সনাতন ঋষি-মুনি, বেদ-উপনিষদ এবং এক মহৌষধী - "সোমরস" ।

*সনাতন ঋষি-মুনি, বেদ-উপনিষদ এবং এক মহৌষধী - "সোমরস" ।*

*প্রসূন কাঞ্জিলাল*

প্রাচীনকালে অনেক ধার্মিক লোক ছিলেন ৷ তাদের মধ্যে অনেকে অরণ্যে বসে ঈশ্বরের তপস্যা করতেন৷ তাদের কোনো লোভ লালসা ছিল না ৷ তারা তপস্যার দ্বারা লোভ লালসা জয় করেছিলেন৷ ধর্ম সম্পর্কেও তাদের অনেক জ্ঞান ছিল৷ তাদের বলা হতো মুনি৷ যেসব ঊচ্চস্তরের মুনি তপস্যাবলে বেদমন্ত্র প্রকাশ করতে পারতেন তাঁদের বলা হতো ঋষি ৷ বেদের কবিতাগুলোকে বলা হয় মন্ত্র ৷ মুনি-ঋষিরা ছিলেন সেকালের শিক্ষক , জ্ঞান বিজ্ঞানের নানা বিষয়ের উদ্ভাবক ৷ কয়েকজন বিখ্যাত মুনি-ঋষি হলেন ---অত্রি, কশ্যপ, গৌতম, বশিষ্ঠ, বিশ্বামিত্র , কণ্ব , মৈত্রেয়ী,গার্গী প্রভৃৃৃৃতি৷

প্রাচীন প্রার্থনাগাথা বেদ-এর প্রাচীন ঋক থেকে (বেদপংক্তির যজ্ঞীয় ব্যবহার-বিষয়ক ব্রাহ্মণ ও অরণ্যচারীদের প্রয়োজনীয় বেদপংক্তি-সংকলন আরণ্যক হয়ে ) জ্ঞানান্বেষী উপনিষদ পর্যন্ত বিস্তৃত হিন্দুশাস্ত্ররাশির রচয়িতা বা দ্রষ্টা সকলে ঋষি বা ঋষিকা ব'লে পরিচিত ছিলেন।

তৈত্তিরীয় আরণ্যক এ বলা হয়েছে :---

"তপ বা গভীর ধ্যানের সাহায্যে যারা বৈদিক মন্ত্রার্থ বুঝতে পারে তাদেরকে সর্বশক্তিমানের কৃপায় ঋষি বলা যায় ।"

বেদের শব্দসংকলক "যাস্ক" তার  "নিরুক্ত" গ্রন্থে বলেছেন যে :------

ধর্মজ্ঞানী ব্যক্তিরাই (মন্ত্র)দ্রষ্টা বা ঋষি বা বৈদিক মন্ত্র যারা অনুধাবন করতে সক্ষম তারাই ঋষি।

ঋষিদের মননশীল সুদীর্ঘ জ্ঞানযাত্রা :----

প্রায় ছ'সহস্রাধিক বছরের সুদীর্ঘ যাত্রাটির শুরু হয়েছিল নক্ষত্রাদির প্রতি অগ্নিকে বাহক কʼরে ঋষিদের গোত্র বা বংশ-পরম্পরা অনুসরিত অজস্র পূরণমূলক আকাঙ্খা ও ধারণাশ্রয়ী অভিজ্ঞতার যৌথায়নে নির্মিত সূক্তমালা দিয়ে ।


অতঃপর সকল বৈপরীতাদিকে সমন্বয় এর গোলকধাঁধার মায়াবী চমকাদির সাহচর্য্যেই অবশেষে জ্ঞানান্বেষী উপনিষদসমূহের মননশীল চলমানতায় প্রাপ্ত একেশ্বরমুখী গন্তব্যে এসে একীভূত ও স্থিত । ঋষিদের মধ্যে প্রাচীনতম হচ্ছেন ঋগ্বেদীয় ঋষিরা । 

এদেরই একজন "সংবনন ঋষি" বলছেন :----

"আকূতিসব একই হোক
হৃদয়াদি একই হোক
মনেরা সব একই হোক।"

'ঋষ্’ ধাতুর অনেকগুলি অর্থের মধ্যে একটি অর্থ হচ্ছে ঊধর্বগতি অর্থাৎ ওপরের দিকে ওঠা ৷ কোন বাড়ীর একতলা থেকে ওপরে ওঠার জন্যে এই ‘ঋষ্’ ধাতু ব্যবহৃত হয়৷ ‘ঋষ্’ ধাতুূ ‘ইন্’ করে ‘ঋষি’ শব্দ পাচ্ছি যার ভাবারূূরার্থ হচ্ছে যিনি ওপরের দিকে ওঠেন আর যোগারূূরার্থ হচ্ছে উন্নতমানস.....উন্নতধী...উন্নত ভাবনার পুরুষ৷ ‘ঋষি’ শব্দের স্ত্রীলিঙ্গ রূপ ‘ঋষ্যা’ হলেও অভিন্নলিঙ্গ ‘ঋষি’ শব্দটিও চলতে পারে৷ অর্থাৎ কোন পুরুষকে যেমন ‘ঋষি’ বলা যায় কোন নারীকেও তেমনি ‘ঋষি’ বলা যেতে পারে আবার ‘ঋষ্যা’ তো চলতেই পারে। উন্নত চেতনার মানুষদের ঋগ্বেদীয় যুগ থেকে ‘ঋষি’ বলে আসা হয়েছে৷ প্রতিটি মন্ত্র যেমন একটি ছন্দে রচিত, অধিকাংশ মন্ত্র যেমন পরমপুরুষের একটি বিশেষ নামে সম্বোধিত, তেমনি প্রতিটি মন্ত্রেরই একজন করে দ্রষ্টা–ঋষি থাকতেন যিনি তাঁর সাধনায় বা ধ্যানধারণায় সত্যকে উপলব্ধি করে তা শিষ্যকে কানে কানে শুনিয়ে দিতেন (গোড়ার দিকে অক্ষর ছিল না৷ তাই লিখে শেখানো সম্ভব ছিল না৷ যেহেতু লিপি ছিল না তাই ‘লেখক–ঋষি’ বলা হত না–বলা হত দ্রষ্টা–ঋষি, অর্থাৎ যে ঋষি ধ্যানে সত্যকে দেখেছেন)৷

ঋগ্বেদীয় যুগ থেকে ঋষিদের মুখ্যতঃ  সাতটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে ৷ 

এই সাতটি শ্রেণি হলো -- ব্রহ্মর্ষি,দেবর্ষি,মহর্ষি,পরমর্ষি, কান্ডর্ষি, শ্রুতর্ষি,রাজর্ষি৷

১-ব্রহ্মর্ষি----ব্রহ্ম বা ঈশ্বর সম্পর্কে যাঁদের বিশেষ জ্ঞান আছে তাদেরকে বলা হয় ব্রহ্মর্ষি ৷এমন এক ঋষির নাম হলো বশিষ্ঠ৷ যাঁরা আজীবন আধ্যাত্মিক এষণাতে জীবন অতিবাহিত করে দিতেন তাঁদের বলা হত ব্রহ্মর্ষি (যেমন ব্রহ্মর্ষি কণ্ব, অথর্বা প্রভৃতি)৷ অথর্ববেদের সময় অথর্ববেদের প্রবক্তা বা আদি পুরুষ (বৈদিক ভাষায় ‘আদর্শ পুরুষ’) অথর্বাকে ব্রহ্মর্ষি বলে মর্যাদা দেওয়া হ’ত৷ আর মহর্ষির মর্যাদায় সম্মানিত হতেন বেশ কয়েকজন ঋষি৷ তাঁদের মধ্যে আট জনের নাম বিশেষভাবে উল্লেখ্য৷ তাঁরা হলেন–মহর্ষি অত্রি, অঙ্গিরা, অঙ্গিরস, পুলহ, পুলস্ত, সত্যবাহ, বশিষ্ঠ ও বৈদর্ভি৷ যাঁরা ভাবেন বেদ সামগ্রিকভাবে বহির্ভারতে রচিত তাঁদের এই ভাবনা নিরঙ্কুশ হতে পারে না৷ অন্ততঃ অথর্ববেদের ক্ষেত্রে তো নয়–ই৷ বৈদর্ভি নামটিতেই প্রমাণিত হয় যে তিনি ছিলেন বিদর্ভের অর্থাৎ নাগপুর–মরাবতী অঞ্চলের মানুষ৷ মহর্ষি বৈদর্ভি মধ্য এশিয়ায় গিয়ে সেখানে বসে বসে অথর্ববেদ তৈরী করেছিলেন এমন কথা বলা কিছুটা কষ্টকল্পিত৷ তবে হ্যাঁ, সামগ্রিকভাবে অথর্ববেদ এদেশে রচিত নাও হয়ে থাকতে পারে৷ মহর্ষি অথর্বা অথর্ববেদের আদর্শ পুরুষ ছিলেন৷ তাঁকে প্রাচীন পুরুষ হিসেবেও শ্রদ্ধা করা হত৷ এখনও আমরা অধিক বয়স্ক্ মানুষের সম্বন্ধে বলে থাকি, ‘‘তিনি অথর্ব হয়ে পড়েছেন’’৷

২--দেবর্ষি --যিনি দেবতা হয়েও ঋষি তাকে বলা হয় দেবর্ষি৷ দেবর্ষি স্বর্গে বাস করেন৷ যাঁরা দেবকুলে (নর্ডিক, এ্যলপাইন অথবা মেডিটারেনিয়ান উপবর্গীয় ও ককেশীয় বর্গীয় কুলে) জন্মগ্রহণ করে সাধনার দ্বারা আধ্যাত্মিক চেতনায় অধিষ্ঠিত হতেন তাঁদের বলা হত দেবর্ষি (যেমন, দেবর্ষি নারদ) । 

৩--মহর্ষি- ঋষিদের মধ্যে যারা প্রধান ও মহান তাদের বলা হয় মহর্ষি৷এমন এক ঋষির নাম হলো ব্যাসদেব৷ যে সকল মানুষ তাঁদের জাগতিক কর্ত্তব্য যথাবিধি সম্পাদন করার সঙ্গে সঙ্গে ঊধর্বতর জগতের খোঁজে ধ্যান–ধারণা–সাধনা (আরণ্যক ও উপনিষদ) প্রভৃতি করতেন ও তৎসহ সেই অধ্যাত্ম মার্গে সিদ্ধিলাভ করে জগতের সেবা করতেন তাঁদের বলা হত মহর্ষি (যেমন, মহর্ষি বিশ্বামিত্র)৷

৪--পরমর্ষি--পরম ব্রহ্মকে যিনি দর্শন করেছেন তিনি পরমর্ষি৷এমন এক  ঋষির নাম হোলো পৈল৷

৫-কান্ডর্ষি-- বেদের দুটি কান্ড৷ কর্মকান্ড ও জ্ঞানকান্ড৷ কর্মকান্ডে আছে যাগযজ্ঞের কথা ৷আর জ্ঞানকান্ডে আছে জ্ঞানের কথা ও ব্রহ্মের কথা ৷বেদের কোনো কান্ড সম্পর্কে  জ্ঞানী ঋষিদের বলা হয় কান্ডর্ষি ৷যেমন--জৈমিনি, বেদের কর্মকান্ডের ব্যখ্যা করেছেন৷

৬-শ্রুতর্ষি--বেদ ঈশ্বরের বাণী ৷ঋষিরা তপস্যা করে বেদমন্ত্র লাভ করেছেন৷কিন্তু এভাবে সকল ঋষি বেদমন্ত্র লাভ করেন নি৷ কেউ কেউ অন্য ঋষির কাছ থেকে শুনেছেন৷ যারা শুনে শুনে বেদমন্ত্র লাভ করেছেন তাদের বলা হয় শ্রুতর্ষি ৷এমন এক ঋষির নাম হলো সুশ্রুত ৷

৭-রাজর্ষি--রাজা হয়েও  যিনি ঋষি তাকে বলা হয় রাজর্ষি৷ তিনি ঋষির মতো জ্ঞানী৷ ঋষির মতো আচরণ করেন৷ যাঁরা জাগতিক কর্তব্যের অতিরিক্ত সামাজিক কর্তব্য (যেমন, রাজা) প্রতিপালনের সঙ্গে সঙ্গে নিজের হৃদয়বৃত্তিকে...মনীষাকে আধ্যাত্মিক চেতনায় অভিক্লপ্ত করতেন ( হৃদামনীষা মনসাহভিক্লপ্তঃ ) তাঁদের বলা হত রাজর্ষি  (যেমন, রাজর্ষি জনক) । এমন এক ঋষির নাম রাজা জনক। 


মনে রাখা দরকার, ‘ঋষি’ আর ‘মুনি’ এক জিনিস নয়৷  ‘মুনি’ শব্দ মুখ্যতঃ দু’টি অর্থে ব্যবহূত হয়ে থাকে৷ ‘মুনি’–র একটা মানে হচ্ছে ‘মননশীল সত্তা’৷ অর্থাৎ  intellectual ‘মুনি’–র দ্বিতীয় মানে হচ্ছে যিনি তাঁর মনকে পরমপুরুষে সংলীন করে রেখেছেন–
‘‘ন মুনির্দুগ্ধৰালকঃ মুনিঃ সংলীনমানসঃ৷’ ( ‘‘ শব্দ চয়নিকা’’ দ্বিতীয় খণ্ড। )

হিন্দু মতে- যিনি জ্ঞানমার্গ অবলম্বনে সংসার ত্যাগ করতে পারেন তিনিই ঋষি। অথবা পরমার্থ তত্ত্বে যিনি সম্যক দৃষ্টি রাখেন তিনিই ঋষি। তবে মন্ত্রদ্রষ্টা মুনি, বেদমন্ত্র-রচয়িতা, তাপস, জ্ঞানী, সাধু, তন্ত্রোক্ত মন্ত্রের উপাসনায় সিদ্ধ ইত্যাদি গুণের অধিকারীরাই ঋষি নামে অভিহিত হয়ে থাকেন। হিন্দু শাস্ত্রমতে ঋষি সাত প্রকার। যথা- শ্রুতর্ষি, কাণ্ডর্ষি, পরমর্ষি, মহর্ষি, রাজর্ষি, ব্রহ্মর্ষি ও দেবর্ষি।

আদি  রামায়ণে উক্ত সাত প্রকার ঋষি ছাড়াও আরও প্রায় ২০ প্রকার ঋষির নাম পাওয়া যায়। এঁরা হলেন-

১। বৈখানস : যাঁরা ব্রহ্মার মুখ থেকে উৎপন্ন।

২। বালখিল্য : যাঁরা ব্রহ্মার লোম থেকে উৎপন্ন।

৩। মরীচিপ : যাঁরা সূর্যকিরণ পান করে জীবনধারণ করেন।

৪। সংপ্রক্ষাল : যাঁরা বিষ্ণুর পাদপ্রক্ষালন জল থেকে উৎপন্ন।

৫। অশ্মকুট্ট : যাঁরা অপক্বকুট্টিতান্ন ভোজনে জীবনধারণ করেন।

৬। আকাশনিলয় : যাঁরা সবসময় অনাবৃত স্থানে বাস করেন।

৭। অনবকাশিক : যাঁরা কোন পা পরিবর্তন না করে এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকেন।

৮। দন্তোলূখল : যাঁরা আহারের সকল দ্রব্য দাঁত দ্বারা পেষণ করে ভক্ষণ করেন।

৯। অশয্যা : যাঁর কখনো শয়ন করেন না বা ঘুমান না।

১০। পত্রাহার : যাঁরা গাছের পাতা ছাড়া আর কিছু খান না।

১১। উন্মজক : যাঁরা আকণ্ঠ জলে দাঁড়িয়ে থেকে ভগবানের ধ্যান করেন।

১২। গাত্রশয্যা : যাঁরা মাটিতে শয়ন  করেন।

১৩। বায়ুভক্ষক : যাঁরা বাতাস ভক্ষণ  করে জীবনধারণ করেন।

১৪। জলাহার : যাঁরা জল গ্রহণ করে  জীবনধারণ করেন।

১৫। আদ্রপট্টবাস : যাঁরা ভেজা কাপড়ে অবস্থান করেন।

১৬। স্থণ্ডিলশায়ী : যাঁরা যজ্ঞস্থলের মাটিতে শয়ন করে রাত্রি যাপন করেন।

১৭। উধ্ববাস : যাঁরা গিরি শিখরে অবস্থান করেন।

১৮। তপোনিষ্ঠ : যাঁরা সকল সময় তপে নিযুক্ত থাকেন।

১৯। পঞ্চতাপান্বিত : যাঁরা গ্রীষ্মকালে পঞ্চতাপের মধ্যে তপস্যা করেন।

২০। সজপ : যাঁরা সর্বদা জপ করেন। ইত্যাদি। 

এছাড়া মহাভারতে বানপ্রস্থ, ফলাহারী, মূলাহারী প্রভৃতি আরো কয়েক প্রকার ঋষির নাম পাওয়া যায়।

শৌণক তাঁর "বৃহদ্দেবতা" নামক গ্রন্থে ঋগ্বেদ রচয়িতৃ ঋষি/ঋষিকাদেরকে তাদের রচিত ঋক ও সূক্তের ভাব ও বিষয় অনুযায়ী দেবোপাসক , ঋষি-দেববাচী ও আত্মস্তুতক - এ তিন শ্রেণীতে বিন্যস্ত করেছেন ।

ক) দেবোপাসক -----
খ) দেব-ঋষিবাচী ------
গ) আত্মস্তুতক ------



মুনি ঋষিদের অনেক গুণ ৷ তারা সব সময় সকলের মঙ্গল কামনা করেন৷ জগতের মঙ্গল কামনা করেন৷ জগতের মঙ্গলের জন্য  তারা নিজের জীবন পর্যন্ত বিসর্জন দান করতে পারেন৷  তাদের কাছ থেকে আমরা অনেক জ্ঞানের কথা জানতে জানতে পাই৷ বিশ্বের সকলের মঙ্গলের কথা পাই৷ আমরাও তাদের মতো জ্ঞানী হবো৷ তারা যেমন  সকলের মঙ্গল করেছেন আমরাও তেমনি সকলের মঙ্গল করবো ৷ তাদের মতো ধর্মীয় হবো আমরা ৷ তাদের মতো জ্ঞানী হবার চেষ্টা চালিয়ে যাব।

নশ্বর এই পৃথিবীতে মানুষের চিরকালের আকাঙ্ক্ষা ছিল অমর হওয়ার। শুধুমাত্র এই অমরত্ব লাভের উপায় খুঁজতে অনেকেই নিজের জীবন অতিবাহিত করেছেন। প্রাচীন যুগের যোগীদের থেকে শুরু করে আধুনিক যুগের গবেষকরা পর্যন্ত সমুদ্র, পাহাড়-পর্বত পাড়ি দিয়েছেন অমরত্ব লাভের খোঁজে। সন্ধান করেছেন অমৃত সুধা। যা পারে নিজের অস্তিত্বকে সমগ্র মহাজগতের সঙ্গে এক করে ফেলতে, নিয়ে যেতে পারে জাগতিক দর্শনের ঊর্ধ্বে। মানুষকে করতে পারে সর্বশক্তিধর, নিরোগ, সুস্বাস্থ্যের অধিকারী এবং ধনরত্নপ্রদায়ক।

সোমলতা বা সোমরস তেমনি এক উপাদান। হাজার হাজার বছর ধরে চলছে অনুসন্ধান। গবেষণা চলছে এখনো। কারণ ধারণা করা হয় এই সোমলতা থেকে নির্গত সোমরস মানুষকে এনে দিতে পারে অমরত্ব! সোমরস বৈদিক চিন্তার একধরনের মহাজাগতিক শক্তি। একধরনের আধ্যাত্মিক নীতি। উদ্ভিদ জগতের প্রতিরূপ হলো এই সোমরস।

মূলত সোম হলো গুল্ম বা লতা। এই লতার রস ছিল আর্য এবং প্রাগবৈদিক যুগের ঋষিদের অতি প্রিয় পানীয়। সোমরস বিন্দু বিন্দু করে ক্ষরিত হতো বলে এর নাম দেয়া হয়েছিল "ইন্দু"। এই রস হতে একধরনের উত্তেজক তরল প্রস্তুত হতো। প্রাচীন মুনি-ঋষিদের বিশ্বাস ছিল সোমরস পান শুধু তাদের শক্তি এবং সাহস দেবে তাই নয়; বরং এটি পান করলে ধনার্জনে পারঙ্গমতা লাভ করবে এবং বেড়ে যাবে সন্তান উৎপাদনের ক্ষমতা। সোমরস ছিল যজ্ঞের প্রধান আহুতি।


সোমলতা থেকে সোমরস তৈরি হতো। দেবতাদের উদ্দেশ্যে বিশেষ করে ইন্দ্রের উদ্দেশ্যে সোমরস অগ্নিতে আহুতি দেয়া হতো। ঋগ্বেদের নবম মণ্ডলে সোম দেবতা নামে সোমের স্তুতি করা হয়েছে। বলা হয় বহুকাল আগেই সোমলতা বিলুপ্ত হয়েছে কিন্তু তা কতটা ঠিক তা নিয়ে প্রশ্ন তো উঠবেই। এত জনপ্রিয় পানীয় সত্যিই  কি হারিয়ে গেছে?

