Chitrapur was noted for the temple of ChitreswariDeby or the goddess of Chitru, known among Europeans as the temple of Kali at Chitpore”। এখানে আরও লেখা হয়েছিল, “This was the spot where the largest number of human sacrifices was offered to the goddess in Bengal before the establishment of the British Government.” একই ধরনের কথা পাওয়া যায় কটন সাহেবের ‘ক্যালকাটাওল্ড অ্যান্ড নিউ’ গ্রন্থেও। এই বইটির মতে এই স্থানটি ছিল “noted for the temple of Chitru or Kalee, renowned for the number of human sacrifices formerly offered at her shrine.”কলকাতা বা তার উপকন্ঠের আর একটি প্রসিদ্ধ কালীক্ষেত্র দক্ষিণেশ্বর, যা রানি রাসমণি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ১৮৫৫ সালের ৩১শে মে এই মন্দিরে ভবতারিণী কালীর মূর্তি প্রতিষ্ঠার দিনের কাহিনী পাওয়া যায় ‘সমাচার দর্পণে’। সেদিন নাকি “কলিকাতার বাজার দূরে থাকুক্‌, পাণিহাটি, বৈদ্যবাটি, ত্রিবেণী ইত্যাদি স্থানের বাজারেও সন্দেশাদি মিষ্টান্নের বাজার আগুন হইয়া উঠে। এইমত জনরব যে পাঁচশত মণ সন্দেশ লাগে।” এই দক্ষিণেশ্বরের ভবতারিণীর পূজারী হিসেবে নিযুক্ত রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের দৌলতে এই মন্দির পরবর্তী কালে বিশ্বখ্যাত হয়ে ওঠে। অথচ একথা আজ হয়তো অনেকেই জানেন না, শ্রীরামকৃষ্ণের প্রধান শিষ্য বিবেকানন্দের এই মন্দিরে প্রবেশ নিষিদ্ধ হয়েছিল সমুদ্র অতিক্রম করে ম্লেচ্ছদেশে যাবার কারণে! এই মন্দিরের কালীকে নিয়ে ইংরেজিতে চমৎকার একটি কবিতা লিখেছিলেন হরীন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়।কলকাতার প্রাচীন ও প্রথম বারোয়ারি (সম্ভবত বাংলার প্রথম বারোয়ারি কালীপূজা), মধ্য কলকাতার "আদি বারোয়ারি কালী পূজা" নামে উদযাপিত হয়ে থাকে। ১৮৫৮ সালে, জনৈক শ্রী বিহারী লাল বসুর হাতে এই পূজাটি শুরু হয়। ১৯২৪-২৬ সালের মধ্যে পূজাটি বারোয়ারি কালী পূজায় পরিণত হয়। উল্লেখ্য যে সেই সময় বাংলায় কালী পূজার প্রচলন (সর্বজনীন ভাবে) সেই রকম ভাবে ছিল না।কলিকাতা কালিকাক্ষেত্রের গল্প-ইতিহাস “এই কলিকাতা কালিকাক্ষেত্র, কাহিনী ইহার সবার শ্রুত” সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের কবিতার এই কথাগুলো কিন্তু ফেলনা নয়। কলকাতার সঙ্গে কালীর সম্পর্ক এমনকি দুর্গাঠাকুরের চেয়েও বেশি পুরোনো। কলকাতা শহর গড়ে ওঠার আগেই দূর-দূরান্ত থেকে মানুষরা এসে ভিড় করে পুজো দিতেন কালীঘাটের মন্দিরে। কেউ কেউ তো ‘কলিকাতা’ নামের পিছনেও ‘কালী’ শব্দটির খোঁজ পেয়েছেন। সে হয়তো কষ্ট-কল্পনা, কিন্তু তা বলে কালীপুজোর সঙ্গে এই শহরের সম্পর্ক খুঁজতে কল্পনাবিলাসী হওয়ার প্রয়োজন নেই। এমনিতেই শহরজোড়া একাধিক বিখ্যাত কালীমন্দির। কালীঘাটের মন্দির ছাড়াও চিৎপুরের ডাকাতে কালী, ঠনঠনিয়ার সিদ্ধেশ্বরী কালী, ফিরিঙ্গি কালী বা দক্ষিণেশ্বরের ভবতারিণী। এইসব বিখ্যাত কালীমন্দিরের সঙ্গে জড়িয়ে কত রোমাঞ্চকর ইতিহাস। নেহাত ভক্তিরসের সামগ্রী নয় সেইসব গল্প। আর, কলকাতার কালীপুজো বলতে এই বিখ্যাত মন্দিরের বাইরেও হাজারো ইতিহাস। রাজ-রাজরা, ডাকাত, জমিদার, লালমুখো সাহেব, বড়োলোক সবাই সমাপতিত সেখানে। কলকাতার সবচাইতে বিখ্যাত কালীমন্দির কালীঘাটের পুজো নিয়েই গল্পের শেষ নেই। অনেকের মতে, এই কালীই কলকাতার অধিষ্ঠাত্রী দেবী। আর, এই মন্দিরে রাজাদের দানধ্যান-ব্যয়ের কথা বললে তো শেষই হবে নাকি। রাজা নবকৃষ্ণ, শোভাবাজারের রাজা গোপীমোহন দেব, খিদিরপুরের গোকুলচন্দ্র ঘোষাল, কালীচরণ মল্লিক, ইন্দ্রচন্দ্র সিংহ, পাতিয়ালার মহারাজ, নেপালের প্রধান সেনাপতি জঙ বাহাদুর প্রভৃতি ব্যক্তির দানের কথা আগেই বলা হয়েছে।দেবীর অঙ্গসজ্জার পাশাপাশি এই মন্দিরের গড়ে ওঠার, সেজে ওঠারও বিচিত্র ইতিহাস যা ইতিপূর্বেই সংক্ষেপে বর্ণিত হয়েছে, যার তথ্য গুনে শেষ করা যাবে না। শুধু কালীঘাট নয়, কলকাতার অন্যান্য সাবেক কালীমন্দিরগুলোর ইতিহাসও কম রঙিন নয়। ‘ব্ল্যাক প্যাগোডা’নামে প্রচলিত কোম্পানীর দেওয়ান গোবিন্দরাম মিত্র প্রতিষ্ঠিত সিদ্ধেশ্বরী কালীমন্দির, , দক্ষিণেশ্বরের ভবতারিণী মন্দির, অথবা কলকাতায় নানা বড়োলোক-অভিজাত মানুষদের বাড়ির কালীপুজোয় জাঁক-জমকের অন্ত ছিল না। পাশাপাশি, বড়লোকের বাড়ির কালীপূজায় অবধারিত ছিল পশুবলি। খিদিরপুরের ন্যায়নারায়ণ ঘোষালের পুজোয় বা শোভাবাজারের কালীশঙ্কর ঘোষের বাড়ির কালীপূজার টাকার পাশাপাশি মদ্য ও রক্তেরও বন্যা বইত। শুধু পশুবলিই নয়, নরবলির ঘটনাও শোনা যেত তখন কলকাতায়। অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে কলকাতা তখন জঙ্গলাকীর্ণ এক শহর। এখানে-সেখানে ডাকাতদের ডেরা। চিতু ডাকাত-প্রতিষ্ঠিত চিত্তেশ্বরী কালী মন্দিরে ১৭৭৮ সালের এক অমাবস্যায় নাকি নরবলি হয়েছিল। কালীঘাটেও নাকি