লতা অর্থে শুধু পেচিয়ে গাছে জড়ানো উদ্ভিদ নয় বরং শীর্ণ কাণ্ড বিশিষ্ট উদ্ভিদও হতে পারে। বৈদিক যুগে হয়তো তেমনটাই বোঝাত। কেননা বেদে সোমলতার যে গাঠনিক বর্ণনা দেয়া হয়েছে তার সাথে কাণ্ডবিশিষ্ট উদ্ধিদের মিল পাওয়া যায়।

যেমন:---

১. সোমলতার পাতা বিচিত্রকুশযুক্ত।
 (ঋগ্বেদ, ১/২৩/১৩,১৪) 

২. হে সোম! তোমার যে দুটি পাতা বক্রভাবে অবস্থিত ছিল তদ্বারা তোমার সর্বাপেক্ষা চমৎকার শোভা হয়েছিল।
 (ঋগ্বেদ, ৯/৬৬/২) 

৩. হে সোম, তোমার চতুর্দিকে লতা অবস্থায় যে সকল পত্র বিদ্যমান ছিল তদ্বারা তুমি সকল ঋতুতে সুশোভিত ছিলে। 
(ঋগ্বেদ, ৯/৬৬/৩) 

৪. এ সোম, শৃঙ্গ যূথপতি বৃষভের ন্যায় তীক্ষ্ম।
 (ঋগ্বেদ, ৯/১৫/৪) 

উপরের বর্ণনাগুলিতে বর্তমানের ইক্ষু তথা আখ গাছের সাথে হুবহু মিলে যায়। আখের দুটি পাতা বাকা, আখ একবর্ষজীবী ৩নং. মন্ত্রে তা বলা হয়েছে। আবার এর পাতা ষাড়ের শিং এর ন্যায় ৪নং. এ বলা হয়েছে। শুধু তাই নয় ইক্ষু যেভাবে কান্ডের মাধ্যমে জন্মায় সোমের ক্ষেত্রেও তাই বলা হয়েছে।

৫. হে সোম, তোমার প্রধান উৎপত্তিস্থান স্বর্গের মধ্যে বিদ্যমান আছে, সেখান থেকে গ্রহণপূর্বক পৃথিবীর উন্নত প্রদেশে তোমার অবয়বগুলি নিক্ষিপ্ত হয়েছিল, সে স্থানে তারা বৃক্ষরূপে জন্ম নিল।
( ঋগ্বেদ, ৯/৭৯/৪) 

আবার আখ জারিত করে গুড় তৈরির পদ্ধতিটি বর্তমানে যেমন ঠিক একই পদ্ধতির কথা ঋগ্বেদের ১ ও ৯ মণ্ডলের যথাক্রমে ক্রমিক ২৮ ও ৬৬ সূক্তে উল্লেখ করা হয়েছে সোমরসের ক্ষেত্রে।

অন্যদিকে সোমরসের রঙের বর্ণনাও রয়েছে বেদে :-----

৬. এর ধারা হরিৎবর্ণ। 
(ঋগ্বেদ, ৯/৬৬/২৬) 

৭. শুভ্রবর্ণ সোমরসগুলি ক্ষরিত হতে হতে এবং নানাবিধ স্তুতিবাক্য গ্রহণ করতে করতে উৎপাদিত হলেন। 
(ঋগ্বেদ, ৯/৬৩/২৫) 

৮. লেহিতবর্ণ সোমরসকে নিষ্পীড়নের দ্বারা প্রস্তুত করা হল। 
(ঋগ্বেদ, ৯/৮২/১) 

ইক্ষুরস লোহিত, পিঙ্গল কিংবা রস নিষ্কাশনের পর শুভ্র বর্ণ ধারণ করে। একারণে বলা যেতে পারে সোম হয়তো আখেরই অন্য নাম। পরবর্তী সময়ে এর নেশাজাতীয় যথেচ্ছ ব্যবহারের ফলে আখের আড়ালে সোম নামটি চাপা পড়েছে।

কিন্তু যারা সোমকে মদ বলে মনে করেন তাদের জেনে রাখা দরকার যে হিন্দুধর্মে মদ বা যেকোন নেশাকে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

*"নকী রেবন্তঃ সখ্যায়া বিন্দসে পীয়ন্তি তে সুরস্বঃ। / য়দা কুয়োসি নদানু সমূহস্যাদিত পিতেব হূয়সে"।।*

( ঋগ্বেদ, ৮/২১/১৪) 

অনুবাদ:--
তোমার নেশাকারী সঙ্গী অথবা বন্ধু যদি সবচেয়ে বিদ্বান বা ধনীও হয় তারপরও বজ্রপাততূল্য এবং অবশ্য পরিত্যাজ্য।

*"সুরা বৈ মলমন্নানাং পাপ্মা চ মলমুচ্যতে। / তস্মাদ্ ব্রাহ্মণরাজন্যৌ বৈশ্যশ্চ ন সুরাং পিবেৎ।।"*

 (মনুসংহিতা, ১১/৯৪) 

অনুবাদ:--
সুরা হল অন্নের মলস্বরূপ, পাপরূপ তাই ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় নির্বিশেষে সকলের জন্যই অবশ্য বর্জনীয়।

সোমকে মদ হিসেবে ব্যাপক প্রচলনের দরুণ হয়তো আখের সমার্থক শব্দ সোম হারিয়ে গেছে। আজকের আখই হয়তো বেদের সোম জাতীয় উদ্ভিদ। ঋগ্বেদে সমস্ত নবম মণ্ডল সোমের স্তবে পরিপূর্ণ। সোম বন্দনার সুক্ত সংখ্যা ১২০। এর বাইরে অন্য ছয়টি সুক্তে অগ্নি, ইন্দ্র, পূষা এবং রুদ্র দেবতার সঙ্গে সোমের স্তব করা হয়েছে।

পৃথিবীর অধিকাংশ প্রাচীন আখ্যানে অমরত্ব প্রদানকারী রূপে কোনো না কোনো বনস্পতির উল্লেখ বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। এমনকি "প্লিনি" র রচনাতেও অমরত্ব প্রদানকারী "অ্যাম্ব্রোসিয়া" বা অমৃত শব্দ বিভিন্ন বনস্পতির প্রতি নির্দেশক। বনস্পতির দীর্ঘকালীন জীবন, প্রাচীন মানবদের নিকট চিত্রিত হয়েছিল - বনস্পতি মরণহীন রূপের প্রতিচ্ছবিতে। মানুষ সম্ভবত এ রকম দীর্ঘজীবী বৃক্ষগুলোকে দেখে প্রথম অমরত্ব লাভের কল্পনা করতেও শুরু করে।

পৃথিবীব্যাপী বিশেষ করে ইউরোপ এবং আমেরিকায় বেশকিছু পাইন ও অলিভ বৃক্ষের সন্ধান পাওয়া যায়। যেগুলোর বয়স কয়েক হাজার বছর। অদ্যাবধি প্রাপ্ত তথ্যের নিরিখে, পৃথিবীর প্রাচীনতম জীবিত প্রাণের একটি হলো "স্প্রুস গোত্রের বৃক্ষ"। যার অবস্থান সুইডেনে। ওল্ড টিজেআইকেকেও নামে পরিচিত। এই বৃক্ষের বয়স আনুমানিক প্রায় ৯ হাজার ৫ শত ৫০ বছর বলে ধারণা করা হয়। গবেষণা চলছে, হতে পারে এই প্রাচীন কোনো বৃক্ষের মাঝেই লুকিয়ে আছে চীরাকাঙ্ক্ষিত অমরত্বের রহস্য !

উৎপত্তিস্থল:---

তবে আধুনিক ধারণায় সোম আসলে শুধু একটি উদ্ভিদ নয়। যদিও একসময় নির্দিষ্ট কোনো স্থানে প্রাথমিকভাবে সোম উদ্ভিদ বা সোমলতার অস্তিত্ব ছিল বলে প্রাচীন গ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে। ঋগ্বেদ অনুযায়ী বিভিন্ন বিশেষ উদ্ভিদের পরিমাণ মতো মিশ্রণেও তৈরি হয় সোমরস (ঋগ্বেদ ১০/৯৭/৭)। 

এ ছাড়াও ঋগ্বেদে সোমের আরো কিছু ধরনের কথাও উল্লেখ রয়েছে। যেমন, হিমালয় থেকে উৎপন্ন হিমবাহের জল। 
(ঋগ্বেদ ৬/৪৯/৪)। 

বেদ অনুসারে অগ্নি বা আগুনের প্রতিটি রূপের মধ্যেও রয়েছে সোম। এই ক্ষেত্রে মহাবিশ্বের সর্বত্রই সোমের উপস্থিতি রয়েছে বলে ধারণা করা হয়। এমনকি অগ্নি এবং সোম, চীনা ‘ইন অ্যান্ড ইয়ং’ দর্শনের সমতুল্য।

প্রাচীন গ্রন্থে সোমরসের বর্ণনা অনুযায়ী, সোমরস শুভ্র-বর্ণ, ঈষৎ অম্ল ও মাদকতাজনক। যার জন্মস্থান মুজবান পর্বত কিংবা সরস্বতী নদী। বলা হয় স্বর্গ হতে শ্যানপক্ষী সোম আহরণ করে এনেছিলেন। এরপর সোমকে পর্বত হতে শকটে করে যজ্ঞ স্থানে আনা হতো। পরে পাথর বা লোহা দ্বারা ছেঁচে সোমরস নিষ্কাশন করা হতো। রস নিষ্কাশনের একটি পদ্ধতিও ছিল। দুই হাতের দশ আঙুল দিয়ে চেপে রস নিঙড়ানো হতো। পরে ‘তনা’ নামে মেষলোম - নির্মিত ছাঁকনি দ্বারা ছেঁকে দুগ্ধ মিশ্রিত করে সোমরস পান করা হতো। এটি ছিল অমরত্ব লাভের লুকায়িত জ্ঞান। যা যুগে যুগে মানুষেরা নিজেদের ভেতর ধারণ করে এসেছিলেন।

আধুনিক পণ্ডিতদের মতে "এফেড্রা" থেকে সোমরস তৈরি হয়। আফগানিস্তান এবং ইরানে এফেড্রা খুবই পরিচিত উদ্ভিদ। ফারসিদের কাছে এফেড্রাই ছিল সোম উদ্ভিদ। এমনটাই ধারণা করা হতো। বর্তমান যুগেও ভারতের কিছু অংশে এফেড্রা র অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়। যা সোমলতা নামে পরিচিত। কিন্তু এর মধ্যেও কিছু মতভেদ রয়েছে। সোম নিঙড়ালে দুধের মতো রস নির্গত হয়। কিন্তু এফেড্রা শুকনো উদ্ভিদ যা থেকে সামান্য পরিমাণে রস নির্গত হয়। তাই এফেড্রা থেকে সোম রস তৈরির যুক্তি খুব বেশি গ্রহণযোগ্যও হয়নি। 

প্রাগৈতিহাসিক সময় থেকে পৃথিবীব্যাপী সোমের সন্ধান খুঁজে চলেছেন গবেষকরা। তার মধ্যে বিগত আড়াইশ বছর ধরে বিশেষভাবে আমেরিকান এবং ইউরোপিয়ানদের মধ্যে চলছে সোম রস খোঁজার চেষ্টা।

চালর্স উইন্সকিনের মতে ,---  "সোম একপ্রকার লতাজাতীয় বনস্পতি। যা যজ্ঞ অনুষ্ঠানের অন্তিম পর্যায়ে পশুবলির পর সোম রস পান করা হয়।"

গ্রিক জেনারেল জেনোফেন ৪০১ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে তার গবেষণায়---- তিনি মধুকে সোমরস বলে ভুল করেন।

১৮৫৫ সালে ম্যাক্সমুলার একটি প্রাচীন আয়ুর্বেদিক শ্লোক উদ্ধার করেন। সেই শ্লোক অনুযায়ী সোম কৃষ্ণ-বর্ণ, শুভ্র-বর্ণ, ঈষৎ অম্ল ও মাদকতাজনক। সোমরস নিয়ে এটিকে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে সঠিক বর্ণনা হিসেবে ধরা হয়ে থাকে। 

এছাড়া ড. ওয়াল্টার রক্সবার্গ, জর্জ স্টিফেনসন, ড. ডেভিড ফ্রোলে বিভিন্ন সময় সোমলতা এবং সোমরস আবিষ্কারে নিয়োজিত ছিলেন।

অনেক বিশেষজ্ঞদের মতে, সোমরস "অ্যামানাইটা মাসকারি"  মাশরুম থেকে তৈরি হয়। যার উৎপত্তি স্থল সাইবেরিয়াতে। বেদে সোমকে ভিন্নভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। যার পাতা রয়েছে। কিন্তু মাশরুমের কোনো পাতা হয় না।

এছাড়া অথর্ব বেদে বলা হয় (অথর্ব বেদ ১১/৬/১৫) -- কিছু উদ্ভিদ যেমন মারিজুয়ানা বা গাঁজা, যব অথবা দূর্বা থেকে সোম অনেক উন্নত। কিন্তু ডারভা বা দূর্বার, মারিজুয়ানার মধ্যে সোমের কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে। অন্যান্য উদ্ভিদ যেগুলো সোমের সাথে সংযুক্ত সেগুলো হলো পদ্ম এবং শাপলা। সোমের মতো এই উদ্ভিদগুলো পিষলে এদের থেকেও দুধের মতো রস নির্গত হয়। সোমরস সুমিষ্ট, এই রস যেমন পানীয় হিসেবে ব্যবহৃত হতো-তেমন দুধ, দধি ও ক্ষীরে দেয়া হতো মিষ্টতার জন্য। এই কারণেও হয়তো সোমকে মধুও বলা হয়ে থাকে।

আয়ুর্বেদে বিভিন্ন রোগনাশক ভেষজ ঔষধি উদ্ভিদের নাম হিসাবে সোমকে বর্ণনা করা হয়েছে। বর্তমান আয়ুর্বেদে সোম উদ্ভিদ বলতে কোনো একটি বিশেষমাত্র উদ্ভিদকে চিহ্নিত করে না। 

সোম উদ্ভিদ মানে উদ্ভিদগোষ্ঠীর প্রায় ২৪ ধরনের বিভিন্ন উদ্ভিদের সমন্বয়। সোম গোষ্ঠীর উদ্ভিদগুলোর ভেষজ গুণাগুণ সম্পর্কে বৈদিক ঋষিরা খুব ভালোভাবে পরিচিত ছিলেন।

সোমলতা মস্তিষ্কের সঙ্গে দেহের আত্মিক এক সম্পর্ক তৈরি করে - যা যোগাসন, প্রাণায়াম অথবা ধ্যান করতে  সাহায্য করে।

সোমকে প্রাচীন এবং পবিত্র উদ্ভিদ হিসেবে ধরা হয়। যা আধ্যাত্মিকতা বৃদ্ধিকারী, অনুপ্রেরণাদায়ক এবং বুদ্ধিবৃত্তি উন্নয়নকারী। ধারণা করা হয় প্রতিটি সম্প্রদায়ে অথবা ভৌগলিক অঞ্চলে তাদের নিজস্ব সোমলতা রয়েছে।

ঋগ্বেদের ষষ্ঠ মণ্ডলের ৪৭ নম্বর সূক্ত:-- ‘এই সোম পীত হইয়া আমার বাক্যের স্ফূর্তি বিধান করিতেছে। ইহা অভিলষিত বুদ্ধি প্রদান করিতেছে।’ কী সহজসরল বাস্তব অনুভূতি!

কিন্তু সোমরস জিনিসটা ঠিক কী? সম্ভবত আফগানিস্থান, পাকিস্তানের হিন্দুকুশ অঞ্চলে "এফিড্রা সিনিকা" নামের এক লতা। কিন্তু পণ্ডিতেরা এখনও নিশ্চিত নন। আপাতত, তাঁদের ওই ব্যর্থতার জন্যই আমরা যথার্থ সোমরস পান করতে পারিনি , রাম-হুইস্কি আর কালী মার্কাতেই তৃপ্ত থাকতে হয়।

চাঁদনি রাতে এই লতাটাকে মূলসুদ্ধু উপড়ে, ছাগলে-টানা গাড়িতে নিয়ে আসা হত যজ্ঞস্থানে। আমাদের চেনা ব্যা-ব্যা করা ছাগল নয়। ২০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে আফগানিস্থানের তাগড়াই পাহাড়ি ছাগল। যজ্ঞস্থলে আগে থেকেই ঘাস আর কাঠকুটো দিয়ে একটা জায়গা করা থাকত। সেখানে ওই সোমলতাকে গাড়ি থেকে নামিয়ে পাথরে পেষা হত। তার পর ওই পিষে-যাওয়া লতাগুল্মকে পশমের ছাঁকনিতে রেখে দশ আঙুলে চটকানো হত। আর্যরা যথার্থ ‘কনয়সিয়র’ ছিলেন।

 ঋগ্বেদের দশম মণ্ডলে ৯৪ নম্বর সূক্তে ---  সোমলতা পেষাই করার পাথরগুলির প্রতিও কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন তাঁরা, ‘এই অবিনাশী প্রস্তরদিগের গুণকীর্তন কর। দশ আঙুল যখন সোমরস নিষ্পীড়ন করার সময় এদের স্পর্শ করে, পাথরটাকে মনে হয় দ্রুতগামী ঘোড়া। দশটি রজ্জু তাদের টেনে নিয়ে চলেছে।’

পাথরে ছেঁচা, ঈষৎ হলুদরঙা ওই রস এ বার দুধে মিশিয়ে টানা ৯ দিন ধরে গাঁজানো বা জারিত করা হত। তার পরই তৈরি হত দেবভোগ্য সোমরস। আর কত যে সযত্নে রাখা হত তাকে! কাঠের পাত্রকে বলা হত ‘গ্রহ’। আর মাটির পাত্রকে ‘স্থালী’। সকাল, দুপুর ও সন্ধ্যা... তিন বার সোম নিষ্কাশন করা হত। কে ক’বার টানবেন, তারও নিয়ম ছিল। যজমানেরা শুধু সন্ধ্যাবেলায়, আর যজ্ঞের পুরোহিত বা ঋত্বিকেরা তিন বারই। ঋত্বিকদের কী আর দোষ? বশিষ্ঠ, বিশ্বামিত্র, ভরদ্বাজ প্রমুখ মুনিঋষিদের আশ্রমেও মদের ভাল যোগান ছিল। রামায়ণে ভরদ্বাজ ঋষির আশ্রমে অতিথিরা এসে হাজির হলে, ভরদ্বাজ বললেন, “আমি ইন্দ্রাদি তিন লোকপালকে আহ্বান করিতেছি, তাঁহারা আমার অতিথি সৎকারের ইচ্ছাপূরণ করুন। মৈরেয় মদ্য এবং সুসংস্কৃত সুরা প্রবাহিত করিতে থাকুন।”

মেয়েরাও কম যেতেন না। বনবাসকালে রামচন্দ্র সীতাকে নিয়েই মৈরেয় মদ্য পান করেছিলেন। ভরদ্বাজের আশ্রম থেকে বেরিয়ে রাম, লক্ষ্মণ, সীতা চিত্রকূট পর্বতের দিকে যখন যাচ্ছেন, মাঝে ভেলায় করে যমুনা নদী পেরোতে পেরোতে মা জানকী দিব্যি দিলেন, ১৪ বছর পর ভালোয় ভালোয় অযোধ্যা ফিরে এলেই পুজো দেবেন। ১০০ টি গরু আর হাজার ঘড়া মদ্য দিয়ে। "সুরাঘটসহস্রেণ"!