নরবলি দেওয়া হয়েছিল একবার। ডঃ ডাফ লিখেছেন, এই নরবলির ঘটনায় কোম্পানির শাসকরা ফাঁসিতেও ঝুলিয়েছিলেন কয়েকজনকে। সেদিনের কলকাতা শহর আজকের তিলোত্তমা মহানগরী নয়। তার কালীপুজোর ধরণেও তাই ভক্তিরসের সঙ্গে অনায়াসে মিশে যায় বীভৎসতারস। পশুবলিকে ঘিরে রাজা-বাবুদের উদ্দামতার বিবরণ শুনে গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে। এবং, এরই পাশাপাশি মিশে থাকে বাবু-জমিদারদের আড়ম্বরের কথাও। কালীপুজোর রাতে কারণবারি তো ‘প্রসাদ’। তার নেশা সাত্ত্বিক নেশা। সেই ‘কারণবারি’ হোক না বিলিতি। ক্ষতি কী? মহেন্দ্রনাথ দত্ত লিখেছেন, শিমলার বসুবাড়ির বিখ্যাত কালীপুজোয় ততোধিক বিখ্যাত মদ্যপানের কথা। গৃহস্থ-ভক্ত সবাই মিলে মাটির গামলায় কারণবারি নিয়ে গোল হয়ে ঘিরে বসতেন। তারপর স্ট্র থুড়ি নল দিয়ে টানতেন সুরা। আবার শোভাবাজারের কালীশঙ্কর ঘোষের বাড়িতে তো ভৃত্য-গৃহিণী কেউই সুরারসে বঞ্চিত হতেন না। একবার নাকি নেশার ঘোরে পুরুতকেই বলি দেবার উপক্রম হয়েছিল। এই নিয়ে প্রাণকৃষ্ণের মজার গল্প আছে একখানা। কারণবারি প্রসাদে চুর এক ভৃত্য পদসেবা করতে গিয়ে কিছুতেই আর বাবুর পা খুঁজে পাচ্ছে না। গোটা বাড়ি জুড়ে পায়ের খোঁজে হইহই পড়ে গেল। বাবুর পা কোথায় গেল? পুজোমণ্ডপেও পা নেই। এদিকে পায়ের অভাবে বাবু নামতে-হাঁটতে পারছেন না। শেষে গিন্নিমা আদেশ দিলেন পুরুতমশাইয়ের বাড়িতে গিয়ে খোঁজ করার। নৈবেদ্যর সঙ্গে পা-টাও ভুলক্রমে চলে গেছে হয়তো। পুরুতমশাই সব শুনে খুবই বিনয়ের সঙ্গে বললেন, এত নৈবেদ্যর মধ্যে বাবুর পা খুঁজতে রাত কাবার হয়ে যাবে। খুঁজে পেলে কাল সকালে তিনি স্বয়ং বাবুকে পা ফিরিয়ে দিয়ে আসবেন।শুধু মদ্যপানে কি আর জমে পুজো? তাই, পুজোর পরে পার্টি হত। সেই পার্টিতে সাহেব-মেমরা আসতেন। বাইজি নাচ, কবিগান, পাঁচালি, তরজা, আখড়াই-হাফ আখড়াইতে মেতে থাকত আসর। পরে যুক্ত হল যাত্রাগান আর জেলেপাড়ার সঙ। তাছাড়া ছিল আতসবাজির পসরা। কালীপ্রতিমা নিয়ে বাজনা-আলো সহকারে শোভাযাত্রাতেও বেরোতেন বাবুরা। সেই শোভাযাত্রার জাঁক নিয়ে পরস্পরের মধ্যে রেষারিষিও ছিল তীব্র। সব মিলিয়ে কালীপুজো ব্যাপারটা মোটে সাধারণ এক উৎসব ছিল না কলকাতাবাসীর কাছে।সময় গড়িয়ে গেল ঢের। গঙ্গার মূল স্রোত সরে এসে আদিগঙ্গাও শুকিয়ে পরিণত হল খালে। সেইসব বাবুয়ানি-রাজ-রাজরাদের কালও শেষ হল। মহানগরীর সেইসব কালীপুজোও মুখ লুকোল ইতিহাসে। বিখ্যাত কালীমন্দিরগুলোর পুজোর কথা অবশ্য আলাদা। প্রথা মেনে তারা আজও বহমান। কিছু সাবেক পুজোও বেঁচে-বর্তে আছে কোথাও কোথাও। কিন্তু, ফাঁকা জমি-জঙ্গলাকীর্ণ আধো আলো-আধো অন্ধকারের সেই গা ছমছমে কলকাতার গায়ে কাঁটা দেওয়া কালীপুজোরা আর নেই। ডাকাতরা নেই, বলির বীভৎসতাও নেই। কিন্তু, ইতিহাসের গপ্পেরা এত সহজে মরে না। আতসবাজির মতো আকাশজুড়ে তাদের ছড়িয়ে পড়তে দেখাও কম লোভনীয় নয়।কত যে কালী কলকাতায়। এমনটা কোনও শহরে নেই। শাক্তধর্মের এমন জনপ্রিয়তা বঙ্গদেশ ছাড়া কোথাও মিলবে না। বিশ্বসৃষ্টির আদিকরণ তিনি। আবার অন্যমতে, ইনিই আদ্যাশক্তি মহাময়ী। তন্ত্র ও পুরাণে কালিকার নানা রূপভেদ যা পূর্বেই আলোচিত হয়েছে। বাংলা জুড়ে অবশ্য তার নানা নাম। কলকাতার উত্তরে দক্ষিণেশ্বরে তিনি মা ভবতারিণী আবার দক্ষিণের কালীঘাটে দেবী কালিকা। আদ্যাপীঠে আদ্যাকালী, কাশীপুরে চিত্তেশ্বরী, ঠনঠনিয়ায় সিদ্ধেশ্বরী, বউবাজারে ফিরিঙ্গি, কেওড়াতলায় শ্মশানকালী, টালিগঞ্জে করুণাময়ী, নিমতলায় আনন্দময়ী। কালীময় কলকাতার কথা কয়েক আঁচড়ে আঁকার চেষ্টা রইল এখানে। অবশ্যই সবার কথা বলা গেল না।ক্ষেত্রবিশেষে কিছু কিছু পুনঃকথন হলেও কলকাতার কিছু কালী মন্দির বিশেষ উল্লেখের দাবী রাখে।কালীঘাটের দেবীকালিকা: কালীঘাটের মন্দিরের গুরুত্ব বেড়েছে প্রকৃতপক্ষে সপ্তদশ শতাব্দীর শেষ দিকে। কালীঘাটে দেবীর চারটি আঙুল পড়েছিল। দেবী কালিকার ভৈরব নকুলেশ্বর। কিংবদন্তী কাশীর মতো পুণ্যক্ষেত্র কালীঘাটে কীটপতঙ্গ মরলেও সঙ্গে সঙ্গে তারা মুক্তি পেয়ে যায়। এই কালীপীঠ গড়ে ওঠার পিছনে নানা কাহিনির জাল বিস্তৃত। এমন একটা কাহিনি হল:যশোরের রাজা প্রতাপাদিত্যের খুল্লতাত শ্রীবসন্ত রায় একটি ছোট মন্দির নির্মাণ করেছিলেন। সেই সময় দেবীর সেবায়েত ছিলেন ভুবনেশ্বর ব্রহ্মচারী। তিনি ছিলেন অপুত্রক। তাঁর দৌহিত্র হালদাররাই বর্তমানে কালীঘাটের বিখ্যাত বংশ। মন্দিরের পূজা এখনও করে চলেছেন তাঁরা। বর্তমান মন্দির নির্মাণ হয় উনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে। শোনা যায় সাবর্ণ চৌধুরীর পরিবারের সন্তোষ রায় পঁচিশ হাজার টাকা ব্যয়ে বাংলার নিজস্ব ঘরানার চার চালা এবং তার উপর আর একটি ছোট চারচালার শিখর সমেত মন্দিরটি নির্মাণ শুরু করেছিলেন। তাঁর পুত্র রামনাথ রায় ও ভ্রাতষ্পুত্র রাজীবলোচন রায় ১৮০৯ সালে মন্দির নির্মাণ সম্পূর্ণ করেন। পরবর্তী কালে আন্দুলের জমিদার কাশীনাথ রায় নাটমন্দির গড়ে দেন। নহবত্‌খানা ও দুটি ভোগের ঘর তৈরি করে দিয়েছিলেন গোরক্ষপুরের টিকা রায়। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিও মন্দিরের জন্য দুশো বিঘা জমি দান করেছিলেন। কালীঘাটের দেবীকালিকার রূপ মাহাত্ম্যের কথা তো আগেই বলা হয়েছে।কালীঘাটের মূল পূজা মূলত আটটি। রক্ষাকালী পুজো, স্নানযাত্রা, জন্মাষ্টমী, মনসাপুজো, চড়ক, গাজন ও রামনবমী। কালীপুজোর রাতে দেবীকে পুজো করা হয় লক্ষ্মীরূপে। কালী-শ্যামা নন দীপাবলিতে আরাধিত হন লক্ষ্মী।দক্ষিণেশ্বরের মা ভবতারিণী: কথিত রয়েছে এক বার কাশীযাত্রার আগের দিন ভোর রাতে জানবাজারের রানি মা রানি রাসমণির স্বপ্নে দেখা দিলেন মা জগদম্বা। রানিকে বললেন গঙ্গার পূর্ববর্তী তীরে মন্দির স্থাপনা করতে। কাশী যাওয়ার দরকার নেই। সেই স্বপ্নাদেশ শিরোধার্য করে ১৮৪৭ খ্রিস্টাব্দে ৬ সেপ্টেম্বর কলকাতা থেকে ছ’কিলোমিটার দূরে ভাগীরথীর তীরে সুপ্রিম কোর্টের অ্যাটর্নি জেমস হেস্টির কাছ থেকে ৬০ বিঘা জমি ৬০ হাজার টাকায় কিনলেন। ১৮৫৫ খ্রিস্টাব্দের ৩১ মে স্নানযাত্রার দিন গড়ে তুললেন সাদা রঙের নবরত্ন মন্দির। কাজটা সহজ ছিল না। কৈর্বত্য হরেকৃষ্ণ দাসের মেয়ে মন্দির গড়বে। এ ‘আস্পর্দা’ সে দিন মেনে নিতে পারেননি কুমারহট্ট হালিশহরের ব্রাহ্মণ ও উচ্চবর্ণের সমাজপতিরা। শেষপর্যন্ত সব বাধা দূর করে প্রতিষ্ঠিত হল কষ্ঠিপাথরের দেবীমূর্তি। সাধ করে রাসমণি তার নাম রাখলেন ভবতারিণী। মন্দিরের মেঝে শ্বেত ও কৃষ্ণ প্রস্তরাবৃত। সোপানযুক্ত উঁচুবেদী। বেদীর উপর সহস্র দল রৌপ্যপদ্ম। তার উপর দক্ষিণে মাথা ও উত্তরে শয়ান শ্বেতপাথরের শিবমূর্তি। মহাদেবের বুকের উপর ত্রিনয়নী ভবতারিণী রঙিন বেনারসি ও মহামূল্যবান রত্নঅলঙ্কারে ভূষিতা। ১৮৫৭-৫৮ খ্রিস্টাব্দে দাদা রামকুমার চট্টোপাধ্যায়ের কাছ থেকে পুজোর দায়িত্ব পান শ্রীরামকৃষ্ণ। এই মন্দিরই এই যুগাবতারের সাধনপীঠ।ঠনঠনিয়ার সিদ্ধেশ্বরী কালী: বর্তমান মন্দিরটি তৈরির অনেক আগেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল সিদ্ধেশ্বরী কালী এমন একটা মত প্রচলিত রয়েছে। জনশ্রুতি, উদয়নারায়ণ-ব্রহ্মচারী নামে এক তান্ত্রিক আনুমানিক ১৭০৩ খ্রিস্টাব্দে মাটি দিয়ে সিদ্ধেশ্বরী রূপের কালীর্মূতি গড়েন। তখন স্থানটি ছিল জঙ্গলাকীর্ণ। ১৮০৬ খ্রিস্টাব্দে শঙ্কর ঘোষ নামে এক ধনী ব্যক্তি কালীমন্দির ও পুষ্পেশ্বর শিবের আটচালা মন্দির নির্মাণ করেন। পুজোর ভারও নেন তিনি। কার্তিক অমাবস্যায় আদিকালীর পুজো ছাড়াও জৈষ্ঠ্যমাসে ফলহারিণী এবং মাঘ মাসে রটন্তী কালীর পুজো হয়।