শুধু কী মাতা সীতা? মহাভারতে আদিপর্বের শেষ দিকে মদালসা দ্রৌপদী আর সুভদ্রার চমৎকার বর্ণনা দিয়েছেন ব্যাসদেব। কৃষ্ণ, অর্জুন, দ্রৌপদী, সুভদ্রা তাঁদের বন্ধুবান্ধবদের নিয়ে এক বার যমুনার ধারে প্রমোদভ্রমনে গিয়েছেন। একটু পরে এখানেই অগ্নিদেব কৃষ্ণ আর অর্জুনের কাছে আসবেন, খাণ্ডবদাহন ঘটবে। কিন্তু দিনের শুরুতে, যমুনাতটে ? কালীপ্রসন্ন সিংহ প্রায় নিরামিষ ঢঙে জানান, ‘দ্রৌপদী ও সুভদ্রা বিচিত্র বসন ও নানাবিধ অলঙ্কার কামিনীগণকে প্রদান করিলেন।’ কিন্তু সেটি  ঘটনা নয়, বিবেক দেবরায় সম্প্রতি মহাভারতের প্রামাণ্য সংস্করণের ইংরেজি অনুবাদে আসল ঘটনাটি ফাঁস করে দিয়েছেন, ‘...expensive food and drinks were spread out. In great intoxication, Droupadi and Subhadra gave away expensive garments and ornaments to the women.’ মত্ত মেয়েরা কেউ তখন গদগদ স্বরে কথা বলছে, কেউ বা নির্জন স্থানে সখীর সঙ্গে গোপন আলোচনা সারছে, কেউ বা অহেতুক ঝগড়া করছে। আর শুধু দ্রৌপদী, সুভদ্রা কেন? বিরাট রাজার পত্নী সুদেষ্ণা জলের বদলে মদ্যপান করতেই ভালবাসতেন। কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের শেষে অভিমন্যুর শবদেহ আঁকড়ে পড়ে আছেন তাঁর বালিকা স্ত্রী উত্তরা। সখেদে গান্ধারী বললেন, “মাধ্বীকের মত্ততায় মূর্চ্ছিত হয়েও যে উত্তরা স্বামীকে আলিঙ্গন করতে লজ্জা পেত, হায়, সে আজ সকলের চোখের সামনে পতির অঙ্গ পরিমার্জনা করছে।”
এখানেই প্রাচীন হিন্দু ঐতিহ্য। পুরুষদের পাশাপাশি মেয়েরাও সমান তালে মদ্যপান করতেন। কোনও বিধিনিষেধ বা জড়তা ছিল না।

 ‘কুমারসম্ভব’- এ হরপার্বতীর বিয়ে দেখতে মেয়েরা জানলায় দাঁড়িয়ে আছে। ‘রঘুবংশম্’-এও অজ-ইন্দুমতীর বিয়ে দেখতে মেয়েরা জানলায়। দুটি কাব্যেই কালিদাস উপমা দেন ---- *"ভাসাং মুখৈরাসব  গন্ধ-গর্ভৈব্যাপ্তান্তরাঃ।"* গবাক্ষগুলি পুরসুন্দরীদের আসবগন্ধমধুর স্বাদ পরম্পরায় ভরিয়া গেল।

কেন মেয়েদের মদ্যপানে ছিল না বিধিনিষেধ? এর উত্তর রয়েছে বাৎস্যায়নের ‘কামসূত্র’র দশম অধ্যায়ে। মুনিবরের বিধান :-  পুরুষ নারীকে আহ্বান করে মদ দেবেন। তারপর তার চুলে বিলি কেটে দেবেন, আলিঙ্গন করবেন। মদের যে কত গুণ!
মহাকাব্যে মদ যে কত! ‘ওয়াইন’কে বলা হত আসব। আঙুরের রস থেকে ‘দ্রাক্ষাসব’, ফুলের মধু থেকে ‘পুষ্পাসব’, কত বৈচিত্র্য ! মধু থেকে তৈরি হত ‘মাধ্বী’। গম বা যব থেকে হত বিয়ার জাতীয় ‘পৈষ্টী’ এবং ‘মেদক’। আর বিশেষ মশলাযোগে আজকের ‘ফর্টিফায়েড ওয়াইন’-এর মতো তৈরি হত ‘অরিষ্ট’ এবং ‘মৈরেয়’। মৈরেয় খাসা জিনিস, ভরদ্বাজ তাঁর অতিথিদের দিয়েছিলেন।
মদ কিন্তু শিবের অঙ্গজ হওয়ার সম্মান পায়নি! অমৃত নিয়ে সুর আর অসুরে তখন কাড়াকাড়ি। অবশেষে দেবতাদের কাছে অমৃত এল। শিব নিজের অঙ্গনিঃসৃত এক লতায় শোধন করে নিলেন সেই অমৃত। অথর্ববেদে তাই পাঁচটি পুণ্য উদ্ভিদের একটি হল গাঁজাগাছ। ঋগ্বেদের সোমলতা চেনা গেল না ঠিকই, কিন্তু অথর্ববেদের গাঁজাটুকু তো রয়েছে। 

আন্তর্জাতিক গবেষক এবং বিশিষ্ট চিন্তাবিদের মতে, সোম হলো ধ্যানের এমন এক পর্যায় যাওয়া- যে পর্যায়ে নিজের অস্তিত্বের সাথে পৃথিবীসহ পুরো জগৎকে এক করে ফেলা। প্রাচীন যুগের যোগীরা দীর্ঘ সাধনার মাধ্যমে এমন এক পর্যায় উপনীত হতে পারতেন, যে পর্যায়ে মস্তিষ্ক থেকে একধরনের মোমের মতো রস পুরো শরীরে নিঃসরণ করার সক্ষমতা রাখতেন। যে রস প্রতিটি কোষ-অনুকোষকে নতুনভাবে জন্ম দিতে পারত। প্রাচীন যোগীরা বারবার এই ধ্যানের মাধ্যমে দীর্ঘ জীবন লাভ করতেন। মূলত সোম থেকে সমুদ্র শব্দটি এসেছে। সোম মানে উপরে থেকে নীচে প্রবাহমান। সাধারণ মানুষকে এর মাহাত্ম্যকে উপলব্ধি করতে পারে না। প্রাচীন মুনী-ঋষিরা তাদের প্রাপ্ত বা গবেষণালব্ধ জ্ঞানকে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে হস্তান্তরের উদ্দেশ্যে সহজভাবে পূজার মাধ্যমে জ্ঞানগুলো হস্তান্তর করেছেন।

বিদেশি বিজ্ঞানীদের সোমরস নিরসনের প্রচেষ্টা পরপর ব্যর্থ হয়ে আসছে। তবু ইউরোপ বা আমেরিকার বিশেষজ্ঞগণ আজও সোমরসের সন্ধান করে যাচ্ছেন। আজও সোমরস অনুসন্ধানে যে-পরিমাণ গবেষণা চলছে, তাতে বোঝা যায় সোমরসে হয়তো অমরত্বের সন্ধান থাকলেও থাকতে পারে। 

বিধর্মীরা মূলত “সোম” মানে কোনো মাদক পানীয় দ্রব্য হিসাবেই চেনে। অনেকে আবার সোমরস এর অর্থ হিসাবে সুরা বা মদ লেখে। এটা বর্তমান অনেক অভিধানে লিখেছে।

*শ্রী গীতাতে সোম*---
বাংলা ও সংস্কৃতে তে "সোম" এর সাধারণ মানে “চাঁদ”। কিন্তু সংস্কৃতে এর আনুমানিক ১৯ টি বিভিন্ন অর্থ আছে।
শ্রীগীতাতেও আছে-
“পুষ্ণামী চৌষধীঃ সর্ব্বাঃ সোমো ভূত্ত্বা রসাত্মকঃ”।

অর্থ-
(ঈশ্বর) রসাত্তক চন্দ্ররুপে ধান, যবাদি ঔষধী পুষ্টি করেন।
এখানে “সোম” মানে “চন্দ্র”

*যোগ বিদ্যায় সোম*----
আবার যোগবিদ্যায় যোগীরা শরীরের পিনিয়াল গ্রন্থি নিঃসৃত হর্মোনকে সোমরস বা অমৃত বলে থাকেন। আধ্যাত্মিক সাধনায় যাঁহারা দেহচক্র সম্বন্ধে ধারণা রাখেন তাহারা এই সোমরস সম্বন্ধে বুঝে থাকেন। হটযোগ প্রদিপিকা তে বহু স্থানে এর উল্লেখ আছে।

*পবিত্র বেদে সোম*---
বিধর্মীরা অপ্রচার করে বেরাচ্ছেন, আর্য ও বৈদিক দেব দেবীরা সোমরস খেয়ে মাতলামো করতো তা নাকি আবার বেদে উল্লেখ আছে।তাদের অভিযোগ বেদে সোম নামক নেশাজাতীয় পদার্থের কথা বলা হয়েছে।কিন্তু সত্য কি তাই ?

প্রথমে মনে রাখতে হবে পবিত্র বেদে যে "সোম" এর কথা বলা হয়েছে সেটা কোনো মাদক দ্রব্য নয়। কারণ পবিত্র বেদে মাদক পান নিষিদ্ধ।

১. ঋগবেদ (৮.২১.১৪) 

"নকী রেবন্তঃ সখ্যায়া বিন্দসে পীয়ন্তি তে সুরস্বঃ।
য়দা কুয়োসি নদানু সমূহস্যাদিত পিতেব হূয়সে।।"

তোমার নেশাকারী সঙ্গী/বন্ধু যদি সবচেয়ে বিদ্বান বা ধনীও হয় তারপরও বজ্রপাততূল্য এবং অবশ্য পরিত্যজ্য।

২. অথর্ববেদ (৭.৬০.১) 

“হে মনুষ্য, ইন্দ্রিয় কে সংযত কর। একমাত্র চরিত্রহীন লোকেরাই নেশা, নারীর দিকে আকৃষ্ট হয়।“

৩. মনুসংহিতা (১১.৯৪) 

"সুরা বৈ মলমন্নানাং পাপ্মা চ মলমুচ্যতে।
তস্মান ব্রাহ্মনরাজন্যো বৈশ্যশ্চ ন সুরাং পিবেত্‍।।"

অনুবাদ- 
সুরা হল অন্নের মলস্বরুপ,পাপরুপ তাই ব্রাহ্মন,ক্ষত্রিয় নির্বিশেষে সকলের জন্যই অবশ্য বর্জনীয়।

“সোম” এর প্রথম পরিচয় আমরা পাই ঋগ্বেদে। সেখানে একে “আয়ুবর্ধ অমৃত” বলা হয়েছে।

৪. (ঋগ্বেদ ৮.৪৮.৩) 

"অ অপামা সোমম অমৃত অভূমগ্নাম জ্যোতির অবিদাম দেবাম।
চ কি নুনম অস্মান কমবদ আরাতিহ কীম উ ধুরতির অমৃত মর্তস্য।।"

এই মন্ত্রের মহর্ষি দয়ানন্দ এর ভাষ্যটি দেয়া হল-

সোম(ভাল ফল/খাদ্য কোনো মাদক পানীয় নয় ), অপামা (আমরা তোমাকে পান করি),অমৃত অভূম (তুমি জীবনীবর্ধক), জ্যোতির অগ্ণম (শারীরিক শক্তি দানকারী),অবিদাম দেবাম (ইন্দ্রিয়ের সংযমকারী),কি নুনম অস্মান কমবদ আরাতিহ ( আভ্যন্তরীণ শত্রু বা কু বাসনাকারী ইন্দ্রিয় বা কু-বাসনা আমার কী ই বা করতে পারে)কিম উ ধুরতির অমৃত মর্তস্য (হে ঈশ্বর, এমনকি হিংস্র মানুষ ই বা আমার কি করতে পারে)

“হে সোম আমরা তোমাকে পান করি,তুমি জীবনীবর্ধক, শারীরিক শক্তি দানকারী, ইন্দ্রিয়ের সংযমকারী,এই পরিস্থিতিতে, আমার অভ্যন্তরীণ শত্রু(কু-বাসনা) আমার কী ই বা করতে পারে, হে ঈশ্বর,এমনকি হিংস্র মানুষ ই বা আমার কি করতে পারে”

এখানে “সোম” মানে ভেষজগুনসম্পন্ন পানীয় বিশেষ। নিচের অংশটুকু পড়ুন বুঝে যাবেন।

ঋগ্বেদ এর নবম মণ্ডল এর অপর নাম সোম পবমন মণ্ডল বা বিশুদ্ধ সোম মণ্ডল।এই মণ্ডলে “সোম” এর বিভিন্ন অর্থ ও তার প্রয়োগ বর্ণনা দেয়া হয়েছে। 

একইভাব সামবেদ এর পূর্বারচীকে ও পবমন পর্বে সোমকে বর্ণনা করা হয়েছে এই রূপে-

১)আধ্যাত্মিকতা বৃদ্ধিকারী
২)অনুপ্রেরণাদায়ক
৩)বুদ্ধিবৃত্তি উন্নয়নকারী

৫. অথর্ববেদ ১৪.১.৩ তে বলা হয়েছে- “সাধারন ভাবে সোমকে তোমরা রোগনাশক হিসেবে জানো, কিন্তু প্রকৃত জ্ঞানী দ্বেষ নাশক অমৃতরুপ সোম এর সন্ধান করেন”

*আয়ুর্বেদে সোম*---

আয়ুর্বেদে বিভিন্ন রোগনাশক ভেষজ ঔষধীয় উদ্ভিদের নাম হিসাবে “সোম” কে বর্ণনা করা হয়েছে।বর্তমান আয়ুর্বেদে “সোম” উদ্ভিদ বলতে কোনো একটি বিশেষ মাত্র উদ্ভিদ কে চিন্হিত করে না। “সোম” উদ্ভিদ মানে উদ্ভিদগোষ্ঠির ২৪ ধরণের ভিন্ন উদ্ভিদ সমূহ।

উদাহরণ-

Ephedra sp,
Saccharum sp ,
Desmostachya sp, 
Cannabis sp, 
Hordeum sp, 
Peganum sp, 
Nelumbo  sp, 
Papaver sp, 
Argyreia sp, 
Sarcostemma sp, 
Periploca sp , 
And
Some Different Species of Mushrooms Etc.

আর এই সমস্ত “সোম” গোষ্ঠীর উদ্ভিদগুলির ভেষজগুনা গুন সম্বন্ধে বৈদিক ঋষিরা খুব ভালো ভাবে পরিচিত ছিলেন। আর হবে নাই বা কেনো পবিত্র বেদের উপ-বেদগুলির একটি শাখা হলো এই “আয়ুর্বেদ”।

আবার হটযোগ প্রদিপিকা তে আমরা সঠিক “সোমরস” এর অর্থ খুঁজে পাই- সোমলতা নামক উদ্ভিদের নির্যাসিত রস, যা স্বাদে লবনাক্ত, বর্ণ সবুজাভ, দুদ্ধ, ঘি ও মধু মিশ্রিত এক ধরণের পানীয়। ইহা বিশেষ ভেষজ গুনাবলী যুক্ত এবং একজন যোগীর জন্য উত্তম পানীয়।

অর্থাৎ উপরোক্ত আলোচনা থেকে আমরা পাই যে “সোম” শব্দটি্র একদিকে অর্থযুক্ত ও অপর দিকে রোগ নিরাময়কারী ঔষধ হিসেবে বিবেচিত হয় ও একটি উত্তেজক পানীয়।।


*তথ্যঋণ ----*

১. ঋগ্বেদ সংহিতা ,
 বাংলানুবাদ:রমেশচন্দ্র দত্ত 
(সায়ন , ম্যাক্সমুলার সহ অন্যান্যের ভাষ্যাদিকে টীকাকারে উল্লেখকৃত), 
হরফ প্রকাশনী 
(এ-১২৬ কলেজ স্ট্রীট মার্কেট 
কলকাতা ৭ ,১৯৭৬) 

২. শ্রী প্রভাতরঞ্জন সরকার।

৩.  “ঋগ্বেদ ও নক্ষত্র” - বেলাবাসিনী ও অহনা গুহ , ১৯৬৯ , গোপা প্রকাশনী , কলকাতা ।

৪. ইন্টারনেট ও অন্যান্য।

Popular posts from this blog

*সংক্ষিপ্ত কালী সংহিতা**.........প্রসূন কাঞ্জিলাল।* সনাতন ধর্মমতে কালী বা কালিকা হচ্ছেন শক্তির দেবী। কাল শব্দটির অর্থ সময় হতে পারে, আবার এটা রঙও বুঝাতে পারে। কাল তথা কৃষ্ণবর্ণ, এর অর্থ হতে পারে মৃত্যুবোধক। যেমন আমরা বলি- ‘কাল’এসে গেছে, মৃত্যুর সময় সমাসন্ন, মহাকাল এসে গেছে। দেবীর নাম মহাকালীও বটে। কালীর নাম কাল না হয়ে কালী হলো এ কারণে যে শিবের অপর নাম কাল, যা অনন্ত সময়কাল বোধক। কালী হচ্ছে কাল-এর স্ত্রীলিঙ্গ বোধক। মা কালী মা দুর্গা বা পার্বতী’র সংহারী রূপ। ঊনবিংশ শতাব্দীর সংস্কৃত ভাষার বিখ্যাত অভিধান শব্দকল্পদ্রুম এ বলা হচ্ছে ‘কাল শিবহ্। তস্য পত্নতি কালী।’ অর্থাৎ শিবই কাল বা কালবোধক। তাঁর পত্নী কালী। কালী হচ্ছেন মা দুর্গার বা পার্বতীর অপর ভয়াল রূপ। তিনি সময়ের, পরিবর্তনের, শক্তির, সংহারের দেবী। তিনি কৃষ্ণবর্ণা বা মেঘবর্ণা এবং ভয়ংকরী। সনাতন ধর্মাবলম্বীরা ভয়ংকরেরও পূজা করেন। তিনি অশুভ শক্তির বিনাশ করেন। তাঁর এই শক্তির পূজা সনাতন সমাজকে প্রভাবিত করেছে, বিশুদ্ধ শক্তি সঞ্চারিত করেছে, অন্তর শুদ্ধি দিয়েছে, দুর্দিনের দুর্বলতায় সাহস দিয়েছে। শাক্ত সৃষ্টিতত্ত্ব মতে এবং শাক্ত-তান্ত্রিক বিশ্বাস মতে তিনিই পরম ব্রহ্ম। কালীকে এই সংহারী রূপের পরেও আমরা মাতা সম্বোধন করি। তিনি সন্তানের কল্যাণ চান, তিনি মঙ্গলময়ী, তিনি কল্যাণী--- এটাই তাঁর প্রতি সনাতন ধর্মীয় বিশ্বাসের মূল আস্থা ও নির্যাস। একটা ধারণা আমাদের মধ্যে বর্তমান আছে যে, শিব পার্বতীর স্বামী এবং মা কালীর ভাসুর। কথাটি আদৌ সত্য নয়। অসুররক্ত স্নাত কোপান্বিতা এই দেবীর সংহারী মূর্তিতে কিছুটা নিবৃত্ত ও প্রশমিত করতে শিব তাঁর চলার পথে শুয়ে থাকলেন। দেবী পথ চলতে গিয়ে তাঁর স্বামী শিবকে পায়ে মাড়ালেন। এই পাদস্পৃষ্ঠতার লজ্জায় ও তার অনুশোচনায় মায়ের জিহ্বায় কামড় পড়লো। তাঁর কোপভাব স্থিমিত হলো, ছেদ পড়লো।কালীকে যদি বলি কল্পনা, তবে সেই কল্পনাও ধর্মে বর্ণিত হয়েছে বর্তমান বিজ্ঞানের ধারণার হাজার হাজার বছর আগে। এ কথা বিজ্ঞান প্রথমতঃ স্বীকার করে যে, সৃষ্টির আদি যুগে অনন্ত ব্রহ্মা- ছিল নিকষ কালো অন্ধকারে নিমজ্জিত, নিশ্ছিদ্র তমসায় আবৃত, অনন্ত সৃষ্টিতে তখনো আলোর সৃষ্টি হয়নি। রবি শশী তারা বা কোন আলোকবর্তিকা তখনো ছিলনা। বিজ্ঞান মতে আলোর সৃষ্টির আগে অন্ধকার ছিল। এ বর্ণনায় কান পেতে শুনলে আমরা দেখি কৃষ্ণবর্ণা মা কালী সেই যুগের প্রতিনিধিত্ব করছেন। ধর্ম ও বিজ্ঞানের এখানে অপূর্ব সমন্বয় ঘটেছে। দ্বিতীয়তঃ বিজ্ঞানের ‘বিগ্ ব্যাংগ্ তত্ত্ব’ মতে কাল বা সময় তখন সবে মাত্র সৃষ্টি হয়েছে, কাল্ বা সময় যখন সৃষ্টি হলো তথা যে দিন ভূমিষ্ঠ হলো, সেদিন নির্ধারিত হলো সেই কালেরও শেষ আছে, সংহার আছে। বিশ্ব ব্রহ্মা- সৃষ্টি যখন হয়েছে সময় এলে তা ধ্বংসও হবে। তার লয়ও অবশ্যম্ভাবী। কালী এই সংহারের প্রতিভূ, তিনি কাল এর জীবন্তকালের সীমারেখার নির্ধারণকৃত। তৃতীয়তঃ বিজ্ঞানীরা সৃষ্টির প্রথম যুগের মহাবিশ্বের যে বর্ণনা দেন তা ভয়াল ভীষণ, তার মধ্যে সৃষ্টির চাইতে ধ্বংসই বেশী। প্রবল সংহারের মধ্যে দিয়ে অনন্ত ব্রহ্মার সৃষ্টি। মা কালী সেই সংহারের প্রতিভূ তিনি ভয়াল দর্শনা সংহারের দেবী। সৃষ্টির সেই ক্রমবিকাশের যুগেই মা কালী মা জগজ্জননী প্রবল সংহারের মধ্যে দিয়েই তাঁর সৃষ্টি ও তাঁর কল্যাণময় রূপকে আমাদের কাছে তুলে ধরেছেন। মা কালী যুগপৎ কাল, কৃষ্ণবর্ণ এবং সংহারের দেবী। কিছুই ছিল না, তখন দেবী ছিলেন। এই মাতৃপূজা তথা মাতৃমূর্তি হিন্দুধর্মের আদিকথা।অথর্ব বেদ-এ কালীর উল্লেখ থাকলেও বিশেষ হিসেবে কথক গ্রাহ্য সূত্রে (১৯.৭) প্রথমবার কালীর উল্লেখ ঘটে। কালী অগ্নিদেবের সাতটি জিহ্বার একটি নাম, অগ্নিদেব হচ্ছেন আগুনের ঋগ্বেদীয় দেবতা যার উপস্থিতি মুণ্ডুক উপনিষদে বর্তমান; তবে এখানে কালী বলতে দেবী কালীকেই উল্লেখ করা হয়েছে এটা নির্ণীত করা কঠিন। কালী’র বর্তমান রূপের উপস্থিতি আমরা পাই মহাভারতের সুপ্তিকা পার্বণে, যেখানে তিনি কালরাত্রি হিসেবে অভিহিতা, যিনি পাণ্ডব সৈন্যদের স্বপ্নে দৃশ্যমান এবং পরে দ্রোণাচার্য পুত্র অশ্বত্থামা যখন তাদের আক্রমণ করলেন তখন তিনি প্রকৃত স্বরূপে আবির্ভূতা। মহাদেবী’র একটি শক্তি হিসেবে তিনি ষষ্ঠ শতাব্দীর ‘দেবী মাহাত্ম্যম’এ প্রসিদ্ধ, এবং ‘রক্তবীজ’ নামক অসুরকে পরাভূতকারী দেবী হিসেবে গুরুত্ব সহকারে উল্লেখিত। রক্তবীজকে নিশ্চিহ্ন করতে দেবী নরসিংহী, বৈষ্ণবী, কুমারী, মহেশ্বরী, ব্রাহ্মী, বরাহী, ঐন্দ্রী, চামু- বা কালী এই অষ্ট-মাতৃকা রূপে সংস্থিতা। দশম শতাব্দীর ‘কালিকা পুরাণে’ পরম সত্য হিসেবে কালীকে স্তুতি করা হয়। তবে ভিন্ন ও স্বতন্ত্র এক দেবী হিসেবে ষষ্ঠ শতাব্দীতে কালী প্রথম উল্লেখিতা। এবং এ সকল তন্ত্রে গ্রন্থে তিনি বহির্বৃত্তে বা প্রান্তিক সীমায় বা যুদ্ধ ক্ষেত্রে স্থিতা বা দণ্ডায়মানা দেবী। অধিকাংশ ক্ষেত্রে তিনি শিবের শক্তিরূপে চিহ্নিতা, এবং বিবিধ পুরাণে শিবের উপস্থিতির সঙ্গে তিনি ওতপ্রোতভাবে সম্পৃক্তা। কালিকা পুরাণে তাঁকে বলা হচ্ছে ‘আদি শক্তি’, তিনি প্রকৃতির সীমার বাইরেও অধিষ্ঠাত্রী ‘পরা প্রকৃতি’।১৬৯৯ শকাব্দে (১৭৭৭ খ্রীষ্টাব্দে) কাশীনাথ বিরচিত ‘শ্যামাসপর্যায়বিধি-তে এ পূজার সর্বপ্রথম উল্লেখ লক্ষণীয়। পূজার প্রমাণস্বরূপ এ গ্রন্থে পুরাণ ও তন্ত্রের বচন উল্লেখিত। সপ্তদশ শতাব্দীতে বলরাম বিরচিত কালিকা মঙ্গলকাব্যে একটি বাৎসরিক ধর্মীয় অনুষ্ঠান কালীকে নিবেদিত এই মর্মে উল্লেখিত। অষ্টাদশ শতাব্দীতে নবদ্বীপের রাজা কৃষ্ণচন্দ্র বাংলায় প্রথম কালীপূজার প্রবর্তন করেন। ঊনবিংশ শতাব্দীতে কালীপূজা বাংলায় বিশেষ প্রাধান্য লাভ করে। রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের পৌত্র ঈশানচন্দ্র এবং কলকাতার সমাজের বিত্তবান ও উচ্চশ্রেণীর লোকজনের মধ্যে এ পূজার প্রচলন বৃদ্ধি পায়। ক্রমে দুর্গা পূজার সাথে সাথে কালী পূজাও বিশেষত বাংলায় একটি প্রধান হিন্দু ধর্মীয় উৎসবে পরিণত হয়। পরে এবিষয়ে বিস্তারিত আলোচনায় আসা যাবে।শিবের উপর দণ্ডায়মানা কেন, তার তিনটি ব্যাখ্যা বর্তমান এর একটি প্রচলিত কাহিনী, একটি পৌরাণিক, অন্যটি তান্ত্রিক ব্যাখ্যা। এটা বলা হয়ে থাকে যে শক্তি ছাড়া শিব হচ্ছে শব। শিবের উপর দন্ডায়মানা কালী এটাই বুঝায় যে শক্তি বাদ দিলে বস্তু মৃতমাত্র। পৌরাণিক ব্যাখ্যা মতে, পার্বতী একদিন স্বামীকে প্রশ্ন করলেন তার দশটি রূপের মধ্যে কোনটি শিবের পছন্দ ? বিস্মিত পার্বতী শুনলেন, কালীর ভয়াল মূর্ত্তিতেই শিবের সাচ্ছন্দ্য। এই ধারণাটি দেবী ভাগবত পুরাণে ব্যাখ্যা করা আছে। দ্বাদশ থেকে পঞ্চদশ শতাব্দীর ভক্তিমূলক শ্যামাসঙ্গীতেও মায়ের বর্তমান রূপের এই ধারণাটি গুরুত্ব পেয়েছে। তান্ত্রিক পদ্ধতিতে তাঁর ভয়াল রূপ সত্ত্বেও রাত দুপুরে শ্মশানে তাঁর মুখোমুখি হওয়ার সাহস অর্জন এবং অন্যদিকে তাঁর প্রতি বাঙালিদের শিশুর মতো শর্তহীন ভালবাসা উভয় ক্ষেত্রে মৃত্যুর সঙ্গে পরিচিত হওয়া ও তাকে মেনে নেওয়াই মুখ্য কাজ।দুর্গার মতো কালীও সাধারণ সর্বজনীন হিসেবে বিবেচিত। সবচেয়ে সরাসরি বহুল ভাবে তিনি পূজিতা হন মহাকালী বা ভদ্রকালী রূপে। আদি পরাপ্রকৃতি (দেবী দুর্গা) অথবা ভাগ্যবতীর দশমহাবিদ্যা রূপের একটি রূপে কালী পূজিতা হন। দেবী বন্দনার এই স্তোত্রকে বলা হয় দেবী অর্গলা স্তোত্রম্ যা নিম্নরূপঃ'‘ওঁ জয় ত্বং দেবী চামুণ্ডে জয় ভূত অপহারিণি।জয় সর্বগতে দেবী কালরাত্রি নমোহস্তুতে।। ১জয়ন্তী মঙ্গলা কালী ভদ্রকালী কপালিনী।দুর্গা শিবা ক্ষমা ধাত্রী স্বাহা স্বধা নমোহস্তুতে।। ২’'আবার 'শ্রী শ্রী চন্ডী'-র একাদশ অধ্যায় তথা উত্তর-চরিত্র, 'নারায়ণীস্তুতি'-র দশম শ্লোক অনুযায়ী,"সর্বমঙ্গলা মঙ্গল্যে শিবে সর্বার্থসাধিকে। শরণ্যে ত্র্যম্বকে গৌরী নারায়নী নমহোস্তুতে।।১০"যা উপরে বর্ণিত একই ব্যঞ্জনার দ্যোতক।মধ্যযুগের শেষের দিকে বাঙালীর ভক্তিমূলক সাহিত্যে কালী ব্যাপক স্থান নিয়ে বিরাজমান। সাধক রামপ্রসাদ সেন(১৭১৮-১৭৭৫) এর মতো কালীভক্ত উপাসকরা কালীকে নিয়ে রচনা করেছেন অসংখ্য ভক্তিমূলক গান। অথচ শিবপত্নী হিসেবে পার্বতীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হয়ে নানা কাহিনীতে উচ্চারিত হওয়া ছাড়া কালীকে অষ্টাদশ শতাব্দীর আগে বাঙালীর ঘরে ঘরে আবাহনী গেয়ে পূজিত হতে কদাচিৎ দেখা গেছে। আর বাঙালির ঘরে তাঁর ভয়াল রূপের বর্ণনা, বৈশিষ্ট, অভ্যাসসমূহ উল্লেখযোগ্য কোন রূপান্তর ঘটেনি। বাংলাদেশে অনেক কালী মন্দির আছে। এর অনেকগুলোই সুপ্রাচীন। অধুনা লুপ্ত ঢাকার রমনা কালী মন্দির তেমনি একটি পুরাতন কালী মন্দির। ব্রহ্মযামলে উল্লেখ আছে ‘কালিকা বঙ্গদেশে চ’, অর্থাৎ, ‘বঙ্গদেশে দেবী কালিকা বা কালী নামে পূজিতা হন।’ নানা রূপে নানা স্থানে কালী পূজিতা হন, যেমন দক্ষিণাকালী, শ্মশানকালী, ভদ্রকালী, রক্ষাকালী গুহ্যকালী, মহাকালী, চামুণ্ডা ইত্যাদি নামে মাহাত্ম্যে এ কালীর মধ্যে কিছু কিছু ভিন্নতা বর্তমান। অন্যদিকে বিভিন্ন মন্দিরে দশমহাবিদ্যা ব্রহ্মময়ী, ভবতারিণী, আনন্দময়ী, করুণাময়ী ইত্যাদি নামে কালী’র পূজা হয়। চট্টগ্রাম শহরের চট্টেশ্বরী শ্রী কালীবাড়ী, গোলপাহাড় শ্মশান কালীবাড়ী, দেওয়ানহাটের দেওয়ানেশ্বরী কালীবাড়ী,সদরঘাট কালীবাড়ী, পটিয়া পিঙ্গলা কালীবাড়ী, ধলঘাট বুড়াকালীবাড়ী সহ চট্টগ্রামে অনেক প্রসিদ্ধ কালী মন্দির বর্তমান। এছাড়াও আসামের কামরূপ কামাখ্যা দেবীর পূজাও বিশেষ প্রসিদ্ধ। এর প্রায় প্রত্যেকটিতে প্রত্যেক শনি ও মঙ্গলবার এবং অমাবস্যায় কালীপূজা হয়। কার্ত্তিক মাসের অমাবস্যা তিথিতে দীপান্বিতার দিন কালীপূজা বিশেষভাবে পালিত হয়।সর্বজনীন মণ্ডপে যেখানে দুর্গাপূজা হয় সেখানে অধিকাংশ মণ্ডপে কালীপূজাও হয়ে থাকে। অনেক কালীসাধক বিখ্যাত এবং শ্রদ্ধার্হ। শ্রীরামকৃষ্ণ কালীর উপাসক ছিলেন। স্বামী বিবেকানন্দও কালীর ভক্ত ছিলেন। কালী প্রশস্তিমূলক গান তথা শ্যামাসঙ্গীত বাংলা গানের একটি ভিন্ন ধারা। কালীসাধক রাম প্রসাদ সেন, কমলাকান্ত ভট্টাচার্য এ ধারায় অন্যতম অবদান রাখেন। দ্বিজেন্দ্রলাল রায় এবং কাজী নজরুল ইসলামও এ ধারার উৎকৃষ্ট মানের গান রেখে গেছেন। নিরক্ষর শ্রীরামকৃষ্ণ দেবী কালী সচেতনতায় সিক্ত হয়ে অনবদ্য বাণী উচ্চারণ করতেন যা শ্রী'ম রচিত অমর গ্রন্থ ‘রামকৃষ্ণ কথামৃত’তে স্থান পেয়েছে। ‘মৃত্যুরূপা কালী’, দেবী কালীকে নিয়ে আছে স্বামী বিবেকানন্দ রচিত একটি বিখ্যাত সুদীর্ঘ কবিতা। ভগিনী নিবেদিতা মাতৃরূপা কালী নামক একটি কালী বিষয়ক গ্রন্থ রচনা করেছিলেন।দীপাবলী বা দীপান্বিতা বা কার্ত্তিকী অমাবস্যায় অনুষ্ঠিত কালীপূজা উপলক্ষে দেবী মূর্তির দক্ষিণা কালীর অবয়বে তৈরী হয়, এক্ষেত্রে দেবী বৈশিষ্ট হচ্ছে দেবী করালবদনা, কৃষ্ণবর্ণা, নীলবর্ণা বা মহামেঘবর্ণা। দেবী আলুলায়িত কেশা। রামপ্রসাদী গানে ভক্তিভরে মাকে বলা হচ্ছে,‘…এলোকেশী সর্বনাশী..’,মা এলোকেশী, রক্তচক্ষু, লোল জিহ্বা, চতুর্ভূজা, নৃমুণ্ড-মালিনী,, নরহস্তের কোমরবন্ধ, বাম ঊর্ধ্ব করে উন্মুক্ত খড়্গ এবং অধো হস্তে নরমুণ্ড, দক্ষিণ করদ্বয়ে বর ও অভয়মুদ্রা। দক্ষিণা কালীর দক্ষিণ পা শিববক্ষে স্পর্শমান, বাম পা খানিকটা দূরত্বে। স্বামীর গায়ে পা পড়ায় অসুর-রক্ত পানে সিক্ত জিহ্বায় কামড়। ত্রিনয়নী মা অসুর হত্যার মহাঘোরে হাস্যরতা ও ভয়াল দর্শনা। মায়ের গলায় নৃমুণ্ড মালায় সাধারণত ১০৮টি অথবা ৫১ টি নরমুণ্ড বর্তমান। ১০৮ হিন্দুদের জন্য একটি পবিত্র সংখ্যা, দেবনাগরী বর্ণমালায় সর্বসমেত ৫১টি বর্ণ আছে। হিন্দুদের বিশ্বাস সংস্কৃত একটি চলমান জীবন্ত ভাষা এবং এর ৫১ টি বর্ণমালায় অপার শক্তি নিহিত আছে।