কাশীপুরের চিত্তেশ্বরী সর্বমঙ্গলা: গভীর জঙ্গল ঘেরা এক স্থান। ভাগীরথীর তীরে। সে জঙ্গলে বাস দুর্ষর্ধ ডাকাত দলের। সেই ডাকাত দলের পাণ্ডা রঘু ডাকাত। এই ডাকাত সর্দারের হাতেই প্রতিষ্ঠা পায় চিত্তেশ্বরী। নিয়মিত নরবলি হত এখানে। সর্দারের মৃত্যুর পর দায়িত্ব নেন রামশরণ সিমলাই নামে এক ব্রাহ্মণ। তিনি স্বপ্নাবিষ্ট হয়ে কাশীপুর গান অ্যান্ড শেল ফ্যাক্টারি রোড বা বর্তমানে খগেন চ্যাটার্জি রোডে নতুন বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করেন। রামশরণ প্রতিষ্ঠিত বিগ্রহটি নিমকাঠের রক্তবর্ণা ত্রিনয়নীদেবী চতুর্ভুজা ও সিংহবাহিনী। দেবীর হাত বর, অভয় মুদ্রা, খড়্গ ও কমণ্ডুলে বিভূষিতা। কথিত, রামপ্রসাদ কলকাতা থেকে হালিশহর নৌকাযোগে যেতে যেতে দেবীকে গান শুনিয়েছিলেন, ‘মা তারিণী শঙ্কর বৈরাগী তোর নাং...।’ মূল মন্দিরটি ১৬১০ খ্রিস্টাব্দে নির্মাণ করেছিলেন হুগলি জেলার মনোহর ঘোষ ওরফে মহাদেব ঘোষ।কাশীপুর আদি চিত্তেশ্বরী দুর্গা: এই দেবীর কাহিনিও প্রায় এক। তবে এখানে ডাকাতের নাম চিতু বা চিত্তেশ্বর রায়। ডাকাতি করতে যাওয়ার আগে চিতু ষোড়শপচারে দেবীর পুজো করত। আদি চিত্তেশ্বরী বলার কারণ কথিত প্রায় পাঁচশো বছর আগে এই দেবীর প্রতিষ্ঠা হয়েছিল। দেবীর নামেই জায়গাটির নাম চিত্‌পুর হয়ে ওঠে। এই দেবীও নিমকাঠ দিয়ে তৈরি। দেবীর বিগ্রহের সঙ্গে রয়েছে একটি বাঘের মূর্তি। জমিদার গোবিন্দরাম মিত্র মন্দিরটি পুনঃনির্মাণ করেছিলেন।বউবাজারের ফিরিঙ্গি কালী: ১৪৩৭ খ্রিস্টাব্দে তখন কোথায় কলকাতা কোথায় চিত্তরঞ্জন অ্যাভিনিউ। গভীর জঙ্গল, শ্মশান, অদূরে ভাগীরথী। সেই শ্মশানে ছোট একটি চালা ঘরে প্রতিষ্ঠিত ছিল শিবলিঙ্গ ও দেবীকালিকায় বিগ্রহ। শ্মশানে প্রতিষ্ঠিত হলেও দেবী ছিলেন সিদ্ধেশ্বরী। কালের বিবর্তনে শহর গড়ে উঠল। জনপদ সৃষ্টি হল। আনাগোনা শুরু হল পতুর্গিজ ও ইংরেজদের। তাদের মধ্যে ছিলেন পতুর্গিজ খ্রিস্টান অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি। এই ফিরিঙ্গি কালীভক্তের দৌলতে সিদ্ধেশ্বরী কালী লোকমুখে হয়ে উঠলেন ফিরিঙ্গি কালী। ১৮২০-১৮৮০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত এই মন্দিরের পূজারী ছিলেন শ্রীমন্ত পণ্ডিত। সাড়ে পাঁচ ফুট উচ্চতার বিগ্রহ ত্রিনয়নী। এই মন্দিরে শিব ও সিদ্ধেশ্বরী কালী ছাড়াও দুর্গা, শীতলা, মনসা ও নারায়ণের মূর্তি প্রতিষ্ঠিত রয়েছে। প্রতি পূর্ণিমায় সত্যনারায়ণ ও অমাবস্যায় বিশেষ কালীপুজো হয়ে থাকে।কলকাতার কালী মাহাত্ম্যের এ এক সামান্য অংশ। কলকাতার উত্তর থেকে দক্ষিণ ঐতিহ্যপূর্ণ কালী-মন্দিরের সংখ্যা অন্তত তিন ডজন। রাজ্যে সাধনপীঠ ও সতীপীঠ যোগ করলে সে সংখ্যাটি কমপক্ষে ২২২। এই সংখ্যাটি পরিণত ও জনপ্রিয় কালীমন্দির বা পীঠের। এ ছাড়াও এই শহর ও রাজ্যের নানা প্রান্তে জমিদার ও বনেদিবাড়িগুলিতে রয়েছে বহু কালীমন্দির। কলকাতায় এমনই বিখ্যাত ছয় বনেদিবাড়ি হল, হাটখোলার রামচন্দ্র দত্ত। হাটখোলারই জগত্‌রাম দত্ত। দর্জিপাড়ার নীলমণি মিত্র স্ট্রিটের মিত্রবাড়ি। সিমলার রামদুলাল সরকার ও সিমলারই তারক প্রামাণিকের বাড়ি।কালীর এই ভয়াবহ নগ্নিকা মূর্তি-ভাবনার পিছনে আদিম কোনও ধর্মধারা বা ‘কাল্ট’ এর প্রভাব রয়েছে বলে অনুমান করেন সমাজবিদেরা। তাঁদের অনেকেরই মতে কালী আদতে কোনও বৈদিক দেবী নয়। এ দেশের লোকায়ত মাটি থেকেই তার উদ্ভব। কোনও এক নগ্নিকা খড়্গ-মুণ্ডমালা শোভিতা যখন দেবী হিসাবে পূজিত হচ্ছেন তখন তা আদিম অরণ্যচারী মানুষের সংস্কৃতির কোনও ঐতিহ্যকে বহন করছে বলে মনে করা হয়। পরবর্তী কালে আর্য ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতির দেবীভাবনার সঙ্গে যুক্ত হয়ে কালী হিন্দু-ব্রাহ্মণ্যতন্ত্রের দেবীতে রূপান্তরিত হয়েছেন।"ওঁ ক্রীং কালিকায়ৈ নমঃ"তথ্যসূত্র:---১- Tantric visions of the divine feminine: th e ten mahavidyas By David R. Kinsley.২- Mother of my heart, daughter of my dreams By Rachel Fell McDermott.৩- Encountering Kali: in the margins, at the center, in the West By Rachel Fell McDermott, Jeffrey John Kripal.৪- The camphor flame: popular Hinduism and society in India By Christopher John Fuller..৫. বঙ্গদর্শন ও আনন্দবাজার পত্রিকা। ৬. পণ্ডিত শ্যামাচরণ কবিরত্ন বিরচিত শ্রী শ্রী কালীপূজা পদ্ধতি।৭. শ্রী শ্রী চণ্ডী // নীলিমা সান্যাল।৮. ইন্টারনেট // গুগল সার্চ।৯. বিশেষ কৃতজ্ঞতা স্বীকারঃ শুভজিৎ মুখার্জী।

কর্মতাপস আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় আদতে এক প্রফুল্ল স্মৃতি ।

একটি নারীই সবচেয়ে শক্তিশালী ও কার্যকর নেতৃত্ব দিতে পারেন ।।