মায়ের কোন চিরস্থায়ী গুণ বা প্রকৃতি নেই, যার মানে দাঁড়ায় বিশ্ব-প্রকৃতি ধ্বংসের পরেও তিনি বর্তমান থাকবেন। হিন্দু শাস্ত্রে পূজিতা দেবীদের মধ্যে কালীর রূপ ও চরিত্র সর্বাধিক রোমাঞ্চকর ও বিস্ময় উদ্রেককারী। ঘোর অমাবস্যার গভীর রাতে তাঁর পূজা সম্পন্ন হয়। কালী ভীষণ দর্শনা, ক্রোধান্বিতা, লজ্জাহীনা। কালী ভয়ঙ্কর যোদ্ধা, রক্তপিয়াসী। কালী চির ব্যতিক্রমী। ঐশী সংযোগ সত্ত্বেও এক দীর্ঘকালীন উপেক্ষার আখ্যান। তবে দুর্বল, দ্বিধান্বিত মন যখনই শক্তি প্রার্থনা করেছে, বল ভিক্ষা করেছে, ওই করাল বদনা মহাতেজার শরনাপন্ন হয়েছে। ঘোর আমানিশায় জনমানবহীন মধ্যরাতের নিভৃত পূজাতেই ছিল তাঁর অধিকার। কোনো ক্ষেত্রে সূর্যের আলো স্পর্শ ও ছিল নিষিদ্ধ। হাজার বছরের বিমুখতা অতিক্রম করে আজকের দীপাবলী উৎসবে যথেষ্ট ধূমধাম সহযোগে তাঁর উপাসনা হয়ে থাকে। তবে বাঙালীর উৎসবমুখীতাই যে এই পূজার জনপ্রিয়তার অংশত কারণ তাতে সন্দেহের অবকাশ নেই। কারণ বহু ধুমধাম সহযোগে সম্বৎসরের এই মাতৃ আরাধনা তথা শক্তি পূজা আমাদের সমাজে নারীর অবস্থান ও গ্রহণযোগ্যতাকে বিন্দু মাত্র প্রভাবিত করে না। বর্তমান সময়ের দীপান্বিতা উৎসব যদি মোহনা হয়, তবে এই তরঙ্গিনীর উৎস সম্পর্কে আগ্রহ স্বাভাবিক। এই অনুসন্ধান সহজ নয়। কালের প্রবাহে উপনদীর মতো অসংখ্য উপগাথা এসে মিশে গেছে মূল তথ্যে - আজ তাদের পৃথক করা বেশ কঠিন কাজ। অনেক সময়ই অসম্ভব। তবে প্রতিটি অংশই অতীব চিত্তাকর্ষক তাতে সন্দেহ নেই। পুরান তথা বিভিন্ন সাহিত্য থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী কালীর বর্তমান রূপ পরিগ্রহে সময় লেগেছে অন্তত দুই হাজার বছর। কালীর বৈদিক পরিচয় অথর্ব বেদের সুত্রে। এই বেদে প্রথম কালীর স্বরূপ প্রকাশিত হয়। তবে মার্কণ্ডেয় পুরাণ, কালিকা পুরাণ ইত্যাদিতেও কালীর উল্ল্যেখ পাওয়া যায়। মহাভারতের সৌপ্তিক পর্বে কালরাত্রি নাম্নী এক দেবীর বর্ণনা পাই। এই দেবী কালিকারই অন্য রূপ বলে উল্লিখিত হয়ে থাকে। উৎস খুঁজতে গিয়ে দেবী কালীর প্রথম পর্যায়ের সাথে অনার্য সম্বন্ধের সম্ভাবনা জোরালো ভাবে উঠে আসে। হরপ্পা - মহেঞ্জদরো সভ্যতায় মাতৃ পূজা প্রচলিত ছিল বলে জানা যায়। এই সভ্যতা ছিল মাতৃতান্ত্রিক। পূজিতা এই দেবীর সাথে দেবী কালিকার প্রভূত সাদৃশ্য পাওয়া যায়। আবার কেউ কেউ কালীকে আদিবাসি সম্প্রদায়ের দেবী রূপেও বর্ণনা করে থাকেন। সপ্তম - অষ্টম দশকের কিছু লেখায় এর উল্ল্যেখ আছে তবে ঈষৎ ভিন্ন ভাবে। যেমন বান ভট্টের নাটক কাদম্বরীতে দেবী চণ্ডীর উপাখ্যান পাওয়া যায়। ইনি শবর জাতির দ্বারা পূজিতা হতেন। সমকালীন কবি বাকপতি বিরচিত " গৌড় বহও " নামক প্রাকৃত ভাষায় রচিত কাব্য গ্রন্থে বিন্ধ্যবাসিনি নামে এক দেবীর কথা আছে যিনি ছিলেন শবরদের আরাধ্যা। তাঁর সাথে ও কালীর বিশেষ মিল পাওয়া যায়। মূল বর্ণনা অনুযায়ী এই দেবী ভীষণ দর্শনা, মুণ্ডমালিনী, প্রায় নগ্ন এক মূর্তি। খ্রিস্ট পূর্ব ৩০০ থেকে প্রায় ৬০০ খ্রিস্টাব্দ অবধি কালী মূলত যুদ্ধের দেবী রূপে পূজিতা হতেন। বৈদিক দেবী হলেও তৎকালীন সময়ে সনাতন হিন্দু ধর্মের মূল স্রোতে তিনি কিছুটা ব্রাত্যই ছিলেন। কালীর আরাধনা বিশেষত নিম্ন বর্ণ বা অবৈদিক সমাজেই বিশেষ জনপ্রিয় ছিল। নগরের বাইরে শ্মশানের কাছাকাছি অঞ্চলেই কালী মন্দিরের অবস্থান বেশি পরিলক্ষিত হয়। তবে ষষ্ঠ শতকের 'দেবী মাহাত্মম' রচনায় মহাকালী রূপে কালীর রূপ ও মাহাত্ম্যের বিস্তৃত বর্ণনা পাই। অশুভ বিনাশ করে ইনি শুভ শক্তির প্রতিষ্ঠা করেন। দেবী দুর্গার ললাট উৎপন্না মহা শক্তিশালিনী দেবী রূপে তিনি স্বীকৃতি পান। আবার স্বামী অভেদানন্দের মতে বৈদিক দেবী 'রাত্রি' পরবর্তীতে দেবি কালিকা হয়ে ওঠেন। তবে তন্ত্র সাধনার সাথে সুনিবিড় যোগাযোগ এক সুদীর্ঘ সময় কালীকে সাধারন মানুষের থেকে দূরে সরিয়ে রাখে। এক ভয় মিশ্রিত শ্রদ্ধা এর কারণ হয়তো। তবে পরবর্তীতে এই সম্পর্ক ধীরে ধীরে সহজ হয়। সতেরোশ খ্রিস্টাব্দ-উত্তর সময়ে কালী সাধনা এক অন্য রূপ পায়। ভয়াল ভয়ঙ্কর রক্ত পিপাসু দেবী, স্নেহময়ী মা হয়ে ওঠেন। সাধক রাম প্রসাদ, সাধক বামাখ্যাপা তথা শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংস দেবের ন্যায় কালী উপাসকেরা দেবী কালিকার ভবতারিণী মাতৃ রূপ পূজা প্রচার করেন। ক্রমশ এই রূপ সাধারন বাঙালী মনের কাছাকাছি আসে । বাঙালী হৃদয় আসনে তখন থেকেই তাঁর করুনাঘন অবস্থান।ব্রিটিশ শাসিত বাংলা তথা ভারতে কালী উপাসনা বিশেষ তাৎপর্য পূর্ণ হয়ে উঠেছিল। পরাধীন জাতির অন্তরের ক্ষোভ আর প্রতিবাদের উচ্চারণ কালীর দৃপ্ত ব্যক্তিত্বকে অনুসরন করতে চাইত। সশস্ত্র স্বাধীনতা সংগ্রামের অংশ হিসেবে শক্তি আরাধনা তথা কালী উপাসনার প্রচলনের বহু প্রমান পাওয়া যায়। কালীর তেজোময়ী, লড়াকু ভাবময়তা তৎকালীন বিপ্লবীদের মধ্যে যথেষ্ট জনপ্রিয়তা অর্জন করে। প্রখর নারী সত্ত্বা, যা ছিল উপেক্ষিত, বিপর্যয়ের ক্ষণে তা দৈবী স্বরূপে স্বীকৃত হয়। অপর কারণটি ছিল কালী সম্পর্কে শাসক জাতির অবহেলা মিশ্রিত আতঙ্ক ও ভয়। এই উগ্র ভয়াল প্রায় নগ্ন রূপ ব্রিটিশ মানসিকতাকে সজোরে আঘাত করে। রক্তপিপাসু এবং যৌনতার প্রতীক রূপেই কালীর পরিচয় হয়। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, শ্রীমৎ দক্ষিণাকালিকার ধ্যান মণ্ত্রে সর্বশেষ পঙ্ক্তির আগের পঙ্ক্তির অংশ বিশেষ ---".... মহাকালেন চ সমং বিপরীতরতাতুরাম ।।"অর্থাৎ, দেবী বিপরীত-রতাতুরা -- দেবীর ভৈরব মহাকাল। মহাকালের সাথে দেবী বিপরীত রতিতে সঙ্গতা হয়ে রয়েছেন। ( রতিকালে শায়িত পুরুষোপরি নারী আরোহণ করে ক্রীয়া নিষ্পন্ন করলে তাকে বিপরীত রতি বলে )। এক্ষেত্রে, ব্রক্ষ্মচৈতণ্যকে অধিষ্ঠান করে মায়াশক্তিরূপিণী কালী জগত সৃষ্টি করে চলেছেন। আর এখানেই প্রচ্ছন্ন ভাবে লুকিয়ে আছে যৌনতা ও সৃষ্টির পারস্পরিক মেলবন্ধন।কালীকে নিয়ে অবজ্ঞা ভাব তখনকার বহু বিদেশী বিদ্বদজনের মধ্যেও দেখা যায়। এমনকি পণ্ডিত ম্যাক্সমুলার ও কালীকে নিয়ে বিশেষ আগ্রহ দেখান নি। তবে পরবর্তীতে বিশেষত উনিশশো ষাট ও সত্তরের দশকে কালীর এই ব্যতিক্রমী স্ত্রী সত্ত্বা বহু গবেষণার মূল বিষয় হয়ে ওঠে। কালী শব্দের ব্যুৎপত্তি ও অর্থ সম্পর্কিত প্রচলিত ধারনা সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত উল্ল্যেখ ব্যতিরেকে এই আলোচনা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। কু ধাতুর উত্তরে অল্ + কর্তৃবাচ্যে অন্ যুক্ত হয়ে কাল পদটি হয়। এর অর্থ হলো মৃত্যু বা মহাকাল অর্থাৎ মহাদেব। এই কাল শব্দের উত্তরে স্ত্রীলিঙ্গে ঈপ্ প্রত্যয় যুক্ত হয় কালী শব্দটির সৃষ্টি হয়েছে। অর্থ হলো মহাকালের বিশেষ শক্তি কালী। দশমহাবিদ্যার ইনিই প্রথম মহাবিদ্যা। অনন্তকালের সৃষ্টিরুপিণী পরমা প্রকৃতির রূপ এই মহাশক্তি কালী। শ্রী শ্রী চণ্ডী মতে কালী তিনি, যিনি 'কাল' নিয়ন্ত্রন করেন। 'কাল' অর্থে সময়। বেদ তত্ত্ব অনুসারে তিনি আদি শক্তি - মহাকাল শিবের অর্ধাঙ্গিনী! শক্তি উপাসনা এ ক্ষেত্রে অনেকাংশেই পুরুষ তথা শিব নির্ভর। তবে তন্ত্র মতে কালীর দৈবী সত্ত্বা বহুলাংশে স্বাধীন ও একক। এই মতবাদ অনুযায়ী কালী শব্দের মধ্যে 'কল' ধাতু আছে। কল্ ধাতুর ভাবগত অর্থ হলো গণনা, গতি, আশ্রয়, শব্দ, সংখ্যা ! তাই কালী শব্দের তাৎপর্য হলো সংখ্যায়নী গতি সম্পন্না যিনি। শিবের বুকের উপর দণ্ডায়মান কালী - এটা সৃষ্টি তত্ত্বের প্রথমিক পর্যায়ের ইঙ্গিতবাহী। সাংখ্য দর্শন বলে পুরুষ অক্রিয় , প্রকৃতির সংস্পর্শে তিনি সক্রিয় হয়ে ওঠেন। তাই পুরুষ শিব এখানে শব রূপে শায়িত। বস্তুবাদী এই দর্শন অনুসারে পুরুষ স্থানু বা স্থির ধর্মী , প্রকান্তরে তীব্র ধনাত্মক শক্তি। আর নারী চরিষ্ণু বা ঋণাত্মক। এই দুই বিপরীতধর্মী শক্তির পারস্পরিক মিলনে সৃষ্টির সূচনা। আর তারই প্রতীক নিস্ক্রিয় শিবের বুকে চঞ্চলা কালীর পদ চারণা! মধ্যযুগীয় তন্ত্র মতোবাদের প্রসারে এই সাংখ্য দর্শনের যথেষ্ট প্রভাব দেখা যায়।কালী নারী সত্ত্বার এমন এক রূপ যা স্বয়ংসম্পূর্ণ, প্রচলিত স্ত্রী ভাবনার পরিপন্থী, অনন্য। তাঁর দৈবী ভাবমূর্তি বিতর্কিত ও বটে। কারণ কালী পৃথক - লোল জিহ্বা, উন্মুক্ত স্তন, নগ্ন জঙ্ঘা অথচ অনায়াস সাবলীল ভঙ্গিমায় এক ব্যতিক্রমী চরিত্র। আবহমান কাল ধরেই ভক্তি মার্গে তাঁর আসনে উপেক্ষার ছায়া। তাঁর রণরঙ্গিণী রক্ত লোলুপ নির্লজ্জ রূপে তথা কথিত সভ্য মন সদা বিব্রত - সে একাল হোক বা সেকাল। বেদ ও পুরানের অকুণ্ঠ সমর্থন সত্ত্বেও তাঁর ঐশী অস্তিত্বের সামগ্রিক গ্রহনীয়তা দীর্ঘসময় ধরে ছিল অবহেলিত। এখানে এও এক লড়াইয়ের কাহিনি--- আপস না করার লড়াই। অতি প্রাচীনকাল থেকেই কালী আধুনিক। তাঁর বলিষ্ঠ ব্যক্তিত্বকে কখনই আরোপিত মনে হয় না। যুদ্ধ ক্ষেত্রে প্রবল পরাক্রমে অসুর নিধন তাকে কখনই অসহজ করে তোলে না। এই স্বাচ্ছন্দ্যই হয়তো নারী ক্ষমতায়নের প্রথম সোপান।শ্রীশ্রী মা কালীর নাম উৎপত্তি ও রূপভেদ:--- ব্রহ্মযামল নামক তন্ত্রগ্রন্থের মতে, কালী বঙ্গদেশের অধিষ্ঠাত্রী দেবী। ‘কালী’ শব্দটি ‘কাল’ শব্দের স্ত্রীলিঙ্গ। এই শব্দের অর্থ ‘কৃষ্ণ’ (কালো) বা ‘ঘোর বর্ণ’। মহাকাব্য মহাভারত-এ যে ভদ্রকালীর উল্লেখ আছে, তা দেবী দুর্গারই একটি রূপ। মহাভারত-এ ‘কালরাত্রি’ বা ‘কালী’ নামে আরও এক দেবীর উল্লেখ পাওয়া যায়। ইনি যুদ্ধে নিহত যোদ্ধৃবর্গ ও পশুদের আত্মা বহন করেন। আবার হরিবংশ গ্রন্থে কালী নামে এক দানবীর উল্লেখ পাওয়া যায়। ‘কাল’ শব্দের দুটি অর্থ রয়েছে: ‘নির্ধারিত সময়’ ও ‘মৃত্যু’। কিন্তু দেবী প্রসঙ্গে এই শব্দের মানে "সময়ের থেকে উচ্চতর"। সমোচ্চারিত শব্দ ‘কালো’র সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক না থাকলেও, সংস্কৃত সাহিত্যের বিশিষ্ট গবেষক টমাস কবার্নের মতে, ‘কালী’ শব্দটি ‘কৃষ্ণবর্ণ’ বোঝানোর জন্যও ব্যবহৃত হতে পারে।★ রূপভেদ- তন্ত্র পুরাণে দেবী কালীর একাধিক রূপভেদের উল্লেখ পাওয়া যায়। তোড়লতন্ত্র অনুসারে, কালী আট প্রকার। যথা: দক্ষিণকালিকা, সিদ্ধকালিকা, গুহ্যকালিকা, শ্রীকালিকা, ভদ্রকালী, চামুণ্ডাকালিকা, শ্মশানকালিকা ও মহাকালী। মহাকাল সংহিতার অনুস্মৃতিপ্রকরণে নয় প্রকার কালীর উল্লেখ পাওয়া যায়। যথা: দক্ষিণাকালী, ভদ্রকালী, শ্মশানকালী, কালকালী, গুহ্যকালী, কামকলাকালী, ধণকালিকা, সিদ্ধিকালী, চণ্ডিকালিকা। শ্রী অভিনব গুপ্তের তন্ত্রালোক ও তন্ত্রসার গ্রন্থদ্বয়ে কালীর ১৩টি রূপের উল্লেখ আছে। যথা: সৃষ্টিকালী, স্থিতিকালী, সংহারকালী, রক্তকালী, যমকালী, মৃত্যুকালী, রুদ্রকালী, পরমার্ককালী, মার্তণ্ডকালী, কালাগ্নিরুদ্রকালী, মহাকালী, মহাভৈরবঘোর ও চণ্ডকালী। জয়দ্রথ যামল গ্রন্থে কালীর যে রূপগুলির নাম পাওয়া যায়, সেগুলি হল: ডম্বরকালী, রক্ষাকালী, ইন্দীবরকালিকা, ধনদকালিকা, রমণীকালিকা, ঈশানকালিকা, জীবকালী, বীর্যকালী, প্রজ্ঞাকালী ও সপ্তার্নকালী। নিম্নে মা কালীর মূল রূপগুলির (অষ্টধা কালী) ব্যাখ্যা দেবার চেষ্টা করলাম।● দক্ষিণাকালী- দক্ষিণাকালী হলো কালীর সর্বাপেক্ষা প্রসিদ্ধ মূর্তি। ইনি প্রচলিত ভাষায় শ্যামাকালী নামেও আখ্যাতা। দক্ষিণাকালী করালবদনা, ঘোরা, মুক্তকেশী, চতুর্ভূজা এবং মুণ্ডমালাবিভূষিতা। তাঁর বামকরযুগলে সদ্যছিন্ন নরমুণ্ড ও খড়্গ; দক্ষিণকরযুলে বর ও অভয় মুদ্রা। তাঁর গাত্রবর্ণ মহামেঘের ন্যায়; তিনি দিগম্বরী। তাঁর গলায় মুণ্ডমালার হার; কর্ণে দুই ভয়ানক শবরূপী কর্ণাবতংস; কটিদেশে নরহস্তের কটিবাস। তাঁর দন্ত ভয়ানক; তাঁর স্তনযুগল উন্নত; তিনি ত্রিনয়নী এবং মহাদেব শিবের বুকে দণ্ডায়মান। তাঁর দক্ষিণপদ শিবের বক্ষে স্থাপিত। তিনি মহাভীমা, হাস্যযুক্তা ও মুহুর্মুহু রক্তপানকারিনী। তাত্ত্বিকের তাঁর নামের যে ব্যাখ্যা দেন তা নিম্নরূপ: দক্ষিণদিকের অধিপতি যম যে কালীর ভয়ে পলায়ন করেন, তাঁর নাম দক্ষিণাকালী। তাঁর পূজা করলে ত্রিবর্ণা তো বটেই সর্বোপরি সর্বশ্রেষ্ঠ ফলও দক্ষিণাস্বরূপ পাওয়া যায়।● সিদ্ধকালী- সিদ্ধকালী কালীর একটি অখ্যাত রূপ। গৃহস্থের বাড়িতে সিদ্ধকালীর পূজা হয় না; তিনি মূলত সিদ্ধ সাধকদের ধ্যান আরাধ্যা। কালীতন্ত্র-এ তাঁকে দ্বিভূজা রূপে কল্পনা করা হয়েছে। অন্যত্র তিনি ব্রহ্মরূপা ভুবনেশ্বরী। তাঁর মূর্তিটি নিম্নরূপ: দক্ষিণহস্তে ধৃত খড়্গের আঘাতে চন্দ্রমণ্ডল থেকে নিঃসৃত অমৃত রসে প্লাবিত হয়ে বামহস্তে ধৃত একটি কপালপাত্রে সেই অমৃত ধারণ করে পরমানন্দে পানরতা। তিনি সালংকারা। তাঁর বাম পদ শিবের বুকে ও দক্ষিণ পদ শিবের উরুদ্বয়ের মধ্যস্থলে সংস্থাপিত।● গুহ্যকালী- গুহ্যকালী বা আকালীর রূপ গৃহস্থের নিকট অপ্রকাশ্য। তিনি সাধকদের আরাধ্য। তাঁর রূপকল্প ভয়ংকর: গুহ্যকালীর গাত্রবর্ণ গাঢ় মেঘের ন্যায়; তিনি লোলজিহ্বা ও দ্বিভূজা; গলায় পঞ্চাশটি নরমুণ্ডের মালা; কটিতে ক্ষুদ্র কৃষ্ণবস্ত্র; স্কন্ধে নাগযজ্ঞোপবীত; মস্তকে জটা ও অর্ধচন্দ্র; কর্ণে শবদেহরূপী অলংকার; হাস্যযুক্তা, চতুর্দিকে নাগফণা দ্বারা বেষ্টিতা ও নাগাসনে উপবিষ্টা; বামকঙ্কণে তক্ষক সর্পরাজ ও দক্ষিণকঙ্কণে অনন্ত নাগরাজ; বামে বৎসরূপী শিব; তিনি নবরত্নভূষিতা; নারদাদিঋষিগণ শিবমোহিনী গুহ্যকালীর সেবা করেন; তিনি অট্টহাস্যকারিণী, মহাভীমা ও সাধকের অভিষ্ট ফলপ্রদায়িনী। গুহ্যকালী নিয়মিত শবমাংস ভক্ষণে অভ্যস্তা। মুর্শিদাবাদ-বীরভূম সীমান্তবর্তী আকালীপুর গ্রামে মহারাজা নন্দকুমার প্রতিষ্ঠিত গুহ্যকালীর মন্দিরের কথা জানা যায়। মহাকাল সংহিতা মতে, নববিধা কালীর মধ্যে গুহ্যকালীই সর্বপ্রধানা। তাঁর মন্ত্র বহু – প্রায় আঠারো প্রকারের।● মহাকালী- তন্ত্রসার গ্রন্থমতে, মহাকালী পঞ্চবক্ত্রা ও পঞ্চদশনয়না। তবে শ্রীশ্রীচণ্ডী-তে তাঁকে আদ্যাশক্তি, দশবক্ত্রা, দশভূজা, দশপদী ও ত্রিংশলোচনা রূপে কল্পনা করা হয়েছে। তাঁর দশ হাতে রয়েছে যথাক্রমে খড়্গ, চক্র, গদা, ধনুক, বাণ, পরিঘ, শূল, ভূসুণ্ডি, নরমুণ্ড ও শঙ্খ। ইনিও ভৈরবী; তবে গুহ্যকালীর সঙ্গে এঁর পার্থক্য রয়েছে। ইনি সাধনপর্বে ভক্তকে উৎকট ভীতি প্রদর্শন করলেও অন্তে তাঁকে রূপ, সৌভাগ্য, কান্তি ও শ্রী প্রদান করেন।● ভদ্রকালী- ভদ্রকালী নামের ভদ্র শব্দের অর্থ কল্যাণ এবং কাল শব্দের অর্থ শেষ সময়। যিনি মরণকালে জীবের মঙ্গলবিধান করেন, তিনিই ভদ্রকালী। ভদ্রকালী নামটি অবশ্য শাস্ত্রে দুর্গা ও সরস্বতী দেবীর অপর নাম রূপেও ব্যবহৃত হয়েছে। কালিকাপুরাণ মতে, ভদ্রকালীর গাত্রবর্ণ অতসীপুষ্পের ন্যায়, মাথায় জটাজুট, ললাটে অর্ধচন্দ্র ও গলদেশে কণ্ঠহার। তন্ত্রমতে অবশ্য তিনি মসীর ন্যায় কৃষ্ণবর্ণা, কোটরাক্ষী, সর্বদা ক্ষুধিতা, মুক্তকেশী; তিনি জগৎকে গ্রাস করছেন; তাঁর হাতে জ্বলন্ত অগ্নিশিখা ও পাশযুগ্ম। গ্রামবাংলায় অনেক স্থলে ভদ্রকালীর বিগ্রহ নিষ্ঠাসহকারে পূজিত হয়। এই দেবীরও একাধিক মন্ত্র রয়েছে। তবে প্রসিদ্ধ চতুর্দশাক্ষর মন্ত্রটি হল – ‘হৌঁ কালি মহাকালী কিলি কিলি ফট স্বাহা’।● চামুণ্ডাকালী- চামুণ্ডাকালী বা চামুণ্ডা ভক্ত ও সাধকদের কাছে কালীর একটি প্রসিদ্ধ রূপ। দেবীভাগবত পুরাণ ও মার্কণ্ডেয় পুরাণ-এর বর্ণনা অনুযায়ী, চামুণ্ডা চণ্ড ও মুণ্ড নামক দুই অসুর বধের নিমিত্ত দেবী দুর্গার ভ্রুকুটিকুটিল ললাট থেকে উৎপন্ন হন। তাঁর গাত্রবর্ণ নীল পদ্মের ন্যায়, হস্তে অস্ত্র, দণ্ড ও চন্দ্রহাস; পরিধানে ব্যাঘ্রচর্ম; অস্তিচর্মসার শরীর ও বিকট দাঁত। দুর্গাপূজায় মহাষ্টমী ও মহানবমীর সন্ধিক্ষণে আয়োজিত সন্ধিপূজার সময় দেবী চামুণ্ডার পূজা হয়। পূজক অশুভ শত্রুবিনাশের জন্য শক্তি প্রার্থনা করে তাঁর পূজা করেন। অগ্নিপুরাণ-এ আট প্রকার চামুণ্ডার কথা বলা হয়েছে। তাঁর মন্ত্রও অনেক। বৃহন্নন্দীকেশ্বর পুরাণে বর্ণিত চামুণ্ডা দেবীর ধ্যানমন্ত্রটি এইরূপ - নীলোৎপলদলশ্যামা চতুর্বাহুসমন্বিতা । খট্বাঙ্গ চন্দ্রহাসঞ্চ বিভ্রতী দক্ষিণে করে ।। বামে চর্ম্ম চ পাশঞ্চ ঊর্দ্ধাধোভাগতঃ পুনঃ । দধতী মুণ্ডমালাঞ্চ ব্যাঘ্রচর্মধরাম্বরা ।। কৃশোদরী দীর্ঘদংষ্ট্রা অতিদীর্ঘাতিভীষণা । লোলজিহ্বা নিমগ্নারক্তনয়নারাবভীষণা ।। কবন্ধবাহনাসীনা বিস্তারা শ্রবণাননা । এষা কালী সমাখ্যাতা চামুণ্ডা ইতি কথ্যতে ।।● শ্মশানকালী- কালীর "শ্মশানকালী" রূপটির পূজা সাধারণত শ্মশানঘাটে হয়ে থাকে। এই দেবীকে শ্মশানের অধিষ্ঠাত্রী দেবী মনে করা হয়। তন্ত্রসাধক কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ রচিত বৃহৎ তন্ত্রসার অনুসারে এই দেবীর ধ্যানসম্মত মূর্তিটি নিম্নরূপ:----"শ্মশানকালী দেবীর গায়ের রং কাজলের মতো কালো। তিনি সর্বদা বাস করেন। তাঁর চোখদুটি রক্তপিঙ্গল বর্ণের। চুলগুলি আলুলায়িত, দেহটি শুকনো ও ভয়ংকর, বাঁ-হাতে মদ ও মাংসে ভরা পানপাত্র, ডান হাতে সদ্য কাটা মানুষের মাথা। দেবী হাস্যমুখে আমমাংস খাচ্ছেন। তাঁর গায়ে নানারকম অলংকার থাকলেও, তিনি উলঙ্গ এবং মদ্যপান করে উন্মত্ত হয়ে উঠেছেন।"শ্মশানকালীর আরেকটি রূপে তাঁর বাঁ-পাটি শিবের বুকে স্থাপিত এবং ডান হাতে ধরা খড়্গ। এই রূপটিও ভয়ংকর রূপ। তন্ত্রসাধকেরা মনে করেন, শ্মশানে শ্মশানকালীর পূজা করলে শীঘ্র সিদ্ধ হওয়া যায়। রামকৃষ্ণ পরমহংসের স্ত্রী সারদা দেবী দক্ষিণেশ্বরে শ্মশানকালীর পূজা করেছিলেন। কাপালিকরা শবসাধনার সময় কালীর শ্মশানকালী রূপটির ধ্যান করতেন। সেকালের ডাকাতেরা ডাকাতি করতে যাবার আগে শ্মশানঘাটে নরবলি দিয়ে শ্মশানকালীর পূজা করতেন। পশ্চিমবঙ্গের অনেক প্রাচীন শ্মশানঘাটে এখনও শ্মশানকালীর পূজা হয়। তবে গৃহস্থবাড়িতে বা পাড়ায় সর্বজনীনভাবে শ্মশানকালীর পূজা হয় না। রামকৃষ্ণ পরমহংস বলেছিলেন, শ্মশানকালীর ছবিও গৃহস্থের বাড়িতে রাখা উচিত নয়।● শ্রীকালী- গুণ ও কর্ম অনুসারে শ্রীকালী কালীর আরেক রূপ। অনেকের মতে এই রূপে তিনি দারুক নামক অসুর নাশ করেন। ইনি মহাদেবের শরীরে প্রবেশ করে তাঁর কণ্ঠের বিষে কৃষ্ণবর্ণা হয়েছেন। শিবের ন্যায় ইনিও ত্রিশূলধারিনী ও সর্পযুক্তা।সেকালের কালী পূজা:----আজ আমরা যে কালীমূর্তির আরাধনা সর্বত্র দেখতে পাই, তার রূপটি (দক্ষিণাকালী) সর্বপ্রথম বিখ্যাত তন্ত্রসাধক কৃষ্ণানন্দ আগমবাগিশ (১৬ শতক) কল্পনা করেছিলেন বলে কথিত আছে। শোনা যায়, তিনি অমাবস্যার রাতে স্বহস্তে কালীমূর্তি তৈরি করে সে-রাতেই নিজে পূজা সম্পন্ন করে প্রতিমা বিসর্জন দিতেন। অবশ্য অনেকে মনে করেন যে, তাঁর আগেও বাঙলায় কালী আরাধনা প্রচলিত ছিল। এ-ভাবেই বাঙলার কালী আরাধনার সঙ্গে যুক্ত হয়ে গেছে কৃষ্ণনগরের মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্রের নাম। জনশ্রুতি এই যে, এই কালীভক্ত রাজা আদেশ দিয়েছিলেন যে, তাঁর রাজ্যে প্রতি গৃহস্থকে কার্তিকী অমাবস্যায় তার বাড়িতে কালীপূজা করতে হবে, অন্যথায় শাস্তি পেতে হবে। তাঁর পরবর্তী দুই পুরুষও এই আদেশ বহাল রাখেন। এর ফলে শুধু কৃষ্ণনগর জেলাতেই নাকি দশ সহস্রাধিক বাড়িতে কালীপূজা অনুষ্ঠিত হতো, যার পরিণতিতে ঐ অঞ্চলে শ্যামাপূজার রাত্রিতে পূজারী ব্রাহ্মণের অভাব দেখা দেয়। কালীপূজায় ঐ জেলায় পশুবলিও নাকি হতো প্রায় দশ হাজারের মতো। চিন্তাহরণ চক্রবর্তী রচিত ‘বাঙলার পূজাপার্বন’ বইটিতে এই তথ্য পাওয়া যায়। এই লেখকের মতে আঠারো শতকের শেষের দিকেও কালীপূজা বাংলাদেশে ততটা জনপ্রিয় হয়নি। ‘তন্ত্রসার’-এর মতো প্রাচীন কোনো গ্রন্থে কালীপূজার উল্লেখ নেই। যে ‘শ্যামাসপর্যা’ গ্রন্থে এই পূজার উল্লেখ পাওয়া যায়, তা অপেক্ষাকৃত আধুনিক।রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের পৌত্র ঈশানচন্দ্রের কালী আরাধনা নিয়েও অনেক কাহিনী শোনা যায়। কালীপূজায় তাঁর এক হাজার মণ মিষ্টান্ন ও সেই ওজনের চিনি, চাল-কলা ইত্যাদি সহ এক হাজারটি শাড়ি ও মেয়েদের এক হাজার রেশমি পোশাক ইত্যাদির হাজার রকমের ভোগ নিবেদনের কাহিনী পাওয়া যায়। ঐ কাহিনী অনুসারে এই কালীপূজায় মহিষ, পাঁঠা ও ভেড়া (প্রতিটি এক হাজার করে) বলি দেবার খরচ পড়েছিল প্রায় দশ হাজার টাকা আর পূজার অন্যান্য খরচ ধরলে আরও প্রায় কুড়ি হাজার টাকা! এই বেহিসেবী ব্যয় মেটাতে গিয়ে ঈশানচন্দ্রকে নাকি সর্বস্বান্ত হতে হয়েছিল।কালীপূজার আড়ম্বরে এমনই নিঃস্ব হয়ে যাওয়া আর এক রাজার গল্প পাওয়া যায় শ্রীরামপুরের মিশনারি উইলিয়াম ওয়ার্ডের লেখায় (১৮১৫)। এই রাজা রামকৃষ্ণ বরানগরে কালীর এক মর্মরমূর্তি প্রতিষ্ঠার উৎসবে নাকি তখনকার দিনে এক লক্ষ টাকা ব্যয় করেছিলেন। ওয়ার্ড লিখেছেন, কালীর নামে রাজা বিপুল সম্পত্তি দান করেছিলেন, সেই সম্পত্তির আয় থেকে দৈনিক পাঁচশ’ লোক খাওয়ানো হয়।... কালীপূজার খরচের ফলে এখন তিনি প্রায় সর্বস্ব হারিয়েছেন।সারা বাংলাদেশ জুড়ে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য ‎ঐতিহ্যমন্ডিত কালী-আরাধনার কেন্দ্র আর তাদের নিয়ে প্রচলিত নানা কাহিনীরও শেষ নেই! যেমন, মুর্শিদাবাদের ডাহাপাড়ার দেবী কীরিটেশ্বরী, জনশ্রুতি - বাংলার নবাব মীরজাফর অসুস্থ অবস্থায় এই দেবীর চরণামৃত পান করতেন। এ-রকম আরো কয়েকটি কালীমন্দিরের মধ্যে উল্লেখযোগ্য শান্তিপুরে শাক্ত কৃষ্ণানন্দ আগমবাগিশ আর বৈষ্ণব অদ্বৈত আচার্যের বংশধরদের প্রতিষ্ঠিত কালী, রামপ্রসাদের সাধনপীঠ কুমারহট্টের (হালিশহর) ও কমলাকান্তের কোটালহাটের কালী, ভদ্রপুরে মহারাজা নন্দকুমারের প্রতিষ্ঠিত দ্বিভুজা কালী, বিষ্ণুপুরের ময়নাপুরে প্রাচীন কালী, কালনা, সিঙ্গুর ও রাণাঘাটের সিদ্ধেশ্বরী, সিউড়ি ও নবদ্বীপের ভবতারিণী, চূঁচুড়ার দয়াময়ী, নলহাটির ললাটেশ্বরী, শেওড়াফুলির নিস্তারিনী, বাগনানের মহাকালী, বর্ধমানের কঙ্কালেশ্বরী ইত্যাদি ইত্যাদি। এছাড়া বীরভূমে বীরসিংহপুরের কালী, অম্বিকা-কালনার দারুময়ী অম্বিকা ও ২৪ পরগ্ণার ময়দার কালীও বিখ্যাত।পশ্চিমবঙ্গের বাইরেও বিশ্রুত কালীক্ষেত্রের সংখ্যা নেহাত কম নয়। ঝাড়খন্ডে ধানবাদের নিকটবর্তী কল্যাণেশ্বরী ও রাজরাপ্পার ছিন্নমস্তার মন্দির ভক্তদের কাছে সুপরিচিত। এ ছাড়া পূর্ববঙ্গে (বাংলাদেশ) বিক্রমপুরে সোনারঙের কালী, ঢাকার জয়দেবপুরে শ্মশানকালী, বগুড়ার কালঙ্কেশ্বরী (বা প্রেতাসনা কালী), ত্রিপুরার মেহারে মেহার-কালী ইত্যাদিও সুপরিচিত। তমলুকের দেবী বর্গভীমা এবং কাঁথির কপালকুণ্ডলার নামাঙ্কিত মন্দির বা বাঁশবেড়িয়ার হংসেশ্বরী মন্দিরে পূজিতা দেবীও আদতে কালীরই নানা রূপ। বীরভূমের তারাপীঠে পূজিতা দেবী কালীর নিকটতম রূপান্তর তারার মন্দিরের কথা ছেড়ে দিলেও সেখানে রয়েছে বোলপুরের কাছে কঙ্কালী, ভাঙ্গালি ও বর্ধমান সীমান্তে অট্টহাস ইত্যাদি কালী-উপাসনা স্থলগুলি, যার মধ্যে কয়েকটি শক্তিপীঠ হিসেবে পরিগণিত হয়ে থাকে। এছাড়াও রয়েছে নানা ডাকাতের নামের সঙ্গে জড়িত অগণিত কালীমন্দির।এ-রকমই একটি, সিঙ্গুরের ডাকাতকালীর মন্দির দেখতে যাবার এক বিবরণ মেলে যোগেন্দ্রনাথ গুপ্তের বিখ্যাত বই ‘বাংলার ডাকাত’-এ। শেওড়াফুলি যাবার পথের বর্ণনা দিয়ে তিনি লিখছেন, “শীর্ণ সংকীর্ণ সর্পিল পথ। চৈত্র মাস। শুষ্ক পথের পাশে স্থানে স্থানে জঙ্গলঘেরা ডোবা। অতিকষ্টে মন্দিরের কাছে আসিলাম। ডাকাত কালীর মন্দির ভগ্ন ও জীর্ণ। ইঁট খসিয়া পড়িতেছে। এদিক ওদিক সাপ ছোটাছুটি করিতেছে। দিনের বেলায়ও অন্ধকার। মন্দিরে ভীষণাকৃতি কালীমূর্তি। ভিতরে আবর্জনা পূর্ণ।......একপাশে একটি বড় হাড়িকাঠভূমিতে পড়িয়া আছে।......আমি ডাকাতে কালীকে দেখিতে আসিয়া ভয়ে বিস্ময়ে শিহরিয়া উঠিলাম...। নানা আগাছায় পূর্ণ ভয়াল স্থান। দিনের বেলায়ও ভয় করে।...” সিঙ্গুরের এই ডাকাতে কালীর মন্দির কিন্তু আজও আছে, যদিও প্রাচীন জরাজীর্ণ মন্দিরের সংস্কার হয়েছে। এই কালীর নাম সিদ্ধেশ্বরী। গগন সর্দার, সনাতন বাগদি, রঘু ডাকাত ইত্যাদি নানা ডাকাতের নাম ও গল্প সিঙ্গুরের এই কালীর সঙ্গে জড়িত।এই সূত্রে কালীপূজোয় আরও দুটি বিদেশী-লিখিত নরবলির বিবরণের উল্লেখ এখানে করা যায়। একটি পর্তুগীজ জার্নালে ক্যাপটেন নরোনহা নামে এক ধর্মভীরু পর্তুগীজের বিবরণ পাওয়া যায়। মেদিনীপুরের কাছাকাছি কোনো স্থানে ডাকাতদের সঙ্গে গিয়ে তিনি এক বটগাছের নীচে তিনি তাদের আরাধ্যা কালীমূর্তি দেখতে পান। বলি হিসেবে সেখানে দু’টি অর্ধমূর্ছিত বালক ও অদুরে সিঁদুর মাখানো খড়গ দেখে তিনি ভয়ে সেখান থেকে পালিয়ে যান। আর একটি বিবরণ যার লেখা, তিনি ধর্মে ক্যাথলিক হলেও পেশায় ছিলেন ডাকাত। এক স্থানীয় জমিদারের পৃষ্ঠপোষকতায় তিনি খুলনা ও নোয়াখালি অঞ্চলে ডাকাতি করতেন, পরে পালিয়ে যান সুন্দরবনের গভীরে। সেখানে তিনি ‘ভবানীপূজা’র আয়োজন করেন বলে জানিয়েছেন, যাতে নরবলির জন্য মানুষ কেনাবেচার কথা পাওয়া যাচ্ছে ও বলির যোগ্য মানুষের লক্ষণ মিলিয়ে সওদা করছেন স্ব্য়ং পুরোহিত!ওয়ার্ডের বিবরণে এরকম আরো কালীভক্তদের বিবরণ মেলে, যারা কালীপূজো উপলক্ষে বিপুল ব্যয় করতেন, যেমন ধরা যাক, খিদিরপুরের ন্যায়নারায়ণ ঘোষাল বা গোপীমোহন নামে কলকাতার এক বৈষ্ণব ব্রাহ্মণ। প্রথমজন নাকি ১৭৯৫ সাল নাগাদ কালীপূজায় পঁচিশ হাজার টাকা ব্যয় করে ২৫টি মহিষ, ১০৮টি পাঁঠা ও ৫টি ভেড়া বলি দিয়েছিলেন। অপর ব্যক্তি ১৮১১ সালে কালীপূজায় দশ হাজার টাকা ব্যয় করেছিলেন।কলকাতার আরেক বাবু শোভাবাজারের কালীশঙ্কর ঘোষের বাড়ির কালীপূজার আড়ম্বরের বিবরণ পাওয়া যায় হরিহর শেঠের লেখায়ঃ- “কালীশঙ্কর ঘোষের বাটীতে তান্ত্রিকমতে অতি ভয়ানক ভাবে কালীপূজা হইত। শ্যামাপূজার রাত্রে মদ্যপান অব্যাহতভাবে চলিত এবং বলির রক্তে প্রাঙ্গণ ভরিয়া যাইত, নর্দমা দিয়া রক্তস্রোত বহিয়া যাইত।” এই বাড়ির পূজোতেই পশুবলির বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছেন পূর্বে উল্লিখিত পাদ্‌রি ওয়ার্ড তাঁর বইয়ে। বাড়ির মাঝখানে খোলা আঙিনায় রয়েছে বলির পশুগুলি, পাশেই স্ব্য়ং কালীশংকর। তাঁর কয়েকজন সঙ্গী ও বলির কাজে সহায়তার জন্য জনা বিশেক লোক। আঙ্গিনার চারদিক ঘিরে দালান, তার একটি ঘরে উত্তরমুখী করে প্রতিমা বসানো, অপর কয়েকটি ঘর দর্শকে ঠাসা। এর পর এই পাদরি জানিয়েছেন যে, প্রথমে বলি পড়ে পাঁঠা, তারপর মহিষ ও সবশেষে দু’ তিনটি ভেড়া। ওয়ার্ডের বর্ণনা কিছুটা শোনা যাকঃ- “একজন পূজারী বলি দেওয়া পাঁঠার মুন্ডুটি ধরে নাচতে নাচতে মূর্তির সামনে নিয়ে গেল। সদ্য কাটা মুন্ড থেকে তাজা রক্ত তার সর্বাঙ্গে গড়িয়ে পড়তে থাকে। বলিদান শেষ হলে কালীশঙ্কর, যে লোকটি বলি দিল, তাকে গাঢ় আলিঙ্গনে আবদ্ধ করলেন। তাকে বস্ত্র ইত্যাদি প্রভূত জিনিষপত্র দান করা হলো। পশুর মুন্ড, রক্ত, দেহের বিভিন্ন অংশের মাংস পূজারী দেবীকে নিবেদন করলেন। তারপর বালির ওপর আগুন জ্বেলে ঘৃত সহযোগে হোম শুরু হলো। তখন সারা আঙিনা রক্তে ভাসছে।” এ-ছাড়াও কালীপূজার বিষয়ে ওয়ার্ড যে-সব তথ্য জানিয়েছেন, তার মধ্যে আছে, দেবীকে যে মদ্য নিবেদন করা হয়, তা কর্তা ও তাঁর ঘনিষ্ঠ মহলের লোকেরা একান্তে পান করে। আর প্রতিমার সম্মুখে নৃত্যগীতের মধ্য দিয়ে উৎসবের সমাপ্তি ঘটে।পশুবলি অবশ্য গৃহস্থ বাড়ির কালীপূজোয় ছিল বহুল প্রচলিত প্রথা। কাঁসারিপাড়ার মল্লিকবাড়িতে আর সিমলার হোগলকুঁড়িয়ায় গুহবাড়িতে কালীপূজোয় মহিষ বলির প্রথা ছিল বলে জানা যায়। পাঁঠা বলি তো ছিল সাধারণ ব্যাপার! আবার বিখ্যাত ধনী আশুতোষ দেবের (ছাতুবাবু) বাড়ির কালীপূজায় কোনো বলিই হতো না। ১৭৫৭ সালে সুতানুটি অঞ্চলে রাজা মাণিক বন্দ্যোপাধ্যায় প্রতিষ্ঠিত পুঁটে-কালীর মন্দিরে বৈশিষ্ট্যই ছিল অসংখ্য বলিদান। পলাশির যুদ্ধের সমকালে যখন কলকাতার অধিকাংশ জায়গা ছিল জঙ্গলাকীর্ণ, তখন ডাকাতি করতে যাবার আগে কালীমূর্তির সামনে এমন কি, নরবলি দেবার গল্পও শোনা যায়। চিতু ডাকাতের প্রতিষ্ঠিত চিত্তেশ্বরী কালী মন্দিরে ১৭৭৮ সালের গ্রীষ্মের এক অমাবস্যায় এমনই নরবলি হয়েছিল বলে জানা যায়। কালীঘাটেও কোম্পানির আমলে নাকি একবার নরবলির জন্য একজনের ফাঁসি হয়েছিল বলে ডঃ ডাফের বিবরণে উল্লিখিত আছে। কলকাতার সবচেয়ে বিখ্যাত কালীক্ষেত্র কালীঘাটের মন্দিরে কার্তিকী অমাবস্যায় কালী আরাধনার আড়ম্বরের উল্লেখ করে মিশনারি ওয়ার্ড জানিয়েছেন যে, এই পূজায় প্রায় হাজার চারেক লোকের সমাগম হতো। অনেকেই পূজা উপলক্ষে প্রচুর খরচ করত। ১৭৬৫ সালে রাজা নবকৃষ্ণ নাকি এই কালীমন্দিরের পূজোয় লাখ খানেক টাকা ব্যয় করেন ও মূর্তির জন্য দান করেন সোনার মুন্ডমালা। পাদরি ওয়ার্ডের বিবরণ অনুযায়ী এই রাজা কালীমূর্তির জন্য দান করেন হাজার টাকা মূল্যের সোনার হার সহ অন্যান্য অলঙ্কার ও রুপোর বাসনপত্র। তিনি দু’ হাজার আতুরকে অর্থদান করেন ও যে-পরিমাণ ভোজ্যবস্তু ও মিষ্টি দান করেন, তা দিয়ে খাওয়ানো হয়েছিল এক হাজার মানুষকে। এই বিশ্রুত কালীমন্দিরে কালীর নিত্যপূজাও হতো এবং সে সূত্রে এর সঙ্গে নানা ধনাঢ্য মানুষের নাম শোনা যায় নানাজনের লেখা বিবরণে ও সমকালের সংবাদপত্রের পাতায়। শোভাবাজারের রাজা গোপীমোহন দেব ১৮২২ সালে একবার কাড়ানাকাড়া বাজিয়ে ধূমধাম সহকারে কালীঘাটে পূজো দিয়েছিলেন ও এই পূজো দেখতে এত ভীড় হয় যে শান্তিরক্ষায় পুলিশের প্রয়োজন হয়েছিল। রাজা বাহাদুর কালীমূর্তির হাতের রুপোর খড়্গ আর সোনার নরমুন্ড গড়িয়ে দেওয়া ছাড়াও নানা রকমের অলঙ্কার পট্টবস্ত্র আর শাল-দোশালায় মূর্তিকে মন্ডিত করেন।অতীত বাঙলার, এমন কি, ভারত ও নেপালের নানা ধনী ভক্তজন নানা সময়ে কালীঘাটের কালীমূর্তির জন্য বিভিন্ন আভরণ দান করেন বলে শোনা যায়। দেবীর চারটি রুপোর হাত দিয়েছিলেন খিদিরপুরের গোকুলচন্দ্র ঘোষাল। পরে চারটি সোনার হাত দেন কলকাতার কালীচরণ মল্লিক। বেলেঘাটার রামনারায়ণ সরকার দিয়েছিলেন সোনার একটি মুকুট আর পাইকপাড়ার রাজা ইন্দ্রচন্দ্র সিংহ দেবীর সোনার জিভটি গড়িয়ে দেন। পাতিয়ালার মহারাজা দিয়েছিলেন দেবীমূর্তির গলার একশো আটটি নরমুন্ডের মালা, মূর্তির মাথার ওপরের রুপোর ছাতাটি নাকি দেন নেপালের প্রধান সেনাপতি জঙবাহাদুর।মূর্তির পরেই কালীঘাটের মন্দিরের ও মন্দির পরিসরের নানা অংশের নির্মাণেও রয়েছে নানা বিচিত্র মানুষের যোগদান। ১৭৭০-৭১ সাল নাগাদ মন্দিরের সামনের গঙ্গার ঘাটটি এক বিশ্বস্ত পাঞ্জাবি সৈনিক হুজুরিমল্লের শেষ ইচ্ছানুযায়ী বাঁধিয়ে দেয় ইংরেজ সরকার। কালীর বর্তমান মন্দিরটির নির্মাণ হয়েছিল বরিশার জমিদার সন্তোষ রায়চৌধুরী ও তাঁর উত্তরাধিকারীদের সৌজন্যে। এছাড়াও শ্যামরায়ের মন্দির, তোরণদ্বার, বিভিন্ন ভোগঘর, নহবতখানা ইত্যাদির নির্মাণের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাওয়ালির বৈষ্ণব জমিদার উদয়নারায়ণ মণ্ডল, গোরখপুরের টীকা রায়, শ্রীপুরের জমিদার তারকচন্দ্র চৌধুরী, তেলেনিপাড়ার জমিদার কাশীনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখের নাম। ১৮৩৫ সালে নাটমন্দিরটি তৈরি করান আন্দুলের জমিদার রাজা কাশীনাথ রায়। এখানে উল্লেখ করা যায় যে, এই নাটমন্দিরেই ১৮৯৯ সালে কালী সম্পর্কে তাঁর বিখ্যাত বক্তৃতা দিয়েছিলেন স্বামী বিবেকানন্দের বিদেশিনী শিষ্যা ভগিনী নিবেদিতা। সে এক অন্য কাহিনী!অ্যালবার্ট হলে [অর্থাৎ এখনকার কফি হাউস] কালী বিষয়ে তাঁর প্রথম বক্তৃতাটি দিয়েছিলেন আইরিশ দুহিতা নিবেদিতা। শ্রোতাদের মধ্যে ছিলেন কলকাতার শিক্ষিত সমুদায় ও ব্রাহ্মসমাজের নানা বিশিষ্ট ব্যক্তি, যেমন সত্যেন্দ্রমোহন ঠাকুর, ব্রজেন্দ্রনাথ গুপ্ত, ডাঃ নিশিকান্ত চ্যাটার্জি ও ড: মহেন্দ্রলাল সরকার প্রমুখ। সাধারণ শ্রোতারা নিবেদিতার ভাষণে সন্তুষ্ট হলেও কিছু তথাকথিত প্রগতিশীল ব্যক্তি তাঁর বক্তব্যের প্রতিবাদ করেন। নিবেদিতা এই বক্তৃতায় কুসংস্কারকে প্রশ্রয় দিচ্ছেন বলে সবচেয়ে তীব্র ভাষায় আক্রমণ করেন মহেন্দ্রলাল। কলকাতার কালীবিরোধীদের বক্তব্যের জবাব দেবার সুযোগ আসে যখন কালীঘাট মন্দিরের সেবায়েত হালদারেরা নিবেদিতাকে মন্দির প্রাঙ্গনে বক্তৃতা দিতে আমন্ত্রণ জানান। এই কালীঘাটেই নাটমন্দিরের চত্বরে নিবেদিতা ২৮শে মে শ্রোতায় ঠাসা এক সভায় কালী আরাধনার বলিপ্রথা, মূর্তিপূজা ও মূর্তির তথাকথিত কুৎসিত রূপ ইত্যাদি অভিযোগের জবাব দিয়েছিলেন। পরে তাঁর এই বক্তৃতা পুস্তিকাকারে প্রকাশ করেন মন্দির কর্তৃপক্ষ। উল্লেখযোগ্য যে, ‘কালী দি মাদার’ নামে নিবেদিতার একটি বইও আছে।কালীঘাটের কালীর প্রতি শুধু যে বাঙালি বা হিন্দুরাই ভক্তি বা বিশ্বাস পোষণ করতেন, এমন কিন্তু নয়। শোনা যায়, পাঞ্জাব আর বার্মা দখল করবার পর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির তরফে কালীঘাটে ষোড়শোপচারে পূজো পাঠানো হয়েছিল। মার্শম্যানের বিবরণেও এর সমর্থন মেলে। কালীপূজোয় কোম্পানির এই এলাহি খরচের পেছনে অবশ্য ভক্তির চেয়ে দেশী সেপাইদের সন্তুষ্ট করার বাসনাই সম্ভবত কাজ করেছিল। কিন্তু পাদরি ওয়ার্ড কালীঘাট সহ বিভিন্ন কালীমন্দিরে অহিন্দু ভক্তদের আনাগোনার কথা লিখেছেন। তিনি জানাচ্ছেন, “শুধু হিন্দুরাই যে এই কালো পাথরের দেবীমুর্তির পূজা করে, এমন কিন্তু নয়। আমি জানতে পেরেছি, অনেক ইয়োরোপীয় বা তাদের এ-দেশীয় স্ত্রীরা কালী মন্দিরে যায় ও দেবীর আরাধনায় হাজার হাজার টাকা ব্যয় করে। আমি যে-ব্রাহ্মণের সাহায্য নিয়ে এই বিবরণ প্রস্তুত করেছি, তিনি বলেছেন, তিনি...... বহুবার সাহেব-মেমদের কালী মন্দিরে পূজো দিতে পালকি করে আসতে দেখেছেন।...... তাঁকে মন্দিরের কর্তৃপক্ষ সুনিশ্চিত ভাবে জানিয়েছেন, কোনো প্রার্থনা নিয়ে কালীর কাছে দিতে ইয়োরোপীয়রা প্রায়ই এসে থাকে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির এক বিশিষ্ট কর্মচারী সম্প্রতি মামলা জিতে কালীদেবীকে দু’ তিন হাজার টাকা মূল্যের নানা সামগ্রী দান করেছেন।”কালীঘাটের মন্দির সম্পর্কে পাদ্রি ওয়ার্ড লিখেছেন, “কলকাতার কাছে কালীর এক বিখ্যাত মন্দির রয়েছে। সমগ্র এশিয়া, এমন কি, সমগ্র বিশ্বের হিন্দু এই দেবীর পূজা করে।” ওয়ার্ডের বিবরণে এই অতিরিক্ত সংবাদও পাওয়া যায় যে, প্রায় পাঁচশো মুসলমান নাকি প্রতি মাসে কালীকে পূজো দিয়ে যেতেন। এর পরে তাঁর অধিকন্তু মন্তব্যঃ- “কি আশ্চর্য ভাবেই না এই দেবীমূর্তি সাধারণ লোকের মনে প্রভাব বিস্তার করেছে! ......বাংলার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সমসংখ্যক গণিকারা এসেও মন্দিরে পূজো দিয়ে যায়। তাদের কারো প্রার্থনা উপপতির রোগমুক্তি, কেউ বা চায় তার ঘরে আরও বেশি লোকের আগমন!” পবিত্রকুমার ঘোষ জানিয়েছেন, একসময় অবিভক্ত বাংলার, পরে পূর্ব পাকিস্তানের জননেতা শহিদ সুরাওয়ার্দি নাকি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হবার বাসনায় কালীঘাটে মানত করেছিলেন ও কলকাতায় দু’জন লোক পাঠিয়ে তাঁর হিন্দু বন্ধুদের মারফৎ ‘বিরাট ডালা সাজিয়ে’ কালীঘাটে পূজো দেবার ব্যবস্থা করেছিলেন। আর একজন বিখ্যাত বাঙালি শিল্পপতি স্যার বীরেন মুখার্জিও নাকি প্রতি সপ্তাহে কালীঘাটের মন্দিরে পূজো দিতেন।কালীঘাট ব্যতিরেকে কলকাতার অন্যান্য প্রাচীন কালী মন্দিরগুলি নিয়েও আড়ম্বর-বৈচিত্র্যের কাহিনী কম নেই। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রতিপত্তিশালী দেওয়ান গোবিন্দরাম মিত্রের প্রতিষ্ঠিত সিদ্ধেশ্বরী কালীর মন্দির ছিল কলকাতার মনুমেন্টের থেকেও উঁচু, আর তা খ্যাত ছিল ‘ব্ল্যাক প্যাগোডা’ নামে। এই মন্দির বেশ কয়েকবার ঝড়ে আর ভূমিকম্পে ভেঙে পড়ে ও তা পুনরায় তৈরি করা হয়। তাঁর কালীপূজোর ঘটাও নাকি ছিল খুব বিখ্যাত।কলকাতার কালীমন্দিরগুলোর মধ্যে সম্ভবত প্রাচীনতা আর খ্যাতির বিচারে কালীঘাটের পরেই চিত্তেশ্বরী মন্দিরের নাম উল্লেখ্য। অতীতের সেই যুগে গঙ্গার তীর ধরে তীর্থযাত্রীরা চিৎপুরে দেবী চিত্তেশ্বরী বা চিত্রেশ্বরী কালীমন্দিরে পূজো দেবার পর মশাল জ্বালিয়ে দল বেঁধে যেত কালীঘাটে। জনশ্রুতি আছে, এই পথের ধারেই তীর্থযাত্রীদের ওপর লুঠপাট চালাতো চিতে ডাকাত, এমন কি, এইসব অসহায় যাত্রীকে ধরে নাকি বলিও দিত কালীর সামনে। এই চিতু ডাকাতের নাম থকেই দেবী চিত্তেশ্বরী বা চিৎপুর নামের জন্ম হয়েছে (বা এর উল্টোটাও হতে পারে), এমন লোকশ্রুতিও আছে (কলকাতা কলেক্টরেটের ১৭৬১ সালের এক পাট্টায়ও এ কথার উল্লেখ আছে)। জঙ্গলাকীর্ণ এই পায়ে চলা রাস্তাটি ইংরেজদের নথিতে পরিচিত ছিল পিলগ্রিমস রোড নামে। বর্তমানে এই চিত্তেশ্বরী মন্দিরে (কাশীপুরে) প্রতিষ্ঠিত বিগ্রহটি দুর্গা বা চন্ডীর হলেও কলকাতার আদিযুগে এটি যে কালীমন্দির হিসেবেই পরিচিত ছিল, তার বহু প্রমাণ আছে। ‘ক্যালকাটা রিভিয়ু’ পত্রিকায় ১৮৪৫ সালে লেখা হয়েছিল, “Chitrapur was noted for the temple of ChitreswariDeby or the goddess of Chitru, known among Europeans as the temple of Kali at Chitpore”। এখানে আরও লেখা হয়েছিল, “This was the spot where the largest number of human sacrifices was offered to the goddess in Bengal before the establishment of the British Government.” একই ধরনের কথা পাওয়া যায় কটন সাহেবের ‘ক্যালকাটাওল্ড অ্যান্ড নিউ’ গ্রন্থেও। এই বইটির মতে এই স্থানটি ছিল “noted for the temple of Chitru or Kalee, renowned for the number of human sacrifices formerly offered at her shrine.”কলকাতা বা তার উপকন্ঠের আর একটি প্রসিদ্ধ কালীক্ষেত্র দক্ষিণেশ্বর, যা রানি রাসমণি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ১৮৫৫ সালের ৩১শে মে এই মন্দিরে ভবতারিণী কালীর মূর্তি প্রতিষ্ঠার দিনের কাহিনী পাওয়া যায় ‘সমাচার দর্পণে’। সেদিন নাকি “কলিকাতার বাজার দূরে থাকুক্‌, পাণিহাটি, বৈদ্যবাটি, ত্রিবেণী ইত্যাদি স্থানের বাজারেও সন্দেশাদি মিষ্টান্নের বাজার আগুন হইয়া উঠে। এইমত জনরব যে পাঁচশত মণ সন্দেশ লাগে।” এই দক্ষিণেশ্বরের ভবতারিণীর পূজারী হিসেবে নিযুক্ত রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের দৌলতে এই মন্দির পরবর্তী কালে বিশ্বখ্যাত হয়ে ওঠে। অথচ একথা আজ হয়তো অনেকেই জানেন না, শ্রীরামকৃষ্ণের প্রধান শিষ্য বিবেকানন্দের এই মন্দিরে প্রবেশ নিষিদ্ধ হয়েছিল সমুদ্র অতিক্রম করে ম্লেচ্ছদেশে যাবার কারণে! এই মন্দিরের কালীকে নিয়ে ইংরেজিতে চমৎকার একটি কবিতা লিখেছিলেন হরীন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়।কলকাতার প্রাচীন ও প্রথম বারোয়ারি (সম্ভবত বাংলার প্রথম বারোয়ারি কালীপূজা), মধ্য কলকাতার "আদি বারোয়ারি কালী পূজা" নামে উদযাপিত হয়ে থাকে। ১৮৫৮ সালে, জনৈক শ্রী বিহারী লাল বসুর হাতে এই পূজাটি শুরু হয়। ১৯২৪-২৬ সালের মধ্যে পূজাটি বারোয়ারি কালী পূজায় পরিণত হয়। উল্লেখ্য যে সেই সময় বাংলায় কালী পূজার প্রচলন (সর্বজনীন ভাবে) সেই রকম ভাবে ছিল না।কলিকাতা কালিকাক্ষেত্রের গল্প-ইতিহাস “এই কলিকাতা কালিকাক্ষেত্র, কাহিনী ইহার সবার শ্রুত” সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের কবিতার এই কথাগুলো কিন্তু ফেলনা নয়। কলকাতার সঙ্গে কালীর সম্পর্ক এমনকি দুর্গাঠাকুরের চেয়েও বেশি পুরোনো। কলকাতা শহর গড়ে ওঠার আগেই দূর-দূরান্ত থেকে মানুষরা এসে ভিড় করে পুজো দিতেন কালীঘাটের মন্দিরে। কেউ কেউ তো ‘কলিকাতা’ নামের পিছনেও ‘কালী’ শব্দটির খোঁজ পেয়েছেন। সে হয়তো কষ্ট-কল্পনা, কিন্তু তা বলে কালীপুজোর সঙ্গে এই শহরের সম্পর্ক খুঁজতে কল্পনাবিলাসী হওয়ার প্রয়োজন নেই। এমনিতেই শহরজোড়া একাধিক বিখ্যাত কালীমন্দির। কালীঘাটের মন্দির ছাড়াও চিৎপুরের ডাকাতে কালী, ঠনঠনিয়ার সিদ্ধেশ্বরী কালী, ফিরিঙ্গি কালী বা দক্ষিণেশ্বরের ভবতারিণী। এইসব বিখ্যাত কালীমন্দিরের সঙ্গে জড়িয়ে কত রোমাঞ্চকর ইতিহাস। নেহাত ভক্তিরসের সামগ্রী নয় সেইসব গল্প। আর, কলকাতার কালীপুজো বলতে এই বিখ্যাত মন্দিরের বাইরেও হাজারো ইতিহাস। রাজ-রাজরা, ডাকাত, জমিদার, লালমুখো সাহেব, বড়োলোক সবাই সমাপতিত সেখানে। কলকাতার সবচাইতে বিখ্যাত কালীমন্দির কালীঘাটের পুজো নিয়েই গল্পের শেষ নেই। অনেকের মতে, এই কালীই কলকাতার অধিষ্ঠাত্রী দেবী। আর, এই মন্দিরে রাজাদের দানধ্যান-ব্যয়ের কথা বললে তো শেষই হবে নাকি। রাজা নবকৃষ্ণ, শোভাবাজারের রাজা গোপীমোহন দেব, খিদিরপুরের গোকুলচন্দ্র ঘোষাল, কালীচরণ মল্লিক, ইন্দ্রচন্দ্র সিংহ, পাতিয়ালার মহারাজ, নেপালের প্রধান সেনাপতি জঙ বাহাদুর প্রভৃতি ব্যক্তির দানের কথা আগেই বলা হয়েছে।দেবীর অঙ্গসজ্জার পাশাপাশি এই মন্দিরের গড়ে ওঠার, সেজে ওঠারও বিচিত্র ইতিহাস যা ইতিপূর্বেই সংক্ষেপে বর্ণিত হয়েছে, যার তথ্য গুনে শেষ করা যাবে না। শুধু কালীঘাট নয়, কলকাতার অন্যান্য সাবেক কালীমন্দিরগুলোর ইতিহাসও কম রঙিন নয়। ‘ব্ল্যাক প্যাগোডা’নামে প্রচলিত কোম্পানীর দেওয়ান গোবিন্দরাম মিত্র প্রতিষ্ঠিত সিদ্ধেশ্বরী কালীমন্দির, , দক্ষিণেশ্বরের ভবতারিণী মন্দির, অথবা কলকাতায় নানা বড়োলোক-অভিজাত মানুষদের বাড়ির কালীপুজোয় জাঁক-জমকের অন্ত ছিল না। পাশাপাশি, বড়লোকের বাড়ির কালীপূজায় অবধারিত ছিল পশুবলি। খিদিরপুরের ন্যায়নারায়ণ ঘোষালের পুজোয় বা শোভাবাজারের কালীশঙ্কর ঘোষের বাড়ির কালীপূজার টাকার পাশাপাশি মদ্য ও রক্তেরও বন্যা বইত। শুধু পশুবলিই নয়, নরবলির ঘটনাও শোনা যেত তখন কলকাতায়। অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে কলকাতা তখন জঙ্গলাকীর্ণ এক শহর। এখানে-সেখানে ডাকাতদের ডেরা। চিতু ডাকাত-প্রতিষ্ঠিত চিত্তেশ্বরী কালী মন্দিরে ১৭৭৮ সালের এক অমাবস্যায় নাকি নরবলি হয়েছিল। কালীঘাটেও নাকি নরবলি দেওয়া হয়েছিল একবার। ডঃ ডাফ লিখেছেন, এই নরবলির ঘটনায় কোম্পানির শাসকরা ফাঁসিতেও ঝুলিয়েছিলেন কয়েকজনকে। সেদিনের কলকাতা শহর আজকের তিলোত্তমা মহানগরী নয়। তার কালীপুজোর ধরণেও তাই ভক্তিরসের সঙ্গে অনায়াসে মিশে যায় বীভৎসতারস। পশুবলিকে ঘিরে রাজা-বাবুদের উদ্দামতার বিবরণ শুনে গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে। এবং, এরই পাশাপাশি মিশে থাকে বাবু-জমিদারদের আড়ম্বরের কথাও। কালীপুজোর রাতে কারণবারি তো ‘প্রসাদ’। তার নেশা সাত্ত্বিক নেশা। সেই ‘কারণবারি’ হোক না বিলিতি। ক্ষতি কী? মহেন্দ্রনাথ দত্ত লিখেছেন, শিমলার বসুবাড়ির বিখ্যাত কালীপুজোয় ততোধিক বিখ্যাত মদ্যপানের কথা। গৃহস্থ-ভক্ত সবাই মিলে মাটির গামলায় কারণবারি নিয়ে গোল হয়ে ঘিরে বসতেন। তারপর স্ট্র থুড়ি নল দিয়ে টানতেন সুরা। আবার শোভাবাজারের কালীশঙ্কর ঘোষের বাড়িতে তো ভৃত্য-গৃহিণী কেউই সুরারসে বঞ্চিত হতেন না। একবার নাকি নেশার ঘোরে পুরুতকেই বলি দেবার উপক্রম হয়েছিল। এই নিয়ে প্রাণকৃষ্ণের মজার গল্প আছে একখানা। কারণবারি প্রসাদে চুর এক ভৃত্য পদসেবা করতে গিয়ে কিছুতেই আর বাবুর পা খুঁজে পাচ্ছে না। গোটা বাড়ি জুড়ে পায়ের খোঁজে হইহই পড়ে গেল। বাবুর পা কোথায় গেল? পুজোমণ্ডপেও পা নেই। এদিকে পায়ের অভাবে বাবু নামতে-হাঁটতে পারছেন না। শেষে গিন্নিমা আদেশ দিলেন পুরুতমশাইয়ের বাড়িতে গিয়ে খোঁজ করার। নৈবেদ্যর সঙ্গে পা-টাও ভুলক্রমে চলে গেছে হয়তো। পুরুতমশাই সব শুনে খুবই বিনয়ের সঙ্গে বললেন, এত নৈবেদ্যর মধ্যে বাবুর পা খুঁজতে রাত কাবার হয়ে যাবে। খুঁজে পেলে কাল সকালে তিনি স্বয়ং বাবুকে পা ফিরিয়ে দিয়ে আসবেন।শুধু মদ্যপানে কি আর জমে পুজো? তাই, পুজোর পরে পার্টি হত। সেই পার্টিতে সাহেব-মেমরা আসতেন। বাইজি নাচ, কবিগান, পাঁচালি, তরজা, আখড়াই-হাফ আখড়াইতে মেতে থাকত আসর। পরে যুক্ত হল যাত্রাগান আর জেলেপাড়ার সঙ। তাছাড়া ছিল আতসবাজির পসরা। কালীপ্রতিমা নিয়ে বাজনা-আলো সহকারে শোভাযাত্রাতেও বেরোতেন বাবুরা। সেই শোভাযাত্রার জাঁক নিয়ে পরস্পরের মধ্যে রেষারিষিও ছিল তীব্র। সব মিলিয়ে কালীপুজো ব্যাপারটা মোটে সাধারণ এক উৎসব ছিল না কলকাতাবাসীর কাছে।সময় গড়িয়ে গেল ঢের। গঙ্গার মূল স্রোত সরে এসে আদিগঙ্গাও শুকিয়ে পরিণত হল খালে। সেইসব বাবুয়ানি-রাজ-রাজরাদের কালও শেষ হল। মহানগরীর সেইসব কালীপুজোও মুখ লুকোল ইতিহাসে। বিখ্যাত কালীমন্দিরগুলোর পুজোর কথা অবশ্য আলাদা। প্রথা মেনে তারা আজও বহমান। কিছু সাবেক পুজোও বেঁচে-বর্তে আছে কোথাও কোথাও। কিন্তু, ফাঁকা জমি-জঙ্গলাকীর্ণ আধো আলো-আধো অন্ধকারের সেই গা ছমছমে কলকাতার গায়ে কাঁটা দেওয়া কালীপুজোরা আর নেই। ডাকাতরা নেই, বলির বীভৎসতাও নেই। কিন্তু, ইতিহাসের গপ্পেরা এত সহজে মরে না। আতসবাজির মতো আকাশজুড়ে তাদের ছড়িয়ে পড়তে দেখাও কম লোভনীয় নয়।কত যে কালী কলকাতায়। এমনটা কোনও শহরে নেই। শাক্তধর্মের এমন জনপ্রিয়তা বঙ্গদেশ ছাড়া কোথাও মিলবে না। বিশ্বসৃষ্টির আদিকরণ তিনি। আবার অন্যমতে, ইনিই আদ্যাশক্তি মহাময়ী। তন্ত্র ও পুরাণে কালিকার নানা রূপভেদ যা পূর্বেই আলোচিত হয়েছে। বাংলা জুড়ে অবশ্য তার নানা নাম। কলকাতার উত্তরে দক্ষিণেশ্বরে তিনি মা ভবতারিণী আবার দক্ষিণের কালীঘাটে দেবী কালিকা। আদ্যাপীঠে আদ্যাকালী, কাশীপুরে চিত্তেশ্বরী, ঠনঠনিয়ায় সিদ্ধেশ্বরী, বউবাজারে ফিরিঙ্গি, কেওড়াতলায় শ্মশানকালী, টালিগঞ্জে করুণাময়ী, নিমতলায় আনন্দময়ী। কালীময় কলকাতার কথা কয়েক আঁচড়ে আঁকার চেষ্টা রইল এখানে। অবশ্যই সবার কথা বলা গেল না।ক্ষেত্রবিশেষে কিছু কিছু পুনঃকথন হলেও কলকাতার কিছু কালী মন্দির বিশেষ উল্লেখের দাবী রাখে।কালীঘাটের দেবীকালিকা: কালীঘাটের মন্দিরের গুরুত্ব বেড়েছে প্রকৃতপক্ষে সপ্তদশ শতাব্দীর শেষ দিকে। কালীঘাটে দেবীর চারটি আঙুল পড়েছিল। দেবী কালিকার ভৈরব নকুলেশ্বর। কিংবদন্তী কাশীর মতো পুণ্যক্ষেত্র কালীঘাটে কীটপতঙ্গ মরলেও সঙ্গে সঙ্গে তারা মুক্তি পেয়ে যায়। এই কালীপীঠ গড়ে ওঠার পিছনে নানা কাহিনির জাল বিস্তৃত। এমন একটা কাহিনি হল:যশোরের রাজা প্রতাপাদিত্যের খুল্লতাত শ্রীবসন্ত রায় একটি ছোট মন্দির নির্মাণ করেছিলেন। সেই সময় দেবীর সেবায়েত ছিলেন ভুবনেশ্বর ব্রহ্মচারী। তিনি ছিলেন অপুত্রক। তাঁর দৌহিত্র হালদাররাই বর্তমানে কালীঘাটের বিখ্যাত বংশ। মন্দিরের পূজা এখনও করে চলেছেন তাঁরা। বর্তমান মন্দির নির্মাণ হয় উনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে। শোনা যায় সাবর্ণ চৌধুরীর পরিবারের সন্তোষ রায় পঁচিশ হাজার টাকা ব্যয়ে বাংলার নিজস্ব ঘরানার চার চালা এবং তার উপর আর একটি ছোট চারচালার শিখর সমেত মন্দিরটি নির্মাণ শুরু করেছিলেন। তাঁর পুত্র রামনাথ রায় ও ভ্রাতষ্পুত্র রাজীবলোচন রায় ১৮০৯ সালে মন্দির নির্মাণ সম্পূর্ণ করেন। পরবর্তী কালে আন্দুলের জমিদার কাশীনাথ রায় নাটমন্দির গড়ে দেন। নহবত্‌খানা ও দুটি ভোগের ঘর তৈরি করে দিয়েছিলেন গোরক্ষপুরের টিকা রায়। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিও মন্দিরের জন্য দুশো বিঘা জমি দান করেছিলেন। কালীঘাটের দেবীকালিকার রূপ মাহাত্ম্যের কথা তো আগেই বলা হয়েছে।কালীঘাটের মূল পূজা মূলত আটটি। রক্ষাকালী পুজো, স্নানযাত্রা, জন্মাষ্টমী, মনসাপুজো, চড়ক, গাজন ও রামনবমী। কালীপুজোর রাতে দেবীকে পুজো করা হয় লক্ষ্মীরূপে। কালী-শ্যামা নন দীপাবলিতে আরাধিত হন লক্ষ্মী।দক্ষিণেশ্বরের মা ভবতারিণী: কথিত রয়েছে এক বার কাশীযাত্রার আগের দিন ভোর রাতে জানবাজারের রানি মা রানি রাসমণির স্বপ্নে দেখা দিলেন মা জগদম্বা। রানিকে বললেন গঙ্গার পূর্ববর্তী তীরে মন্দির স্থাপনা করতে। কাশী যাওয়ার দরকার নেই। সেই স্বপ্নাদেশ শিরোধার্য করে ১৮৪৭ খ্রিস্টাব্দে ৬ সেপ্টেম্বর কলকাতা থেকে ছ’কিলোমিটার দূরে ভাগীরথীর তীরে সুপ্রিম কোর্টের অ্যাটর্নি জেমস হেস্টির কাছ থেকে ৬০ বিঘা জমি ৬০ হাজার টাকায় কিনলেন। ১৮৫৫ খ্রিস্টাব্দের ৩১ মে স্নানযাত্রার দিন গড়ে তুললেন সাদা রঙের নবরত্ন মন্দির। কাজটা সহজ ছিল না। কৈর্বত্য হরেকৃষ্ণ দাসের মেয়ে মন্দির গড়বে। এ ‘আস্পর্দা’ সে দিন মেনে নিতে পারেননি কুমারহট্ট হালিশহরের ব্রাহ্মণ ও উচ্চবর্ণের সমাজপতিরা। শেষপর্যন্ত সব বাধা দূর করে প্রতিষ্ঠিত হল কষ্ঠিপাথরের দেবীমূর্তি। সাধ করে রাসমণি তার নাম রাখলেন ভবতারিণী। মন্দিরের মেঝে শ্বেত ও কৃষ্ণ প্রস্তরাবৃত। সোপানযুক্ত উঁচুবেদী। বেদীর উপর সহস্র দল রৌপ্যপদ্ম। তার উপর দক্ষিণে মাথা ও উত্তরে শয়ান শ্বেতপাথরের শিবমূর্তি। মহাদেবের বুকের উপর ত্রিনয়নী ভবতারিণী রঙিন বেনারসি ও মহামূল্যবান রত্নঅলঙ্কারে ভূষিতা। ১৮৫৭-৫৮ খ্রিস্টাব্দে দাদা রামকুমার চট্টোপাধ্যায়ের কাছ থেকে পুজোর দায়িত্ব পান শ্রীরামকৃষ্ণ। এই মন্দিরই এই যুগাবতারের সাধনপীঠ।ঠনঠনিয়ার সিদ্ধেশ্বরী কালী: বর্তমান মন্দিরটি তৈরির অনেক আগেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল সিদ্ধেশ্বরী কালী এমন একটা মত প্রচলিত রয়েছে। জনশ্রুতি, উদয়নারায়ণ-ব্রহ্মচারী নামে এক তান্ত্রিক আনুমানিক ১৭০৩ খ্রিস্টাব্দে মাটি দিয়ে সিদ্ধেশ্বরী রূপের কালীর্মূতি গড়েন। তখন স্থানটি ছিল জঙ্গলাকীর্ণ। ১৮০৬ খ্রিস্টাব্দে শঙ্কর ঘোষ নামে এক ধনী ব্যক্তি কালীমন্দির ও পুষ্পেশ্বর শিবের আটচালা মন্দির নির্মাণ করেন। পুজোর ভারও নেন তিনি। কার্তিক অমাবস্যায় আদিকালীর পুজো ছাড়াও জৈষ্ঠ্যমাসে ফলহারিণী এবং মাঘ মাসে রটন্তী কালীর পুজো হয়।কাশীপুরের চিত্তেশ্বরী সর্বমঙ্গলা: গভীর জঙ্গল ঘেরা এক স্থান। ভাগীরথীর তীরে। সে জঙ্গলে বাস দুর্ষর্ধ ডাকাত দলের। সেই ডাকাত দলের পাণ্ডা রঘু ডাকাত। এই ডাকাত সর্দারের হাতেই প্রতিষ্ঠা পায় চিত্তেশ্বরী। নিয়মিত নরবলি হত এখানে। সর্দারের মৃত্যুর পর দায়িত্ব নেন রামশরণ সিমলাই নামে এক ব্রাহ্মণ। তিনি স্বপ্নাবিষ্ট হয়ে কাশীপুর গান অ্যান্ড শেল ফ্যাক্টারি রোড বা বর্তমানে খগেন চ্যাটার্জি রোডে নতুন বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করেন। রামশরণ প্রতিষ্ঠিত বিগ্রহটি নিমকাঠের রক্তবর্ণা ত্রিনয়নীদেবী চতুর্ভুজা ও সিংহবাহিনী। দেবীর হাত বর, অভয় মুদ্রা, খড়্গ ও কমণ্ডুলে বিভূষিতা। কথিত, রামপ্রসাদ কলকাতা থেকে হালিশহর নৌকাযোগে যেতে যেতে দেবীকে গান শুনিয়েছিলেন, ‘মা তারিণী শঙ্কর বৈরাগী তোর নাং...।’ মূল মন্দিরটি ১৬১০ খ্রিস্টাব্দে নির্মাণ করেছিলেন হুগলি জেলার মনোহর ঘোষ ওরফে মহাদেব ঘোষ।কাশীপুর আদি চিত্তেশ্বরী দুর্গা: এই দেবীর কাহিনিও প্রায় এক। তবে এখানে ডাকাতের নাম চিতু বা চিত্তেশ্বর রায়। ডাকাতি করতে যাওয়ার আগে চিতু ষোড়শপচারে দেবীর পুজো করত। আদি চিত্তেশ্বরী বলার কারণ কথিত প্রায় পাঁচশো বছর আগে এই দেবীর প্রতিষ্ঠা হয়েছিল। দেবীর নামেই জায়গাটির নাম চিত্‌পুর হয়ে ওঠে। এই দেবীও নিমকাঠ দিয়ে তৈরি। দেবীর বিগ্রহের সঙ্গে রয়েছে একটি বাঘের মূর্তি। জমিদার গোবিন্দরাম মিত্র মন্দিরটি পুনঃনির্মাণ করেছিলেন।বউবাজারের ফিরিঙ্গি কালী: ১৪৩৭ খ্রিস্টাব্দে তখন কোথায় কলকাতা কোথায় চিত্তরঞ্জন অ্যাভিনিউ। গভীর জঙ্গল, শ্মশান, অদূরে ভাগীরথী। সেই শ্মশানে ছোট একটি চালা ঘরে প্রতিষ্ঠিত ছিল শিবলিঙ্গ ও দেবীকালিকায় বিগ্রহ। শ্মশানে প্রতিষ্ঠিত হলেও দেবী ছিলেন সিদ্ধেশ্বরী। কালের বিবর্তনে শহর গড়ে উঠল। জনপদ সৃষ্টি হল। আনাগোনা শুরু হল পতুর্গিজ ও ইংরেজদের। তাদের মধ্যে ছিলেন পতুর্গিজ খ্রিস্টান অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি। এই ফিরিঙ্গি কালীভক্তের দৌলতে সিদ্ধেশ্বরী কালী লোকমুখে হয়ে উঠলেন ফিরিঙ্গি কালী। ১৮২০-১৮৮০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত এই মন্দিরের পূজারী ছিলেন শ্রীমন্ত পণ্ডিত। সাড়ে পাঁচ ফুট উচ্চতার বিগ্রহ ত্রিনয়নী। এই মন্দিরে শিব ও সিদ্ধেশ্বরী কালী ছাড়াও দুর্গা, শীতলা, মনসা ও নারায়ণের মূর্তি প্রতিষ্ঠিত রয়েছে। প্রতি পূর্ণিমায় সত্যনারায়ণ ও অমাবস্যায় বিশেষ কালীপুজো হয়ে থাকে।কলকাতার কালী মাহাত্ম্যের এ এক সামান্য অংশ। কলকাতার উত্তর থেকে দক্ষিণ ঐতিহ্যপূর্ণ কালী-মন্দিরের সংখ্যা অন্তত তিন ডজন। রাজ্যে সাধনপীঠ ও সতীপীঠ যোগ করলে সে সংখ্যাটি কমপক্ষে ২২২। এই সংখ্যাটি পরিণত ও জনপ্রিয় কালীমন্দির বা পীঠের। এ ছাড়াও এই শহর ও রাজ্যের নানা প্রান্তে জমিদার ও বনেদিবাড়িগুলিতে রয়েছে বহু কালীমন্দির। কলকাতায় এমনই বিখ্যাত ছয় বনেদিবাড়ি হল, হাটখোলার রামচন্দ্র দত্ত। হাটখোলারই জগত্‌রাম দত্ত। দর্জিপাড়ার নীলমণি মিত্র স্ট্রিটের মিত্রবাড়ি। সিমলার রামদুলাল সরকার ও সিমলারই তারক প্রামাণিকের বাড়ি।কালীর এই ভয়াবহ নগ্নিকা মূর্তি-ভাবনার পিছনে আদিম কোনও ধর্মধারা বা ‘কাল্ট’ এর প্রভাব রয়েছে বলে অনুমান করেন সমাজবিদেরা। তাঁদের অনেকেরই মতে কালী আদতে কোনও বৈদিক দেবী নয়। এ দেশের লোকায়ত মাটি থেকেই তার উদ্ভব। কোনও এক নগ্নিকা খড়্গ-মুণ্ডমালা শোভিতা যখন দেবী হিসাবে পূজিত হচ্ছেন তখন তা আদিম অরণ্যচারী মানুষের সংস্কৃতির কোনও ঐতিহ্যকে বহন করছে বলে মনে করা হয়। পরবর্তী কালে আর্য ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতির দেবীভাবনার সঙ্গে যুক্ত হয়ে কালী হিন্দু-ব্রাহ্মণ্যতন্ত্রের দেবীতে রূপান্তরিত হয়েছেন।"ওঁ ক্রীং কালিকায়ৈ নমঃ"তথ্যসূত্র:---১- Tantric visions of the divine feminine: th e ten mahavidyas By David R. Kinsley.২- Mother of my heart, daughter of my dreams By Rachel Fell McDermott.৩- Encountering Kali: in the margins, at the center, in the West By Rachel Fell McDermott, Jeffrey John Kripal.৪- The camphor flame: popular Hinduism and society in India By Christopher John Fuller..৫. বঙ্গদর্শন ও আনন্দবাজার পত্রিকা। ৬. পণ্ডিত শ্যামাচরণ কবিরত্ন বিরচিত শ্রী শ্রী কালীপূজা পদ্ধতি।৭. শ্রী শ্রী চণ্ডী // নীলিমা সান্যাল।৮. ইন্টারনেট // গুগল সার্চ।৯. বিশেষ কৃতজ্ঞতা স্বীকারঃ শুভজিৎ মুখার্জী।

কর্মতাপস আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় আদতে এক প্রফুল্ল স্মৃতি ।

একটি নারীই সবচেয়ে শক্তিশালী ও কার্যকর নেতৃত্ব দিতে পারেন ।।